English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

উপন্যাস

অগ্নিমানুষ

মোস্তফা কামাল

  • ১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০

অঙ্কন : ধ্রুব এষ

পাকিস্তানের দায়িত্ব পেয়েই জেনারেল ইয়াহিয়া খান বললেন, সব আন্দোলন ও বিদ্রোহ শক্তভাবে দমন করা হবে। আমি কোনো ফোড়া সহ্য করব না।

ইয়াহিয়া খানের সামনে বসে থাকা সিনিয়র সেনা কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসলেন। তাঁরা কেউ কোনো মন্তব্য করলেন না। তাঁরা খান সাহেবের মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর স্বাভাবিক চেহারা মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। সাধারণ কোনো প্রজা হঠাৎ করে মহারাজা বনে গেলে যে অবস্থা হয়, ইয়াহিয়া খানের সেই অবস্থা হয়েছে। এখন কোনো মন্তব্য করতে গেলে তোপের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই সবাই চুপচাপ বসে আছেন।

ইয়াহিয়া খান নিজের চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। অন্যরাও দাঁড়িয়ে পড়লে তিনি হাতের ইশারায় বসতে বললেন। তাঁরা পাশাপাশি বসে পরস্পরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছেন। ইয়াহিয়া খান রুমের মধ্যে পায়চারি করছেন আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। কর্মকর্তারা কান খাড়া করে তাঁর কথা বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেউ বুঝতে পারছেন না। ইয়াহিয়া আবার নিজের চেয়ারে বসলেন। তারপর সিগারেট ধরিয়ে একনাগাড়ে টানতে শুরু করলেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় শ্বাস টানতে পারছিলেন না সেনা কর্মকর্তারা। কেউ কেউ কাশতে শুরু করলেন। কিন্তু খান সাহেবের কোনো বিকার নেই। তিনি একটার পর একটা সিগারেট টেনেই যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটি অ্যাশট্রের ওপর রেখে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বললেন, আপনারা কি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?

দীর্ঘ বিরতির পর হঠাৎ খান সাহেবের প্রশ্নটি সবাই ধরতে পারছিলেন না। তাঁরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কেউ বুঝেছেন কি না তা জানার চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই প্রসঙ্গটি জেনারেল হামিদ খানের মনে পড়ে। তিনি দেরি না করে বললেনজি স্যার, বুঝতে পেরেছি।

ধন্যবাদ। তাহলে আমাদের কী করতে হবে?

স্যার, সামরিক শাসন জারি করতে হবে।

ঠিক। একদম ঠিক। আমি আজই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেব। কিভাবে কী করতে হবে তা ঠিক করেন। ভাষণে কী বলব, তার ড্রাফটও তৈরি করেন। আর মোজাফফর, আপনাকে আমি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেব। আপনি প্রস্তুতি নিন।

জি স্যার। কোনো অসুবিধা নেই।

হামিদ সাহেব, আপনার জন্যও একটা সুখবর অপেক্ষা করছে। সেটা এখনই বলছি না। সময়মতো বলব।

জি স্যার। ঠিক আছে, স্যার।

এই ধরুন কাগজ-কলম। আপনি আমার ভাষণের ড্রাফটটা তৈরি করুন।

হামিদ খান ইয়াহিয়া খানের হাত থেকে কাগজ-কলম নিয়ে ভাষণ লিখতে বসেন। লেখা শুরুর আগে তিনি জানতে চানস্যার, আপনার কোনো পরামর্শ? কিংবা কোনো পয়েন্ট যদি থাকে।

ইয়াহিয়া খান ইতিবাচক মাথা নেড়ে বলেন, হ্যাঁ। সামরিক শাসন জারি হবে। আর আইয়ুব খানের সাংবিধানিক বিধি-বিধান বাতিল করা হবে।

ঠিক আছে, স্যার। আমি বুঝতে পেরেছি।

ইয়াহিয়া সাহেব পিএস সাহেবকে ডেকে বললেন, দুপুর দুইটায় আমি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেব। এর একটা ঘোষণা রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করতে বলো। দেরি কোরো না। এখনই বলো।

পিএস সাহেব কোনো কথা না বলে নিজের রুমে গেলেন। রেডিও-টেলিভিশনের ডিজিকে টেলিফোনে প্রেসিডেন্ট সাহেবের নির্দেশের কথা জানালেন। তাঁরাও এমন একটি নির্দেশের অপেক্ষাই করছিলেন। তাঁরা ঘোষণাটি তৈরি করেই প্রচার শুরু করলেন।

রেডিও পাকিস্তান ও টেলিভিশন থেকে প্রচারিত ঘোষণাটি ছিল এ রকম : একটি ঘোষণা। সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে আজ দুপুর দুইটায় সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তাঁর ভাষণ রেডিও পাকিস্তান ও টেলিভিশনে একযোগে প্রচারিত হবে।

রেডিও-টিভিতে বারবার ঘোষণার কারণে দেশের মানুষ ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কেউ রেডিও নিয়ে, আবার কেউ টেলিভিশনের সামনে বসে। তিনি জাতিকে কী নসিহত করবেন তা শোনার জন্য অপেক্ষা করে।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ভাষণ সেনাপ্রধানের দপ্তর থেকেই রেকর্ড করা হয়। রেকর্ডকৃত সেই ভাষণে তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর তিনি জেনারেল আইয়ুব খানের করা সব সাংবিধানিক বিধি-বিধান অর্থাৎ সংবিধান বাতিল করে সামরিক কালাকানুন চালুর নির্দেশ দেন। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদও ভেঙে দেওয়া হয়। ওই ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়।

ইয়াহিয়া খান তাঁর ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মন্তব্য করেন। তিনি আবারও বলেন, সব আন্দোলন ও বিদ্রোহ শক্তভাবে দমন করা হবে। আমি কোনো ফোড়া সহ্য করব না। যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বা ভবিষ্যতে দেবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কঠিন ব্যবস্থা!

প্রথম দিনই ইয়াহিয়া খানের গরম বক্তব্য রাজনীতিসচেতন মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। আইয়ুব খান যেমন বলেছিলেন, অস্ত্রের ভাষায় মোকাবেলা করবেন। তার চেয়ে তিনি কম কিছু বলেননি। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মির্জা নূরুল হুদাকে সরিয়ে মেজর জেনারেল মোজাফফর উদ্দিনকে নিয়োগ দেন। তিনি সামরিক আইন ঘোষণার পরপরই উপসেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন জেনারেল হামিদ খানকে। পরে হামিদ খানকে তিনি তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠান।

হামিদ খান মুহূর্তের মধ্যে ইয়াহিয়া খানের দপ্তরে হাজির হন। তাঁকে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে ইয়াহিয়া বলেন, বাহ্! দারুণ দেখালেন তো! আমি তো এমনটাই চাই।

ধন্যবাদ স্যার।

শোনেন, পূর্ব পাকিস্তানের গণ্ডগোল থামানোর জন্য যা যা করা লাগে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সেনা মোতায়েন করেন।

জি স্যার। আমি সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি, স্যার।

আরেকটা কথা।

জি স্যার।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেন। উনি আমার নিজের লোক। উনার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করবেন। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে, যাতে কেউ টুঁ শব্দটি করতে না পারে। ওদের মনে করিয়ে দিতে হবে, ইয়াহিয়া খান অনেক শক্ত শাসক। আন্দোলন-ফান্দোলন করে তাঁকে টলানো যাবে না।

জি স্যার। প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে হবে।

ইয়েস! কথাটা মনে রেখে কাজ করেন।

জি স্যার। আমি তাহলে আসি, স্যার?

চা খেলেন না?

হামিদ খান কয়েকবার চায়ে চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। স্যালুট করে ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

চলে যাওয়ার সময় হামিদ খানের দিকে একবার তাকালেন ইয়াহিয়া খান। তারপর মনে মনে বললেন, আই থিংক, ইউ আর মাই রাইট চয়েস।

হামিদ খান নিজের দপ্তরে গেলেন। তারপর মহাজোশে পূর্ব পাকিস্তানের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিল। শহরজুড়ে জরুরি অবস্থার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হলো। কাকপক্ষীর ডাকও যেন বন্ধ হয়ে গেল। একেবারেই নীরব-নিথর হয়ে গেল ঢাকা শহর। সন্ধ্যা নামার পর মনে হলো যেন নরকপুরী।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ইয়াহিয়া খানকে জানাল। সব জানার পর তিনি মনে মনে বললেন, সবে তো শুরু, এখনই এই অবস্থা! ভয়ে নেতারা ঘরে লুকিয়েছে! জোরে কথা বলাও বন্ধ হয়ে গেছে। প্যাদানি দিলে কী করবে? আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে চলে গেছেন। তাই বলে আমিও ছাড়ব? অত সহজ নয়। আমি সহজে ছাড়ার মানুষ না!

ইয়াহিয়া খান মনে মনে এও বলেন, আইয়ুব খানের মনগড়া বেসিক ডেমোক্রেসি হাস্যকর একটা ব্যাপার ছিল। তিনি নিজেও তা জানতেন। তার পরও তিনি সেই বেসিক ডেমোক্রেসি নিয়ে আত্ম-অহংকারে মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর কাণ্ড দেখে অনেক সময়ই হেসেছি। কিন্তু কিছু বলতে পারিনি। লোকটা আমার জন্য অনেক করেছেন। যাক, ওসব নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না। তা ছাড়া আমি ওসবের মধ্যে নেই। শক্ত হাতে দেশ চালাতে হবে। একটু নরম হলেই বাঙালরা পেয়ে বসবে। সেই সুযোগ আমি কিছুতেই দেব না।

হঠাৎ পিএস সাহেব ইয়াহিয়া খানের রুমে ঢুকে বললেনস্যার, রেডিওর ডিজি সাহেব এসেছেন।

ইয়াহিয়া খান মনে করতে পারছিলেন না আবার রেডিওর ডিজি কেন এসেছেন। তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন। তারপর তিনি পিএস সাহেবের কাছেই জানতে চাইলেন, ডিজি কেন এসেছে?

আবার নাকি রেকর্ডিং আছে, স্যার!

ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। আছে তো! ডাকো ডাকো। তাঁকে আমার রুমে আসতে বলো।

রেডিওর ডিজি সাহেব অত্যন্ত সমীহ করে সালাম দিলেন। ইয়াহিয়া খান সালামের জবাব দিয়ে বললেন, আপনার রেকর্ডিংয়ের লোক এসেছে?

জি স্যার। আপনি রেডি থাকলে আমি ওদের ডাকি।

আমি রেডি, ডাকেন তাড়াতাড়ি। আর শোনেন, সন্ধ্যা সাতটায় প্রচার করে দেবেন। এক মিনিটও দেরি করবেন না।

জি স্যার। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।

এ সময় পিএস সাহেব রেকর্ডিংয়ের লোকদের নিয়ে ইয়াহিয়া খানের রুমে ঢুকলেন। তাঁরাও মাথা নিচু করে তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়েছেন কি না বোঝা গেল না। তাঁদের দেখেই বললেনআসো আসো, টেবিলের ওপরই রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করো।

মুহূর্তের মধ্যে রেকর্ডিংয়ের যন্ত্রপাতি সেট করা হলো। ইয়াহিয়া খান খুব সতর্কতার সঙ্গে তাঁর লিখিত বক্তব্য পেশ করলেন। একবার নয়, দুবার নয়, তিনবার।

ইয়াহিয়া বললেন, এবার যান। যেটা বেশি ভালো সেটা প্রচার করেন।

অবশেষে সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খানের ভাষণ রেডিওতে প্রচার করা হলো। ওই ভাষণে তিনি নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই আমার লক্ষ্য। সে জন্য যা যা করা দরকার তা আমি করছি।

জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্টের দপ্তরে পা রাখলেন। স্থির হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। চারদিকে তাকিয়ে দপ্তরটি ভালো করে দেখলেন। তারপর একপা দুপা করে চেয়ারের কাছে এগিয়ে গেলেন। দুই হাত দিয়ে চেয়ারখানা পেছনের দিকে টেনে বিসমিল্লাহ বলে চেয়ারে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ডান পা কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরে ধড়ফড় করে উঠল। মনে হলো, চেয়ারখানা বড়ই পিচ্ছিল। তাই তিনি দুই হাত হাতলের ওপর রেখে যেন শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। মনে মনে বললেনস্যার, কেন যে আমার কাঁধে এত বড় বোঝা চাপিয়ে গেলেন। কোথায় আইয়ুব খান আর কোথায় ইয়াহিয়া খান! তিনি যে পাকিস্তানকে সামলাতে পারলেন না, সেই পাকিস্তান আমি সামলাব কী করে?

ইয়াহিয়া খান রুমের মধ্যে পায়চারি করেন আর মনে মনে ভাবেনআজ অফিসে আমার প্রথম দিন। আজ আমার মেজাজ ফুরফুরে থাকার কথা। আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। শুধু তা-ই নয়, আমি পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক। বলা যায়, পাকিস্তানের সেকেন্ড গড! এখন আমি যা বলব পাকিস্তানে তা-ই হবে। অথচ আমার মনটা প্রথম দিনই খারাপ হয়ে গেল। টেনশনে মনে হচ্ছে সব কিছু উল্টাপাল্টা হয়ে যাবে। এ সময় মাথা গরম করা যাবে না। সব কিছু ঠাণ্ডা মাথায় সামাল দিতে হবে। স্যার যেমন ঠাণ্ডা মাথায় সব কিছু সামাল দিয়েছেন, আমাকেও তা-ই করতে হবে।

ইয়াহিয়া খান আবার নিজের চেয়ারে বসলেন। কিন্তু তিনি স্বস্তি পাচ্ছেন না। তাঁর শরীর ঘামছে; যদিও তাঁর কক্ষটি যথেষ্ট ঠাণ্ডা। তিনি সিগারেট ধরালেন। এর মধ্যেই পিএস সাহেব রুমে ঢুকে কিছু বলার অনুমতি চাইলেন। ইয়াহিয়া সাহেব তাঁকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বললেন, অনুমতি না নিয়ে তুমি রুমে ঢুকলে কেন?

পিএস সাহেব কাঁচুমাচু করে বললেনস্যরি, স্যরি স্যার। ভুল হয়ে গেছে। আমাকে মাফ করবেন, স্যার।

ঠিক আছে যাও। আমি কলিংবেল চাপলে এসো। ঠিক আছে? আমার রুমে কখনোই হুটহাট ঢুকবে না। দ্বিতীয়বার আমি এ কথা বলব না।

পিএস সাহেব খুবই বিব্রত। তিনি বুঝে গেছেন, আইয়ুব খানের স্টাফদের তিনি রাখবেন না। কেনই বা রাখবেন? প্রেসিডেন্ট সাহেবের স্টাফ হিসেবে তো তাঁরা একটু আপারহ্যান্ডেই ছিলেন! প্রেসিডেন্ট স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাঁর রুমে কত সময় তাঁকে বসে থাকতে হয়েছে। এখন তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে তাঁকে সহ্য করবেন কেন! তাঁর বরং বদলি হয়ে যাওয়াই ভালো। দেখা যাক, দু-চার দিন যাক।

পিএস সাহেব রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ইয়াহিয়া খান খুব আয়েশ করে সিগারেট টানলেন। টেবিলে রাখা জিনিসপত্রের দিকে তাকালেন। পুরো রুমটি আবারও ভালো করে দেখলেন। র্যাকে কোথায় কী ফাইল আছে তা দেখলেন। দু-একটি ফাইল নাড়াচাড়া করে আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের গোপন নথি লেখা একটি ফাইল তিনি তাঁর টেবিলের ওয়্যারড্রয়ারে রাখলেন। এই ফাইলটা তিনি খুব ভালো করে স্টাডি করবেন মনস্থির করলেন। তারপর কলিংবেল চাপলেন।

পিএস সাহেব রুমে ঢুকেই বললেনস্যার, আপনাকে ফুল দেওয়ার জন্য অনেকে এসেছেন।

অনেকেই মানে কে কে?

স্যার, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এসেছেন। এর মধ্যে আছেন অ্যাডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান, এয়ার চিফ মার্শাল নূর খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল গোলাম ওমর। তাঁরা জানালেন, আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েই চলে যাবেন।

ঠিক আছে, আসতে বলো। তবে যত কম ভিজিটর দিতে পারো ততই ভালো। আমার অনেক কাজ করতে হবে আজ। বেশি ভিজিটর অ্যালাউ করলে কাজ করব কখন?

জি স্যার। আমার মনে থাকবে, স্যার।

শুধু মনে রাখলে হবে না, কাজটাও ঠিকমতো করতে হবে।

স্যরি স্যার। আমি কি স্যার ভিজিটর পরে আসতে...

উহ্! তুমি যাও তো! কারা এসেছে দেখো।

জি স্যার।

পিএস সাহেব একমুহূর্তও দাঁড়ালেন না। তিনি দ্রুত বাইরে বের হয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে অভিনন্দন জানাতে আসা লোকদের উদ্দেশে বললেন, যাঁরা স্যারকে ফুল দিতে এসেছেন তাঁরা আসেন আমার সঙ্গে। দ্রুত আসতে হবে। স্যার খুব ব্যস্ত। তিনি বেশি সময় দিতে পারবেন না।

পিএস সাহেব কথা শেষ করা মাত্র সবাই হুড়মুড় করে প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢুকলেন। রুমে ঢুকেই সবাই একসঙ্গে বলা শুরু করলেনঅভিনন্দন স্যার, অভিনন্দন!

পিএস সাহেব সবাইকে সতর্ক করে বললেন, আপনারা সবাই লাইনে দাঁড়ান। এক এক করে ফুল দিন। স্যার সবার ফুলই গ্রহণ করবেন।

সঙ্গে সঙ্গে সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর এক এক করে ফুল দিতে লাগলেন প্রেসিডেন্ট সাহেবের হাতে। ফুলেল শুভেচ্ছায় প্রেসিডেন্ট সাহেব বেশ আপ্লুত হলেন। হাসিমুখে সবার উদ্দেশে বললেন, আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনাদের সবাইকে আমার মিষ্টিমুখ করানো উচিত।

জনৈক কর্মকর্তা বললেননা স্যার, না স্যার। আপনি অনেক ব্যস্ত। আমরা পিএস সাহেবের রুমে বসে খেয়ে নেব।

গুড, ভেরি গুড। পিএস সাহেব, সবাইকে মিষ্টি খাওয়ান। আর আহসান সাহেব, নূর খান ও ওমর, আপনারা বসেন।

আহসান সাহেব বললেন, জি স্যার।

ইয়াহিয়া খান আহসান সাহেবকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনাকে আমার ক্যাবিনেটে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনি আমার অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী হিসেবে কাজ করবেন।

আহসান সাহেব দাঁড়িয়ে ইয়াহিয়া খানকে স্যালুট করে বললেন, জি স্যার। থ্যাংক ইউ, স্যার।

ইয়াহিয়া খান এয়ার চিফ নূর খানকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনাকে স্বাস্থ্য ও শ্রম মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করছি।

নূর খানও দাঁড়িয়ে ইয়াহিয়া খানকে স্যালুট করলেন।

স্যালুটের জবাব নিয়ে ইয়াহিয়া আবার লেফটেন্যান্ট জেনারেল গোলাম ওমরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি আমার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন।

গোলাম ওমরও দাঁড়িয়ে স্যালুট করলেন।

পিএস সাহেব সবাইকে নিয়ে বের হন। এর পরপরই প্রেসিডেন্ট সাহেব পূর্ব পাকিস্তান লেখা ফাইলের ওপর চোখ রাখলেন।

দুই

বারান্দায় ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন শেখ মুজিব। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন। ইয়াহিয়া খানের বক্তব্যে কী আছে তা মনে করার চেষ্টা করলেন। বক্তব্যে নির্বাচনের কথা বলা হলেও সেটা কতটা সফল হবে তা নিয়ে মনের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সামরিক শাসন মানেই রাজনীতি নিষিদ্ধ, মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ! এ অবস্থা কত দিন চলবে সে বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। নানা বাহানা করে আইয়ুব খানের মতো ইয়াহিয়া দশ বছর পার করবেন না তো! ক্ষমতায় বসলে কেউ আর ছাড়তে চায় না। ইয়াহিয়া তো আরো বেশি ক্ষমতালিপ্সু। গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ করার পেছনে তাঁর হাত আছে। নিশ্চয়ই আইয়ুব খান চাননি তাঁর নিজের উদ্যোগ ব্যর্থ হোক! একটা গণ-অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসন জারি করা হলো কেন! এর পেছনে কিন্তু আছে। আইয়ুব খান এমনি এমনি ক্ষমতা ছাড়েননি। ইয়াহিয়া ভুট্টোর সঙ্গে আঁতাত করে আইয়ুব খানকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছেন!

হঠাৎ আমগাছে বসে থাকা কাকগুলো কা কা করে উঠল। আর অমনি শেখ মুজিব চমকে উঠলেন। কাকগুলোর ডাক শুনে তাঁর জেলখানার সেই স্মৃতি মনে পড়ল। জেলখানায় মাঝেমধ্যেই কাকগুলো বিরক্ত করত। মুড়ি খাওয়ার জন্য বারান্দায় দল বেঁধে অপেক্ষা করত। মুড়ি না দেওয়া পর্যন্ত কাকগুলো কিছুতেই যেত না। আজ কাকগুলো কী কারণে অমন করে ডাকাডাকি শুরু করল কে জানে। খাবারের দরকার হলে নিশ্চয়ই গাছে বসে থাকত না। নিচে নেমে আসত!

শেখ মুজিব কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর পাইপ ধরালেন। পাইপ টানতে টানতে ইয়াহিয়া খানের কথাগুলো আবার মনে করেন। মনে মনে বলেন, তাঁর বক্তৃতায় কঠোর হুমকি, সামরিক শাসন জারি, ঢাকাজুড়ে সেনা মোতায়েনের ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী! রাজনৈতিক চাপ না থাকলে নির্বাচন দেবে বলে মনে হয় না। উর্দি পরা লোকরা নিজের ইচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। ক্ষমতা থেকে তাদের ছাড়াতে হয়। জনরোষের মাধ্যমে তাদের বিদায় করতে হয়। প্রবল রাজনৈতিক চাপ না থাকলে আইয়ুব খানকে সরানো যেত না। অবশ্য নির্বাচন না দিলে ইয়াহিয়া খানকেও বিদায় নিতে হবে। সামরিক শাসন দিয়ে দেশ কত দিন চালাবে!

ফজিলাতুন্নেছা রেণু বারান্দায় চা নিয়ে এসে শেখ মুজিবের পাশে বসলেন। তাঁকে চিন্তিত দেখে বললেনকী ব্যাপার, কী নিয়ে চিন্তা করছ?

ইয়াহিয়ার ভাষণ শোনার পর থেকে কেন জানি আমার টেনশন হচ্ছে।

তোমার কি মনে হয় নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করবে?

করতে পারে। দেখছ না, কিভাবে ক্ষমতায় একেবারে গেড়ে বসেছে। প্রেসিডেন্ট, আবার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক! মানে ক্ষমতার ভাগ কাউকে দেবে না। এ ধরনের মানুষ সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন ফজিলাতুন্নেছা রেণু। তারপর বললেননাও, চা নাও।

শেখ মুজিব চায়ে চুমুক দিলেন। ফজিলাতুন্নেছা বললেন, আইয়ুব খানকেও তো লৌহমানব বলা হতো। সে-ও তো তোমাদের আন্দোলনের মুখে বিদায় নিয়েছে। নিয়েছে না?

হ্যাঁ, নিয়েছে। কিন্তু তাতে তো কোনো লাভ হয়নি। এক স্বৈরাচার গেছে, আরেক স্বৈরাচার এসেছে।

কত দিন থাকতে পারে দেখো!

আরে, তুমি তো বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছ! ঘটনা কী?

ঘটনা কিছু না। আমার মন বলছে, ইয়াহিয়া বেশিদিন টিকতে পারবে না।

হ্যাঁ। তোমার ধারণা সত্যি হতে পারে। কারণ ইয়াহিয়া ক্যারেকটারলেস! মদ আর নারী ছাড়া সে কিছু বোঝে না। এ রকম একটা মানুষ বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে, তা আমার মনে হয় না।

আচ্ছা শোনো, ওয়াজেদের ইতালিতে একটা চাকরি হয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। হাসুকে ওর সঙ্গে নিয়ে যেতে বলো না! ফজিলাতুন্নেছা বললেন।

খবরটি শুনে শেখ মুজিব মনে হয় খুশিই হয়েছেন। তাঁর কণ্ঠেও খুশির রেশ। তাই! কে বলল তোমাকে?

ওয়াজেদই বলেছে।

আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি ওকে বলব।

আজই বলবে। কারণ ওর তো কোনো পাসপোর্ট নেই। পাসপোর্ট করাতে হবে। ভিসা করাতেও তো সময় লাগবে।

পাসপোর্ট করাতে বেশি সময় লাগবে না। আমার পরিচিত লোক আছে, করিয়ে দেবে।

আবার ভুলে যেয়ো না।

শেখ মুজিব ফজিলাতুন্নেছা রেণুর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর বললেন, তুমি এখনই ওয়াজেদকে আমার কাছে পাঠাও। আমি বলে দিচ্ছি।

আচ্ছা, বলছি। তুমি কি বাইরে বের হবে?

ঠিক নেই। তাজউদ্দীনের আসার কথা। ওর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করব।

ফজিলাতুন্নেছা চলে গেলেন। তিনি ওয়াজেদ মিয়াকে ডেকে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। ওয়াজেদ মিয়া তখনই শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করলেন। শেখ মুজিব তাঁর কাছে জানতে চাইলেনওয়াজেদ, তুমি নাকি ইতালিতে চাকরি নিয়ে যাচ্ছ?

জি।

হাসুকে নিয়ে যাচ্ছ? নাকি একাই যাচ্ছ?

না, মানে, ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করিনি।

নিয়ে যাও না! অসুবিধা কী?

জি না, কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ওর তো কোনো পাসপোর্ট নেই।

পাসপোর্টের ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি।

জি আচ্ছা। তাহলে কোনো সমস্যা নেই।

ওয়াজেদ মিয়া চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার এসে জানালেন, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান বেশ কয়েকজন নেতা দেখা করতে এসেছেন।

শেখ মুজিব ড্রয়িংরুমের দিকে যেতে যেতে বললেন, চা-নাশতা কিছু দিয়েছ?

ওয়াজেদ মিয়া বললেননা, আব্বা। এখনই তো এলেন।

তোমার শাশুড়িকে বলো না।

জি, বলছি আব্বা। আপনি যান।

শেখ মুজিব এগিয়ে গেলেন ড্রয়িংরুমের দিকে। রুমে ঢুকেই বললেন, কী খবর, তাজউদ্দীন?

তাজউদ্দীন বললেন, জি ভালো। তবে শহরের অবস্থা খুব একটা ভালো মনে হলো না। লোকজন খুব কম। যানবাহনও কম। সেনাবাহিনীর লোক রাস্তায় টহল দিচ্ছে। যানবাহন থামিয়ে চেক করছে। আপনার বাসার আশপাশেও অপরিচিত কিছু লোকের আনাগোনা দেখলাম।

তাই! বলো কী।

সৈয়দ নজরুল বললেন, ইয়াহিয়া খানের ভাবসাব দেখে মনে হয় আইয়ুব খানকেও উনি হার মানাবেন।

শেখ মুজিব বললেন, দেখা যাক। কিছুদিন যেতে দাও। বেশি কড়াকড়ির ফল ভালো হয় না। তবে এটা ঠিক, রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে না পারলে ইয়াহিয়াকে সরানো যাবে না।

তাজউদ্দীন বললেন, জি জি। ঠিক বলেছেন, মুজিব ভাই।

সৈয়দ নজরুল বললেন, সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতিই তো নিষিদ্ধ করে দিল। কিভাবে চাপ বাড়াবেন?

শেখ মুজিব বললেন, এই মুহূর্তে ধৈর্য ধরতে হবে। নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে তো আর বছরের পর বছর পার করতে পারবে না। তাই না?

জি মুজিব ভাই। ধৈর্য তো ধরতেই হবে।

তাজউদ্দীন বললেন, ভেতরে ভেতরে আমাদের নির্বাচনের জন্য কাজ করা উচিত।

শেখ মুজিব এ কথা শোনার জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এটাই এখন আমাদের মূল কাজ হওয়া উচিত। জনসংযোগ বাড়াও। তবে খুব সাবধানে করতে হবে। সময় কিন্তু ভালো না। জেলা ও থানা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করো। তাদের বলো, নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখে তারা যেন কাজ করে। আবার এখন এমন কিছুও করা যাবে না, যাতে ইয়াহিয়া সরকার সেই অজুহাতে সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করে।

তাজউদ্দীন বললেন, জি মুজিব ভাই।

এ সময় ফজিলাতুন্নেছা নিজেই চা-নাশতা নিয়ে ড্রয়িংরুমে হাজির হলেন। তাঁকে দেখে সবাই সালাম জানালেন। সালামের জবাব দিয়ে ফজিলাতুন্নেছা বলেন, নজরুল ভাই, তাজউদ্দীন ভাই, নাশতা নেন।

তাঁরা নাশতা খাওয়া শুরু করেন। ফজিলাতুন্নেছা ভেতরের ঘরে যাওয়ার সময় বলেন, আপনাদের জন্য রান্না করছি। আজ রাতে খেয়ে যাবেন।

তাজউদ্দীন কিছু বলার জন্য ফজিলাতুন্নেছার দিকে তাকালেন। কিন্তু ততক্ষণে তিনি ভেতরে চলে যান। শেখ মুজিব বললেন, রেণুর হাতের রান্না তো অনেক দিন খাও না। আজ যেহেতু দাওয়াত পেয়েছ, এটা হাতছাড়া করবা কেন?

তাজউদ্দীন নিচু স্বরে বললেন, তা অবশ্য ঠিক।

শেখ মুজিব অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। তিনি পাইপ টানছেন আর ভাবছেন। তাঁর ভাবনাজুড়ে ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন। তিনি মনে মনে বলেন, ছয় দফার দাবিতে একটা অভ্যুত্থান হয়ে গেল। আইয়ুব খানের মতো শাসককে বিদায় নিতে হলো। অথচ ইয়াহিয়ার এক আদেশে সব কিছু থমকে গেল! রাজনীতি বন্ধ, মিছিল-মিটিং বন্ধ, বক্তৃতা-বিবৃতি বন্ধ! না না, এটা মানা যায় না। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী! সব কিছু কেমন এলোমেলো লাগছে। নেতাকর্মীরা যদি হতাশ হয়ে পড়ে! যদি তারা মনোবল হারিয়ে ফেলে!

শেখ মুজিব আরো ভাবেন, এই পরিস্থিতিতে কেউ যাতে মনোবল না হারায় সে জন্য সাহস দেওয়া দরকার। কিন্তু কিভাবে? সামরিক সরকার টের পেলে আবার জেলে যেতে হবে। এই পরিস্থিতিতে জেলে যাওয়া কি সমীচীন হবে? আমি জানি, সামরিক শাসন জারির কারণে অনেকের মধ্যেই হতাশা কাজ করছে। তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী, কামারুজ্জামানওদের বললাম, ওরা যেন কিছু কাজ করে। সামরিক শাসনের মধ্যে ওরাই বা কী করবে। এ সময় কোথাও মুভ করাও তো কঠিন!

শেখ মুজিব কী করবেন তা ঠিক এই মুহূর্তে ভেবে পাচ্ছেন না। তিনি বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় হাঁটাহাঁটি করেন আর পাইপ টানেন। মনে মনে তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খোঁজেন। তবে তাঁর আশা, এ রকম পরিস্থিতি থাকবে না। কেটে যাবে। নির্বাচন তাঁকে দিতেই হবে। এ ছাড়া তাঁর বিকল্প কোনো পথ নেই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়লাভ করতেই হবে। ছয় দফা বাস্তবায়ন করতে হলে নির্বাচনে জেতা ছাড়া বিকল্প নেই।

শেখ মুজিব মনে মনে বলেন, আমাদের দল নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত তো! আমার তো মনে হয় আওয়ামী লীগ জিতবে, বিপুল ভোটে জিতবে।

ফজিলাতুন্নেছা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এক রুম থেকে আরেক রুমে যান। শেখ মুজিবকে খোঁজেন। কিন্তু কোথাও খুঁজে না পেয়ে বাইরের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখেন, মুজিব পায়চারি করছেন। তিনি যেকোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন তা তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ফজিলাতুন্নেছা তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, কী এত ভাবছ?

না না! তেমন কিছু না। ও, চা এনেছ? ধন্যবাদ। চা-টা বড় প্রয়োজন ছিল।

ফজিলাতুন্নেছা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, তা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমার এত অস্থিরতা কী নিয়ে বলো তো?

আচ্ছা রেণু, খুব দ্রুতই যদি নির্বাচন দিয়ে দেয়! আওয়ামী লীগ জিতবে তো?

অবশ্যই জিতবে।

সত্যি বলছ?

সত্যি বলছি।

কেন জিতবে?

কারণ এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের চেয়ে জনপ্রিয় দল দ্বিতীয়টি নেই।

মুসলিম লীগ?

মুসলিম লীগের ভরাডুবি হবে। তুমি লিখে রাখতে পারো।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি?

পিপলস পার্টির নামই তো সবাই জানে না। পশ্চিম পাকিস্তানে কিছু আসন পেতে পারে। আমাদের এখানে ভোট পাবে না।

ধন্যবাদ। তোমার মতামত আমার পছন্দ হয়েছে। আমারও এ রকমই মনে হচ্ছে।

এবার টেনশনটা ঝেড়ে ফেলো। তারপর ভেতরে চলো।

তুমি যাও। আমি এখনই আসছি।

শেখ মুজিবের হাত থেকে কাপ নিয়ে ফজিলাতুন্নেছা বাড়ির ভেতরে গেলেন। শেখ মুজিব আবার পাইপ টানতে শুরু করলেন। কিন্তু সেই ভাবনাটা তাঁকে প্রতিমুহূর্তে তাড়া করছিল।

তিন

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হাউসে উঠবেন। আইয়ুব খান বিদায় নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হাউস ধুয়েমুছে ঝকঝকে তকতকে করা হয়েছে। নতুন করে সাজানো হয়েছে। নয়া প্রেসিডেন্টকে বরণ করার জন্য প্রেসিডেন্ট হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রস্তুত। সকাল থেকে তাঁরা অপেক্ষা করছেন। তাঁদের সবার হাতে নানা রঙের ফুল। ফুল দিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে বরণ করা হবে। ইতিমধ্যেই রোদের উত্তাপ বাড়তে থাকে। হাতের ফুলগুলো সতেজতা হারাতে শুরু করে। প্রেসিডেন্ট ভবনের কর্মকর্তারা দুশ্চিন্তায় পড়েন। সবার এক প্রশ্ন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আর কত দেরি করবেন! তাজা ফুল না দেখলে তো আবার উনি খেপে যাবেন। তখন সামাল দেব কী করে!

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হাউসে পা রাখবেন তাঁর প্রিয় বান্ধবী আকলিম আখতারের কাঁধে হাত রেখে। তাঁকে তিনি খবর পাঠিয়েছেন। তিনি এলেই প্রেসিডেন্ট ভবনের উদ্দেশে রওনা হবেন। বাইরে গণ্যমান্য অনেকে প্রেসিডেন্টের জন্য অপেক্ষা করছেন। রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাপ্রধানের বাসা থেকে প্রেসিডেন্ট হাউস পর্যন্ত রাস্তা ফাঁকা করা হয়েছে। বের হচ্ছি হচ্ছি করেও প্রেসিডেন্ট সাহেব বের হচ্ছেন না। বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কানাঘুষা করছেন। ঘটনা কী! প্রেসিডেন্ট সাহেব বের হচ্ছেন না কেন? কার জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন?

হঠাৎ সবার চোখ পড়ল একজনের দিকে। রাজরানির বেশে সেনাপ্রধানের বাসভবনে ঢুকলেন আকলিম আখতার। এত সুন্দর সাজে আগে কখনো তাঁকে দেখা যায়নি। সবাই একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। এতক্ষণ যাঁরা অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়েছিলেন তাঁদের চেহারা এখন অন্য রকম। কারো কপালে বিরক্তির ভাঁজ নেই। তাঁরা এখন রসালো আলাপ শুরু করেছেন। প্রেসিডেন্ট সাহেবের মালখানা তো বেশ খাসা!

প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ইসহাক আকলিম আখতারকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি তাঁর চোখের দিকে তাকাতে গিয়েও তাকানোর সাহস পেলেন না। মনে মনে ভাবেন, প্রেসিডেন্ট সাহেবের পেয়ারের জিনিস। কোনো রকম অভিযোগ পেলেই চাকরি নট! ঝুঁকি নেওয়ার কী দরকার। তিনি মাথা নিচু করে বললেনম্যাডামজি, প্রেসিডেন্ট স্যার রেডি হয়ে আপনার জন্য বসে আছেন।

আকলিম দ্রুত পা চালিয়ে যেতে যেতে বললেন, ও তাই! এই তো এসে গেছি!

প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে ইসহাক সাহেব বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অপরূপ সাজে সেক্সি আকলিমকে দেখে প্রেসিডেন্ট সাহেব যেন দিওয়ানা হয়ে গেলেন! প্রচণ্ড আবেগে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছুতেই তিনি তাঁকে ছাড়তে চাইছিলেন না। কিন্তু আকলিম বললেন, বাইরে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। দেরি করা মোটেই ঠিক হবে না।

তোমাকে যে আদর করতে ইচ্ছা করছে, সুইট হার্ট!

প্রেসিডেন্ট হাউসে গিয়ে যত খুশি আদর কোরো।

সত্যি!

তিন সত্যি।

তুমি নিশ্চয়ই জানো, আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। এই আনন্দের দিনটি আমি শুধু তোমাকে নিয়ে উপভোগ করতে চাই।

অবশ্যই আমরা উপভোগ করব। আজকের রজনী শুধু তোমার-আমার। চলো এবার, জান।

ইয়াহিয়া খান আকলিমের কাঁধে হাত দিয়ে রুম থেকে বের হলেন। আকলিম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেনজান, তুমি এখন প্রেসিডেন্ট! কাঁধে হাত না দেওয়াই ভালো। আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইয়াহিয়া খান আকলিমের কাঁধ থেকে হাত নামান। তবে তাঁকে খুব কাছে কাছে রাখেন। পারলে তাঁর হাত ধরে রাখেন, এমন অবস্থা। হাঁটতে হাঁটতে শুধু আকলিমের প্রশংসা। প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত প্রশংসাও আকলিমকে অস্বস্তিতে ফেলে। তিনি মনে মনে বলেন, ঘটনা কী! প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাঁর প্রশংসার মাত্রা বেড়ে গেল কেন? আমি তো অনেক আগেই তাঁকে সব কিছু সঁপে দিয়েছি। তার পরও এত প্রশংসার মানে কী! উনি কি আজ খুব বেশি পান করেছেন! প্রেসিডেন্ট হওয়ার আনন্দে আকণ্ঠ গিলেছেন! কী জানি। কোনো মতলব আছে কি না কে জানে।

প্রেসিডেন্ট সাহেব আকলিমের দিকে তাকিয়ে তাঁকে অন্যমনস্ক দেখে বললেন, মাই সুইট হার্ট! কী চিন্তা করছ?

আমি তোমাকে নিয়ে ভাবছি, জান। তোমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনে তোমাকে আমি কতটা আনন্দ দিতে পারব তা নিয়ে ভাবছি। আজ রাতটা অবশ্যই আমি স্মরণীয় করে রাখব।

ওয়াও! থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, মাই ডার্লিং।

এর মধ্যে ইয়াহিয়া খান ও আকলিম আখতার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। দুই পাশ থেকে গাড়ির দরজা খুলে রাখল দুজন সেনা সদস্য। দুই পাশ থেকে দুজন গাড়িতে ওঠেন। পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব আবেগের দৃষ্টিতে আকলিমের দিকে তাকান। আকলিমও মাঝেমধ্যে মুচকি হেসে প্রেসিডেন্ট সাহেবের চোখের দিকে তাকান। কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট সাহেব আকলিমের হাতের ওপর তাঁর হাত রাখেন। এতেই যেন প্রেসিডেন্ট সাহেবের কত আনন্দ!

গাড়ি প্রেসিডেন্ট হাউসের সামনে গিয়ে থামে। দুজন একসঙ্গে গাড়ি থেকে নামেন। এ সময় উভয়েই প্রেসিডেন্ট হাউসের কর্মকর্তাদের হাত থেকে ফুল নেন। ফুলগুলোর দিকে ঠিকমতো নজরও দেননি। হাতে নিয়েই তা সামরিক সচিবের হাতে তুলে দেন। তবে ইয়াহিয়া খান আকলিমের হাতটা বেশ শক্ত করে ধরেছেন। তারপর এক পা দুপা করে প্রেসিডেন্ট হাউসে প্রবেশ করেন। মনে হচ্ছিল, তিনি আকলিমকে ছাড়া হাঁটতেই পারছিলেন না। হাঁটতে গিয়ে দু-একবার তাঁকে জড়িয়েও ধরেছেন। সবাই ড্যাবড্যাব করে তাঁদের ঢলাঢলি দেখেন। কেউ কেউ আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন, হয়তো এই মহিলাই একদিন জেনারেল রানি হিসেবে আবির্ভূত হবেন।

মেজর জেনারেল ইসহাক প্রেসিডেন্ট হাউস ইয়াহিয়া খান ও তাঁর প্রিয় বান্ধবীকে ঘুরিয়ে দেখাতে গিয়ে খানিকটা বিপদেই পড়েন। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো প্রেসিডেন্ট সাহেব এবং তাঁর বান্ধবী ঘুরে দেখতে পছন্দ করবেন। কিন্তু না। উল্টো প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁর ওপর চটে গেলেন। তিনি ধমকের সুরে বললেন, এই মিয়া, প্রেসিডেন্ট ভবন আবার ঘুরে দেখার কী আছে? এখানে তো আমিই থাকব, নাকি? না তুমি থাকবা?

ইসহাক সাহেব অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। তিনি কাঁচুমাচু করে বললেন, স্যরি স্যার।

তুমি আমার মিলিটারি সেক্রেটারি, তাই না?

জি স্যার।

তুমি আমার সঙ্গে কী করে কাজ করবা বলো? বসের মেজাজমর্জি না বুঝলে কি কাজ করা যায়?

স্যরি স্যার।

যাও, আগে তুমি আমাকে রিড করো, তারপর আমার সঙ্গে ডিউটি করতে আসবা।

স্যরি স্যার।

ইয়াহিয়া খান আবার বলতে থাকেন, তোমার র্যাংক কি মেজর জেনারেল?

জি স্যার।

তোমার তো মেজর হওয়ারই যোগ্যতা নেই। যাও, আমাদের বেডরুমে নিয়ে যাও। আমি ভীষণ টায়ার্ড। রেস্ট নেব। কাল সকালের আগে আমাকে যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে। কেউ ডিস্টার্ব করলে তোমার চাকরি নট।

ইসহাক সাহেব দপ করে যেন নিভে গেলেন। কথা বলতেও তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। আবার কথা না বললেও ধমক খেতে হবে। শেষ পর্যন্ত মনের ওপর জোর খাটিয়ে তিনি বললেন, জি স্যার। কেউ ডিস্টার্ব করবে না, স্যার।

প্রেসিডেন্ট সাহেব এবং তাঁর বান্ধবীকে বেডরুমের দিকে নিয়ে গেলেন। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললেন স্যার, এটাই বেডরুম, স্যার। আমি তাহলে আসছি, স্যার।

কাল সকাল ১০টার সময় গাড়ি রেডি রাখবে। আমি অফিসে যাব। ঠিক আছে?

জি স্যার।

ইসহাক সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে গেলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব নিজের হাতে দরজার ছিটকিনি লাগালেন। তারপর তিনি গভীর আবেগে আকলিমকে জড়িয়ে ধরলেন।

ইয়াহিয়া খান আকণ্ঠ মদ গিলেছেন। নেশায় ঢুলু ঢুলু করছেন। স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারছেন না। মুখে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। আকলিম আখতারও ইয়াহিয়ার সঙ্গে গ্লাসের পর গ্লাস মদ গলাধঃকরণ করেছেন। নেশায় তাঁকে বেশ ধরেছে। দুজনের কারো পরনেই কোনো কাপড়চোপড় নেই। তাঁরা জড়াজড়ি করে মেঝেতে শুয়ে আছেন। আকলিম ইয়াহিয়ার বুকের ভেতরে ঢুকে আছেন। তার পরও তিনি বলছেন, মাই সুইট হার্ট, তুমি কোথায়? আরো কাছে এসো। আরো কাছে।

আকলিম বললেন, আমি তোমার বুকের মধ্যে, জান!

আমাকে আরো আনন্দ দাও, ডার্লিং। আনন্দে আনন্দে আমাকে ভরিয়ে তোলো।

আকলিম আখতার জড়ানো কণ্ঠে বললেন, তুমি না সকালে অফিসে যাবে?

ইয়াহিয়া খানও অস্পষ্টভাবে বললেন, আরে রাখো তোমার অফিস! অফিস দিয়ে কী হবে? অফিস কি আমাকে এমন আনন্দ দিতে পারবে?

তোমার না অনেক কাজ আছে?

ওসব কাজ করে কী হবে? আমি তো সারাক্ষণ তোমার সঙ্গে থাকতে চাই। তোমার মতো এত আনন্দ আমাকে কে দেয় বলো?

আমি তো আছিই। যখন তুমি চাইবে, আমি হাজির হয়ে যাব। একমুহূর্তও দেরি করব না, জান!

ইয়াহিয়া খান আকলিমকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলেন, এ জন্যই তো তুমি আমার সুইট হার্ট! শোনো, তুমি তো এখানেই থেকে যেতে পারো। তোমার বাসায় যাওয়ার কী দরকার!

বাসাটা তো ফর শো! একটা বাসা রাখতে হয় বলে আছে। আমি তো তোমার কাছেই থাকি।

আমার কাছেই তো থাকবে। আর কার কাছে থাকবে?

হুম্, থাকব। রাতে আমি তোমার কাছেই থাকব। এখন তুমি ঘুমাও, জান! রাতে তো আমাকে পাচ্ছই! তখন যত ইচ্ছা তত আনন্দ কোরো।

ইয়াহিয়া খান এবার শান্ত হলেন। তিনি আকলিম আখতারকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হলো। সকালে আর তাঁর অফিসে যাওয়া হলো না। বিকেলে অফিসে গিয়ে জানতে পারলেন, বিপুলসংখ্যক সাক্ষাত্প্রার্থী সকাল থেকে অপেক্ষা করছেন। প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব এবং একান্ত সচিব সাহেবের রুমে এখনো তাঁরা বসে আছেন। সাক্ষাত্প্রার্থীদের বেশির ভাগই নারী।

অপেক্ষমাণ অতিথির তালিকায় আছেন সেনাবাহিনীর বড় কর্মকর্তারাও। এর মধ্যে জেনারেল টিক্কা খান, মোহাম্মদ শরিফসহ অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য এসেছেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁদেরই আগে ডাকবেন। অথচ তিনি আগে ডাকলেন নারী অতিথিদের। এতে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন টিক্কা খান ও মোহাম্মদ শরিফ। তাঁরা রাগে-ক্ষোভে গজগজ করতে থাকেন।

প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ইসহাক ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। তিনি তাঁদের সান্ত্বনার সুরে বলেন, স্যার প্লিজ, একটু ধৈর্য ধরেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যার ফ্রি হয়ে যাবেন। স্যার আপনাদের বেশি সময় দেবেন বলেই বাইরের অতিথিদের আগে বিদায় দিচ্ছেন।

টিক্কা খান খেদের সঙ্গে বললেন, হুম্! ওসব কথা বলে আর সান্ত্বনা দিতে হবে না।

স্যার!

শোনো, তুমি দ্রুত দেখা করার ব্যবস্থা করো। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি। দেরি করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

ইসহাক সাহেব প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢোকার সাহস পাচ্ছেন না। ভেতরে গিয়ে কী অবস্থায় দেখেন সেই ভয়ে তিনি এক পা এগিয়ে দুই পা পেছান। আর মনে মনে ভাবেন, জেনারেল রানি কোথায়? উনি নিশ্চয়ই এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারতেন!

ইসহাক সাহেব প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমের দরজার সামনে পায়চারি করছেন। মাঝেমধ্যে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। আবার টিক্কা খানের সামনে এসে বললেনস্যার, আরেকটু ধৈর্য ধরেন।

টিক্কা খান চোখ গরম করে ইসহাক সাহেবের দিকে তাকালেন। ইসহাক সাহেব বুঝতে পেরে আবার প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমের দিকে ছুটে গেলেন। এবার তিনি দরজায় টোকা দিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢুকলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব তখন সুন্দরী নারী অতিথিদের নিয়ে চুটিয়ে গল্প করছিলেন। ইসহাক সাহেব কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অস্বস্তি বোধ করে আবার বেরিয়ে এলেন। তিনি টিক্কা খানের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেনস্যার, রুমে ঢুকেছিলাম। কিন্তু কথা বলার সাহস পাইনি।

টিক্কা খানের কপালে বিরক্তির ভাঁজ। তিনি বিরক্তির সঙ্গেই বললেন, তুমি কেমনতরো মিলিটারি সেক্রেটারি হইলা বুঝলাম না।

স্যার, মাইনকা চিপায় পড়ছি। কিছুই করার নাই। আপনি ভেতরের অবস্থা দেখলে বুঝতেন!

কেন, ভেতরে কী হচ্ছে?

বুঝে নেন, স্যার। সব কথা কিভাবে খুলে বলি? মহিলারা মনে হয় স্যারকে চিবায়া খাবে।

বুঝছি বুঝছি! আর বলতে হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সাহেব সময় বুঝে কাজ করবেন না? এখন অফিসের কাজ করার সময়! অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সিদ্ধান্ত দিতে হবে। উনি এখন মহিলাদের নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে?

স্যার, উনি প্রেসিডেন্ট। উনি সর্বময় ক্ষমতার মালিক। উনি না বুঝলে আমরা বুঝে কী করব?

আরে মিয়া! সমস্যা হলে তো সব দোষ আমাদের দেবে! তখন তো নিজের ঘাড়ে কোনো দোষ নেবে না।

জি স্যার। তা তো দেবেই। কিন্তু আমি তো নিরুপায়, স্যার।

নিরুপায় হলে চলবে না। আবার যাও।

স্যার, আমার চাকরি থাকবে না।

টিক্কা খান রাগ করে উঠে চলে যাচ্ছিলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামরিক সচিব অনেক অনুনয়-বিনয় করে আটকে রাখলেন। এর মধ্যেই কলিংবেলের শব্দ পাওয়া গেল। প্রেসিডেন্ট সাহেবের পিএস দৌড়ে তাঁর রুমে গেলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, টিক্কা খান কোথায়?

পিএস সাহেব বললেন, বাইরে স্যার।

তাঁকে আসতে বলো।

পিএস সাহেব তখনই বাইরে বেরিয়ে এসে টিক্কা খানকে উদ্দেশ করে বললেনস্যার, আপনি ভেতরে যান।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও টিক্কা খান প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমের দিকে পা বাড়ান।

চার

সামরিক শাসনের তেজ টের পাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ি বিরক্তির উদ্রেক ঘটাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দমবন্ধকর এই পরিস্থিতি কেউ মানতে পারছে না। রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও শেখ মুজিব বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সমর্থক ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি খুলনা ও যশোর অঞ্চলে গিয়ে বেশ কয়েকটি মতবিনিময়সভা করছেন। সভায় সরকারের সমালোচনা করে বক্তৃতা দিচ্ছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার লোকরা শেখ মুজিবকে সার্বক্ষণিক ফলো করছে। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাঁর গতিবিধি লক্ষ রাখছেন। তিনি ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা বলছেন তা সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হচ্ছে। কিন্তু ওপর থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না বলে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তবে তাদের ভাবসাব দেখে মনে হয়, তারা নির্দেশনা পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।

একবার খুলনা জেলা সফরের সময় ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি তখন জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তাঁর সঙ্গে মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান ছিলেন। শেখ মুজিবকে রাজা সাহেব বললেনস্যার, আমরা খুব চাপে আছি। আপনি আপাতত ঢাকায় অবস্থান করলে ভালো হয়। আপনি জেলা সফরে বের হলেই আমাদের টেনশন বাড়ে। ঝামেলাও বাড়ে।

শেখ মুজিব প্রশ্ন করেন, কেন? আমি কি কোথাও কোনো গণ্ডগোল করছি? কোথাও কোনো সমস্যার সৃষ্টি করছি?

তা করেননি, স্যার। কিন্তু আপনি যে বিভিন্ন জায়গায় যান, রাজনৈতিক কর্মসূচি করেনএসব তো নিষিদ্ধ, স্যার। সামরিক শাসনের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি করা যায় কি?

আরে, রাজনৈতিক কর্মসূচি কোথায় দেখলেন। আমি তো নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করি। তাদের ভালো-মন্দ জানতে চাই। কে কেমন আছে, কী করছে না করছে! এটাকে কি রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে? এটা বড়জোর সামাজিকতা বলতে পারেন। শেখ মুজিব বললেন।

স্যার, আপনি রাজনীতির মানুষ। আপনি যা করেন সবই রাজনীতি, স্যার। আপনার সব কিছুই সরকারকে আমাদের জানাতে হয়, স্যার।

তা তো জানাবেনই। ওটাই তো আপনাদের ডিউটি। আমি একেবারে বসে থাকলে আপনি কী কাজ করবেন? কী রিপোর্ট পাঠাবেন?

খাদিম হুসেন রাজা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। শেখ মুজিবের কথার পর তিনি কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁর অবস্থা দেখে শেখ মুজিব বললেন, ঘরে বসে থাকা আর জেলখানায় থাকা সমান কথা। তাই একটু ঘোরাফেরা করছি।

খাদিম হুসেন রাজা আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন।

শেখ মুজিব পাইপ ধরালেন। পাইপ টানতে টানতে তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। জনগণ আশ্বস্ত হয়েছে। তিনি কি দেশের জনগণের সঙ্গে বেঈমানি করবেন? তাঁকে সরাতেও কি আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান দরকার হবে? কিন্তু নির্বাচন তাঁকে দিতেই হবে।

হঠাৎ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী এসে হাজির হন শেখ মুজিবের সামনে। তাঁরা এসেই স্লোগান ধরেনমুজিব ভাই জিন্দাবাদ, আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ। মুজিব তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে।

শেখ মুজিব হাতের ইশারায় তাঁদের থামতে বললেন। তার পরও যখন স্লোগান দিচ্ছিলেন তখন শেখ মুজিব বললেনআরে মিয়ারা, থামো থামো! সামরিক শাসন চলছে দেখছ না!

স্লোগান থামিয়ে সবাই গোল হয়ে শেখ মুজিবকে ঘিরে বসল। শেখ মুজিব সবার উদ্দেশে বললেন, সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমাদের দাবি কী?

একজন বললেন, স্বায়ত্তশাসন।

মূলত ছয় দফা।

জি মুজিব ভাই, জি।

ছয় দফা বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু আন্দোলন করে হবে না। এ জন্য নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে। নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারলে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। আমরা বলতে পারব, জনগণ ছয় দফার পক্ষে ভোট দিয়েছে।

জি মুজিব ভাই।

তাহলে আমাদের কী করতে হবে?

নির্বাচনে জিততে হবে। কিন্তু নির্বাচন কি দেবে? জনৈক নেতা বললেন।

শেখ মুজিব বললেন, ঘোষণা দেওয়ার পর নির্বাচন না দিলে ইয়াহিয়া ক্ষমতায় থাকতে পারবে?

তা হয়তো পারবে না।

তাহলে! শোনো, ওসব চিন্তা বাদ দাও। নির্বাচনে কিভাবে জেতা যায় সেই চিন্তা করো। মানুষের ঘরে ঘরে যেতে হবে। ছয় দফার বার্তা পৌঁছাতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, ছয় দফার বিকল্প নেই। ছয় দফা বাস্তবায়িত হলেই আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

আচ্ছা মুজিব ভাই।

শুধু কথা নয়, কাজে প্রমাণ দিতে হবে। মনে সাহস রাখতে হবে।

শেখ মুজিবের কথায় সবাই বেশ উজ্জীবিত। নতুন করে তাঁদের ভেতরে আশা সঞ্চারিত হলো। এভাবেই তিনি জেলা পর্যায়ের নেতাদের চাঙ্গা করে তোলেন। পরে শেখ মুজিব ঢাকায় ফিরে আসেন।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনে শেখ মুজিব অস্থির হয়ে উঠলেন। খবরটি টেলিফোনে তাঁকে কেউ দিয়েছেন। টেলিফোনে তিনি জানতে পেরেছেন, গতকাল (৩১ মে ১৯৬৯) গভীর রাতে রাওয়ালপিন্ডিতে হোটেলকক্ষে তিনি মারা গেছেন। তিনি মনে মনে ভাবেন, এটা কি হার্ট অ্যাটাক? নাকি তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে! এই সময় তিনি কেন যে রাওয়ালপিন্ডিতে গেলেন! ওরা বারবার আমাকে এবং মানিক ভাইকে হুমকি দিয়ে আসছিল। ওরা বলেছিল, পশ্চিম পাকিস্তানে এলে তোমাদের মেরে ফেলব! কে জানে, তাঁকে মেরে ফেলা হলো কি না!

