English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

চামড়া শিল্প নগরী সাভারে স্থানান্তরের সুফল মিলছে না

  • তায়েফুর রহমান, সাভার (ঢাকা)   
  • ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর প্রবেশপথসহ ভেতরের সব রাস্তাঘাট এখনো বেহাল। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও কোনো কিছু হয়নি। তরল বর্জ্যও যে পুরোপুরি পরিশোধিত হচ্ছে, তাও বলা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতা আসবে কি না, এ নিয়ে শঙ্কিত ট্যানারি মালিকরা। বিসিক এ চামড়া শিল্প নগরী পুরোপুরি প্রস্তুত না করে ট্যানারি মালিকদের হাজারীবাগ থেকে সাভারে কারখানা স্থানান্তরে বাধ্য করলেও খুব একটা সুফল পাচ্ছে না মালিক-শ্রমিকরা।

হাজারীবাগের ট্যানারির কারণে দূষিত হচ্ছিল বুড়িগঙ্গা নদী। এখন সাভার চামড়া শিল্প নগরীর কারণে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী। ১৫ বছরেও এ চামড়া শিল্প নগরীর সিইটিপিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্পটির সুফল থেকে বঞ্চিত গোটা দেশসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অযোগ্যতা, সময়ক্ষেপণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন এবং ট্যানারি মালিক, শ্রমিক-কর্মচারী, বিসিক কর্মকর্তা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে জানা যায়।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বর্তমান অবস্থা সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, কঠিন বর্জ্যের ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরির কাজ এখনো শুরুই হয়নি। এ বর্জ্যের বেশির ভাগ পুকুর ও এর আশপাশে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের কথা বলা হলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সম্প্রতি মাটি ফেলে ধলেশ্বরী নদীর তীরের কাছে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সীমানাপ্রাচীর ভেঙে বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ হয়েছে। তবে অতিরিক্ত পানির চাপে ওই মাটি যেকোনো সময় সরে গিয়ে ফের দূষিত তরল বর্জ্য নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গোটা শিল্পাঞ্চলের রাস্তার অবস্থা বেহাল। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় কোনো যানবাহন চলার উপায় থাকে না। সড়কগুলোতে কোথাও এখন আর ইটের সন্ধান মেলে না। তবে সিইটিপির কাছে রাস্তায় আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ চলছে।

প্রকল্প এলাকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ওয়েট ব্লুর (কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের প্রাথমিক ধাপ) জন্য প্রস্তুত হয়েছে ১১৫টি ট্যানারি। এই ট্যানারি কারখানাগুলোর শ্রমিকরা সঠিক মাপের নেট ব্যবহার না করে চামড়ার টুকরা ড্রেনে ছেড়ে দেয়। এই কঠিন বর্জ্যের কারণে প্রায়ই ড্রেন উপচে তরল বর্জ্য রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতে ব্যবহূত লবণ পৃথক করার কোনো মেশিনও এখনো এ প্রকল্পে সংযুক্ত হয়নি। কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের চারটি মডিউলের মধ্যে প্রায় সব কটি স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাইপলাইনের কাজ শেষ। মডিউলগুলোতে এখন সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধন করা যাচ্ছে। এখনো সর্বশেষ পঞ্চম এলসির যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছয়নি।

চীনা ঠিকাদারি কম্পানির প্রকল্প কনসালট্যান্ট ও সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুল কাইয়ুম কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন তরল বর্জ্য ফিল্টার করার কাজ (ডি-ওয়াটারিং) করা হচ্ছে না। কারণ এ কাজে ব্যবহূত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এখনো দেশে এসে পৌঁছয়নি। পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতিও এখনো আসেনি।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সহকারী প্রকৌশলী সেহলী সাদেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৫৫টি প্লটের মধ্যে কমলা ট্যানারি ও নবীপুর ট্যানারি মোটেও কাজ শুরু করেনি। তাই তাদের নামে নেওয়া প্লট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া জামিলা ট্যানারি দেউলিয়া হয়ে পড়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে। তিনি আরো বলেন, কয়েকটি ট্যানারি তাদের অনুকূলে বরাদ্দ নেওয়া ট্যানারিতে নামমাত্র পাইলিংয়ের কাজ শুরু করে। পরে তাদের কাজের আর কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত না হওয়ায় তাদের অনেকের বরাদ্দও বাতিল হতে পারে।

