English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

বগুড়ায় কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে ছুরিকাঘাত

আত্মসমর্পণের পর রিমান্ডে বখাটে অভি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   
  • ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

বগুড়ায় কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে ছুরিকাঘাত করার মামলায় শহর যুবলীগের সভাপতির ছেলে বখাটে কাওসার আলম অভি আত্মসমর্পণ করার পর এখন পুলিশ হেফাজতে। মা নাসরিন আলমের সঙ্গে গিয়ে গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টায় অভি সদর থানার পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। গতকাল সোমবার তাঁকে আদালতে হাজির করার পর রিমান্ডে (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজত) নিয়েছে পুলিশ।

ন্যক্কারজনক ওই ঘটনা নিয়ে কালের কণ্ঠে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সামাজিকভাবে ব্যাপক ধিক্কারের মুখে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ে তদবির করে ব্যর্থ হয়ে বখাটে কাওসার আলম অভি (২২) গত রবিবার রাতে অবনত মস্তকে বগুড়া সদর থানায় গিয়ে ধরা দেন। ওই সময় সঙ্গে ছিল তাঁর মাসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য।

কলেজছাত্রীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনার প্রতিবাদে এবং প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে বখাটে অভির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল সকাল ১১টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে এলাকার সাধারণ মানুষ। বগুড়া শহরতলির তিনমাথা রেলগেটে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে ওই মানববন্ধনে পালশা গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। ওই সময় বলা হয়, অভিযুক্ত অভি যত প্রভাবশালী পরিবারের ছেলেই হোক না কেন, তাঁর ব্যাপারে পুলিশ যেন বিন্দুমাত্র ছাড় না দেয়। চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচার দ্রুত বিচার আইনে করার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

জানা যায়, অভিকে গতকাল দুপুরে বগুড়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চান তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বগুড়া সদর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফরিদ উদ্দিন জানান, তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অভির দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যাম সুন্দর রায়।

পুলিশের একটি সূত্রে জানা যায়, নির্যাতিত কলেজছাত্রীর বাবা গত শনিবার বগুড়া সদর থানায় অভির বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকেই অভির খোঁজে অভিযান শুরু করে পুলিশ। পাশাপাশি বখাটে অভিকে ধরিয়ে দিতে ব্যাপক চাপ দেওয়া হচ্ছিল পরিবারকে। অভির চাচা বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেনদরবার করা হচ্ছিল, যাতে গ্রেপ্তার এড়িয়ে আদালতের মাধ্যমে অভির জামিনের ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই তদবির ব্যর্থ হলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে অভিকে তাঁর মা নাসরিন আলমসহ বগুড়া সদর থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভি নির্যাতিত তরুণীকে তাঁর প্রেমিকা বলে দাবি করেন। তাঁর আরো দাবি, অন্য জায়গায় ওই তরুণীর বিয়ের চেষ্টা ভণ্ডুল করতেই ছুরিকাঘাত করা হয়।

বগুড়া পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা বিচার চাই প্রশাসনের কাছে। এসব ঘটনার বিচার না হলে অপরাধী বখাটেরা আরো অনেক মেয়ের সর্বনাশ করার সাহস পাবে।

বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামরুজ্জামান জানান, অভির মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। সেখানে অনেক ছবি ও ভিডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূইয়া বলেন, অপরাধী পুলিশি অভিযানে আতঙ্কিত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রচলিত আইনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য উদ্ঘাটন করা হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা অসহায় ওই তরুণীর পরিবারকে সব ধরনের নিরাপত্তা দেব। পুলিশের তৎপরতা বখাটে ও অপরাধীদের জন্য একটি অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

অভির মা নাসরিন আলম গত রবিবার রাতে বগুড়া সদর থানায় অবস্থানকালে জানান, তাঁর ছেলে যে কাজ করেছেন তাতে তাঁরা অনুতপ্ত। এ ধরনের কাজের বিচার হওয়া উচিত। এ কারণে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শহর যুবলীগের সভাপতি মাহফুজুল আলম জয়ের পরিবারের দাবি, অভি জয়ের সন্তান নন। অভির মা নাসরিন আলম হলেন জয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী। ওই বিয়ের আগেই অভির জন্ম। তবে জানা গেছে, শহরের সেউজগাড়ী এলাকার মাসুদ নামে এক ব্যক্তি জয়ের বন্ধু ছিলেন। চারদলীয় জোট সরকারের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে জয় ওই বন্ধুর বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন। একপর্যায়ে মাসুদের স্ত্রীর সঙ্গে জয়ের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঘরে স্ত্রী থাকার পরও বন্ধুর স্ত্রীর প্রেমে পড়েন জয়। ওই সময় স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে মাসুদ তাঁকে তালাক দেন এবং জয় তাঁকে বিয়ে করেন। অভির চেহারা আর জয়ের চেহারায় ব্যাপক মিল রয়েছে।

খোঁজা হচ্ছে বিপুল খরচের উৎস : তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বখাটে অভি এক ডজনের বেশি মোটরসাইকেলে যাদের নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং প্রতিদিন যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন সেই অর্থের জোগান কোথা থেকে আসত তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। অভি ও তাঁর বন্ধুদের অভিভাবকদের অবৈধ আয়ের কোনো উৎস আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভির বিপুল খরচের মূল উৎস ছিল তাঁর বাবা যুবলীগ নেতা মাহফুজুল আলম জয় ও চাচা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আলম মোহনের প্রভাব। বগুড়া শহরের বিসিক এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী জুলু অভিযোগ করে বলেন, বিসিকে উত্তরা মোটরসের কাঠের প্যাকেট ও স্ক্রাব মালপত্র ক্রয়ের ঠিকাদারি ব্যবসা রয়েছে তাঁর। ২০১০ সালে শহর যুবলীগের সভাপতি জয় তাঁকে মারধর করে ব্যবসার কর্তৃত্ব কেড়ে নেন। এরপর জুলুর প্রতিষ্ঠানের নামে জয় নিজে এই ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকেন। পরে এটির দায়িত্ব দেওয়া হয় অভিকে। অভি তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে অবৈধভাবে কেড়ে নেওয়া ওই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১০ টাকা কেজির কাঠ ১৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো ঢাকার মহাজনদের কাছে। এ ছাড়া অভির অবৈধ অর্থের আরেকটি উৎস হলো অবৈধ পলিথিনের ব্যবসা। এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রক শহরের বৈরাগী নামের একজন ব্যবসায়ী। অভির বাবা ও চাচাদের নাম ভাঙিয়ে এ খাত থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা মাসোয়ারা নিত অভি বাহিনী।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর