English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

গল্প

ম্যাক্স ওয়েবারের আত্মা

মাসুদ আহমেদ

  • ১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০

অঙ্কন : শতাব্দী জাহিদ

টাই, স্যুট আর মুখখানি মিলে ভদ্রলোক নিখুঁত এক রঙিন ছবি। এ বয়সে বেশির ভাগ পুরুষেরই চুল পাতলা হয়ে যায় বা টাক পড়ে। প্রকৃতি সে কাজটিও তার ক্ষেত্রে করেনি। আজমল হামিদ, বয়স ৬০, তৃতীয় দফা এক্সটেনশন চলছে তার। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের একজন সাবেক আমলা।

সকাল থেকে মাত্র একজন দেখা করার উদ্দেশ্যে একটি স্লিপ দিয়েছেন পিএসের কাছে। আধাঘণ্টা তাঁকে বসিয়ে রেখেছেন। স্লিপের নামটা একনজর দেখে দামি পেপারওয়েটে চাপা দিয়ে রেখেছেন। তিনি চারটি খবরের কাগজ পড়ে এশিয়া উইকের পাতায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কয়েকটি ফোন এসেছে। ব্যস্ত বলে পিওকে লাইন দিতে নিষেধ করেছেন। এবার ঘড়ি দেখে পিয়ন আয়নালকে স্লিপটা দেখিয়ে বললেন, একে আসতে বলো।

দর্শনার্থী প্রবেশ করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

আপনার সমস্যাটি কী বলুন?

স্যার, সাত মাস ধরে পেনশনের পেছনে ঘুরছি, কাজটা হচ্ছে না।

ফাইলটা কোথায় এখন?

আপনার এখানে।

শান্তভাবে বললেন, ফাইলটি কবে এসেছে আমার কাছে?

হরগঙ্গা কলেজের রিটায়ার্ড প্রিন্সিপাল আবুল হাশেম বিনীতভাবে বললেন, স্যার, তিন দিন আগে।

ফাইলের কোনো পার্টিকুলার্স আছে আপনার কাছে?

জি স্যার, বলে হাশেম সাহেব ফাইলের ইনওয়ার্ড ডায়েরি নম্বর লেখা একটি ছোট কাগজ আজমল সাহেবের সামনে টেবিলের ওপর মেলে ধরলেন।

পিএ গিয়াসউদ্দীনের সঙ্গে হাশেম সাহেবের এর আগে বেশ কয়েকবার দেখা ও কথাবার্তা হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগে তিনি এই ফাইলটায় একটি নতুন চিঠি ঢোকানোর জন্য গিয়াসউদ্দীনের কাছে এসেছিলেন। তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। বিষয়টি অনেকক্ষণ ধরে শুনে শেষে গিয়াস হাশেম সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, সরকারি এই চিঠিটি তিনি হাতে পেলেন কিভাবে। হাশেম সাহেব বলেছিলেন, তিনি একজন প্রিন্সিপাল ও প্রফেসর এবং চিঠি তার কলেজ থেকেই দেওয়া। গিয়াস বলেছিলেন, আইন সবার জন্য এক। চিঠিটি সরকারি ডাক বা মেসেঞ্জারযোগে রিসিভিং শাখায় পাঠালেই গৃহীত হতে পারে।

আজমল সাহেবের বাঁ পাশে টেবিলের কোণে দাঁড়িয়ে রইলেন গিয়াস।

এই ফাইলটি কোথায়?

স্লিপটার দিকে তাকিয়ে আজমল সাহেব জানতে চাইলেন।

স্যার, আমার ডায়েরিতে একটু দেখে আসি। বলে গিয়াসউদ্দীন স্লিপটা নিয়ে নিজের রুমে গেলেন। একটু পর ডায়েরি নিয়ে এসে জানালেন,

গত পরশু ফাইলটার এন্ট্রি আছে।

কিন্তু ফাইল তো আমার টেবিলে নেই। স্যার, আপনার শেলফটা খুঁজে দেখি?

শেলফ খুঁজে ফাইল পাওয়া গেল না। মাথা চুলকে গিয়াস বললেন, স্যার, ফাইল তো আমি রিসিভ করেছি; কিন্তু গেল কোথায় বুঝতে পারছি না।

আউটওয়ার্ড ডায়েরি দেখুন।

দেখেছি স্যার। ওখানে এন্ট্রি নেই।

ফাইল রুমে ঢুকল, বের হলো না, অথচ পাওয়া যাচ্ছে না। ফাইলের পাখা আছে নাকি যে ওটা উড়ে চলে গেছে। যান খুঁজে বের করুন।

আজমল সাহেবের মেধা ও স্মরণশক্তি সাধারণ পর্যায়ের নয়। পিএর সঙ্গে কথোপকথনে তাঁরও মনে পড়ল যে কয়েক দিন আগে এই নামের একটি ফাইল তিনি পড়ে প্রায় শেষ করে এনেছিলেন, এমন সময় তাঁর দুই বন্ধু আর একজন অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি রুমে ঢুকেছিলেন। অ্যাডিশনাল সেক্রেটারিকে তিনিই সময় দিয়েছিলেন তিনটি ফাইল নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এরপর সব ফাইলই তিনি নিয়ে যেতে বলেছিলেন পিয়নকে।

আসলে হাশেম সাহেবের ফাইলের ওপর রাখা তিনটি ফাইলের আলোচনা শেষ হলে ওগুলোর সঙ্গে অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি ফোরকান আলী রুম থেকে হাতে করে ফাইল তিনটি নেওয়ার সময় খেয়াল করেননি যে তিনি শেষে রাখা হাশেম সাহেবের ফাইলটিও সঙ্গে করে বেঁধে নিয়েছেন। পিএকে নির্দেশ দিয়ে আজমল সাহেব হাশেম সাহেবকে বললেন, আগামীকাল অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি সাহেবের সঙ্গে দেখা করুন। ফাইলটি এর মধ্যে খুঁজে বের করা হবে।

****

সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাশেম সাহেব বাসা থেকে বের হলেন। ১১টার সময় পাস পেলেন। অ্যাডিশনাল সেক্রেটারির রুমের পাশে পিওর টেবিলে গেলেন। পিও-পিয়ন কাউকেই দেখতে পেলেন না। অনেকক্ষণ পর ফাইল হাতে একজন তরুণ অফিসারকে পেলেন। তিনি জানতে চাইলেন, হাশেম সাহেব কার কাছে এসেছেন। হাশেম সাহেব বললেন তাঁর প্রয়োজনের কথা। তরুণ অফিসার বলেন, আজ কর্মচারী ইউনিয়নের ধর্মঘট আছে, কাউকে পাবেন না। তবে অ্যাডিশনাল স্যারকে আমি বলছি আপনার কথা।

এই তরুণ একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি। হাশেম সাহেব যখন তিতুমীর কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে ছিলেন, তরুণটি তার ছাত্র না হলেও ওই কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে পড়ত। হাশেম সাহেবের তা মনে নেই। তরুণটির মনে আছে, তবে তিনি তা উল্লেখ করলেন না। হাশেম সাহেবকে এখানে বসতে বলে বললেন, আমি স্যারকে বলছি। মিনিট চল্লিশেক পার হয়ে গেল। সেই তরুণটির আর দেখা নেই। অন্য একটি লোক বের হয়ে এলেন। একটি ফুলশার্টের হাতা গোটানো আর একটি থ্রি কোয়ার্টার করা হাফহাতা সোয়েটার, পায়ে স্যান্ডেল। হাশেম সাহেবকে তিতিন বললেন, স্যার আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছেন। হাশেম সাহেব ভেতরে গেলেন। সালাম দিলেন। ভদ্রলোক খুব অস্পষ্টভাবে সালামের উত্তর দিলেন। বেশ কটি ফরম পূরণে তিনি ব্যস্ত। ১০ মিনিট পার হলে ফরম আর পাসপোর্ট নিয়ে সোয়েটার পরা লোকটি বাইরে চলে গেল। এবার হাশেম সাহেবের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, বলেন কী করতে পারি আপনার জন্য?

হাশেম সাহেব তার সমস্যার কথা বললেন। আরো বললেন যে সচিব মহোদয় তাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি ফোরকান আলী সাহেব বিষয়টি মনে করতে পারলেন না। অনেক ব্যাখ্যার পর এইটুকু মনে করতে পারলেন যে সেক্রেটারি সাহেব তাকে অন্য পাঁচটি বিষয়ের সঙ্গে এজাতীয় একটি ফাইলের কথা বলেছিলেন। ফোরকান সাহেব খোঁজ করার ফুরসত পাননি।

হাশেম সাহেবের কথা শুনে তিনি ইন্টারকম ও পিএবিএক্সে কয়েকটি ফোন করলেন। যাদের চাচ্ছিলেন তাদের পেলেন না। ওদিকে আজই ভিসা নিতে হবে।

শেষে ডাইরেক্ট লাইন ব্যবহার করে বললেন,

মিয়াজী সাহেব, হাশেম সাহেবের পেনশন ফাইলটি কোথায়, কী অবস্থায়, এক্ষুনি জানান।

ডেপুটি সেক্রেটারি জানান, আমি খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।

২০ মিনিট পার হয়ে গেল। ডেপুটির ফোন এলো না। হাশেম সাহেব এবার বললেন,

আমি না হয় ডিএস সাহেবের কাছে গিয়ে খোঁজ করি।

না, ঠিক আছে, আমি দেখছি।

এবার ডিএসকে পাওয়া গেল। এতক্ষণ ফোন করেননি কেনএ কথাটা না বলে কেসটির অবস্থা জানতে চাইলেন। ডিএস বলেন, ফাইলটি সংশ্লিষ্ট ডাইরেক্টরেটে ফেরত চলে গেছে গত বৃহস্পতিবার।

বিষয়?

স্যার, অবজেকশন আছে কিছু।

তো কপি রাখেন না আপনারা? আর কিভাবে জানলেন অবজেকশন আছে?

স্যার, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডিলিং অফিসার বললেন।

বেশ, ডাইরেক্টরেট অফিস যেন তাড়াতাড়ি অবজেকশন মিট করে, তা দেখুন।

হ্যাঁ, স্যার। ওরা সাত ওয়ার্কিং ডেতে ফেরত দেবে।

রিসিভার রেখে দিলেন ফোরকান সাহেব। হাশেম সাহেবকে বললেন দিন দশেক পর জয়েন্ট সেক্রেটারির কাছে খোঁজ নিতে। হাশেম সাহেব বের হয়ে এলেন রুম থেকে।

ডিএসের নামটি হাশেম সাহেব মনে রেখেছেন। ডিএস বসেন অন্য বিল্ডিংয়ে, যদিও একই বিভাগের। একজন সহকারী সচিবের রুমে ঢুকে তিনি ডিএসের রুম নম্বরটি জানতে চাইলেন। ভদ্রমহিলা জানান, আব্দুল লতিফ মিয়াজী ডিএস রুম নম্বর ১৪২/ক-তে বসেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেলেন ১৪২/ক নম্বর রুম।

নেমপ্লেটটিও দেখতে পেলেন। রুমের দরজাটি খোলা। রুমে কোনো লোক আছে কি না বুঝতে পারলেন না। এ সময় দ্রুতবেগে মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক রুমের ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন। তার মাথায় টুপি। এ সময় আরেক ভদ্রলোক হাতে একটি ফাইল নিয়ে রুমের ভেতর থেকে বের হলেন। তাকে মিয়াজী সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করতেই ভদ্রলোক বললেন, স্যার তো এইমাত্র আপনার সামনে দিয়ে বের হয়ে গেলেন নামাজ পড়তে। আপনি কি উনাকে চেনেন না?

হাশেম সাহেব উত্তর দিতে লোকটি বললেন,

আপনার প্রবলেমটা কী?

প্রবলেমের কথা শুনে বললেন, সহকারী সচিব এটি ডিল করেন, তিনিও আজ একটু আগে বাসায় চলে গেছেন। কারণ কর্মচারীদের ধর্মঘটের ফলে ফাইলে ড্রাফটিং ও টাইপের কাজ করা যাচ্ছে না। ফাইল মুভমেন্টও করা যাচ্ছে না।

ভদ্রলোক জানান, তিনি মন্ত্রকের প্ল্যানিং সেলে আছেন। তিনি একজন সৎ ও আন্তরিক কর্মকর্তা। তবে শেষে বললেন, ফাইলটি কবে গেছে এবং কী আপত্তি হয়েছে, তা অন্তত আজকে জানা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ ওই ধর্মঘট। দারোয়ানরা না আসায় কোনো কোনো রুম এবং রুমের আলমারিই খোলা সম্ভব হয়নি আজ। শেষে তিনি বললেন, আপনি অনুগ্রহ করে কালকে আসেন, আমি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব।

* * *

এখন দুপুর সাড়ে ১২টা। চিন্তা করে এক বুদ্ধি করলেন। সরাসরি ডাইরেক্টরেটে গেলে কেমন হয়? ফাইলটিতে কী লিখে পাঠিয়েছে হয়তো জানা যেত। সোয়া ১টায় আব্দুল গণি রোডের মাথায় এসে নামলেন। হাশেম সাহেব টাই-স্যুট পরেছেন। দারোয়ানকে নিজের পরিচয় দিতে সে ঢুকতে দিতে রাজি হলো। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেন। মহানির্দেশকের নেমপ্লেটটা পড়লেন, তাঁর অনেক জুনিয়র ছিলেন চাকরিতে। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সেকশনের এডি তাঁর ছাত্র না হলেও বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক জুনিয়র। সরাসরি রুমে ঢুকতে যাচ্ছিলেন হাশেম সাহেব। পিয়ন বাধা দিলে নিজের পদবি বলায় যেতে দিল। সহকারী পরিচালক জামাল হোসেন অনেক দিন পর দেখলেও হাশেম সাহেবকে চিনতে পারলেন এবং সালাম দিলেন। তবে উঠে দাঁড়ালেন না। অনেকক্ষণ একটি ফাইলের নোট পড়তে থাকলেন। এটি তাঁর ভাগ্নির ঢাকায় বদলিসংক্রান্ত একটি নোট। এডি সাহেব ফাইলটি বন্ধ করে হাশেম সাহেবকে বললেন, স্যার, আপনি এখন কোথায় আছেন? হাশেম সাহেব বললেন তাঁর অবস্থানের কথা এবং কী জন্য এসেছেন এখানে। এডি সাহেব জানতে চাইলেন, ফাইল নম্বর কত?

তা জানি না। আমার নামে ফাইল। নম্বর কি খুবই দরকার?

হাশেম সাহেব এমনিতে নিরীহ তবে নিজের প্রফেশনের এবং চাকরিতে অনেক জুনিয়রকে পেয়ে একটু দাবির সুরেই প্রশ্নটা করলেন,

ফাইল কবে এসেছে?

গতকালচট করে হাশেম সাহেব উত্তর দিলেন। ওই সহকারীকে ডাকলেন এডি সাহেব। সে আধাঘণ্টা পর রিপোর্ট করল গতকাল বা আজ এই নামে বা পেনশনসংক্রান্ত কোনো ফাইল আসেনি। শেষে সে বলল, ফাইলটি হয়তো মিনিস্ট্রির ডেসপাচ শাখায় আছে। বেশ কিছু ফাইল জমা হলে ডেসপাচ রাইডার একসঙ্গে সাধারণত এগুলো নিয়ে বের হয়।

এডি সাহেব শেষে বললেন, স্যার, আপনি ডেসপাচ থেকে খোঁজ করে আমাকে কাল ফোন করবেন। আমি বিষয়টি দেখব। হাশেম সাহেব উঠলেন। আজ আর কোথাও যাওয়ার সময় নেই।

* * * *

পরের সপ্তাহে অফিস খুললে হাশেম সাহেব বাসা থেকে একজনকে ফোন করতে চেষ্টা করলেন পাসের জন্য। পিএবিএক্সে অনেকবার রিং হলে কেউ ধরার আগে কেটে যাচ্ছে। তিনি ক্লান্ত হয়ে বসে রইলেন। তাঁর কন্যাটি ইউনিভার্সিটিতে গেছে। স্ত্রীকে বলেছিলেন আজ বের হবেন। এবার তিনি রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন,

ঘরের মধ্যে এতক্ষণ ধরে খুটুরখুটুর করে কী করছ?

জাতির সেবা অনেক দিন করেছি তো এখন দু-একজনের সেবা পাওয়ার চেষ্টা করছি। ফোনের বিষয়টি শুনে স্ত্রী বললেন, এখন ঘরে ঘরে জনে জনে মোবাইল। আর তুমি আছ সেই মান্ধাতা আমলের এক সেট নিয়ে।

বেতন পাই না কত মাস ধরে, হাউস বিল্ডিংয়ের ইনস্টলমেন্টে কত যাচ্ছেসে হিসাব রাখো? ভেবেছিলাম পেনশন ও গ্র্যাচুইটির টাকাটা পেলে একটা মোবাইল নেব। তোমার অমন মনকলার কথা শুনে জীবন কাটিয়েছি, এখন বলো কোথায় ফোন করতে হবে?

কী করছ তুমি, ফোনটা তো নষ্ট? স্ত্রীকে ডায়াল করার চেষ্টা দেখে হাশেম সাহেব স্ত্রীকে বললেন, তোমার হাতে কোনো কিছু ভালো থাকে বা আছে, আজ পর্যন্ত শুনেছি?

আসলেও ভাগ্য। স্ত্রী রিসিভার কানে দিয়েই দেখলেন ফোনটা যাচ্ছে। মিসেস হাশেম ফোন করে ভদ্রমহিলাকে পেলেন একবারেই। পাস ২টার সময় পাওয়া যাবে। হাশেম সাহেব লাঞ্চ করে পৌনে ২টায় পাস নেওয়ার কাউন্টারে পৌঁছলেন। সোয়া ২টায় পাস হাতে নিয়ে ডিএস সাহেবের রুমে পৌঁছলেন। রুমটি তালা দেওয়া। পিওর রুমটি খোলা, তবে ওখানে কেউ নেই। বুদ্ধি করে অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফের নামটি শুনে রেখেছিলেন সেদিন। এখানকার প্ল্যানিং সেলটা আবার মূল বিল্ডিংয়ে। হাশেম সাহেব সেদিকে রওনা করলেন।

বিকেল ৩টার মধ্যে হাশেম সাহেব অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফের রুমে পৌঁছতে পারলেন।

ভদ্রলোক হাশেম সাহেবকে দেখে না চেনার ভান করলেন না। বললেন, সহকারী সচিবের সঙ্গে তাঁর একটু আগেই কথা হয়েছে। তিনি ডেস্কেই আছেন। ভদ্রলোক ইন্টারকমে পেনশনের বিষয়টি আবার বললেন। হাশেম সাহেবকে বললেন এক্ষুনি ওখানে যেতে।

২০ মিনিট পর হাশেম সাহেব সহকারী সচিবের রুমে গেলেন। তিনি আপত্তির পয়েন্টগুলো জানতে চাইলেন।

ভদ্রলোক হাশেম সাহেবকে বললেন, আপনার ফাইলে কতগুলো সমস্যা আছে।

যেমন?

আপনার কলেজও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেনি। হাশেম সাহেব চুপ করে শুনতে থাকলেন।

একটি শিট বের করে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি তৌহিদ হোসেন বলে চললেন,

অ্যাপ্লিকেশনে আপনার স্বাক্ষরে গরমিল দেখা যায়। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটি সঙ্গে দেওয়া হয়নি। ব্যাংকের নামে কাটাছেঁড়া আছে। কোয়ালিফাইং সার্ভিসের লেংথটি স্পষ্ট নয়। ২৭ বছরের পরের লেংথটি উল্লেখ করা হয়নি।

হাশেম সাহেব একমুহূর্ত চিন্তা করলেন। তারপর বললেন,

তৌহিদ সাহেব, চাকরিটা করেছি আমি এবং পেনশনটাও আমার। তাই বলতে হচ্ছে, ২৫ বছরের লেংথ হলে এর পরের অংশ ক্যালকুলেট করার বাধ্যবাধকতা নেই। ফুল পেনশন ওতেই দেওয়া যেতে পারে। তৌহিদ সাহেব একটা কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। হাশেম সাহেব বললেন, আমার কথা শেষ হয়নি। আমার জানার প্রয়োজন আছে যে এই অবজেকশনগুলো দিয়ে ফাইলটি ডাইরেক্টরেটে কবে গেছে। কারণ সাত দিন আগে বলা হয়েছে ফাইলটা ফেরত গেছে অথচ গতকালও ওটা ওই অফিস পায়নি। তারপর বললেন, আমি ওই অফিসে গিয়ে চেক করেছি।

দেখুন, ডেসপাচ শাখায় ঠিকই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ডেসপাচ শাখাটা আমার কলেজ বা ডাইরেক্টরেটের কন্ট্রোলে নয়। কাজেই অন অফিসগুলোকে পোস্ট অফিসের সঙ্গে তুলনা সম্ভবত না করলেও পারতেন। আজ এক মাস চেষ্টার পর জানতে পারলাম যে অবজেকশনগুলো কী কী।

একটি ভীতি উদ্রেককারী সার্ভিসে তাঁর একজন দূরসম্পর্কের আত্মীয় আছেন। তা সত্ত্বেও হাশেম সাহেব বুঝতে পারলেন যে একটু অসতর্ক হয়ে পড়েছিলেন তিনি এবং এর ফলে তাঁর ফাইলটির অকল্যাণ হতে পারে। শুনেছেন এমন আচরণের ফলে অনেকের ফাইল হারিয়েও গেছে। তা পুনরুদ্ধার করতে অনেক মাসুল দিতে হয়েছে।

তাই কণ্ঠটি নরম করে আনলেন। বললেন, আপনাদের মতো ইয়ং অফিসাররা আমাদের মতো রিটায়ার্ড লোকদের যদি একটু স্পেশালি না দেখেন, তো আমরা যাব কোথায় বলুন?

তৌহিদ একজন দুঁদে ধূর্ত লোক। সঙ্গে সঙ্গে মুখে হাসি এনে বললেন, না, আসলে আপনার একটু বিরক্ত হওয়ারই কথা। আচ্ছা, আপনি দুই দিন পর আমাকে রিং করবেন। ফাইলটা হয়তো ট্রানজিটে আছে। ওটা যেভাবেই হোক ডাইরেক্টরেটের কনসার্নড এডি সাহেবের হাতে যাতে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা আমি করব।

বড় ভালো লাগল আপনার কথা শুনেবলে হাশেম সাহেব উঠলেন।

* * *

দুই দিন নয়, চার দিন পর হাশেম সাহেব ডাইরেক্টরেটে ফোন করলেন। আজ একবার রিং হতেই কেউ ফোন ধরলেন। এডি সাহেবের খোঁজ করতে লোকটি জানালেন, উনি দুপুর ১টার পর আসবেন। তারপর লোকটি হাশেম সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, তার প্রবলেমটা জানা যায় কি না। হাশেম সাহেব তখন তার পরিচয় জানতে চাইলেন।

লোকটি সেই এফিশিয়েন্ট হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিজুর রহমান। কেসটার কথা বলতেই হাশেম সাহেবকে বললেন, স্যার, আপনার ফাইল আমরা পরশু দিন পেয়েছি। আজই ওটার নোট লিখে আমি এডি সাহেবের হাতে দিতে পারব।

বড় ভালো লাগল শুনে। তো এখন তো বেলা ১০টা, আমি কি আসব? হাশেম সাহেব জানতে চাইলেন।

জি না স্যার, আপনি আসবেন কেন কষ্ট করে? আমিই আপনাকে জানাব, আজ না হোক আগামীকাল।

* * *

পরদিন সকাল ১১টা পর্যন্ত কোনো ফোন না পেয়ে হাশেম সাহেব ফোন করতে সেটের পাশে বসতেই রিং বেজে উঠল। বানিজুরের গলা। তিনি জানান, মন্ত্রকের কিছু অবজারভেশন ছিল। সেগুলোর যথাযথ উত্তর লিখে টাইপ করিয়ে এডি সাহেবের সই নিয়ে ফাইলটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখান থেকে মঞ্জুরিটা এলে বাকি কাজে সময় লাগবে না।

হাশেম সাহেব দিন চারেক অপেক্ষা করলেন। পঞ্চম দিনে একটি পাসের ব্যবস্থা করলেন। দুপুর ২টায় ওটা পাওয়া যাবে। তবে দেড়টায় গেলেও ঢুকতে দিতে আপত্তি করবে না।

তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে সোয়া ১টায় হাশেম সাহেব মন্ত্রকের গেটে পৌঁছলেন। ভিড় সব দিনই হয়; কিন্তু আজ ভিড় প্রচণ্ড রকম বেশি। গেটের বাইরে দুই দিকে কয়েক শ লোক। একজন নিরাপত্তারক্ষীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই সে হাশেম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল, আপনার পাস?

তিনি জানালেন, পাস কাউন্টারে আছে। ওখান থেকে নিতে হবে।

রক্ষীটি জানাল, আজ ভেতরে বিশেষ নিরাপত্তা তল্লাশি চলছে। তা শেষ হওয়ার আগে বহিরাগতদের ভেতরে ঢোকার পারমিশন নেই। অনেকে অবৈধভাবে ঢোকার ফলে এ ব্যবস্থা মাঝেমধ্যে নিতে হয়।

বিকেল ৪টায় তল্লাশি শেষ হলো। এবার পাস নিয়ে ভিজিটররা ঢুকতে পারেন। অনেকেই চলে গেছে অপেক্ষা করে। হাশেম সাহেব সহজেই ঢুকতে পারলেন। লিফটেও ভিড় নেই। সোয়া ৪টা বাজে। নামাজ আর অজুতে বেশির ভাগ অফিসার আর কর্মচারী ব্যস্ত। হাশেম সাহেব ডিএসের রুমে গেলেন। তাঁকে তিনি এখনো চেনেন না। রুমের পাশে পিওকে জিজ্ঞেস করতেই পিও জানালেন, সাহেব নামাজ পড়ে এইমাত্র রুমে ফিরেছেন। নিজের পরিচয় দিতেই পিও বললেন, স্যার, ঢোকেন, পারমিশন লাগবে না।

কোনো অফিসার তাঁর ডেজিগনেটেড চেয়ারেই বসার কথা। হাশেম সাহেব দরজায় নক করে ঢুকে দেখলেন চেয়ারটি খালি। মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক সোফায় বসে একটা পেপার পড়ছেন। তিনি বুঝতে পারলেন না ইনিই ডিএস মিয়াজী, নাকি কোনো সাক্ষাত্প্রার্থী। ডিএস সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করতেই সোফার ভদ্রলোক জানতে চাইলেনসমস্যা কী? হাশেম সাহেব বিষয়টি বলায় তিনি ফাইলটির কথা মনে করতে পারলেন না এবং আরো বললেন, এখন তো অফিসের সময় প্রায় শেষ। কাউকে পাওয়া যাবে না। আগামীকাল আমি দুই দিনের ট্যুরে যাব, আপনি এর পরদিন আমাকে ফোন করুন।

হাশেম সাহেব তৈরি হয়েই এসেছিলেন। এই ফাইল এবং এর আগে তাঁর কলেজের দু-একটি প্রমোশনের ফাইলের পেছনে তাঁর অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাতে তিনি পকেটে একটি ছোট ক্যালেন্ডারও রাখা শিখেছেন। তিনি বললেন, তার মানে আপনি ২২ তারিখে আসতে বলছেন; কিন্তু ওই দিন তো বৃহস্পতিবার। পাস দেওয়া হয় না। পরদিন ও তার পরদিন বন্ধ। রবিবার জন্মাষ্টমী। সোমবারে আছে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি এবং মঙ্গল ও বুধবার টানা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল।

ডিএস মিয়াজী হাশেম সাহেবের কাছ থেকে এতটা প্রস্তুতি আশা করেননি। হাশেম সাহেবের এই তথ্য পেশকে তিনি কিছুটা আক্রমণাত্মক হিসেবে নিয়ে শেষে বললেন, বেশ, আপনি তাহলে ওই বৃহস্পতিবারে আসুন।

বৃহস্পতিবার তো পাস দেওয়া হয় না।

তাহলে ওই দিন ফোন করে পরের রবিবারে আসুন।

ঠিক এ সময় পিও নানু মোল্লা একটি ফাইল হাতে নিয়ে রুমে ঢুকলেন। ডিএস সাহেব তাকে হাশেম সাহেবের কেসটির কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, স্যার, উনার ফাইল তো আজ সকাল ১১টায় আপনি নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারিকে মার্ক করে দিছেয়েন। এই যে রিসিভ করা সই।

বিকেল ৪টা ৫০ হলেও হাশেম সাহেব পিওকে অনুরোধ করলেন নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারিকে ফোন করে ফাইলটির খোঁজ করা যায় কি না। হাশেম সাহেবের অনুরোধে তিনি নিজের পিএবিএক্স ঘোরালেন কয়েকবার।

শেষে বললেন, স্যার, আপনি লেট করে ফেলেছেন। সবাই গাড়ি ধরার জন্য এখন সাড়ে ৪টায় রুম বন্ধ করে। কী বলব, আমাদের সময় গাড়িও ছিল না, তার পরও আমরা শেষ মিনিট পর্যন্ত কাজ করতাম। যাহোক স্যার, আপনি ফোন করবেন, আমি যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করব।

আপনি আমার ফাইলটির মুভমেন্ট একটু লক্ষ করলেই চলবে। দেখেন তো, এখন পর্যন্ত নিজের চোখে দেখলাম না ফাইলে কী লেখা হচ্ছে, ফাইল কোথায় আছে, এক সেকশন থেকে আরেক সেকশন। এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং দৌড়াচ্ছিকত মাস হয়ে গেল।

হুঁ স্যার, আপনার পেরেশানি তো আমি নিজেই দেখছি। কী করবেন অনেকখানেই তো এই অবস্থা।

* * * *

পাসের কথা অনেক আগেই বলে রেখেছিলেন। দুপুর পৌনে ২টায় পাস নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন হাশেম সাহেব। ভিজিটর খুব কম। এর আগে নানু মোল্লাকে ফোন করে নিশ্চিত হয়েছেন, ফাইলটিতে নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি কাজ করছেন এবং নোট লেখা হয়েছে। তবে তাতে মঞ্জুরির সুপারিশ করা হয়েছে কি না, নানু মোল্লা সে তথ্যটি বের করতে পারেননি। কারণ টাইপিংয়ের কাজটি করেছে অন্য একটি শাখার একজন সহকারী। মূল সহকারী ঠিক এ সময়েই রেস্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন লিভে আছে ১৫ দিন।

হাশেম সাহেব কখনো ভাবেননি যে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি র্যাংকের কোনো অফিসারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দেখা করতে হবে। তাই তিনি সরাসরি রুমে ঢুকে পড়লেন।

ফর্সা, লম্বা বলিষ্ঠ গড়নের কর্মকর্তা আবিদুজ্জামান হাশেম সাহেবের পরিচয় জেনে কোনো রকম প্রভাবিত হলেন না। একটি সামারি ধীরেসুস্থে দেখা শেষ হলে ভাবলেশহীন ঠাণ্ডা চোখে হাশেম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন,

আপনার কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল আমার সঙ্গে?

জি না।

একটি ফোন করে এলে ভালো করতেন।

হাশেম সাহেবের ইচ্ছা হলো বলেন, ১০ বার রিং করলেও এখানকার অনেকে ফোন ধরে না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেব কী করে? দ্বিতীয় বিবেচনায় তা বললেন না।

যাহোক, বলেন আমার কাছে কেন এসেছেন? আবিদুজ্জামান আবার প্রশ্ন করেন।

হাসিমুখে হাশেম সাহেব তাঁর কেসটির কথা বললেন। আবিদুজ্জামান বললেন, এগুলো গোপনীয় বিষয়। এভাবে জানানোর বিধান নেই, তবু আপনার কেস, তাই বলছি।

বেশ কয়েকটি অবজেকশন আছে আপনার ফাইলে। যেমন আপনার নিয়োগপত্র পেনশন পেপারের সঙ্গে নেই। আপনি জাতীয়করণ কলেজে যোগদান করার পর একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছিলেন, সেটা সাবমিট করেননি। সার্ভিস লেংথের পুরো হিসাবও উল্লেখ করা হয়নি। দুটিই বেশ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।

হাশেম সাহেব জানান, জাতীয়করণের আগে তিনি যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছিলেন, যা গভর্নর বোর্ডের আদেশে জারি হয়েছিল, সেটির মূল কপি তিনি জমা দিয়েছেন এবং অনুলিপি তাঁর কাছে আছে। জাতীয়করণের পর নতুন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেওয়া হয় না, নিয়মিতকরণ অর্ডার দেওয়া হয়। উত্তরে অফিসারটি জানান, তিনি ফাইল ভালো করে দেখেছেন সেখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নেই।

আসলে আবিদুজ্জামন ঘাগু লোক হলেও লক্ষ করেননি যে ফাইলের একটি পাতা নেই। দ্বিতীয় অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটার ব্যাপারে তিনি শিওর নন যে আসলেই ওটা লাগে কি না।

হাশেম সাহেবের উত্তরে আবিদুজ্জামান ফাইলটা মেলে ধরে বললেন, দেখুন, আমি দেখেই কথা বলছি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নেই এবং লেংথের হিসাব আন্ডারস্টেটেড।

আপনার বলা শেষ হয়ে থাকলে আমি কিছু কথা বলব।

২৫ বছর চাকরি হলেই ফুল পেনশন। কাজেই পুরো লেংথের হিসাব না থাকলেও সেটি কোনো সমস্যা নয়। অরিজিনাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারসমেত যে আমার পেনশন পেপার রিসিভ হয়েছে তার প্রমাণ আমার কাছে এখানেই আছে। তা ছাড়া পেনশন সহজীকরণ বিধি ফলো করলেও আপনার কেয়ারিগুলোর প্রয়োজন পড়ে না।

কিন্তু যে কাগজ ফাইলে পাইনি তা ছাড়া চলবে কিভাবে?

আপনি পাননি, আপনার শাখা পেয়ে রিসিভ করেছে, যার প্রমাণ আমার কাছে এবং ডিজি অফিসে আছে।

আবিদুজ্জামান বললেন, দেখুন, আপনার সঙ্গে তর্ক করব না; কিন্তু যা ফ্যাক্টস তা-ই বললাম আপনাকে।

আমি শুধু তর্ক করব না, প্রয়োজনে আরো কিছু করব।

আপনি কি থ্রেট করছেন আমাকে?

ইন্টারপ্রিটেশন আপনার ব্যাপার, তবে আপনার কাজটা শুধু আপনি বোঝেন মনে করলে হবে না, আমিও বেশ বুঝি এবং ভালো বুঝি।

আবিদুজ্জামান মনে মনে বললেন, এত বোঝো তুমি, তাহলে মাস্টারির পেশা বেছে নিয়েছ কেন? তাও যদি ইউনিভার্সিটির ভালো কোনো সাবজেক্টের প্রফেসর হতে? বাঙালি অন্য বাঙালিকে শুধু মুখেই নয়, মনে মনেও অসম্মান করার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ।

হাশেম পেনশন পেপারের রিসিটটা বের করে বললেন, এখানে সিল ও স্বাক্ষর এবং কী কী কাগজ রিসিভ করা হয়েছে তার প্রমাণ আছে।

আবিদুজ্জামান বুঝতে পারলেন এসব প্রমাণ জেনুইন। ওদিকে নিয়োগপত্রটি যে নেই তাঁর ফাইলে সে কথাটিও ঠিক। কারণ নোট ও ড্রাফট লেখার আগে নিজে ভালো করে ওটা চেক করে দেখেছেন।

কিন্তু দেখুন, আপনার নিয়োগপত্রটি এই ফাইলের কোথাও নেই। হাশেম সাহেবের আজকের কথা শোনার আগে হলে তিনি অবশ্য বলতেন, আপনার এই নিয়োগপত্রের ফটোকপি যে জেনুইন, কী করে বুঝব? কিন্তু এখন তিনি বললেন, আপনারটি তো কপি এবং ওতে কোনো অ্যাটেস্টেশন নেই।

হাশেম সাহেব বললেন, অনুগ্রহ করে আপনার ফাইলটি গুনে দেখুন ২৪টি পাতা আছে কি না। আমার মনে হয়, ২৩টি পাবেন। কেউ হয়তো পাতাটি ছিঁড়ে ফেলেছে অথবা ওটা পড়ে গেছে। নইলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাবেন না কেন?

কোনো লেকচারার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পর্যায়ের কেউ এই পৃষ্ঠা গোনার কথা বললে অবস্থা অন্য রকম হতো। আবিদুজ্জামান এই অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। সহকারীকে ডেকে পৃষ্ঠা গনিয়ে দেখলেন যে ফরোয়ার্ডিং লেটারে সংযুক্তির সংখ্যা ২৪ পৃষ্ঠা লেখা রয়েছে। কিন্তু এখন ২৩টি পাওয়া যাচ্ছে। আবিদুজ্জামান ডিএসকে ফোন করলেন। ফোন এনগেজড। অনেকক্ষণ পর তাঁকে পাওয়া গেল। তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না। অরিজিনাল ডকুমেন্ট ছাড়া পেনশন নিষ্পত্তি বেশ রিস্কি আর কোনো কাগজ হারিয়ে গিয়ে থাকলে ইনকোয়ারি করে দায়দায়িত্ব ফিক্স করতে হবে। কারণ অনেক সময় বহিরাগতরা নিজেদের কাগজ নিজেরাই ছিঁড়ে ফেলে কর্মকর্তাদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে চায়। লম্বা কথা শেষে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফোনটি রেখে বললেন, বলুন, এখন আর কী করতে পারি এই কথার পর?

কেন যদি আমি আমার অ্যাপয়েন্টিং অথরিটির কাছ থেকে সার্টিফিকেট আনতে পারি যে আমার নিয়োগ ওই দিনই হয়েছিল তাহলে চলে না? ওখানে তো সব রেকর্ড রয়েছে।

কিন্তু আপনি তো প্রাইভেট কলেজে ছিলেন এবং সেটি এখন আর নেই।

তাতে কী? তাদের কাগজপত্র তো গভর্নমেন্ট হওয়ার পরও কলেজের অফিসে সংরক্ষিত আছে।

আপনার বিষয়ে আমি নতুন কিছু বলতে পারব না। স্যার যা বলেছেন তার ওপর আমার কোনো যুক্তি চলে না।

কিন্তু আমার কথাটি বলুন তাঁকে, আমরা সবাই তো রিজনেবল পারসন।

আপনি নিজে বলুন। আমি তো আমার সুপিরিয়রের সঙ্গে আর্গুমেন্টে যেতে পারব না।

হাশেম সাহেব বলেন, যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমার মতো অনেকেরই যে কষ্ট হচ্ছে, তা বোধ হয় আপনারা অ্যাপ্রিশিয়েট করছেন না।

এর জন্য নিশ্চয়ই আমি দায়ী নই।

না, আপনি কেন দায়ী হবেন? দায়ী আমার মতো গর্দভরা, যারা আমলা হইনি।

আপনি অনর্থক উত্তেজিত হচ্ছেন। সব কিছুতেই সিস্টেম আছে।

হ্যাঁ, সিস্টেম যে কী চমৎকার কাজ করছে, তা দেখতে পাচ্ছি। আমার একটি ইম্পর্ট্যান্ট ডকুমেন্ট দিব্যি ফাইল থেকে লাপাত্তা অথচ কেউ তা স্বীকার করছেন না, দায়িত্বটা কার।

সে জন্যই তদন্ত হবে, যাতে কেউ দায়িত্ব এড়াতে না পারে।

একটিবারও আপনাদের কেউ দুঃখ প্রকাশ করলেন না।

কেন? দুঃখ প্রকাশের প্রশ্ন আসছে কেন?

বাহ্! এই যে আমি দিন-মাস ধরে ঘুরছি, একেক দিনে শুধু ব্যাংকের ইন্টারেস্টেই কত টাকা লস হচ্ছে তার জন্য।

সে জন্য আমরা কেউ দায়ী এ কথা প্রমাণিত হয়নি।

তাহলে দায়ী কে বা কারা?

ওই যে ম্যাক্স ওয়েবার, সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি, সেই দায়ী। সে যদি স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি আমলাতন্ত্র ব্যবস্থার প্রণয়ন করত হীন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কথা চিন্তা না করে, তাহলে এ অবস্থা হতো না।

সে ব্যবস্থা বদলে নতুন ব্যবস্থা করেননি কেন আপনারা?

এতে তো আপনারও দায়িত্ব ছিল?

আমি তো আমলা নই যে আমার দায়িত্ব থাকতে হবে? আর তাহলে তদন্ত করে লাভ কী? ওই যে ম্যাক্স ওয়েবারের নাম বললেন।

মানে?

মানে, আপনি তো জানেনই কে দায়ী, তদন্ত করে সময় নষ্ট করার দরকার কী তাহলে?

এ কথায়ও আবিদুজ্জামান একটুও লজ্জা বোধ করেন না। বললেন, তবু সিস্টেম তো চালু রাখতে হবে।

পরের দুই সপ্তাহ চেষ্টা করে হাশেম সাহেব জয়েন্ট সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করেন।

তিনি জানান, তদন্তাধীন বিষয়ে কথা বলা ঠিক নয়। দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া হবে।

কিন্তু আমার পেনশন?

বিধি মোতাবেক তা নিষ্পত্তি হবে।

ঈদ সংখ্যা ২০১৮- এর আরো খবর