এলাকাবাসীর দাবি, বর্জ্য পরিশোধন না করে দূষিত কেমিক্যালযুক্ত পানি নদীতে ফেলা যাবে না। তারা বলে, প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ করে সব ট্যানারি স্থানান্তর করা উচিত ছিল। সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না হলে এলাকায় ভীষণ দুরবস্থার সৃষ্টি হবে। এ কারণে বিদেশি ক্রেতাদের স্থায়ীভাবে হারাতে হবে। এ জন্য আগেভাগেই পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেওয়া উচিত বলে মনে করে তারা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, যে যুক্তিতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে ট্যানারি শিল্প মালিকদের কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সে যুক্তি কার্যকর হবে না যদি বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি ছাড়া এই স্থানান্তর করা হয়। সাভারের চামড়া শিল্প পল্লীতে এখনো সিইটিপি পুরোপুরি তৈরি নয়। সেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। হাজারীবাগে যেখানে বড় বড় ড্রেনেই পানি উপচে পড়ে সেখানে সাভারে ছোট ডায়ামিটারের পাইপ দিয়ে ড্রেনেজ চালু করা হয়েছে। এরই মধ্যে যে কয়টি ট্যানারি ওয়েট ব্লুর কাজ শুরু করেছে, তাতেই ওই এলাকায় ওভার ফ্লো হচ্ছে। সেই পানি ধলেশ্বরীতে পড়ে মাছ মারা গেছে। সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইয়ার্ডের কাজও শুরু হয়নি। এরই মধ্যে সেখানে সলিড ওয়েস্টে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এলাকাবাসী আন্দোলন করছে। স্থানটি পুরোপুরি এখনো প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় সব ট্যানারি উত্পাদনে গেলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। তিনি বলেন, চামড়া ওয়েট ব্লু করার পর ক্রাস্ট ও ফিনিশড করার যে দুটি ধাপ, তাতে গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এখন পর্যন্ত উত্পাদনে যাওয়া অনেক ট্যানারি কারখানায় গ্যাস সংযোগ প্রদান করা হয়নি। ট্যানারি মালিকদের যে প্লট দেওয়া হয়েছে, সে প্লটের কোনো দলিলও হস্তান্তর করা হয়নি।

ট্যানারি স্থানান্তর ও ধলেশ্বরী দূষণ সম্পর্কে সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ-এর সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হক বলেন, সরকারি উদ্যোগে এলাকার মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল ডিইপিজেড ও সাভার চামড়া শিল্প নগরী তৈরি করা হয়েছে। আর সেই শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এলাকার মানুষের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি ২০ বছর ধরে ফসলহীন এবং আগামী ২০-২৫ বছর এই জমিতে ফসল না হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধন না করে মাঝে মাঝে ধলেশ্বরী নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের করা পরীক্ষায়ও এর প্রমাণ মিলেছে। নানা কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পদার্থসংবলিত এই পানি তীরবর্তী এলাকার টিউবওয়েল ও কূপের পানির স্তরের সঙ্গে সংযোজিত হচ্ছে। আশপাশের পুকুরের স্তরের সঙ্গে সংযোজন হয়ে পুকুরের পানি দূষিত হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত আছে। পানি দূষিত হওয়ার কারণে দুর্গন্ধসহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

এদিকে শ্রমিকরা বলছে, হাজারীবাগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি জমি দিয়ে মালিকদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে, ১০ শতাংশ প্রণোদনাও প্রদান করা হচ্ছে। অথচ যে শ্রমিক হাত না লাগালে কারখানার চাকা ঘুরবে না, তাদের জন্য ন্যূনতম কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। শ্রমিকদের আবাসন, চিকিত্সাসেবার জন্য হাসপাতাল, ক্যান্টিন, স্কুল, ডে-কেয়ার সেন্টার, ইউনিয়ন (সিবিএ) কার্যালয়, এমনকি ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য ধর্মীয় উপাসনালয় বা একটি মসজিদও নির্মাণ করা হয়নি। থাকা-খাওয়া, যাতায়াত খরচসহ সব ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা দিশেহারা এবং মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

শেখ জাফর (৫২) নামের এক শ্রমিক বলেন, ৩০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় আছেন। এখন সব মিলিয়ে বেতন পান প্রায় ১৪ হাজার টাকা। থাকেন হাজারীবাগ এলাকায়। প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে তিনি কাজে আসার প্রস্তুতি নেন। কয়েকজন শ্রমিক মিলে একটি পরিবহনের ব্যবস্থা করেছেন। এতে প্রতিদিন যাতায়াত বাবদ তাঁর ৬০-৭০ টাকা খরচ হচ্ছে।

শিল্প বাণিজ্য- এর আরো খবর