English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সড়কে মৃত্যুর মিছিল

ছয় জেলায় নিহত ১৮ আহত ৯০

  • কালের কণ্ঠ ডেস্ক   
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকায় গতকাল দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বগুড়া থেকে পঞ্চগড়গামী বিআরটিসির বাস। দুর্ঘটনায় স্ত্রী রোকসানা নিহত হওয়ায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন রুবেল (ইনসেটে)। ছবি : কালের কণ্ঠ

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু থামছে না। শনিবার রাত ও গতকাল রবিবার ছয় জেলায় সড়কে প্রাণ গেছে আরো ১৮ জনের। আহত হয়েছে অন্তত ৯০ জন। এর মধ্যে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরে। সেখানে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশু, নারীসহ সাতজন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ৩০ জন। রাজধানীতে দুটি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে তিনজন।

এর আগে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত কয়েকটি জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১০ জনের বেশি লোক।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গেল মাসে ঈদুল আজহার আগে-পরে ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৫৯ জন। আহত হয়েছে প্রায় এক হাজার লোক।

রংপুরে দুই বাসের সংঘর্ষে সাতজন নিহত : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রংপুরের সিও বাজার এলাকায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী, শিশুসহ সাতজন নিহত হয়েছে। তারা হলো গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা গ্রামের রুবেলের স্ত্রী রোকসানা (২২), পঞ্চগড়ের সোহেল মিয়ার ছেলে শামীম (১০), একই জেলার তেঁতুলিয়া থানায় কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মামুনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সুমি (৩০), ঠাকুরগাঁওয়ের ইব্রাহিমের ছেলে আব্দুর রহমান (৫০), নীলফামারীর সৈয়দপুরের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী অমিজন (৫০), একই জেলার আব্দুল গফুরের স্ত্রী নুর বানু (৪৫) ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার ফুলকি বেগম (৫৫)।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকায় পঞ্চগড়গামী বিআরটিসি বাসের সঙ্গে দিনাজপুর থেকে রংপুরের দিকে আসা একটি গেটলক বাসের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার কারণে এক ঘণ্টারও বেশি সময় রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ আহত হয়েছে। তাদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসক ডা. মুনতাসির জানিয়েছেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে রাতে ফুলকি বেগম মারা গেছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত যাত্রী জোবায়ের জানান, বিআরটিসি বাসের চালকের বেপরোয়া গতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ জানান, বাস দুটি রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে এবং বিআরটিসি বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। তিনি বলেন, দুটি বাসের চালক ও সহকারীরা পলাতক নাকি তারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে, তা এখনো জানা যায়নি। বাস দুটি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক এনামুল হাবিব জানিয়েছেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মান্নান কবিরকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার বিষয়েও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ ছাড়া সড়ক ও মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।

যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কা, নিহত ২ : গতকাল ভোর পৌনে ৪টার দিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বারইয়ারহাট লেভেলক্রসিংয়ে একটি যাত্রীবাহী বাসকে ট্রেন ধাক্কা দিলে দুজন নিহত হন। আহত হয় আরো অন্তত ২০ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। বাকিরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দিয়েছেন লেভেলক্রসিংয়ের গেটম্যান মোহাম্মদ আরিফ।

নিহত বাসযাত্রীর নাম সুনীল চাকমা (৫৫)। তিনি খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্যজনের পরিচয় জানা যায়নি।

আহতদের মধ্যে আছে মংশি প্রু মার্মা, আবদুল করিম, নিউটন চাকমা, কমিষ্ট ত্রিপুরা, দিপ্তী চাকমা, বার্ম বিলা চাকমা, দোস ত্রিপুরা, কজু ত্রিপুরা, নিরেশ চাকমা, সুজন ত্রিপুরা, প্রমি ত্রিপুরা, লোলন দেওয়ান, জু চাকমা, মিনা চাকমা, ডুসুম বীথি, সুনির্মল চাকমা, বিজিবি সদস্য মারুফ হোসেন, গীতা দাশ।

জানা গেছে, বারইয়াহাট পৌর বাজার এলাকার লেভেলক্রসিং অতিক্রম করছিল ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসা বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন। ঢাকার কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা খাগড়াছড়িমুখী এস আলম পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসও একই সময় রেললাইন পার হচ্ছিল। তখনই ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষ হয়।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রবিউল আজম স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যান না থাকায় গেট বন্ধ করা হয়নি।

মিরসরাইয়ের চিনকির আস্তানা রেলস্টেশনের প্রধান স্টেশন কর্মকর্তা মঈনুল হুদা মজুমদার জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে দায়িত্বরত গেটম্যান মোহাম্মদ আরিফ পলাতক রয়েছেন। স্টেশন মাস্টার হিসেবে তখন দায়িত্বে ছিলেন ওয়াহিদুল আলম। তিনি গেটম্যানকে ট্রেন আসার বিষয়টি অবহিত করেছিলেন কি না, তাও তিনি জানেন না।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার কারণে আড়াই ঘণ্টা এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফিরোজ ইফতেখারসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ফিরোজ ইফতেখারকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।

বগুড়ায় দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩ : বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে এক পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ৪০ জন। আহতদের বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

শনিবার গভীর রাতে শেরপুর উপজেলার ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের মহিপুর বাজার ও ধুনটমোড় এলাকায় এই দুটি দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত ব্যক্তিরা হলো এসআর ট্রাভেলসের সুপারভাইজার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার সংসারদীঘি গ্রামের জাহিদুল ইসলাম তাজ (৩৫), চাঁদনী পরিবহনের চালক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বামুনিয়া পাড়ার সাজ্জাদ হোসেন (৩৫) ও বগুড়ার কাহালু উপজেলার মালঞ্চা গ্রামের মিঠু (৩৮)।

শেরপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার রতন হোসেন জানান, রাত ২টার দিকে বগুড়াগামী এনা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকাগামী চাঁদনী পরিবহনের আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ঘ হয়। ঘটনাস্থলে দুজন নিহত হন এবং প্রায় ৪০ জন যাত্রী আহত হয়।

শেরপুর থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) তন্ময় জানান, রাত আড়াইটার দিকে ঢাকাগামী এসআর ট্রাভেলসের একটি বাস ধুনট মোড় এলাকায় মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কার্গো ট্রাককে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই বাসের সুপারভাইজার যাত্রী নিহত হন। আহত হয় বেশ কয়েকজন যাত্রী। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি আটক করা হয়েছে। তবে বাসের চালক ও সহকারীদের আটক করা সম্ভব হয়নি।

রাজধানীতে তিনজনসহ আরো ছয়জন নিহত : রাজধানী ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন অচেনা এক ব্যক্তি। পুলিশ জানায়, গতকাল ভোরে কোনো গাড়ির চাপায় ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। তাঁর পরনে ছিল সবুজ চেক শার্ট ও চেক লুঙ্গি। দুপুরে লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

গত রাত পৌনে ১০টায় রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন খিলগাঁও হাজীপাড়া এলাকার হযরত আলীর ছেলে পাঠাও চালক রিপন সিকদার (৩০) এবং গোপালগঞ্জের আবুল বাশার গাজীর ছেলে ব্যবসায়ী জানে আলম গাজী (৩১)। নবাবপুর রোডে জানে আলমের দোকান রয়েছে।

মতিঝিল থানা পুলিশ জানায়, শিল্প ব্যাংকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পিচ্ছিল রাস্তায় মোটরসাইকেল পড়ে গেলে ছিটকে পড়ে দুই আরোহী। পেছন থেকে আসা একটি ট্রাক তাদের চাপা দিয়ে চলে যায়। পুলিশ ট্রাকটি আটক করলেও চালককে ধরতে পারেনি।

গতকাল সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে অটো বাইকের ধাক্কায় বাবুরাম মণ্ডল (৬৫) নামের একটি ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার জঙ্গল গ্রামের সুবল চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঢোলবাদকদের একটি দল নিয়ে বালিয়াকান্দি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কার্যালয়ের সামনে থেকে ইলিশকোল-রায়পুর মহাশ্মশানে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে যাচ্ছিল। এ সময় তাঁর নাতনিকে একটি অটো বাইক চাপা দিতে গেলে তিনি বাঁচাতে যান। কিন্তু নিজেই চাপা পড়েন বাবুরাম।

একই দিন সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাকচাপায় নিহত হন আছমা বেগম (৬৫)। তিনি ভাটিয়ারী ইউনিয়নের কদমরসুল গ্রামের মৃত বাচা মিয়ার স্ত্রী। বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি আহসান হাবীব জানান, ট্রাকটি আটক করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে শিমরাইল-আদমজী সড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় আদমজী ইপিজেডের শ্রমিক পরিবহনের একটি বাসের চাপায় এক নারী নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম মিনু আক্তার (৫৫)। তিনি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার উত্তর কামারগাঁও গ্রামের আব্দুস সামাদের স্ত্রী।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক রাসেল আহমেদ জানান, বাসটি শনাক্ত করা হয়েছে। গাড়িটি আটকের প্রক্রিয়া চলছে।

(প্রতিবেদনটির জন্য তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, বগুড়া ও রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি)

প্রথম পাতা- এর আরো খবর