English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

‘বন্দুকযুদ্ধে’ কালিয়াকৈরের ত্রাস মুচি জসিম নিহত

পৃথক বন্দুকযুদ্ধে প্রকাশক বাচ্চু হত্যার আসামিসহ নিহত ৩

  • কালের কণ্ঠ ডেস্ক   
  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

মুচি জসিম

দেরিতে হলেও শেষ হয়েছে মূর্তিমান আতঙ্ক মুচি জসিম অধ্যায়ের। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ জোড়া পাম্প এলাকায় ছিল তার রাজত্ব। গতকাল শুক্রবার ভোরে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ভুবনেশ্বর টেকের একটি গজারি বন থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। মুচি জসিমের উত্থান ঘটে বনের জমি দখলের মাধ্যমে। শেষও হলো সেই বনেই। তার মৃত্যুতে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র দিনভর তার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলেছে।

অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই জঙ্গি ও এক মাদক কারবারি নিহত হয়েছে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার বেগম শামসুন্নাহার সাংবাদিকেদের জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে কাপাসিয়ার ভুবনেশ্বর টেক এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে জানায়। পুলিশ সেখানে গেলে টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই দল সন্ত্রাসীর মধ্যে ওই গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

কাপাসিয়া থানার ওসি আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, গতকাল শুক্রবার দুপুরে জসিমের স্বজনা মর্গে এসে লাশটি কালিয়াকৈরের চান্দুরা এলাকার জসিম ইকবাল ওরফে মুচি জসিমের বলে শনাক্ত করে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তার প্রথম স্ত্রী হ্যাপি আক্তার ছায়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জানা যায়, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জসিম উদ্দিন প্রায় ২০ বছর আগে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি জুতার কারখানায় কাজ শুরু করে। পরে নানা কৌশলে ওই এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যায়। ১৭ মামলার পলাতক এই আসামি দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জোড়া পাম্প এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে গাজীপুর জেলা ডিবি পুলিশের ওসি আমির হোসেন জসিমকে গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার ডিবি পুলিশের কোনো টিম কালিয়াকৈরে অভিযান চালায়নি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কালিয়াকৈর উপজেলার মূর্তিমান আতঙ্ক জসিম উদ্দিন ইকবাল ওরফে মুচি জসিমের অন্যতম সহযোগী এ বি সিদ্দিক বাবু। মুচি জসিমের বিরুদ্ধে করা প্রতিটি মামলায় এ বি সিদ্দিকও আসামি। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে বাবুও এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াত। গতকাল সকালে মুচি জসিমের লাশ উদ্ধারের পর দুপুরে অভিযান চালিয়ে এ বি সিদ্দিককেও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার বাদল ও জঙ্গি বাবুকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে। মুচি জসিমের আরেক সহযোগী সাইফুল ইসলাম জলিল। তার বিরুদ্ধে গফরগাঁও থানায় হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। আরেক সহযোগী হানিফ খান গাড়ি পোড়ানোর মামলার ১২ নম্বর আসামি। এ ছাড়া মুচি জসিমের সহযোগী হিসেবে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল শহিদুল ইসলাম ওরফে ছোট শহিদ, বিল্লাল পলান, বাদল, কাকলি, সম্পদ মিয়া, লাল মিয়া, কাইল্যা শাহীন, নাপিত ফরহাদ, জসিম আকন্দ, সুজন, মামুন, জাকির, হান্নানসহ ২৫ জনের বেশি একটি ক্যাডার বাহিনী। মুচি জসিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ ও পৌর যুবলীগের সভাপতি হারেসুজ্জামান খান হারেজের।

উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, মুচি জসিমের কাছে উপজেলার বেশির ভাগ মানুষই জিম্মি ছিল। এপেক্স ফুটওয়্যার কারখানার জুট আগে নিতাম আমি। কিন্তু আমাকে যুবলীগ নেতা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত করে এলাকা ছাড়া করে এই মুচি জসিম। শুধু আমিই নই, এলাকার নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করত সে। তার মৃত্যুর খবরে মানুষ উল্লাস করছে।

হাজী ইউসুফ আলীর ছেলে আবুল কাশেম বলেন, সফিপুর বাজার এলাকায় আমাদের একটি মার্কেট রয়েছে। যা হাজী ইউসুফ আলী সুপার মার্কেট নামে পরিচিত। ওই মার্কেটে দোকান ৫০টিরও বেশি। জসিম তার লোকজন নিয়ে হামলা চালিয়ে ওই মার্কেট দখল করে।

পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, মুচি জসিমের হয়ে প্রায় ৩০ জনের একটি বাহিনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জসিমের লাশ উদ্ধারের পর এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। সাধারণ মানুষ এলাকায় আনন্দ মিছিলসহ মিষ্টি বিতরণ করেছে।

গতকাল দুপুরে জসিমের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, তার মার্কেটের দোকানপাট সব বন্ধ। লোকজন নেই। বাড়ির ভেতরে কিছু লোক দেখা গেছে।

জসিমের স্ত্রী ছায়া জানান, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি লাশ নিয়ে বাসায় আসেন। জানাজা শেষে জোড়া পাম্প এলাকায় মায়ের নামে তার প্রতিষ্ঠিত রাশিদা জামে মসজিদের পাশে দাফন করা হবে।

বন্দুকযুদ্ধে আরো তিনজন নিহত

কালের কণ্ঠর মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কাকা ওরফে বোমা শামিম (৪০) ও এখলাছুর রহমান (৩২) নামের দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। নিহতরা ব্লগার শাহজাহান বাচ্চু হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যে চার জঙ্গি মিলে বাচ্চুকে হত্যা করেছে তার মধ্যে এ পর্যন্ত তিনজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলো। এর আগে বন্দুকযুদ্ধে ব্লগার বাচ্চু হত্যাকারী আব্দুর রহমান নিহত হয়। বাকি অন্য জঙ্গিকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

বৃহস্পতিবার রাত ১টায় শ্রীনগর উপজেলার হাষাড়া কেসি রোডস্থ চেকপোস্টে বন্দুকযুদ্ধে তারা নিহত হয়। এ সময় দুই এসআই ও এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন এসআই মাসুদ ও ইলিয়াস এবং কনস্টেবল তামিম। তাঁদের মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে রাখা আছে।

পুলিশ তাদের কাছ থেকে দুটি রামদা, ১১টি তাজা ককটেল, একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, তিন রাউন্ড গুলি ও একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল জব্দ করেছে।

পুলিশ সুপার জানান, তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন জঙ্গিরা শ্রীনগর এলাকায় ডাকাতির জন্য আসছে। তাই দুটি স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়। কেসি রোডের চেকপোস্টের সামনে দিয়ে দুটি মোটরসাইকেলে চারজন আসছিল। থামানোর সংকেত দিতেই পুলিশের চেকপোস্টে হাতবোমা এবং গুলি ছোড়ে তারা। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। পরে একটি মোটরসাইকেলের দুজন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও অন্য দুজন আরেকটি মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। আটকদের স্থানীয় শ্রীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

গত শুক্রবার দুপুর ১২টায় পুলিশ সুপার তাঁর কার্যালয়ে ব্রিফিং করে এসব কথা জানান।

নিহত শামীম কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানার লৌক্ষা গ্রামের মৃত আব্দুল রশিদের ছেলে এবং এখলাছ জামালপুরের খামারপাড়া গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে।

কালের কণ্ঠর আঞ্চলিক প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হয়েছে। র্যাব দাবি করেছে, বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তি একজন মাদক কারবারি। বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার নয়াদিয়াড়ী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় র্যাবের দুজন সদস্যও আহত হন। নিহত ব্যক্তি উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আলমের ছেলে আবুল হোসেন বাবু।

র্যাব জানায়, গোমস্তাপুর উপজেলার নয়াদিয়াড়ী এলাকায় বৃস্পতিবার রাতে টহল দিচ্ছিল র্যাবের একটি দল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে, ওই এলাকার একটি আমবাগানে চার-পাঁচজনের একটি মাদক কারবারি চক্র মাদক কেনাবেচা করছে। খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় র্যাব। উপস্থিতি টের পেয়ে র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে মাদকচক্রের সদস্যরা। র্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। পরে আমবাগানে তল্লাশি চালিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজনকে উদ্ধার করে গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, তিন রাউন্ড গুলি ও ১৭৭ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে র্যাব।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর