English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রী বললেন

জনগণ ভোট দিলে থাকব না দিলে নয়

  • কালের কণ্ঠ ডেস্ক   
  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, কৃষিবিদদের লক্ষ রাখতে হবে বাংলাদেশকে আবার যেন খাদ্যের জন্য কারো কাছে হাত পাততে না হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে এবং খাদ্যের জন্য যেন আর কোনো দিন বাংলাদেশকে কারো কাছে হাত পাততে না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (কেআইবি) ষষ্ঠ জাতীয় কনভেনশন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সামনে আমাদের নির্বাচন, আমরা একটানা দুই মেয়াদে থাকলাম (রাষ্ট্র ক্ষমতায়), তৃতীয় মেয়াদে জনগণ ভোট দিলে আসব, না দিলে নয়। কিন্তু আমরা চাই, যে অগ্রযাত্রাটা শুরু করেছি, বাংলাদেশকে আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছি, সেটা যেন থেমে না থাকে।

তিনি বলেন, আমাদের আওয়ামী লীগের নীতি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করব, কারো কাছে হাত পাতব না। আর বিএনপির নীতি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া যাবে না, বিদেশ থেকে ভিক্ষা আনতে হবে।

তিনি কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য বিজ্ঞানী, কৃষিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আর যেন বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে ভিক্ষার হাত বাড়াতে না হয় সেদিকে বিশেষভাবে কৃষিবিদরা লক্ষ রাখবেন, আমরা সেটাই চাই। এটুকুই আপনাদের কাছে অনুরোধ করে যাচ্ছি।

কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং কেআইবি সভাপতি এ এম এম সালেহ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। আইএফডিসির প্রেসিডেন্ট এবং সিইও স্কট জে অ্যাঞ্জেল এবং কেআইবি মহাসচিব মো. খায়রুল আলম প্রিন্সও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। কৃষিবিদ ড. মীর্জা আব্দুল জলিল, ড. আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল মান্নান এবং কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

কৃষিক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে কৃষিবিদ বাহাউদ্দিন নাছিমকে কেআইবির পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা পদকে ভূষিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু আমাদের এখন এসব পণ্যে ভ্যালু অ্যাড করতে হবে, প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। কারণ আমাদের দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে, বিদেশে বাজারও তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই এগুলো আমরা দেশে যেমন বিক্রি করতে পারব তেমনি বিদেশেও রপ্তানি করতে পারব।

তাই কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণের দিকে আমাদের বিশেষভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। সে জন্য আমরা উৎসাহিত করছি আমাদের বিনিয়োগটা যেন এদিকে হয়। আমরা তাহলে অর্থনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী হতে পারব, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বল্প মেয়াদি, মধ্য মেয়াদি এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তাঁর সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলেও এ সময় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশের মানুষ খাবারের জন্য হাহাকার করত। বিদেশ থেকে চাল আমদানি করেও চাহিদা মেটানো যেত না। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আমরা যখন সরকার গঠন করি, তখন দেশে ৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। ২০০১ সালে আমাদের দায়িত্ব ছাড়ার সময় ঘাটতি পূরণ করে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে দেশকে আবার খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত করে। কারণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে বিদেশ থেকে নাকি খাদ্য সাহায্য আসবে না। লুটপাটও বন্ধ হয়ে যাবে।

রাসায়নিক সার, সেচ, জ্বালানি তেল এবং কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করার জন্য তাঁর সরকার কৃষিতে বিপুল ভর্তুকির ব্যবস্থা করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন বর্গাচাষিদের মধ্যে জামানত ছাড়াই নামমাত্র সুদে কৃষিঋণ দেওয়া হচ্ছে। দুই কোটি আট লাখ ১৩ হাজারেরও বেশি কৃষক কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে কৃষি সহায়তা পাচ্ছে। মাত্র ১০ টাকায় কৃষকদের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশ আজ কৃষিপণ্য উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এখন দানাদার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাল, শাক-সবজি, মাছ-মাংসসহ বেশ কিছু কৃষিপণ্য আমরা বিদেশে রপ্তানি করছি। বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মৎস্য উৎপাদনে তৃতীয়, ফসলের জাত উৎপাদনে প্রথম অবস্থানে রয়েছে।

কৃষি গবেষণা, উপকরণ সরবরাহ ও সম্প্রসারণ সেবা খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজকের এ উন্নতি অর্জন সম্ভব হয়েছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

উন্নয়নের জন্য গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে বলেন, এরই মধ্যে খরা, লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু বেশ কিছু ফসল, ফলদবৃক্ষ ও অন্যান্য গাছের উচ্চফলনশীল জাত আপনারা উদ্ভাবন করেছেন। এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

তাঁর সরকার কৃষি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন অ্যাগ্রিকালচারকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, পটুয়াখালী কৃষি কলেজ ও দিনাজপুরের হাজী দানেশ কৃষি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কৃষিসংশ্লিষ্ট শাখা খোলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কেমন হবে সেই পরিকল্পনা করে আমরা ডেল্টা প্ল্যান করেছি। সেখানে কৃষি ও পানিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। ব্লু-ইকোনমি শক্তিশালী করার জন্য সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্রও করা হয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত তাঁর সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে আমরা ভাসমান কৃষি ক্ষেত করতে পারি। এরই মধ্যে গোপালগঞ্জের কিছু জায়গায় শুরু হয়েছে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। তিনি বলেন, আমার এলাকায় (গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া-কোটালিপাড়া) কচুরিপানার ওপর বেড তৈরি করে মানুষকে ফসল ফলাতে দেখেছি। এরপর কৃষিমন্ত্রীকে বলেছি। সারা দেশে একই প্রক্রিয়ায় চাষাবাদ শুরু করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কিন্তু অনেকে এভাবে চাষ করতে শুরুও করে দিয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প নিয়ে আমরা প্রতিটি পরিবারকে উৎসাহিত করছি। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক করে দিয়েছি। কেউ ১০০ টাকা সঞ্চয় করলে ব্যাংক থেকে তাকে আরো ১০০ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি বাড়বে। তিনি বলেন একই সঙ্গে কোথাও এক টুকরো জমিও খালি রাখা যাবে না, ফসল ফলাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা লাভের পর অল্প সময়ের মধ্যে জাতির পিতা এ দেশকে গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু তাঁর নেওয়া সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বন্ধ করে দেয় জিয়াউর রহমান ও পরবর্তী এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের উদ্দেশ্যই ছিল এ দেশের মানুষকে শোষণ করা। এ দেশের মানুষ ভিক্ষা করবে, এটাই চেয়েছিল ক্ষমতা দখলকারীরা। তিনি বলেন, বিএনপি যখন সরকারে ছিল, সারের জন্য কৃষকদের ধরনা দিতে হয়েছে। গুলি খেয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। কিন্তু এখন সারের জন্য ধরনা দিতে হয় না, বরং সারই কৃষকের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যায়।

প্রধানমন্ত্রী সারের দাম কমানো প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তিন দফায় সারের দাম কমিয়েছে। কৃষককে যেন ব্যাংকে আসতে না হয়, বরং ব্যাংকই কৃষকের দ্বারে গিয়ে তাকে ঋণ পৌঁছে দেয়, সেই ব্যবস্থাও করেছি।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আপদকালের জন্য খাদ্য মজুদ রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কখন বিপদ-আপদ আসে, বলা যায় না। একটা ফসলের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বহুমুখী ফসল চাষাবাদের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিপদের সময় যাতে খাদ্য সরবরাহ করতে পারি, যে জন্য সাইলো নির্মাণ করে আমরা খাদ্য মজুদ রাখার প্রস্তুতি নিয়েছি।

শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে মূলমঞ্চে যাওয়ার আগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের পতাকা উত্তোলন করেন কৃষিবিদ এ এম এম সালেহ। এ সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

এরপর প্রধানমন্ত্রী পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে কনভেনশনের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মঞ্চে বসা সবাইকে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে দেশের কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়নের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র পরিবেশিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী দুই দিনব্যাপী এ কনভেনশন উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকার মোড়কও উন্মোচন করেন। সূত্র : বাসস।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর