English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সংশোধিত খসড়া মন্ত্রিসভায় উঠছে আজ

শ্রমিকবান্ধব হচ্ছে শ্রম আইন

  • আশরাফুল হক   
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

দেশি-বিদেশি শ্রম সংস্থা ও শ্রমিক সংগঠনের চাপে পড়ে সরকার শ্রম আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। সংশোধিত খসড়ায় ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য ন্যূনতম সদস্যের সম্মতি ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন অনুমোদন দেওয়ার সময়সীমা কমানোর কথা বলা হয়েছে। ধর্মঘট ডাকার অধিকার দুই-তৃতীয়াংশ থেকে কমিয়ে ৫১ শতাংশ করা হচ্ছে। শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দ্বিগুণ করাসহ বিভিন্ন শ্রম ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিধান রেখে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়াটি অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশে ২০০৬ সালের শ্রম আইন কার্যকর রয়েছে। বিভিন্ন শ্রম সংস্থা ও শ্রমিক সংগঠনের দাবির মুখে ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করা হলেও তা যথেষ্ট হয়নি বলে আলোচনা ছিল। এর পর থেকেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আন্তর্জাতিক ক্রেতা জোট এবং বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন শ্রম আইন ফের সংশোধনের দাবি তোলে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার দেশে-বিদেশে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। এরপর শ্রম আইন সংশোধনের খসড়া করে তা আইএলওতে পাঠানো হয়। আইএলওর পর্যবেক্ষণ আমলে নিয়ে মালিক, শ্রমিক ও সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটি আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করে।

প্রচলিত আইনে দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত কারণে শ্রমিকের উত্তরাধিকারীরা এক লাখ টাকা এবং স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতার জন্য এক লাখ ২৫ হাজার টাকা পাওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী, আইএলওসহ সব দেশীয় শ্রমিক সংগঠনের অব্যাহত দাবি ছিল। তাদের দাবির মুখেও এ ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধির বিষয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ একমত হতে পারেনি। ঐকমত্য না হওয়ায় মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পরেনি। এই অবস্থায় বাস্তবতার নিরিখে ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর প্রয়োজন বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশোধনী আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে। তারা প্রস্তাব করেছে, মৃত্যুর কারণে ক্ষতিপূরণ দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বর্তমান আইনে বেআইনি ধর্মঘট বা লক আউটে অংশগ্রহণ করার জন্য এক বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ঢিমে তালে কাজ করার জন্য এবং অরেজিস্ট্রিকৃত ট্রেড ইউনিয়নসংক্রান্ত কাজেরও একই শাস্তির বিধান রয়েছে। এই শাস্তি কমিয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে সংশোধিত খসড়া আইনে। যদিও আইএলও বিশেষজ্ঞ কমিটি এই দণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করতে বলেছে। প্রয়োজনে ফৌজদারিব্যবস্থায় নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে তারা। কিন্তু ত্রিপক্ষীয় কমিটি মনে করে শ্রম আইনে যেসব বিধান রয়েছে তা মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য। এসব অপরাধের জন্য শ্রম আইনে দণ্ডের বিধান রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধ শ্রম আদালত ও শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। এই অবস্থায় শিল্পের সার্বিক দিক বিবেচনা করে ত্রিপক্ষীয় কমিটি কারাদণ্ডের সময় কমিয়ে অর্থদণ্ড বহাল রাখার প্রস্তাব করেছে।

কোনো ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হলে বর্তমান শাস্তি ছয় মাস কারাদণ্ড, দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। খসড়া আইনে ছয় মাসের স্থলে এক মাসের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। সালিসের রায় না মানার শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড থেকে কমিয়ে তিন মাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো মালিক নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।

অসৎ শ্রম আচরণের দণ্ড কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়ায়। প্রচলিত আইনে দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। খসড়া আইনে দুই বছরের জায়গায় এক বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্য তহবিল পরিচালনায় যৌথ দর-কষাকষির সিবিএ না থাকলে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন সরকারের শ্রম পরিচালক। খসড়া আইনে শ্রম পরিচালকের জায়গায় অংশগ্রহণকারী কমিটির মাধ্যমে শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনয়নের বিধান রাখা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ভবিষ্য তহবিল পরিচালনার জন্য ট্রাস্টি বোর্ড থাকে। ওই বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকের সমান প্রতিনিধি থাকে। সরকার মনোনীত কোনো ব্যক্তিরও চেয়ারম্যান হওয়ার বিধান রয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রায়ই জটিলতা দেখা দেয়। সেই কারণে যে প্রতিষ্ঠানে সিবিএ নেই সেখানে অংশগ্রহণকারী কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনীত হওয়ার সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে শ্রম আদালত ও শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের মামলা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব মামলা পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেও নিষ্পত্তি হয় না। বিষয়টি নিয়ে সরকারকে প্রায়ই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এতে মালিক ও শ্রমিক উভয়ের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। সে জন্য শ্রমসংক্রান্ত মামলা ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই নিষ্পত্তি করতে হবে।

বর্তমান আইনে ধর্মঘট বা লকআউটের ক্ষেত্রে গোপন ভোটের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের মতামত নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে আইএলও এবং দেশি শ্রমিক সংগঠনের আপত্তি রয়েছে। খসড়া সংশোধনীতে ধর্মঘটের বিষয়টি দুই-তৃতীয়াংশ থেকে ৫১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমান আইনে মালিকপক্ষকে শ্রমিকপক্ষ তাদের দাবি মানতে বাধ্য করার জন্য ভীতি প্রদর্শন, চাপ প্রয়োগ, বেদখল, হামলা বা টেলিফোন সুবিধা বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। নতুন আইন থেকে এসব শব্দ আইএলওর দাবি অনুযায়ী বাদ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধের তালিকায় পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়েছে।

খসড়া আইনে অসৎ শ্রম আচরণ তদন্ত করার জন্য মানসম্পন্ন পরিচালন পদ্ধতি প্রণয়ন করার বিধান নতুন করে যোগ করা হয়েছে। আইএলওর চাপাচাপিতে এ বিধান যোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গঠনতন্ত্রের মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করলে, সদস্যসংখ্যা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে, প্রতারণার মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার যে বিধান বর্তমানে রয়েছে তা বিলুপ্ত করার জন্য আইএলও মতামত দিয়েছে। কিন্তু ত্রিপক্ষীয় কমিটি শুধু গঠনতন্ত্রের কোনো মৌলিক বিধান লঙ্ঘন করলে রেজিস্ট্রেশন বাতিলের যে বিধান ছিল তা বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে।

বর্তমান নিয়ম হচ্ছে কোনো ট্রেড ইউনিয়নের আবেদন পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে তা রেজিস্ট্রি করতে হবে। আইএলও, আন্তর্জাতিক ক্রেতা জোট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি ছিল রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া শেষ করার সময় কমানোর। একই সঙ্গে তারা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি তৈরি করার কথা বলেছিল। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার সময়সীমা পাঁচ দিন কমিয়ে ৫৫ দিন করাসহ একটি এসওপি করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এবং বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য ৩০ শতাংশ সদস্য থাকার যে বিধান তা কমাতে হবে। সংশোধিত আইনে ২০ শতাংশ সদস্যের সমন্বয়ে ট্রেড ইউনিয়ন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিদ্যমান আইনে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য তাদের কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। তা ছাড়া এই খাতে অনেক ক্ষেত্রে যে মালিক সে আবার শ্রমিকও। হকার, রিকশাওয়ালা, মুচিসহ অনেকেই মালিক ও শ্রমিক উভয়ই। পরিচয়পত্রের এই জটিলতার বিষয়টি দূর করার জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের পরিচয়পত্রের দরকার হবে না বলে বিধান রাখা হয়েছে।

বর্তমান আইনে পাহারাদার, টহলদারি, নিরাপত্তা স্টাফ, গোপন সহকারীদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না। এই ধারা বিলুপ্ত করে তাদের ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় আনা হয়েছে।

বিদ্যমান আইনে মৃত শ্রমিকের পরিশোধিত অর্থ মনোনীত ব্যক্তিকে প্রদান করার বিধান রয়েছে। সংশোধিত আইনে মনোনীত ব্যক্তিকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তা শ্রম আদালতে জমা দিতে হবে। শ্রম আদালত উত্তরাধিকারী খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে এই অর্থ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনকে দেবে। তারা উত্তরাধিকারীকে ১০ বছরের মধ্যে খুঁজে না পেলে সেই অর্থ তাদের নিজস্ব তহবিলে চলে যাবে।

খসড়ায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক শ্রমিককে কিশোর শ্রমিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত পিস রেট বা ঠিকা হার খসড়ায় বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে। পিস রেটের কাজ সব সময় থাকে না বলে মালিক-শ্রমিকের আলোচনাক্রমে তা নির্ধারণ করার বিধান দেওয়া হয়েছে।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর