English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মন্ত্রীদের উদ্বেগ

  • আবদুল্লাহ আল মামুন ও আশরাফুল হক    
  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের উদ্বেগ ততই বাড়ছে। নির্বাচনকালীন সরকার ছোট হবেএমন সম্ভাবনা থেকেই সেই সরকারে নিজেদের থাকা না থাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শেষ সময়ে এসে গুছিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু করেছেন।

নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি আলোচনায় আসে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর গঠন করা হয়েছিল নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ৩৯ সদস্যের সেই সরকারে আওয়ামী লীগের দুই সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদকে অন্তর্ভুক্ত করে চমক দেখানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বাদ পড়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খান, শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও খাদ্যমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকসহ ৩০ জন।

ওই সময় প্রভাবশালী অনেক মন্ত্রী বাদ পড়লেও টিকে গিয়েছিলেন লো-প্রফাইলে চলা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। এবারও শেষ সময়ে এসে তাই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা হিসাব কষছেন নির্বাচনকালীন সরকারে টিকে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে।

সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়ে আগামী মাসের তৃতীয় সপ্তাহে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছর ১২ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে জানিয়েছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী এ বছরের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেছিলেন, কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সে অনুসারে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে। পরে ৩১ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলেছিলাম। তার মানে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব পালন করবে এবং সরকারের পরিসর ছোট করা হবে। সরকার নির্বাচনের সময়ে শুধু রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না।

গত ২০ জুন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। সে সময়ে মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকেই এটা হবে। তবে এ বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই দিন সচিবালয়ে প্রকৌশলীদের সঙ্গে ঈদ-পরবর্তী মতবিনিময়সভায় মন্ত্রী এ কথা বলেছিলেন।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রত্যেক সদস্যেরই আলাদা আমলনামা তৈরি করে রেখেছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের দক্ষতা, যোগ্যতা, দলীয় আনুগত্য, ভাবমূর্তি প্রভৃতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ওই আমলনামা তৈরির ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে, দুর্নীতির অভিযোগ থাকা ও বিতর্কিত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকছেন না। ফলে ওই মন্ত্রিসভা থেকে যাঁরা ছিটকে পড়বেন তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে নতুন সরকারে থাকাও। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই পরে আর মন্ত্রিসভায় ফিরতে পারেননি।

নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা না থাকার বিষয়ে কথা বলেছেন একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। তাঁরা বলেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ওপর নির্ভর করছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অবশ্য আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আমি আছি মনে হয় ইন্টেরিম সরকার পর্যন্ত।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের এখতিয়ার সংসদ নেত্রীর। তিনি সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার আকার ছোট হয়। কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন এটা একান্তই সংসদ নেত্রীর বিষয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আর এ বিষয়ে নেত্রী (শেখ হাসিনা) ছাড়া কেউ কিছু জানেন না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে একটি সংক্ষিপ্ত মন্ত্রিসভা থাকবে। এতে কারা মন্ত্রী থাকবেন না থাকবেন তা নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর। এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহিরয়ার আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনের আগে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হবে। সেই সরকার জরুরি দৈনন্দিন কাজ করবে। সেখানে হয়তো আমরা অনেকেই থাকব না। সেই প্রস্তুতি রয়েছে।

সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এবার নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির থাকার সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সরকার যদি সর্বদলীয় হয়, তাহলে সেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়াও প্রতিনিধি রাখার সুযোগ রয়েছে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, তরীকত ফেডারেশন, জেপি ও বিএনএফের। কারণ বর্তমান সংসদে এই দলগুলোর প্রতিনিধি আছে।

সংবিধানে নির্বাচনের আগের এই সরকার নির্বাচনকালীন না অন্তর্বর্তীকালীন তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৪) দফায় বলা হয়েছে, সংসদ ভাংগিয়া যাওয়া এবং সংসদ-সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফার অধীন নিয়োগদানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার অব্যবহিত পূর্বে যাঁহারা সংসদ-সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্যসাধনকল্পে তাঁহারা সদস্যরূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) ও (৩) দফায় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের আকার ছোট হবে বলে বারবার ঘোষণা দেওয়া হলেও ২০১৩ সালের মন্ত্রিসভা ছোট ছিল না। নির্বাচনকালীন সরকার ছিল ২৯ সদস্যের। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ১০ উপদেষ্টা। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীসহ সেবার সব মিলিয়ে ছিলেন ৩৯ জন।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর