English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সাফল্য

এবার ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটন

  • বাকৃবি প্রতিনিধি   
  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনকারী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এবার ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) দুই দল গবেষক এই সাফল্য পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদলে ছিলেন দুজন প্রবাসী বাংলাদেশিও। তাঁদের হাত ধরেই বিশ্বে এই প্রথম জানা গেল ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল কাজ করেছে শুধু পদ্মার ইলিশ নিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল পদ্মা, মেঘনা ও সমুদ্রের ইলিশ নিয়ে কাজ করেছে।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনের এই আসাধারণ সাফল্যের কথা জানান সংবাদ সম্মেলন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম ও তাঁর সহযোগী গবেষকরা। তাঁরা দেশীয় ইলিশের জীবনরহস্য প্রস্তুতকরণ, জিনোমিক ডাটা বেইস স্থাপন এবং মোট জিনের সংখ্যা নির্ণয় গবেষণায় সাফল্য পেয়েছেন বলে জানান।

ড. সামছুল আলম ছিলেন ইলিশ জিনোম সিকোয়েন্সিং ও অ্যাসেম্বলি টিমের সমন্বয়ক। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াসহ সব জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোম দ্বারা। ইলিশের জিনোমে ৭৬ লাখ ৮০ হাজার নিউক্লিওটাইড রয়েছে, যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স (জিন নকশা) জানার মাধ্যমে অসংখ্য অজানা প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে খুব সহজেই।

এই গবেষক বলেন, বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে ইলিশের স্টকের সংখ্যা (একটি এলাকায় মাছের বিস্তৃতির পরিসীমা) কতটি এবং দেশের পদ্মা, মেঘনা নদীর মোহনায় প্রজননকারী ইলিশগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্টক কি না তা জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে। বছরে দুইবার ইলিশ প্রজনন করে থাকে। জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে এই দুই সময়ের ইলিশ জিনগতভাবে পৃথক কি না তা-ও জানা যাবে। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট নদীতে জন্ম নেওয়া পোনা সাগরে যাওয়ার পর বড় হয়ে প্রজননের জন্য আবার একই নদীতেই ফিরে আসে কি না সেসব তথ্যও জানা যাবে এই জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে।

অধ্যাপক সামছুল আলম আরো বলেন, এ রকম নতুন নতুন তথ্য উন্মোচনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে ইলিশের টেকসই আহরণ। ইলিশের জন্য দেশের কোথায় কোথায় ও কতটি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। দেশীয় ইলিশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের (ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য) ইলিশ থেকে জিনতাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র কি না তা-ও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

গবেষকরা বলেন, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করেন তাঁরা। গত বছরের ৩১ জুলাই ইলিশের পূর্ণাঙ্গ ডি-নোভো জিনোম অ্যাসেম্বলি প্রস্তুত হয়। ওই বছরের ২৫ আগস্ট ইলিশের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিনোম ডাটা বেইস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনে (এনসিবিআই) জমা করা হয়। এ ছাড়া ইলিশের জিনোম বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল দুটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই গবেষকদলের সদস্য হিসেবে আরো ছিলেন পোল্ট্রিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা, বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম এবং ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম কাদের খান।

এক বছর আগে থেকেই ইলিশের জীবনরহস্য নিয়ে কাজ শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা খানের নেতৃত্বে আরো একটি গবেষকদল। সেই গবেষকদলের সদস্যরাও সাফল্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

অধ্যাপক হাসিনা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, আসলে ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন কোনো ছোট কাজ নয়। সবাই মিলেই এই কাজটি করলে ভালো হয়। প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মং সানু মারমা এ বিষয়ে গবেষণার প্রস্তাব দেন। এর পর থেকেই মূলত কাজ শুরু করেছি। আমরা শুধু পদ্মার ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচনে কাজ করেছি। তবে আমাদের তথ্য ৯৫ শতাংশ নির্ভুল।

এই গবেষক আরো বলেন, আমরা আমাদের কাজটি শেষ করেছি বিনা ফান্ডে। তবে আমি অপেক্ষা করছিলাম সরকারের সহযোগিতার জন্য। কারণ পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে হলে অনেক কাজ আছে, যা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আর যদি সরকার এগিয়ে না আসে তাহলে আমরা এটা ইন্টারন্যাশনাল জিন ব্যাংকে পাবলিকেশন্সের জন্য জমা দেব।

তাঁদের এই গবেষণায় আরো রয়েছেন প্রবাসী আরেক বিজ্ঞানী আবদুল বাতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়ন ও অণুজীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম, প্রভাষক ফারহানা তাসনিম চৌধুরী, তরুণ গবেষক অলি আহমেদ, অভিজিৎ দাস, তাসনিম এহসান, জুলিয়া নাসরিন ও রিফাত নেহলিন।

এর আগে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে একদল বাংলাদেশি গবেষক পাটের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করেন ২০১৩ সালে।

বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে গত বছর। এর আগের বছর বাংলাদেশের জামদানি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনের পর এবার এর পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে পারবে বাংলাদেশ।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর