English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

গল্প

যে নগরে কুড়ি থেকে কুড়ি হাজারে সম্ভ্রম কেনা যায়

সকাল রয়

  • ১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০

অঙ্কন : পুজা দপশগুপ্ত

আজ এই ভোরবেলায় স্বাভাবিকের চেয়েও যেন একটু বেশি কাক ডাকছে। সারা আকাশে কা-কা রব। কাকগুলো স্থির থাকে না। কী যেন বলতে চায়? এ ডাল-ও ডাল, ঘরের চাতালে, জংধরা জানালায় কিংবা আস্তাকুঁড়ের পাশে একটানা ডাকে।

তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখালেও যায় না, করুণ সুরে ডাকে। ডানা ঝাপটায়। যেন প্রতিবাদ করছে ভয়ংকর কোনো অপরাধের। এক, দুই, তিন এভাবে কুড়িতে দাঁড়ায়। দল ভারী করা ডাকে আশপাশের কানগুলো গরম হয়ে ওঠে। ওরা থামে না, আকাশময় উড়ে একটানা ডাকে।

সেই সকালে রাস্তায় বসে ভিখারি অবিনেশ, থালায় তখনো দুই টাকার একটা কয়েনও পড়েনি। সে একটু অবাকই আজ। দীনতা গ্রাস করল কি নগরবাসীকে? নাকি বাবু-বিবিদের দয়ার নৌকা চরে এসে ঠেকল! কে জানে বাবা!

ভিখারি অবিনেশ এসব ভাবতে ভাবতে ডানে-বাঁয়ে তাকায়। প্রতিদিন নিয়ম করে যে দুই টাকার কয়েনটা ওর থালায় পড়ত, সেটা আজ পড়েনি। কেন পড়েনি? সেই ভাবনাটা চাগিয়ে ওঠে ভেতর থেকে। অবিনেশ জানে, যে তাকে প্রতিদিন নিয়ম করে দুটি টাকা দিত, সে শুধু অসুস্থ থাকলে ঠিক সময়ে জমা পড়ে না। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই যে দুপুরের আগে সেই কয়েনটা তার পক্ষ থেকে কেউ এসে থালায় রাখে। আর তখন স্বভাবতই তার কণ্ঠ থেকে ভেসে আসত, ঈশ্বর যেন সহায় থাকে তার প্রতি। সত্যিই কী তার প্রতি ঈশ্বর সহায় আছে?

আজ সকালের কাক ডাকার ভাবনাটা ভিখারি মনেও দোল তোলে ক্রমাগত। প্রশ্ন জাগে মনে। আজ সকালটা কেমন যেন ভাবছাড়া লাগছে। কিছু হলো কি? এ সময় খোঁড়াতে খোঁড়াতে আধভাঙা ঝাড়ু নিয়ে সিদ্ধির মা ঝাড়ুওয়ালি দাঁড়ায় অবিনেশের সামনে। অবিনেশ তাকায়, মুখ গোমরা কেন রে সিদ্ধির মা?

অবিনেশ দেশে পচন ধইরছে রে, দেখ গিয়া লেকের ধারে একটা মাইয়্যা মাইনষের লাশ পইড়া রইছে!

দুই

নাম তার সমুদ্রা। একটু সৌন্দর্য, মাধুর্য কিংবা সে একটু মিশুক। সেই সঙ্গে একটু চঞ্চলতা তার মাঝে বিরাজমান। মুখে তার হাসির ফোয়ারা যেন লেগেই থাকে। মন খারাপ করা দিন ছিল তার কম। বৃষ্টি কিংবা কাব্যবন্দনা একসঙ্গে জোটাতে চাইত সে। বৃষ্টির আঙিনায় নিজেই কাব্যের বন্দনা গাইত। মায়া ছিল বেশি। পথ-পাখি-পথিক এই তার প্রিয়। যখন হৃদয়ে দোলা জাগছে তার একটু একটু করে; ঠিক পিছে তারই বন্দনা গাইছে কেউ কেউ, এটা ভালো লাগার প্রথম দৃশ্য। দৃশ্য আরো অনেক হতে পারে। তাই দৃশ্যের অবতারণা করতে চলার পথে বখাটেরা পিছু নেয় প্রায় প্রতিদিন। সৌন্দর্য ভোগ করার লালসাও হয়তো জাগে ওদের মনে। তাই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে ভালোবাসার কথা। সমুদ্রা ফিরিয়ে দেয় সেসব। ভালো লাগে না বলেই। কিন্তু বখাটেরা মানতে পারে না। তারা কলরব ছড়ায়, যৌবন তো কাউকে দিতে হবে তাই না? তাহলে দিবি না ক্যান? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছা ওর হয় না। সমুদ্রা কখনো নত মুখে চলে। এসব জঞ্জালভরা রাস্তায় ভাবে সত্যিকার রাজপুত্রের আবির্ভাব হবে একদিন। যে তাকে রক্ষা করবে এই নরান্তদের হাত থেকে। রূপকথার সেই ভুবনে যাওয়া তো সম্ভব নয়। নরান্তরা তাই ভিড় করেই থাকে সমুদ্রার পাশে। লালসার জিবগুলো বাড়তে বাড়তে এক নদী পেরোতে চায়। চায় জোয়ারে ভাসতে। কখনো ঈহামৃগ হতে চায়; ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় ইন্দুমতির শরীর তলে।

ও সেদিন কলেজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। পথে তখন ভিড় নেই, শ্রান্ত দুপুর। মোড়ের লন্ড্রির দোকান থেকে খুচরা পাঁচটা দুই টাকার কয়েন নিয়ে নিল। প্রতিদিন কলেজে আসার পথে অবিনেশ ভিখারি পাবে একটি করে, আর বন্ধের দিন পাবে দুপুরবেলায়। পাবেই। লন্ড্রিওয়ালা সপ্তাহে দুবার ভাংতি দেয়।

অবিনেশ জীবনটাকে সরল তুলসীগাছের মতোই ভাবে। প্রতিদিন যদি কেউ নিয়ম করে ভক্তিভরে কিছু দেয়, তাহলে সে ভাবে ঈশ্বর তার জন্য দেবদূত পাঠিয়েছেন বৈকি। আর না হলে একালে এমনটি হয় নাকি। মানুষরূপী সেই দেবদূত যেন ভালো থাকে সে আশীর্বাদ রোজ করে অবিনেশ। রোজকার আশীর্বাদের কথাটাই ভাবছিল সমুদ্রা। ভিখারি অবিনেশের কত কষ্ট।

বাঁ পাশের বুটিক হাউস পার হলে একটু নিরিবিলি রাস্তা। নিরিবিলি এ পথে আজ একটা চার চাকার ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে। পা ছেড়ে ছেড়ে হেঁটে যাচ্ছে সমুদ্রা; আজ রোদের আলো ওকে খানিকটা তাতাচ্ছে। চার চাকার পাশে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওদের পাশ কাটিয়ে সমুদ্রা এগিয়ে গেল, কিন্তু মনে হলো পেছনে কে যেন আসছে। ভয়ে যে পিছু তাকাবে সে উপায়টুকুও নেই। হঠাৎ একটা হাওয়া নাকে লাগতেই আচমকা কে যেন ওর মুখটা জাপটে ধরল। মুহূর্তেই দুলে উঠল সামনের দৃশ্যগুলো। তারপর ধরাশায়ী। চার চাকাটা ওকে নিয়ে মিলিয়ে গেল পথের সমুদ্রে। কোথায় গেল! পরিচিত চোখ সেটা বুঝতে পারল না।

তারপর থেকে ওর হদিস নেই। চারপাশে একটা রব উঠল, কলোনির মিষ্টি মেয়েটা নিখোঁজ। বিকেল থেকে সন্ধে। সন্ধে থেকে রাত। সময় গেল, সমুদ্রা এলো না।

তিন

দেহটা ঝাঁপিয়ে পড়ে গোলাপরাঙা শরীরটার ওপর। যে দেহটা এতকাল পিছু ছুটে কুকুর হয়ে গিয়েছিল। যেন হাতের চাপে কেউ কচলে নিংড়ে নিচ্ছে রস। ফুলটা এখনো ফুটতে পারেনি; সবে আধফোটা হয়েছিল। শীৎকারের সঙ্গে সঙ্গে কান্নার একটা কঠিন শব্দ ছিটকে দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়। জমাটবাঁধা ছোট্ট একটা রক্তের ফোঁটা মেঝেতেও পড়ে। একসময় ক্ষান্ত হয় মানব নামের সারমেয়রা।

নিস্তব্ধ প্রকৃতি। বাকশূন্য চারদিক। শুধু দেয়ালটা নীরব গর্জন করে যায় একটানা। যেন সে নীরব সাক্ষী। হাওয়াটা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। এ সময় মনে হলো কোথায় যেন নক্ষত্রের পতন ঘটল। যেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছিটকে গেল নক্ষত্রটা। পশুত্বের সুখে; পশুত্বের আকাঙ্ক্ষার বলি হলো একটা নারীত্ব!

যে কি না ফুল হতে পারেনি। যার অসহায়ত্ব দেয়ালে ঠেকে গেছে, ভেদ করতে পারেনি মনুষ্যত্ব। যার আর্তচিৎকার নগর দেবতার কানে যায়নি। যে অদম্য শখের ভেলায় ভাসতে গিয়ে ডুবে গেছে অতল সমুদ্রে। শেষ পর্যন্ত তাকে নীল হতে হলো। বাঁচতে পারেনি ওই কুকুরটার হাত থেকে। পশুত্বের জোয়ারে মনুষ্যত্ব বড় অসহায় হয়ে গিয়েছিল। বিন্দু পরিমাণ মায়া জাগল না হায়! সতীত্ব মুছে গেল পশুত্বের জোয়ারে। সেই সঙ্গে সমুদ্রা চিরতরে হারাল।

চার

সালোয়ারের একপাশটা রক্তে ভেজা। কামিজটাও ছেঁড়া! কপোলের পাশটায় ক্ষত হয়ে আছে, সেই সঙ্গে রক্তের দাগ। মুখটা শুকনো। উবু হয়ে পড়ে আছে লাশটা সবুজ ঘাসের ওপর। কা-কা রবে মাত করছে কাকগুলো। চক্রাকারভাবে ঘুরছে। যেন ওরা কী হারিয়েছে। রাস্তার নেড়ি কুকুরটাও পাশে চুপটি মেরে বসে আছে আজ। কাকদের প্রতিবাদের ভাষা আছে। কিন্তু ভাষা নেই মুখোশমুখো সভ্য নামের অসভ্য মানুষদের। ওরা শুধু মানববন্ধন করবে রাস্তায় পড়ে, আন্দোলনের মুখে কচু এঁটে বসে রবে। যে নগরে কুড়ি থেকে কুড়ি হাজারে সম্ভ্রম কেনা যায়, কিংবা কুলটা বলে মিথ্যা দাবিতে কুড়ি হাজারে মূল্যমান দাঁড়ায় সম্ভ্রমের দাম। সে নগরে কুড়ি দিনে কুড়িটা সম্ভ্রম খোয়া লাশ এভাবে পড়ে থাকা অসম্ভব কিছু নয়।

অর্ধনগ্ন লাশ দেখে কেউ নাক সিটকায় ঘৃণায় থুতু ফেলে। শহরতলির লোক দেখছে, ওই তো পড়ে আছে সমুদ্রা। সেই জলপাই রঙা ওড়না, হাতে প্লাটিনামের কঙ্কণ। শুধু ওরা আফসোসের সুর তোলে জিবে, আহা! মেয়েটা বড় ভালো ছিল। সেই সঙ্গে মনে মনে বুলি আওড়ায়, ভালোদের বেঁচে থাকতে নেই।

কেন তুই ভালো হতে গেলি?

কেন তোর সতীপনা?

সমুদ্রার মা আছড়ে পড়ে লাশের ওপর। অশ্রু বিসর্জন দেয়। ওপর থেকে বাবা নিস্তব্ধ। কাল বিকেল থেকে কোথাও খুঁজে পায়নি ওকে।

কাকগুলো উড়ে উড়ে ফিরে আসে লাশের কাছে আহাজারি করে মরে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে অবিনেশও এসে যায় সেই ভিড়ের কাছে। চেয়ে দেখে ওই তো শুয়ে আছে সমুদ্রা ঘাসের চাদরে। যেন এখনই এসে বলবে, কী অবিনেশ দা কেমন আছ? অবিনেশের মাথাটা ঘুরপাক খায়! অনুভূতিতে এমন মনে হয়, তার মাথায় যেন কেউ গরম তরল ঢেলে দিয়েছে ততক্ষণে। মেয়েটার কী দোষ ছিল? ভালো ছিল, খুব মিশুক। কেন মারল ওরা?

বারবার কী অদৃশ্য স্পর্শ যেন তাকে ডাকে। সমুদ্রা কেন পড়ে আছে ঘাসের ওপর? তারও একটি মেয়ে আছে ঘরে, তার যদি এমন হতো আজ তাহলে কী করত সে? ভাবনাটা তাকে ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ করে তোলে।

পুলিশ এসে ভিড় জমাচ্ছে।

কাকগুলোর কা-কা ডাক ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে বহুদূর। কাকগুলো এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে না, অনেক কিছু বুঝে নেওয়ার ভঙ্গিতে আহাজারি করে। কিন্তু বুঝতে পারে না এই বিবেকওয়ালা দম্ভকারী

মানুষগুলো।

ঈদ সংখ্যা ২০১৮- এর আরো খবর