English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

‘খাত’ মাদকের চালান মুক্ত খামারবাড়ির প্রতিবেদনে!

  • এস এম আজাদ   
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

খাত নামে পরিচিতি পাওয়া নিউ সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস (এনপিএস) জাতীয় মাদকদ্রব্য আমদানি করে খালাসের সময় সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে (খামারবাড়ি) পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল পণ্যটি গ্রিন টি। এমন ২২ কারবারির তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা, যারা গত কয়েক মাসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পোস্ট অফিস (জিপিও) বৈদেশিক পার্সেল শাখায় কার্টন রাখার পর প্রতিবেদন দেখিয়ে কিছু চালান ছাড়িয়ে নিয়েছে। একই ধরনের আমদানি পণ্য ডাকযোগে (জিপিও পার্সেলে) আফ্রিকার দেশ থেকে এলেও আগে আটকানো হয়নি।

ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারকারী কারবারিরা কিভাবে পণ্য খালাস করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, কাস্টমস ও পার্সেল শাখার লোকজন এই চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। খামারবাড়ি থেকে পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, খাত কারবারের সঙ্গে দেশ-বিদেশের বড় সিন্ডিকেট জড়িত। তাই তদন্তে ইথিওপিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গত রবিবার জিপিওর বৈদেশিক পার্সেল শাখা থেকে ৯৬টি কার্টনে ২০টি ঠিকানায় গ্রিন টি নামে এক হাজার ৫৮৬ দশমিক ৩৬ কেজি খাত জব্দ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় গত সোমবার পল্টন থানায় ২০ আমদানিকারকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় চা পাতার গুঁড়ার মতো দেখতে পণ্যগুলো এনপিএস-জাতীয় বলে প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি।

গতকাল মঙ্গলবার সিআইডির উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শাহ আলম বলেন, অর্গানাইজড ক্রাইম (সিরিয়াস ক্রাইম স্কোয়াড) শাখার অভিযানে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় খাত চালানটি রবিবার জব্দ করা হয়। আমদানিকারক হিসেবে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যেহেতু এগুলো পোস্ট অফিসের মাধ্যমে এসেছে, কোনো বহনকারী নেই। তবে যারাই জড়িত থাকবে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, আগের চালানগুলো থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে কাজ করা হবে। তদন্তে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারব। প্রয়োজনে ইথিওপিয়ায় ড্রাইভ দেওয়া হবে।

সিআইডির এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, এশা এন্টারপ্রাইজের চালানটি ছাড়া বাকি চালানগুলো আগে আসে। সম্প্রতি প্রশাসনের তোড়জোড় দেখে এগুলো ছাড়াতে কেউ আসেনি। তবে আগে তারা ছাড়িয়ে নিয়েছে অনেকবার। কাস্টমসের কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্যগুলো গ্রিন টি বলে দাবি করার পর কারবারিরা খামারবাড়ি থেকে নমুনা পরীক্ষা করে তাঁদের দেখিয়েছে। জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, পরীক্ষার নমুনা নেওয়ার সময় কাস্টমসের কেউ ছিল কি না তার খোঁজ নেই। কারবারিরা কিভাবে, কী নিয়ে পরীক্ষা করল? এর দায় কার? এসব প্রশ্নের জবাব মিলছে না। এ ছাড়া যাদের ঠিকানা সঠিক নেই এরা কিভাবে জিপিওতে গিয়ে পণ্য খালাস করল? এতে বোঝা যায় লোক সবখানে আছে। সিআইডি সব খতিয়ে দেখবে।

সূত্র জানায়, এক হাজার ৬০০ কেজি খাত ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে এসেছে। এশা এন্টারপ্রাইজ ছাড়া বাকি আসামিদের মধ্যে মতি মিয়ার আট কার্টন, একরামুলের পাঁচ কার্টন, উজ্জল মিয়ার তিন কার্টন, আলমগীর হোসেনের তিন কার্টন, সাইফুল ইসলামের চার কার্টন, মুন্নার দুই কার্টন, রাশেদ হোসেনের এক কার্টন, লতিফের দুই কার্টন, ওবায়দুরের দুই কার্টন, শাহ আলমের দুই কার্টন, বাদলের দুই কার্টন, জয়ের এক কার্টন, আতিকুল্লাহর এক কার্টন, আমিনের এক কার্টন, রুহুল আমিনের এক কার্টন, মুশফিকের দুই কার্টন, মিজানুরের এক কার্টন এবং এস এম সাইফুল ইসলামের চার কার্টন খাত জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া গুলশানের সানি অঙ্গেল প্যালেস প্রতিষ্ঠানের নামে এসেছে তিন কার্টন।

জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব ফারহান কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা আসামিদের ঠিকানা যাচাই করে বিভিন্ন সূত্র ধরে তদন্ত করছি। এদের পরিচয় ও অবস্থানের ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাবে না।

সূত্র জানায়, উদ্ভিদজাতীয় পণ্য আমদানি করাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। এই হিসেবে গ্রিন টি আমদানিতে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট দেখাতে হয়। তবে কারবারিরা জালিয়াতির মাধ্যমে ভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার পরিচালক অমিতাভ দাশ বলেন, মূলত দেশের অভ্যন্তরের কৃষিজাত পণ্য আমাদের শাখা থেকে পরীক্ষা করা হয়। এখানে এক্সপার্ট গ্রুপ আছে। তবে আমদানির পণ্যগুলো পরীক্ষা করা হয় সংঘনিরোধ শাখা থেকে। তারা ছাড়পত্র দিয়েছে কি না আমার জানা নেই।

সিআইডির সূত্র জানায়, ৯৬টি কার্টনের মধ্যে ৪২টি এশা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। প্রতি কার্টনে ১৬ কেজি করে চালানের পরিমাণ ৬৭২ কেজি। গত ৩০ আগস্ট ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফ নামে এ চালান আসে। শনিবার এশার নামে আসা ১৬০ কেজির আরেকটি চালান জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউস। সোমবারও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গোয়েন্দারা এশা এন্টারপ্রাইজের নামে আসা ১৪৫ কেজি খাত জব্দ করেন। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে ঢাকার তুরাগ থানাধীন বাউনিয়ার ব্লক : ডি, সড়ক : ২, হাউস নম্বর : ২৮। ডিএনসি ও সিআইডির দল অভিযান চালিয়ে ওই ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব পায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বাবুর ব্যাপারে তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। বাবুকে ধরতে অভিযান চলছে।

গত ৩১ আগস্ট বিমানবন্দরে দেশের ইতিহাসে প্রথম খাত চালান আটক করে ডিএনসি। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে জব্দ হয়েছে দুই হাজার ৮০০ কেজি খাত। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফ ঢাকার শান্তিনগরের নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজের নামে চালানটি পাঠায়। সেদিন বিমানবন্দর ও শান্তিনগর প্লাজা থেকে ৮৬০ কেজি খাতসহ নাজিম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর গত বুধবার বিমানবন্দরে ২০ কেজি, শনিবার ১৬০ কেজি এবং সোমবার ১৪৫ কেজি খাত জব্দ করা হয়। এসব ঘটনার তদন্তে ঢাকায় আরেক কারবারির তথ্য পেয়েছেন ডিএনসির গোয়েন্দারা।

ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া ছাড়াও কেনিয়া থেকে খাত আসছে। এ ছাড়া জিবুতি, উগান্ডা, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে খাতের গাছ উৎপাদন করা হয়। আসক্তিটা অনেকটা ইয়াবার মতো। সেবন করলে অনিদ্রা, অবসাদ, ক্ষুধামান্দ্যসহ মানবদেহে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে আসক্ত হওয়া ব্যক্তি।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর