English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা হবে

৯ লক্ষ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকশন প্ল্যান

  • এস এম আজাদ    
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

মাদকের ভয়ংকর গ্রাস থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অ্যাকশন প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা-সেবা বিভাগ নোডাল এজেন্সি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নিয়ে এই অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে এর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তিন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২২টি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৬টি মতামত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এতে দেখা যায়, মাদকের ভয়ংকর আগ্রাসন রোধে ৯টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়েরের উদ্যোগ, মাদকের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি জেলায় বিশেষ আদালত স্থাপন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় দুজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া, ইয়াবার আগ্রাসন রোধে মিয়ানমার সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ, নৌপথে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের নৌযানগুলোকে আলাদা করা, মাদক কারবার নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখা। এ জন্য তিনটি ক্যাটাগরিতে মাদক কারবারিদের তালিকা করা হবে। এই তালিকা প্রতি মাসে হালনাগাদ করা হবে। একইভাবে মাদকসেবীদের তালিকাও করা হবে।

চলতি বছরের ২৯ জুলাই প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দেশে প্রথমবারের মতো মাদকবিরোধী অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৬টি মন্ত্রণালয়, ২১টি বিভাগসহ অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় ২২ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শেষে ১৬ ধরনের মতামত উঠে আসে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, অ্যাকশন প্ল্যানটি প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অনুমোদন দেওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ নিয়েছে। এখন মতামতসহ অ্যাকশন প্ল্যানটি ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। এসব পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুমোদন হলেই কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। এতে মাদকের অর্থলগ্নিকারী, সিসা বিক্রিসহ নানা অপরাধ যুক্ত হচ্ছে।

অ্যাকশন প্ল্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, এদের মদদদাতা, সাহায্যকারী ও অর্থলগ্নিকারীদের গ্রেপ্তার এবং যথাযথ তদন্ত, বিচারের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থাসহ মাদক বিয়ক্রলব্ধ তাদের যাবতীয় অর্থসম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা, এসংক্রান্ত মানি লন্ডারিং আইন, ২০১২ (২০১৫ সালে সংশোধিত)-এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। জ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি হিসেবে রূপান্তর। ডিএনসির একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মাদকের প্রতিটি মামলাই মানি লন্ডারিং আইনে হতে পারে। এতে মাদক কারবারিরা আটকা পড়বে। মাদক প্রতিরোধে এটি হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ। এ ছাড়া অভিযান ও মামলায় ডিএনসিকে সক্ষম করে তোলার পরিকল্পনাও আছে সরকারের।

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা :

এক বছরের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় ১৫টি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, সীমান্তে মাদকের প্রবেশ রোধে নৌপথে বাংলাদেশের নৌকাগুলোকে রং ও চিহ্ন দিয়ে মিয়ানমারের নৌকা থেকে আলাদা করতে হবে। দুই দেশের নৌযান নিরাপদ দূরত্বে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করবে কোস্ট গার্ড। যৌথ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করবে বিজিবি। বিআইডাব্লিউটিএ, নৌবাহিনী ও পুলিশ এসব কাজে সহায়তা করবে। পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ডিএনসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের করা মাদক কারবারিদের তালিকা সমন্বয় করে কমপক্ষে তিনটি তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের এ ক্যাটাগরি বলে চিহ্নিত করা হবে। দুটি তালিকায় থাকলে বি এবং অন্যদের সি ক্যাটাগরিতে রাখা হবে। প্রতি মাসের ৭ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা-সেবা বিভাগ এই তালিকা হালনাগাদ করবে। তিন মাস পর ছয়টি সংস্থা আপডেট তালিকা সুরক্ষা সেবা বিভাগে পাঠাবে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টাস্কফোর্স সমন্বিত অভিযান চালাবে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালানায় ডিএনসির উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদে প্রশাসন ক্যাডার নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতি জেলায় দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্ব দিতে বলা হয়েছে। ঢাকায় চারজন এবং চট্টগ্রামে দুজন ম্যাজিস্ট্রেট রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রথম স্তরের পরিকল্পনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, মাদকদ্রব্য বিধিমালা, সরকারি-বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র বিধিমালার খসড়া, কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতির বিধিমালা চূড়ান্তকরণের বিষয়টি রাখা হয়েছে। আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে মাদক আইনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করতে প্রতি বিভাগে একটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। ডিএনসির প্রধান কার্যালয়টি কেন্দ্রীয় নিরাময় কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নিজস্ব নতুন ভবনে উদ্বোধন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরই। বিভাগীয় কার্যালয়, একমাত্র প্রশিক্ষণ একাডেমি, চারটি বিভাগীয় শহরে রাসায়নিক পরীক্ষাগার, সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণের ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান (ডিপিপি) দেওয়া হবে। এক বছরের মধ্যে ৬৪ জেলাকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ডিএনসির ন্যূনতম ৪৬ জন জনবল অনুমোদনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঢাকা মেট্রোতে চারটি, চট্টগ্রামে দুটি এবং টেকনাফে একটি উপ-অঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। লোকবল না পাওয়া পর্যন্ত প্রতি জেলায় ১০ জন করে আনসার নিয়োগ করা হবে।

অ্যাকশন প্ল্যানে বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রশাসনের সঙ্গে ডিএনসির সমন্বয়ে ক্রাশ প্রগ্রাম নিতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে স্ব-স্ব অবস্থানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট মাদককে না বলার কর্মসূচি নেওয়া হবে। জেলা ও উপজেলা মাদকবিরোধী প্রচারণা কমিটিকে কার্যকর করা হবে। টেলিভিশনে টিভি ফিলার বিজ্ঞাপন প্রচার, প্রতি জেলার শোভাযাত্রা, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন এবং কমিটির কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে মাদকসংক্রান্ত মডিউল তৈরি করা হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলাকে পর্যায়ক্রমে মাদকমুক্ত ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতি বিভাগে একটি করে উপজেলা নির্বাচন করতে হবে।

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ডোপটেস্টের বিষয়টি রাখা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে লাগবে এই ডোপটেস্ট। এ ছাড়া কাউকে সন্দেহ হলে পরীক্ষা করারও পরিকল্পনা আছে। মাদকের কুফল সম্পর্কে মসজিদের ইমামদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন, রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা :

দুই বছরের মধ্যমেয়াদি পাঁচটি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ বন্ধে সীমানাপ্রচীর নির্মাণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপর আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন, স্বল্পমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন ইত্যাদি। এ সময়ে প্রথমে সরকারি ও পরে বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগে ডোপটেস্ট বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের ২৭ জেলায় যেখানে কেন্দ্র নেই, সেখানে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দুটি বিষয় রাখা হয়েছে। এগুলো হলো অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। কার্যালয়, পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ একাডেমি ও নিরাময় কেন্দ্র তৈরি প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে এ সময়। প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ৫০ ও বেসরকারি কলেজে ১০টি মাদকাসক্তি চিকিৎসার শর্যা স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ৫০ শয্যার স্থলে ১০০ এবং পাবনার হাসপাতালে ৩০ শয্যার স্থলে ৫০ শয্যা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের যত মতামত :

অ্যাকশন প্ল্যান (কর্মপরিকল্পনা) বাস্তবায়নবিষয়ক কর্মশালায় তিন মেয়াদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ডিএনসির অধীনে প্রসিকিউশন সেল গঠন, মাদক অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি, মাদকের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে জেলায় বিশেষ আদালত গঠন, এর জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া, মাদকাসক্তদের জন্য বিশেষ কারাগার স্থাপন, প্রয়োজনে ডোপটেস্ট করা যেতে পারে। এ জন্য ওয়েবসাইটে মতামতের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বক্সবাজার সীমান্ত ছাড়াও অন্য সীমান্তগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। গণসচেতনতা তৈরিতে প্রশিক্ষক দল তৈরি করা, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে ইসলামী ফাউন্ডেশনকে সম্পৃক্ত করা, মাদকাসক্তি নিরাময়ে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ করতে হবে।

সূত্র জানায়, র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী ও ডিএনসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে কর্মশালায় তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর