English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

এমপি জাহাঙ্গীর মুখ-হাত এক সঙ্গে চালান

  • এমরান হাসান সোহেল পটুয়াখালী   
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০

প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকির মুখে এলাকা ছাড়তে হয়। মামলা নেয় না পুলিশ

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের সংসদ সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনের কথা না শুনলেই নির্যাতন নেমে আসে এলাকার সাধারণ মানুষ এমনকি দলীয় নেতাকর্মীদের ওপরও। প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকির মুখে এলাকা ছাড়তে হয়। মামলা নেয় না পুলিশ। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী এবং ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এমপি আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনের রয়েছে নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী। তাঁর সখ্য অন্য দলের লোকদের সঙ্গে। এ ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, দখলবাজি, স্বজনপ্রীতি, সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বেশ কিছু অভিযোগ দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ে।

গলাচিপার প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কাশিনাথ দত্ত জানান, গত বছর ১৫ আগস্ট পৌর মেয়র আহসানুল হক তুহিনের আমন্ত্রণে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনাসভায় যোগ দেওয়ায় তাঁকে অশালীন ভাষায় গালমন্দ করেন এমপি জাহাঙ্গীর। একই সঙ্গে তাঁকে মারধর করার জন্য এমপি নিজের পেটোয়া বাহিনীকে হুকুম দিলে সে যাত্রায় দৌড়ে রক্ষা পান কাশিনাথ। ওই সময় কাশিনাথকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, প্রাণে বাঁচতে হলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে। এরপর থেকে ভয়ে এলাকায় যান না কাশিনাথ। তিনি বলেন, এমপি জাহাঙ্গীর ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের একজন। তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে এবং গত পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন। অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন দেদার। অন্য দলের লোকজনের সঙ্গে তাঁর সখ্য। তাদের নিয়ে লুটপাটে মহাব্যস্ত তিনি। তাঁর নিয়োগ বাণিজ্য, দখলদারত্ব অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এর ফলে গলাচিপা-দশমিনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলতে পারে না।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকদের কাছে এমপি জাহাঙ্গীরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্চাচারিতার বর্ণনা দেওয়ায় গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মো. মতিউর রহমান মিয়াকে গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অপহরণের চেষ্টা করা হয়। তাতে ব্যর্থ হয়ে মতিউরকে একটি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। এ ছাড়া এমপি জাহাঙ্গীর ও তাঁর ভাই খালেদুর রহমান স্বপনের নিয়মবহির্ভূত নানা কর্মকাণ্ড সমর্থন না করায় গজালিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুর রবকে নির্যাতন করা হয় বলে তিনি জানান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কয়েক মাস পরই রবকে মারধর করে এমপির লোকজন। এরপর দীর্ঘদিন তাঁকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র থাকতে হয়। ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর জাহাঙ্গীর মারধর করেন দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক আবুবকরকে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভুক্তভোগী ১৫ জন নেতাকর্মী এ ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে জানান, তাঁরা থানায় মামলা করতে চাইলে তাঁদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়াসহ নানাভাবে ভয়ভীতি দেখায় জাহাঙ্গীরের পেটোয়া বাহিনী।

গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদি মাসুদ জুয়েল বলেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে এখন আওয়ামী লীগ করছি। আমার মতো আওয়ামী লীগের পোড় খাওয়া নেতারা এমপির কারণে কেউ সুখে নেই। এমপি সাহেব নিজেকে সৎ ব্যক্তি দাবি করেন। অথচ জীবনে কোনো দিন চাকরিও করেননি, ব্যবসাও করেননি, আবার জমিদার পরিবারের সন্তানও নন; তাহলে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক কিভাবে হলেন এ প্রশ্ন এলাকার সবার। যাকে-তাকে পিটিয়ে কিংবা গালিগালাজ করে সব দমিয়ে রাখতে চান। দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে পাগলা কুকুরের মতো আচরণ করেন।

কাশিনাথ দত্ত, মতিউর রহমান, মেহেদি মাসুদ জুয়েল ও দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী আমির হোসেন আলাদাভাবে এমপি জাহাঙ্গীর কিংবা তাঁর বাহিনীর নির্যাতন বা হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ করেছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা বরাবর। ওই অভিযোগের অনুলিপি দিয়েছেন তাঁরা দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, গত জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে গলাচিপা থানার সামনে যানজটে আটকা পড়ে এমপি জাহাঙ্গীরের গাড়ি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এমপি গাড়ি থেকে নেমে যানজট সৃষ্টির অজুহাতে মো. রিয়াজ নামের এক রিকশাচালককে মারধর করেন।

২০১৬ সালের ২৬ মার্চ গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউপি কার্যালয়ে ধরে নিয়ে বেধড়ক পিটুনির পর এক গৃহবধূ এবং তাঁর স্বামীর ভাতিজার মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছিলেন এমপি জাহাঙ্গীরের ভাই স্বপন। ওই ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এরপর পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু স্বপনের হুমকির মুখে তখন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় ওই দুই পরিবার। একপর্যায়ে বাড়ি ফিরলে স্বপনের ভয়ভীতির মুখে তারা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগের প্রেক্ষিতে আপনাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নাকি? অভিযোগ সত্য না মিথ্যা আমার দলের নেতাকর্মীদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তারা ভালো বলতে পারবে। জুয়েল নামের যে ছেলে অভিযোগ করেছে সে বিএনপি করত। তাকে দলে নিয়ে পদ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে পারেনি বলে সে অভিযোগ করেছে। যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা মিথ্যা, বানোয়াট, অসত্য। অন্য নেতাদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার সঙ্গে কথা বাড়াতে চাই না। আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না, কারণ আমাকে কোনো কপি দেওয়া হয়নি।

প্রথম পাতা- এর আরো খবর