শেখ মুজিব ফজিলাতুন্নেছা রেণুর কাছে খবরটি জানিয়ে বললেন, মানিক ভাই নাকি মারা গেছেন!

ফজিলাতুন্নেছা বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, কী বলো! কোথায়, কিভাবে মারা গেলেন!

রাওয়ালপিন্ডিতে। গতকাল গভীর রাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে নাকি মারা গেছেন।

সেকি!

মুহূর্তের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এলো। শেখ মুজিব কিংবা ফজিলাতুন্নেছা কেউই কোনো কথা বলতে পারলেন না। মানিক মিয়ার সঙ্গে তাঁদের নানা স্মৃতির কথা মনে পড়তে থাকল। একপর্যায়ে শেখ মুজিব বললেন, ইস্! বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। উনি ছাড়া ইত্তেফাকের কী হবে! আমাদের আন্দোলনে উনি যে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছিলেন! আন্দোলনকে বেগবান করতে ইত্তেফাক বিশাল ভূমিকা রেখে আসছিল। আমাদের সুখে-দুঃখে সব সময় উনি পাশে ছিলেন। এখন কী হবে? আমাদের দাবি, বিশেষ করে ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানিয়ে কে ক্ষুরধার কলাম লিখবেন?

ফজিলাতুন্নেছা তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, উনিও পরিবার নিয়ে খুব কষ্টেই দিন কাটিয়েছেন। তার পরও তোমার অনুপস্থিতিতে উনি যতটুকু পেরেছেন সহযোগিতা করেছেন। সব সময় খোঁজখবর নিতেন।

আমি জানি, রেণু। সেই কলকাতা থেকেই তো আমাদের পরিচয়। আমরা দুজনই সোহরাওয়ার্দীর ভক্ত ছিলাম। সোহরাওয়ার্দী সাহেবও আমাদের ভীষণ পছন্দ করতেন। ইত্তেফাক পরিচালনার জন্য তাঁকে আমি সহযোগিতা করেছি ঠিকই, কিন্তু ইত্তেফাক আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে কাজ করেছে। মানিক ভাই নিজে আমাদের পক্ষে অসংখ্য কলাম লিখেছেন। এ রকম সহযোগিতা আর কার কাছে পাব?

মানিক ভাইয়ের বাসায় যাবা নাকি? সবাই তো ঢাকায়ই আছে। তা ছাড়া মানিক ভাইয়ের লাশ কখন আসবে না আসবে! ফজিলাতুন্নেছা বললেন।

দেখি, খোঁজখবর নিই।

শেখ মুজিব মানিক মিয়ার বাসায় ফোন করলেন। মানিক মিয়ার বড় ছেলে মইনুল হোসেন ফোন ধরেন। তিনি শেখ মুজিবকে জানান, রাওয়ালপিন্ডি থেকে আজই লাশ আসবে। বিকেলে জানাজার ব্যবস্থা করা হবে। লাশ দাফনের জন্য পিরোজপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে।

শেখ মুজিব ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে মানিক মিয়ার বাসায় যান। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান এবং তাঁদের সান্ত্বনা দেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে মানিক মিয়ার জানাজায়ও অংশ নেন।

মানিক মিয়ার আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেন না শেখ মুজিব। তাঁকে হারিয়ে খুব অসহায় বোধ করেন তিনি।

পাঁচ

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিজের দপ্তরে বসে একটার পর একটা সিগারেট টানছেন। তাঁর সামনে বসে আছেন জেনারেল হামিদ খান, মোহাম্মদ শরিফ, গুল হাসান, আতিকুর রহমান, টিক্কা খান, এ এ কে নিয়াজী এবং সাহেবজাদা ইয়াকুব খান। পূর্ব পাকিস্তানের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁদের ডাকা হয়েছে। টেবিলের ওপর পূর্ব পাকিস্তানের পুরনো ফাইলটি রাখা। মাঝেমধ্যে তাঁরা ওই ফাইলের দিকে চোখ রাখছেন।

আতিকুর রহমানের শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে। শ্বাস টানতে গিয়ে কাশি আসছে। তিনি নাকে-মুখে রুমাল দিয়ে শ্বাস টানার চেষ্টা করেন। ইয়াহিয়া খান তাঁর অবস্থা দেখে বললেনআতিক, আপনার বোধ হয় কষ্ট হচ্ছে। আপনি চাইলে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

আতিকুর রহমান আমতা আমতা করে বললেন, ঠিক আছে স্যার। অসুবিধা নেই।

ইয়াহিয়া খান বলেন, আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার অসুবিধা হচ্ছে। যান না, যান। আমি মাইন্ড করব না। আপনি তো জানেন, আমি চেইন স্মোকার। সিগারেট না টানলে মাথা খোলে না।

প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁর সামনে বসা অন্যদের উদ্দেশ করে বললেন, আপনাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো! সমস্যা হলে বলেন।

টিক্কা খান বললেন, না স্যার। কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

অন্যরাও টিক্কা খানের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেন। ইয়াহিয়া খান তাঁদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে আরো বেশি বেশি সিগারেট টানতে লাগলেন।

আতিকুর রহমান বেশ অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। তিনি আস্তেধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেনস্যার, আমি চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আসি। চোখ দুটো জ্বলছে।

আমি তো আপনাকে আগেই যেতে বলেছি।

আতিকুর রহমান বাইরে গেলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব হামিদ খান, মোহাম্মদ শরিফ, গুল হাসান, টিক্কা খান ও নিয়াজীকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, কেন আপনাদের ডেকে পাঠিয়েছি?

হামিদ খান বললেন, জি স্যার। আপনার সামনের ফাইলটা দেখে বুঝলাম।

টিক্কা খান সাহেব, বলেন তো এখন পূর্ব পাকিস্তানের কী অবস্থা? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে তো?

জি স্যার। একেবারে নিয়ন্ত্রণে। শেখ মুজিব একটু ঝামেলা করছে। বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। আপনার সমালোচনা করছে। তবে কোনো পাবলিক গ্যাদারিং করছে না।

আচ্ছা। কিছু ঝামেলা তো থাকবেই। এতটুকু না করলে করবেটা কী? তাঁকে বেশি চাপে রাখলে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা খেপে যাবে। তার চেয়ে বেশি লোক তো আর কারো নাই? অবশ্য ভাসানী সাহেবের কিছু সমর্থক আছে। সেটা কোনো ফ্যাক্টর নয়।

আতিকুর রহমান বাইরে থেকে এসে চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, কোন বিষয়টা, স্যার?

আগে কথা শোনেন। তারপর প্রশ্ন করেন। কথা না শুনেই প্রশ্ন করছেন কেন?

স্যরি স্যার।

যা বলছিলাম। ওখানে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা শুধু শেখ মুজিবেরই আছে।

কিন্তু স্যার...

ইয়াহিয়া খান হাত ইশারা করে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আমার কথা আগে মনোযোগ দিয়ে শোনেন, প্রতিটি জেলায় আমাদের লোকের সংখ্যা বাড়ান। জেলার কোথাও যাতে কিছু ঘটতে না পারে, কেউ যাতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের সেনা সদস্যের সংখ্যা যত বেশি থাকবে ততই ওরা চাপে থাকবে।

জি স্যার। গুড আইডিয়া, স্যার।

প্রতিটি জেলার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যদি আমাদের হাতে থাকে তাহলে আর চিন্তা নাই।

টিক্কা খান বললেন, জি স্যার। নিয়ন্ত্রণেই আছে। গভর্নর সাহেবের সঙ্গে আমার টাইম টু টাইম কথা হচ্ছে। ভাসানী সাহেবের কথা যেটা বললেন, ওখানকার অনেক সাধারণ মানুষ তাঁর খুব ভক্ত। তাঁকে হাত করতে পারলে ভালো হতো।

আতিকুর রহমান বললেন, ভাসানী সাহেব শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।

নিয়াজী বললেন, কেন?

তাঁদের মধ্যে অন্য রকম একটা রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও খুব ভালো। আতিকুর রহমান বললেন।

হামিদ খান বললেন, আপনি এত কিছু জানেন কী করে?

কেন, আপনি জানেন না, স্যার? উনি একসময় আইয়ুব খানকে সমর্থন করেও শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। শেখ মুজিবের মুক্তি দাবিতে মাঠে নামলেন। এসব আপনার মনে নেই?

হামিদ খান ইতিবাচক মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। এখন ভাসানী সাহেবকে হাত করা যায় না? তাকে বড় ধরনের টোপ দিলে গিলবে না?

টিক্কা খান বললেন, শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ভাসানী সাহেবকে ব্যবহার করা বোধ হয় কঠিন হবে। গোয়েন্দাদের ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে।

ইয়াহিয়া খান বললেন, দেখেন না! চেষ্টা করেন। বড় টোপ দেন। যে ধরনের টোপ উনি গিলতে পারেন সে ধরনের টোপ দেন।

জি স্যার। গভর্নর সাহেবের সঙ্গে কথা বলে দেখি। টিক্কা খান বললেন।

ইয়াহিয়া খান বললেন, মোজাফফর উদ্দিন তো আমাদের নিজেদের লোক। তাঁকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে বলেন। অবশ্য তাকে আমি ওখান থেকে সরিয়ে আনার কথা ভাবছি।

স্যার, আপনার পরিকল্পনাটা পরিষ্কারভাবে জানতে পারলে ভালো হয়। আমরা সে অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করতে পারি।

হ্যাঁ, তা করব। কিন্তু একটা ব্যাপার নিয়ে আমি খুব ভাবছি।

কী স্যার!

পূর্ব পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল কেন?

সেটা তো ছয় দফায় উল্লেখ আছে, স্যার।

তা আছে। তাই বলে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না! নিশ্চয়ই আমাদের কোথাও কোনো ভুল আছে।

অবশ্যই আছে, স্যার।

ভাসানী সাহেবকে কেন আমরা আমাদের পক্ষে রাখতে পারলাম না, সে বিষয়টিও ভাবতে হবে।

জি স্যার।

হামিদ খান, আপনি একটা কাজ করেন। আপনি নিজে ব্যাপারটা ডিল করেন তো!

কোন ব্যাপারটা, স্যার?

ভাসানী সাহেবের ব্যাপারটা। তাঁকে কোনোভাবে হাত করা যায় কি না। যদি তা করা যায় তাহলে আমরা ভিন্নভাবে অগ্রসর হব।

তাহলে কি স্যার নির্বাচন দেরি করে করার চিন্তা?

শোনেন, আমার কাছে যে তথ্য আছে তাতে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন দিলে শেখ মুজিবের দল পাস করবে। কোনোভাবেই তাঁকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

তাঁকে ফিনিশ করা যায় না? গুল হাসান বললেন।

সেই চিন্তা থেকেই তো আগরতলা মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তার ফল তো আরো উল্টো হলো।

তাহলে স্যার অন্য কোনো প্ল্যানে যেতে হবে। নিয়াজী বললেন।

সে জন্যই তো বলছি, শেখ মুজিবকে বাটে ফেলার জন্য ভাসানীকে দরকার। হামিদ খান, টিক্কা সাহেব, আপনারা দুজনেই চেষ্টা করেন। যে করেই হোক ভাসানী সাহেবের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ান। তাঁকে হাত করেন।

দেখি স্যার। কোনো একটা পথ বের করা যায় কি না। হামিদ খান বললেন।

দেখি না। সফল হতে হবে। ক্ষমতা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। বুঝতে পারছেন তো?

জি স্যার।

গুল হাসান, আতিকুর রহমান, নিয়াজী সাহেব, আপনারাও চিন্তা করেন। বাঙালির হাতে ক্ষমতা দিলে দেশের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। তছনছ করে দেবে।

হামিদ খান বললেন, একেবারে ঠিক বলেছেন, স্যার। আরেকটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার, স্যার।

কী বিষয়?

স্যার, ভুট্টো সাহেব তো পশ্চিম পাকিস্তানে একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠছেন। তাঁর ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছা দরকার।

হুম্। রগচটা টাইপের মানুষ। সারাক্ষণই মনে হয় মাথাটা তাঁর গরম!

তার পরও স্যার, তাঁর দল কিছুটা দাঁড়িয়েছে।

তা আমি জানি। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিপদে-আপদে তাঁকে কাজে লাগবে।

হামিদ খান বললেন, জি স্যার। তাঁর সঙ্গে আমি যোগাযোগ করব।

ইয়াহিয়া খান অন্যদের উদ্দেশে বললেন, আপনাদের কারো কোনো লিংক থাকলে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁকে হাতে রাখতে পারলে আমাদের সুবিধা হবে। আমি কী বোঝাতে চাইছি নিশ্চয়ই আপনারা বুঝতে পারছেন।

গুল হাসান বললেন, জি স্যার। বুঝতে পেরেছি।

আরেকটা কথা আপনারা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।

সবাই ইয়াহিয়া খানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। ইয়াহিয়া খান বললেন, এই দেশ নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেললে আমরা তাদের ছেড়ে দেব না। যেকোনো পরিস্থিতি আমরা ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করব। আমরা সবাই অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব। কেউ কাজের ক্ষেত্রে অবহেলা করব না।

সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন, জি স্যার! জি স্যার!

সারা দিন ইয়াহিয়া খানের খুবই ব্যস্ত সময় কেটেছে। সন্ধ্যায় যখন প্রেসিডেন্ট হাউসে ফিরলেন তখন তিনি বেশ ক্লান্ত। এ সময় তিনি তাঁর প্রিয় বান্ধবী নূরী মানে নূরজাহানের সঙ্গ পেতে চেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে সে রকমই কথা ছিল। সন্ধ্যায় নূরজাহান আসবেন। তিনি প্রেসিডেন্ট সাহেবকে গান শোনাবেন। অথচ নূরজাহান আসেননি। তাঁকে না পেয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেব খেপে গেলেন। তিনি তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ইসহাকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, তুমি কী দায়িত্ব পালন করো, ইসহাক? তোমাকে দিয়ে তো কোনো কাজ হচ্ছে না!

স্যরি স্যার। আমি এখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এখন তুমি কী ব্যবস্থা নেবে?

স্যার, আমি তাঁকে হাজির করার ব্যবস্থা করছি।

হাজির করার ব্যবস্থা নিতে হবে না। তুমি শুধু খোঁজ নাও সে কোথায় আছে।

জি স্যার।

এমন কিছু করবে না, যাতে সে বিরক্ত হয়।

জি স্যার।

ইসহাক সাহেব চলে যান। চরম বিরক্তির সঙ্গে তাঁর চলে যাওয়া দেখেন ইয়াহিয়া খান। তারপর এক পা দুপা করে রুমের ভেতরে যান। সোফায় হেলান দিয়ে বসেন। তাঁর মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে আছে। কিছুই ভালো লাগছে না। তিনি চিৎকার দিয়ে লোক জড়ো করেন। বিরক্তির সঙ্গে বলেন, কোথায় থাকো তোমরা? কোনো কাজকাম নাই, তাই না? যত্তসব উজবুকের দল!

সবাই ভয়ে অস্থির। প্রেসিডেন্ট সাহেবের চোখরাঙানি দেখে কারো কারো কাঁপুনি ওঠে। কে কী করবে তার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট সাহেব কর্কশ স্বরে বললেন, আমার মদ কই? বাদাম-চানাচুর কই? এগুলো রেডি রাখোনি কেন?

সঙ্গে সঙ্গে একেকজন একেকটা নামিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামনে এনে দিল। প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামনের টি-টেবিলে হুইস্কি, শ্যাম্পেন, ভদকাসহ নানা ধরনের মদের বোতল রাখা। তিনি ভদকার বোতল হাতে নিয়ে একজনকে বললেন, এটা বানাও। মুহূর্তের মধ্যে লোকটি একটি গ্লাস হাতে নিলেন।

তারপর ভদকার সঙ্গে পরিমাণমতো সোডা ওয়াটার আর আইস দিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামনে দিলেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব গ্লাসটি হাতে নিয়ে একটি চুমুক দিলেন। এভাবে দু-তিন গ্লাস খাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, তোমরা সবাই যাও। আমি একটু রেস্ট নেব।

লোকগুলো রুম থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই দরজায় নক করার শব্দ। প্রেসিডেন্ট সাহেব দরাজ গলায় বললেন, কে?

নূরজাহান দরজা খুলে চমৎকার হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমি তোমার নূরী।

প্রেসিডেন্ট সাহেব যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না। তিনি ভূত দেখার মতো নূরীকে দেখছেন।

ছয়

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সকালের নাশতা রুটি, আলু ভাজি আর ডিম অমলেট। তাঁর খাওয়া শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যেই তাঁর সামনে গরম চা দেওয়া হয়েছে। চায়ের ধোঁয়া উড়ছে। নাকে চায়ের গন্ধ আসতেই তিনি কাপটা নিজের সামনে টেনে নিলেন। রুটির শেষ অংশটুকু মুখে নিয়ে চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়ালেন। এ সময় তাঁর কাজের ছেলে শফিক এসে বললহুজুর, আপনার কাছে একজন লোক আসছে। উনি আপনার লগে দেখা করতে চায়। তারে কি ড্রয়িংরুমে বসামু?

এই সকালবেলা কে এলো! বিস্ময়ের সঙ্গে মওলানা ভাসানী জানতে চান।

শফিক বলল, জিজ্ঞাসা করি নাই। তার নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসা কইরা আসব?

হ যা। জিজ্ঞাসা করে আয়।

শফিক তাড়াতাড়ি লোকটির কাছে গেল। তার কাছে জানতে চাইল, আপনি কোথা থেকে আসছেন? আপনার নাম-পরিচয় কী?

আই অ্যাম খাদিম হুসেন রাজা। হুজুর নো মি, ওয়েল।

বাংলায় কন। ইংরেজি বুঝি না।

খাদিম হুসেন রাজা বিপদেই পড়লেন। এখন তিনি কী করে বোঝাবেন? তিনি প্রথমে নিজের দিকে ইশারা করে বললেন, খাদিম হুসেন রাজা।

আচ্ছা, বুঝছি। আপনি খাদিম হুসেন রাজা?

খাদিম হুসেন রাজা হেসে বললেন, ভেরি গুড।

জি? কী বললেন? ভালো, না খারাপ?

এ সময় মওলানা ভাসানী সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে বললেন, কিরে শফিক? কে আসল বললি না?

শফিক রাজা সাহেবকে দেখিয়ে বলল, উনি আসছেন, হুজুর।

মওলানা ভাসানী প্রশ্ন করার আগেই রাজা সাহেব উর্দুতে বললেনহুজুর, আমি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা।

মওলানা ভাসানীও উর্দুতে বললেন, আসেন আসেন! ভেতরে এসে বসেন। শফিক, চা-নাশতা দে তো, বাবা!

খাদিম হুসেন রাজা বললেন হুজুর, আমি নাশতা করেই এসেছি। শুধু চা দিলেই চলবে।

আচ্ছা আচ্ছা। শফিক, শুধু চা দে।

মওলানা ভাসানী রাজা সাহেবকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলেন। দুজন মুখোমুখি বসলেন। কুশল বিনিময় করলেন। এ সময় শফিক চা নিয়ে এলো। মওলানা ভাসানী তাঁকে চা খেতে বললেন। তারপর বললেনকী ব্যাপার, রাজা সাহেব? হঠাৎ আমার বাসায়!

খাদিম হুসেন রাজা বললেন, আপনাকে দেখতে আসলাম, হুজুর। আপনার সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো পরিচয় ছিল না। অবশ্য জেনারেল হামিদ খান কয়েক দিন আগেই আপনার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন।

হামিদ খান? আচ্ছা আচ্ছা...

হুজুর, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কী?

রাজনৈতিক খবর তো আমার চেয়ে আপনার ভালো জানার কথা। আপনারা দেশ চালাচ্ছেন!

না, মানে, প্রেসিডেন্ট সাহেব নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই কিন্তু সামরিক শাসন দিয়েছেন।

কী জানি! নির্বাচন কি আদৌ হবে?

হুজুর, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন; নির্বাচন সরকার দেবে।

তাই? নির্বাচন দেবে? আমার কেন জানি খুব সন্দেহ হচ্ছে।

আমি সত্যি বলছি, হুজুর। নির্বাচন সরকার দেবে। আপনার যে জনপ্রিয়তা দেখলাম, তাতে আপনার দলের বিরাট একটা সম্ভাবনা!

তাই? কোথায় দেখলেন?

বিভিন্ন জেলায়, হুজুর। আমি ঘুরেছি, হুজুর। বিভিন্ন জেলায় গিয়েছি।

আপনি হয়তো ব্যক্তি ভাসানীর কথা বলছেন। আমার জনপ্রিয়তা থাকতে পারে; কিন্তু আমার দলের খুব বেশি জনপ্রিয়তা নেই। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিব এগিয়ে আছে। অনেক এগিয়ে আছে।

হুজুর যে কী বলেন! আপনার জনপ্রিয়তা আপনি বুঝতে পারছেন না। টেরও পাচ্ছেন না বোধ হয়। শেখ মুজিব আপনার কাছে কিছুই না।

আপনার তথ্য সঠিক নয়। আমি রাজনীতি করে করে বড় হয়েছি। আমি সব জানি। সব বুঝি। আসল কথাটি কী সেটা বলেন।

তেমন কিছু না, হুজুর। একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করলাম। আপনার দাবিগুলো কিন্তু ছয় দফার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

হুম্। তা ঠিক। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, শেখ মুজিবের ছয় দফাই মানুষ গ্রহণ করেছে। ১৪ দফা তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।

হয়তো আপনার প্রচার-প্রপাগান্ডায় সমস্যা ছিল। তা না হলে ১৪ দফাই মানুষ গ্রহণ করত।

কী জানি! গ্রহণ করত কি না খোদাতালাই জানেন।

আপনি হুজুর শুধু শুধুই শেখ মুজিবকে সমর্থন করেন। উনি আপনার জন্য কী করেছেন?

সে নিজেই তো বিপদে! আমার জন্য কিভাবে করবে? আর কী-ই বা করার আছে?

হুজুর, আমার মনে হয় আপনি ভিন্নভাবে চিন্তা করেন।

কী রকম?

আপনি তো শুধু রাজনীতিই করলেন! কিছুই পাননি। এবার একটা সুযোগ আসছে, হুজুর। আপনি আপনার দল নিয়ে এককভাবে আগান। দেখবেন, আপনার ধারেকাছেও কেউ থাকতে পারবে না। তা ছাড়া আপনার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট সাহেবের বিশেষ দুর্বলতা আছে। উনি চান, আপনিই দেশের হাল ধরেন। হুজুর, আমার মেসেজটা বুঝতে পারছেন তো!

বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি তো আমার দল নিয়েই আছি।

আছেন। কিন্তু আপনি মুজিবকে যেভাবে সাপোর্ট দেন, তাতে মনে হয় আপনি আর শেখ মুজিব একই দল করেন।

শোনেন, এইসব বলে কোনো লাভ নেই। আমি সমর্থন না করলেও মুজিবের জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমবে না। তাঁকে অবহেলা করে আপনারাও খুব ভালো থাকতে পারবেন না।

হুজুর, আপনি আরেকটু চিন্তা করে দেখেন। প্রেসিডেন্ট সাহেব বলেছেন, উনি নির্বাচনে জিতলেও উনার হাতে ক্ষমতা দেওয়া যাবে না।

কেন? এটা কেমন কথা হলো?

কারণ উনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি। আন্দোলনের কারণে উনি মামলা থেকে রেহাই পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ সত্য। যিনি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন তাঁর হাতে কি ক্ষমতা দেওয়া যায়?

মওলানা ভাসানী হাসলেন। রাজা সাহেব অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি হাসির রহস্য বুঝতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেনহুজুর, হাসলেন যে!

মওলানা ভাসানী রাজা সাহেবের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, আজ খোদা হাফেজ। পরে আবার কথা হবে।

রাজা সাহেব আর কিছু বললেন না। তিনি মওলানা ভাসানীকে সালাম দিয়ে বের হয়ে গেলেন। মওলানা ভাসানী মনে মনে বললেন, হায়রে কপাল! একজন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ!

টাইম ম্যাগাজিনে মওলানা ভাসানীর একটি সাক্ষাৎকার বেরিয়েছে। সেই সাক্ষাৎকার দেখে দেশের সচেতন মানুষের মধ্যে আশা সঞ্চারিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারে টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিক ডান কোগিনের প্রশ্নের জবাবে মওলানা ভাসানী বলেছেন, আমি আমার দেশবাসীর জন্য ফাঁসিতেও ঝুলতে পারি। তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে প্রতি-নোটিশ জারি করেন। নোটিশে তিনি বলেন, দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় না বসলে তিনি আবার আন্দোলন শুরু করবেন। তিনি অবিলম্বে দীর্ঘকালের পুরনো বৈষম্যের সমাধান দাবি করেন। তা না হলে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যেমন আন্দোলন করেছেন, ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধেও তা করতে বাধ্য হবেন। তিনি বলেন, এবারের আন্দোলন আরো ভয়াবহ হবে।

সাংবাদিক ডান কোগিন প্রশ্ন করেন, পাকিস্তানিরা কি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সত্যি আন্দোলন করবে?

মওলানা ভাসানী ক্ষোভের সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করেন, সাড়ে বারো কোটি পাকিস্তানিকে কি সেনাবাহিনীর পক্ষে হত্যা করা সম্ভব? ভিয়েতনামের নাগরিকরা কি প্রাণের ভয়ে যুদ্ধ থামিয়েছে? আমরাও তাদের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নাগরিক। অসন্তোষের আগুন একবার জ্বালানো হলে জনগণ কিছুতেই থামবে না।

ভাসানী সাহেবের সাক্ষাৎকার পড়ে ইয়াহিয়া খানও ক্ষুব্ধ হন। কোথায় তিনি তাঁর পক্ষ নেবেন তা না, উল্টো তিনি তাঁকে একহাত নিয়েছেন! এটা ইয়াহিয়া কিছুতেই মানতে পারছেন না। তিনি জরুরি ভিত্তিতে হামিদ খানকে তলব করলেন। হামিদ খান পড়িমরি করে প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তরে হাজির হলেন। তাঁকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ডাকা হলো। অথচ প্রেসিডেন্ট সাহেবের মুড অফ! তিনি একের পর এক সিগারেট টানছেন। কেউ যে তাঁর সামনে বসে আছে সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। টুঁ শব্দটি করছেন না। হামিদ খান বিব্রত। তিনি কী করবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর তিনি বললেনস্যার, আমাকে ডেকেছিলেন।

ইয়াহিয়া খান সিগারেট টানতে টানতেই বললেন, আমার মেজাজটা চড়ে আছে। তাই কথা বলছি না।

তা আমি বুঝতে পারছি, স্যার। কিন্তু আমার কোনো ভুল...

আপনাকে না বলেছি ভাসানী সাহেবকে হাত করেন। কী করেছেন বলেন।

স্যার, আমি খাদিম হুসেন রাজাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছে।

প্রেসিডেন্ট সাহেব টাইম ম্যাগাজিনটি হামিদ খানের দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, তার রেজাল্ট কি এটা?

হামিদ খান ম্যাগাজিন উল্টেপাল্টে দেখেন। ভাসানী সাহেবের সাক্ষাৎকার দেখে চমকে ওঠেন। তারপর গভীর মনোযোগে পড়তে শুরু করেন। শেষ করে মাথা ওপরে তুলে বলেন, স্যরি স্যার। সাক্ষাৎকারটা মনে হয় আগের নেওয়া।

না না। এটা আমার বিশ্বাস হয় না। আমার মনে হয়, রাজা ভাসানী সাহেবের সঙ্গে ডিলিংটা ভালো করেনি। আগে তো তাঁকে বুঝতে হবে! যাক গে, ভুট্টো সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছেন?

না, স্যার।

কেন না?

স্যার, উনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমি অবশ্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। উনি বলেছেন, কয়েক দিন পরে আমার সঙ্গে বসবেন।

যত দ্রুত বসতে পারেন ততই ভালো। উনার তো একটু মাথা গরম। কখন কী করে বসে! দেখেননি, আইয়ুব খানের এত কাছের মানুষ; অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে বাদ পড়ার পর চোখ উল্টে ফেললেন!

জি স্যার। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, উনি রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠক বয়কট না করলে ঘটনা অন্য রকম হতো। আপনার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পেছনে তাঁর হাত আছে।

সে জন্যই তো আপনি তাঁর সঙ্গে বৈঠক করবেন। আমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট। তাঁকে বলবেন, আপনিই আলটিমেটলি দেশ চালাবেন। আমরা তো সাময়িক সময়ের জন্য আছি। এই সময় সে যেন আবার সরকারবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড না করে। তাঁর ভুলের কারণে যাতে শেখ মুজিব সুবিধা নিতে না পারে।

আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন, স্যার। ভুট্টো সাহেব কখনোই ঝামেলা পাকাবেন না। উনি আপনার সঙ্গেই আছেন।

গুড, ভেরি গুড।

স্যার, আমি এখন যাই। আমি নিজেই ভাসানী সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি। চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।

সেটাই তো বলছি। আপনি নিজেই চেষ্টা করেন। উনাকে আমাদের পক্ষে আনতে পারলে শেখ মুজিব একা হয়ে যাবে। তখন আর সে কিছু করতে পারবে না।

জি স্যার। আমি আসছি, স্যার।

হামিদ খান চলে যাওয়ার পর ইয়াহিয়া খান সোফায় হেলান দিয়ে বসে সিগারেট টানা শুরু করলেন। তাঁর মাথার মধ্যে ভাসানী সাহেবের কথাগুলো ঘুরপাক খায়।

সাত

পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল মোজাফফর উদ্দিন গভর্নরের দায়িত্বও পালন করতেন। একদিন সকালে নিজের গভর্নর হাউসে পা রেখে বুঝতে পারলেন, তিনি আর ওই পদে নেই। তাঁর স্থলে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান। আকস্মিক এই বার্তা তাঁকে যারপরনাই বিব্রত করেছে। তিনি মনে মনে ভাবেন, কেন তাঁকে এভাবে অপমান করা হলো! তিনি কী ভুল করেছেন তা বোঝার চেষ্টা করেন। পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও কি সরকারবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড হয়েছে! না তো! সবই তো ঠিক আছে। তাহলে কেন তাঁকে এই অপমান?

মোজাফফর উদ্দিন স্থির হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। কী করবেন তা নিয়ে ভাবেন। তারপর তিনি অফিসে ঢুকে তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অনেকটা নীরবেই অফিস ত্যাগ করেন। অফিস থেকে আবার বাসায় ফিরে যাওয়ার ঘটনায় অনেকেই হতবাক হয়। বাসার লোকজন বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকায়। কেউ কেউ জানতে চায় শরীর খারাপ হলো কি না। নাকি অন্য কোনো সমস্যা হয়েছে।

মোজাফফর উদ্দিন কী বলবেন? তিনি কোনো কথার জবাব দেন না। তিনি নিজের রুমে গিয়ে ছিটকিনি লাগান। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন। নানা ভাবনা তাঁর মাথায় ঘুরপাক খায়। চাকরির শর্তেই আছে, জনস্বার্থে সরকার তাঁকে যেকোনো জায়গায় যখন-তখন বদলি করতে পারবে। মোজাফফর উদ্দিনও সেভাবেই চাকরিটাকে নিয়েছিলেন। সরকারের যেকোনো নির্দেশ তাঁকে মানতে হবে। সে জন্য সব সময়ই তাঁর মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আজ তাঁর মন খুবই খারাপ হয়েছে। আগে থেকে জানলে তাঁর এতটা খারাপ লাগত না। তা ছাড়া একজন গভর্নরকে আগে থেকে না জানিয়ে যে বদলি করা যায় তা-ও তাঁর জানা ছিল না।

মোজাফফর উদ্দিন নিজের মনকে সান্ত্বনা দেনদুঃখ কোরো না, মোজাফফর! জীবনে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। এ নিয়ে দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। বরং স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া উচিত। তোমাকে আবার তোমার পুরনো দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে। ১৪ ডিভিশনের জিওসি। মন্দ কি? এখানে পাঠিয়ে তোমাকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। না-ও তো পাঠাতে পারত! তুমি ভুলে যাও। সব কিছু ভুলে যাও। নিশ্চয়ই আরো ভালো কিছু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

মোজাফফর উদ্দিন তাঁর পিএস মাহবুবকে ডেকে বললেন, আমি দু-এক দিনের মধ্যেই ঢাকা ছেড়ে চলে যাব। আমার মালপত্র সব গোছানো শুরু করো।

মাহবুব বিস্ময়ের দৃষ্টিতে গভর্নর সাহেবের দিকে তাকায়। হঠাৎ তাঁর চলে যাওয়ার খবরে সে বিচলিত। কী হয়েছে তা সে জানতে চায়।

মোজাফফর উদ্দিন এর কোনো জবাব দিতে পারেন না। তিনি নিজেও জানেন না কেন তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি শুধু বললেন, আমি চলে যাব, এটুকুই জেনে রাখো। আর কিছু জানার দরকার নেই।

মাহবুব আবারও মোজাফফর উদ্দিনের দিকে তাকায়। নিস্তেজ মানুষটাকে ভালো করে দেখে। তারপর মাথা নিচু করে ভাবে, কয়টা মাস কী উৎসাহ নিয়ে কাজ করেছেন! আর আজ তাঁকে মনে হচ্ছে অচেনা এক মোজাফফর উদ্দিন।

মাহবুব আর দাঁড়ায়নি। সে পা টেনে টেনে হেঁটে অন্য রুমের দিকে চলে যায়। মোজাফফর উদ্দিনের জন্য তার খুব কষ্ট হচ্ছে। এত কষ্ট সে আগে কখনো কারো জন্য অনুভব করেনি। মাহবুব অন্য রুমে ঢোকার আগেই তার আবার ডাক পড়ে। মাহবুব দৌড়ে মোজাফফর উদ্দিনের কাছে যায়। তাঁর সামনে সে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে দেখে মোজাফফর উদ্দিন বলেনকী ব্যাপার, মাহবুব! তোমার মন খারাপ কেন?

স্যার, আপনার আকস্মিক চলে যাওয়ার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

শোনো মাহবুব, জীবনের প্রতিটি ঘটনাই একটা অভিজ্ঞতা। যখন যা ঘটবে তাতে যদি তোমার কোনো হাত না থাকে তাহলে মন খারাপ করবে না। মনে করবে, ওটাই তোমার নিয়তি। নিয়তির ওপর কারো হাত নেই। ওটা বিধাতা নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি যা ভালো মনে করেন তা-ই করেন।

জি স্যার।

আমাকে আগের পদেই ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হয়তো আমি ওখানেই বেশি ভালো করব। আচ্ছা শোনো, আমি এখন কিছু সময় বিশ্রাম নেব। এই সময় আমার ফোন আসতে পারে। লোকজন দেখা-সাক্ষাৎও করতে আসতে পারে। তুমি বলবে, আমি বিশ্রামে আছি। আর যারা যোগাযোগ করবে তাদের নাম-ঠিকানা বা ফোন নম্বর লিখে রাখবে। প্রয়োজন হলে আমি যোগাযোগ করব।

জি স্যার।

মাহবুব চলে যায়। মোজাফফর উদ্দিন মাহবুবকে নিয়ে ভাবেন। মনে মনে বলেন, ছেলেটা অল্পদিনেই আমার ভক্ত হয়ে উঠেছে। খুব সরল সোজা টাইপের ছেলে। আবেগও কিছুটা বেশি। এ ধরনের মানুষদের খুব বেশি কষ্ট পেতে হয়। আমি চলে গেলে ও হয়তো চোখের পানি ফেলবে। কিন্তু ওর জন্য আমি কী করতে পারি!

মোজাফফর উদ্দিন বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলেন। আর অমনি তাঁর মাথাটা ঘুরতে শুরু করল। অতিরিক্ত টেনশন করলে তাঁর এমন অবস্থা হয়। তিনি টেনশন ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি মনে মনে বলেন, আমার ব্যর্থতা কী এটা যদি জানতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। ইয়াকুব খান স্যার আমার সিনিয়র। গভর্নর পদটা হয়তো তাঁর জন্যই বেশি মানানসই। নিয়োগ দেওয়ার আগে এটা ভাবা যেত না! আমি এতবার ভাবলাম, এই বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলব। অথচ ওই বিষয়টাই আমাকে সারাক্ষণ তাড়া করছে।

মোজাফফর উদ্দিন বিশ্রাম করতে পারেননি। টেনশন করতে করতেই কয়েক ঘণ্টা কেটে যায়। পরে তিনি মাহবুবকে ডেকে পাঠান। মাহবুব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে তাঁর কাছে। তার হাতে একটি ফর্দ। সেখানে নাম ও টেলিফোন নম্বর লেখা। ফর্দ দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছেন, তাঁর কাছে অনেক টেলিফোন এসেছে। তার পরও তিনি মাহবুবের কাছে জানতে চাইলেন, ওটা কী?

মাহবুব বললস্যার, এঁরা সবাই টেলিফোন করে আপনাকে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে করাচি, ইসলামাবাদ ও লাহোরের ফোনও আছে, স্যার।

তাই নাকি!

জি স্যার। আমি কি ধরিয়ে দেব, স্যার? কথা বলবেন?

না, দরকার নেই।

জি স্যার।

শোনো মাহবুব, আমি দু-এক দিনের মধ্যেই ঢাকা ছেড়ে চলে যাব। আমার মালপত্র গোছানো হচ্ছে তো?

জি স্যার। আমি নিজেই তদারক করছি, স্যার।

ভেরি গুড। তুমি একটা কাজ করো।

জি স্যার।

আমাকে কফি খাওয়াও। আমার মাথাটা কেন জানি ধরে আছে। কফি খেলে হয়তো আরাম পাব।

জি স্যার।

মাহবুব খুব ভালো করে এক মগ কফি বানায়। তারপর মোজাফফর উদ্দিনের হাতে দিয়ে বলে, আমি নিজে বানিয়েছি, স্যার। আমার মনে হয় আপনার খুব ভালো লাগবে। আপনার মাথা ব্যথাও থাকবে না।

মোজাফফর উদ্দিন মাহবুবের কথা শুনে হাসলেন। তারপর মগের কফিতে লম্বা করে ফুঁ দিয়ে চুমুক দিলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, বাহ্! মাহবুব দারুণ কফি বানিয়েছে তো!

মাহবুব হন্তদন্ত হয়ে মোজাফফর উদ্দিনের সামনে এসে দাঁড়াল। হাঁপাতে হাঁপাতে বললস্যার, অফিস থেকে ফোন করেছিল। আপনাকে এখনই যেতে বলেছে। নতুন গভর্নর সাহেব এসে গেছেন। তাঁকে নাকি দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে।

ঠিক আছে। তুমি গাড়ি রেডি করতে বলো। আমিও রেডি হচ্ছি। আচ্ছা শোনো, আমার জিনিসপত্র সব রেডি তো?

জি স্যার। সব প্যাকিং হয়ে গেছে। আপনি যখন যেতে চাইবেন তখনই যেতে পারবেন।

তুমি তাহলে যাও, গাড়ি রেডি করতে বলো।

মাহবুব লম্বা লম্বা পা ফেলে বাইরের দিকে যায়। ড্রাইভার ও নিরাপত্তাকর্মীদেও তৈরি হতে বলে। নিজেও তৈরি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই মোজাফফর উদ্দিন তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। মাহবুব তাঁকে দেখে দৌড়ে গাড়ির কাছে যায়। ততক্ষণে ড্রাইভার গাড়ি গেটের কাছে নিয়ে তৈরি থাকে। পেছনেই পুলিশের গাড়ি। মোজাফফর উদ্দিন মাহবুবকে সামনে বসার ইঙ্গিত করে গাড়িতে বসলেন। গাড়ি ছুটে চলল গভর্নর হাউসের দিকে। খুব দ্রুত গভর্নর হাউসে পৌঁছলেন মোজাফফর উদ্দিন। তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছেন। ইয়াকুব খানকে স্যালুট দিয়ে কুশল বিনিময় করলেন মোজাফফর উদ্দিন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি গভর্নরের রুমে ঢুকলেন। সামরিক আইন প্রশাসক (জোন বি) এবং গভর্নরের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়াকুব খানের কাছে হস্তান্তর করে তিনি সবিনয়ে বললেনস্যার, আমি এখন যাই?

ইয়াকুব খান মোজাফফর উদ্দিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, মন খারাপ কোরো না, মোজাফফর। সৃষ্টিকর্তা যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।

জি স্যার। ঠিক বলেছেন। আমি মন খারাপ করিনি। তবে আমি যদি জানতে পারতাম আমার ব্যর্থতা কী তাহলে নিজেকে শোধরাতে পারতাম।

তোমার কোনো ব্যর্থতা নেই। তুমি ভালোই চালিয়েছ। সবই প্রেসিডেন্ট সাহেবের মর্জি। আমিও কয়দিন থাকি কিংবা থাকতে পারি কে জানে!

ঠিক আছে স্যার, এখন যাই। কাল ভোরেই চলে যাব।

ভালো থেকো। বেস্ট অব লাক।

মোজাফফর উদ্দিন চলে যান। ইয়াকুব খান পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের দিকে নজর দেন। তারপর গভীর মনোযোগে পড়তে শুরু করেন।

গভর্নর সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা জানতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেন। কী করে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে তা বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গেও গোপনে দেখা করেন। তাঁদের মনোভাব সম্পর্কে ধারণা নেন। তিনি গোপনে শেখ মুজিবের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ছয় দফার যৌক্তিকতা নিয়ে কথাবার্তা বলেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি মোটামুটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে ছয় দফা বাস্তবায়িত হলেই কেবল বিদ্যমান সংকট নিরসন হবে।

ইয়াকুব খানের এই কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরুতেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন কি না, তা নিয়ে সরকারের একটি পক্ষ প্রশ্ন তোলে। এই খবর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছেও পৌঁছে। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ইয়াকুব খানের কাছে টেলিফোন করেন। তাঁর কাছে জানতে চানকী ঘটনা, ইয়াকুব খান! আমার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে না তো!

স্যার, আপনি যে কী বলেন! আপনি আমাকে সিএমএলএ করে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। আর আপনার বিরুদ্ধেই আমি ষড়যন্ত্র করব!

নানা জনে তো নানা কথা বলে। আমি তো আর মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারব না।

তা পারবেন না। তবে আমাকে আপনার বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস না থাকলে আমাকে আপনি প্রত্যাহার করতে পারেন।

সেকি! আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? আমার বিশ্বাস তো আছেই। তার পরও সাবধান থাকা ভালো না! যা কিছুই করেন, খুব সাবধানে করবেন।

জি স্যার। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার ক্ষতি হয় এমন কিছু করব না।

গুড। ভেরি গুড।

প্রেসিডেন্ট সাহেব টেলিফোন রাখার পর ইয়াকুব খান মনে মনে ভাবেন, কারা তাঁকে এসব উল্টাপাল্টা খবর দেয়। তাকে মানসিক চাপে রাখার জন্যই কি গোয়েন্দারা এসব করে!

আট

জুলফিকার আলী ভুট্টো লারকানা থেকে করাচির বাসায় ফিরেই জানতে পারলেন, পাকিস্তানের উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল হামিদ খান এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। এ কথা শোনার পর ভুট্টো সাহেব এগিয়ে গেলেন তাঁর কাছে। তাঁকে দেখে বললেন, স্যরি হামিদ খান, আই অ্যাম ভেরি স্যরি। আপনাকে সময় দিয়ে আমিই দেরি করে ফেলেছি। অনেকক্ষণ বসে ছিলেন, তাই না? আমি লারকানায় গিয়েছিলাম। ফিরতে কিছুটা দেরি হলো। কিছু মনে করবেন না।

না না! কী বলেন! একটু-আধটু দেরি তো হতেই পারে। আমি কিছু মনে করিনি। হামিদ খান বললেন।

ভুট্টো সাহেব ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, আপনি সত্যিই খুব ভালো মানুষ।

হামিদ খান মুচকি হেসে বললেন, আপনাকেও ধন্যবাদ।

ভুট্টো সাহেব তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে নাশতা দিতে বলে কথা শুরু করলেন। আপনি ফোনে বলেছিলেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।

হামিদ খান সঙ্গে সঙ্গে বললেন, জি জি! গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্যই এসেছি। প্রেসিডেন্ট সাহেবই আপনার কাছে আমাকে পাঠিয়েছেন।

তাই! হঠাৎ কী হলো?

না, মানে, রাজনৈতিক নেতা তো এখন দুই দিকে দুজন। পূর্বে শেখ মুজিব আর পশ্চিমে আপনি। আপনি ঠিক থাকলে পূর্বের নেতাকে চাপে রাখা যায়।

আমি ঠিক থাকলে মানে! আমি এখন পর্যন্ত বেঠিক কিছু করেছি? আমারও তো রাজনীতি আছে, রাজনৈতিক দল আছে। আমার দলকে শক্তিশালী করতে হবে, তাই না? আর আপনি তো সবই জানেন। আমি আইয়ুব খানের রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিলে দেশের রাজনীতি ভিন্ন রূপ নিত। আমি সমর্থন না দিলে ইয়াহিয়া খান কি প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন! পারতেন না। কাজেই তাঁকেও আমার কথা মনে রাখতে হবে।

আপনার কথা প্রেসিডেন্ট সাহেবের মনে আছে। সে জন্যই তো আমাকে পাঠিয়েছেন। উনি বলেছেন, আপনিই মূলত দেশ চালাবেন। উনি ক্রাইসিসের সময়টাতে দায়িত্ব পালন করছেন। ক্রাইসিস কাটিয়ে উঠতে যত দিন সময় লাগে! তারপর আপনার হাতেই উনি দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন।

জেনারেল হামিদ খানের কথা শুনে ভুট্টো সাহেবের দারুণ একটা ভালো লাগা কাজ করে। তিনি খুশি হয়ে বেশ কয়েকবার জেনারেল হামিদকে ধন্যবাদ জানান। তারপর বলেন, আমাকে নিয়ে আপনাদের চিন্তা করতে হবে না। আপনারা শেখ মুজিবকে সামলান। সে ক্ষমতায় আসতে পারলে কিন্তু দেশটাকে দুই ভাগ করে ফেলবে।

আপনি শুধু ধৈর্য ধরেন। তারপর দেখেন আমরা কী করি! শেখ মুজিব যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সেই ব্যবস্থাই তো করতে যাচ্ছি।

ধন্যবাদ। খুব ভালো একটা খবর দিলেন।

বললাম তো! আপনি শুধু ধৈর্য ধরেন। দেখেন আমরা কী করি! তবে এটা ঠিক, আপনার সাপোর্ট ছাড়া আমরা সফল হতে পারব না।

আমি আছি তো! আমি আপনাদের সব ধরনের সাপোর্ট দিয়ে যাব। আমার বিষয়টাও আপনাদের ভাবতে হবে।

ভাবার কিছু নেই। আমরা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছি।

ধন্যবাদ। অনেক অনেক ধন্যবাদ।

ভুট্টো সাহেব, আমি তাহলে আসি। পরে আবার কথা হবে।

আচ্ছা, আবার আসবেন।

অবশ্যই আসব।

জেনারেল হামিদ খান ভুট্টো সাহেবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলে গেলেন। ভুট্টো সাহেব তাঁকে বিদায় দিয়ে ঘরে এসে বসলেন। তাঁর মনের মধ্যে অন্য রকম একটা আনন্দ খেলা করছে। তিনি একা একা হাসছেন। মনে মনে ভাবেন, আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হব! এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী আছে! একটু ধৈর্য ধরলে যদি বড় কিছু পাওয়া যায়, তাহলে অসুবিধা কী? কিন্তু ইয়াহিয়া খান বিট্রে করবে না তো! দূর! এখনই নেগেটিভ চিন্তা করছি কেন? নিশ্চয়ই আমার সামনে বড় সুযোগ অপেক্ষা করছে।

ভুট্টো সাহেব দম ফাটিয়ে হাসতে লাগলেন। বাড়ির কাজের লোকজন তাঁকে হাসতে দেখে বলে, লোকটা একা একা অমন করে হাসছে কেন? পাগলটাগল হয়ে গেল নাকি!

নুসরাত ভুট্টোও জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাসির শব্দ শুনতে পান। তিনি মনে মনে বলেন, কণ্ঠস্বর তো ভুট্টোর! কিন্তু ও কি এমন করে হাসে? হঠাৎ কী হয়েছে? যা-ই ঘটুক, এমন করে হাসা ভুট্টোর উচিত হয়নি। যাই, ওর কাছেই শুনি কী ঘটেছে।

নুসরাত ভুট্টো জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে এলেন। তাঁর কাছে এসে কোনো ভণিতা ছাড়াই বললেন, এমন বিদঘুটে হাসি কী কারণে হাসলে, ভুট্টো?

ও, তাই নাকি! বিদঘুটে হাসি!

আচ্ছা, কী হয়েছে বলো তো?

তেমন কিছু না।

জেনারেল সাহেব কেন এলেন?

তেমন কিছু না।

আরে! যা বলি, তাতেই বলো, তেমন কিছু না।

কথাবার্তা বলার জন্য এসেছে আর কি।

কী কথা বলল?

আমাকে ধৈর্য ধরতে বলল।

হঠাৎ ধৈর্য ধরার প্রসঙ্গ কেন?

আমি যেন ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রকম আন্দোলন-ফান্দোলন না করি। আমিই নাকি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট। তারা আমার হাতে পাকিস্তানের ভার তুলে দেওয়ার জন্যই নাকি ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।

আর সে জন্যই তুমি দম ফাটিয়ে হেসেছ?

আমি ইচ্ছা করে হাসিনি; হাসি বেরিয়ে গেছে।

হুম্। এমন কথা শুনলে কার না হাসি বের হয়? তুমি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট! তুমি প্রেসিডেন্ট হলে আমি হব ফার্স্ট লেডি। বাহ্! ভাবতে ভালোই লাগছে। ভুট্টো, আমি একটা জিনিস দেখলাম, জেনারেলদের সঙ্গে তোমার বেশ ভালোই আঁতাত!

আঁতাত কেন বলছ?

কেন বলব না? তুমি নিজেই চিন্তা করে দেখো। আইয়ুব খানের সঙ্গে তোমার কী দহরম-মহরম ছিল! উনি তোমাকে অতি অল্প বয়সে ফরেন মিনিস্টারও বানালেন। তাঁর সঙ্গে কেন জানি সম্পর্কের অবনতি হলো। তারপর তুমি তাঁর সেকেন্ডম্যান ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুললে। তাঁর সঙ্গে আঁতাত করে গোলটেবিল বৈঠক বয়কট করলে। উনি এখন তোমাকে প্রেসিডেন্ট বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। ভালোই তো!

তুমি এভাবে বলছ কেন? আমি আমার যোগ্যতার বলেই ফরেন মিনিস্টার হয়েছি। আর জেনারেলদের সঙ্গে যোগাযোগ! তাদের প্রয়োজনেই তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমি কী করব? তবে এটাও ঠিক, শুধু রাজনীতি করলেই ওপরে ওঠা যায় না। সব দিকেই একটু-আধটু যোগাযোগ রাখতে হয়!

হুম্। তা বটে!

নুসরাত ভুট্টো কথা শেষ করেই চলে গেলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁর চলে যাওয়া দেখেন। মনে মনে বলেন, নুসরাত কথাগুলো এভাবে কেন বলল? রাজনীতি কি এত সহজ জিনিস! আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলে আমি রাজনীতি করতে পারব? আমাকে মুহূর্তের মধ্যে নাই করে দেবে। নুসরাত কেন যে না বুঝে কথা বলে!

সকালে গভীর মনোযোগে পত্রিকা পড়ছেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। মাঝেমধ্যে সিগারেটে টান দিচ্ছেন। ধোঁয়া ছাড়ছেন আস্তে আস্তে। পত্রিকা পড়তে পড়তেই শেখ মুজিবের বিষয়টি তাঁর মাথায় আসে। তিনি মনে মনে ভাবেন, শেখ মুজিবের দলের যে জনপ্রিয়তা, নির্বাচন দিলেই তো তাঁর দল জিতে যাবে! নির্বাচন করব কি শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার জন্য? না না! এটা হতেই পারে না। পিপলস পার্টিকে আরো বেশি জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। সাধারণ মানুষের ইস্যু নিয়ে কথা বলতে হবে। রাজপথে নামতে হবে। রাজপথে নামার ব্যাপারে তো আবার প্রেসিডেন্ট সাহেবের ঘোর আপত্তি। আমরা কোনো দাবি নিয়ে রাস্তায় নামি তা তিনি চান না। কী যে করি!

ভুট্টো সাহেব পত্রিকা টি-টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। গভীর এক ভাবনা তাঁকে আচ্ছন্ন করে। এ সময় নুসরাত ভুট্টো দরাজ গলায় ভুট্টো সাহেবকে ডাকেন। ডাকতে ডাকতে তিনি বারান্দা পর্যন্ত আসেন। ভুট্টোকে চিন্তিত দেখে বলেনকী ব্যাপার, একেবারে চুপচাপ বসে আছ! কী নিয়ে এত ভাবছ?

কেন জানি খুব টেনশন হচ্ছে। নেতিবাচক ভাবনা মাথায় ভর করেছে।

ওসব ভাবনা বাদ দাও তো! কী নিয়ে এত ভাবো? আর নেগেটিভ ভাবনা কী?

ভাবছি, পপুলারিটির দিক দিয়ে তো শেখ মুজিব আমার চেয়ে এগিয়ে আছে। নির্বাচন দিলে সে জিতে যাবে। তাকে অজনপ্রিয় করার উপায় কী?

কোনো উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে তোমার জনপ্রিয়তা বাড়াতে হবে।

সেটা কি আদৌ সম্ভব? এখন সামরিক শাসন চলছে। এখন তো রাজনীতিই নিষিদ্ধ।

কৌশল বের করো। তুমি রাজনীতি করো। জনগণের পালস তো তোমারই বোঝার কথা।

কথাটা ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি যে খুব প্রেসারে আছি।

প্রেসারে থাকাটা কি খুব অস্বাভাবিক কিছু! রাজনীতি করতে হলে নানা রকম প্রেসার তোমাকে সহ্য করতে হবে। তোমাকে বলি, তুমি শুধু প্রেসিডেন্ট সাহেবের ভরসায় থেকো না। তাহলে কিন্তু একূল-ওকূল দুই কূলই যাবে। তোমাকে গণমুখী রাজনীতি করতে হবে।

হুম্।

তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ তো?

পারছি।

তুমি মনে কোরো না আমি তোমাকে গাইড করছি। আমি তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি। তুমি চাইলে গ্রহণ করতে পারো, না-ও পারো।

তুমি ভালো পরামর্শই তো দিয়েছ। এখন সময়টা খুব খারাপ। দেখা যাক, কী পরিস্থিতি দাঁড়ায়।

ঠিক আছে। দেখতে থাকো।

নুসরাত ভুট্টো আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়া দেখলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তাঁর কথা যে নুসরাত ভুট্টোর ভালো লাগেনি, সেটা তিনি বেশ বুঝতে পেরেছেন। তিনি যে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছেন সেটাও তিনি উপলব্ধি করছেন।

নয়

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অস্থিরভাবে নিজের অফিসকক্ষে হাঁটাহাঁটি করছেন। তাঁর কেন জানি মনে হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইয়াকুব খান ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। তাঁর নিদের্শনা ঠিকভাবে মান্য করছেন না। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, ইয়াকুব খানকে সরিয়ে ভাইস অ্যাডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তিনি জেনারেল হামিদ খান, আতিকুর রহমান, মোহাম্মদ শরিফ, টিক্কা খান ও নিয়াজীকে তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁদের মতামত নেবেন; তারপর তাঁর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন।

ইয়াহিয়া খান সিগারেট ধরিয়ে টানতে শুরু করলেন। তিন মিনিটে একটি সিগারেট শেষ করেন। এর মধ্যেই তিনি আট-দশটি সিগারেট শেষ করেছেন। তার পরও তাঁর সিগারেটের নেশা কাটেনি। তিনি আবার সিগারেট ধরান। সিগারেটের ধোঁয়া গিলে নাক দিয়ে ছাড়েন। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর তিনি পিএস সাহেবকে ডাকেন। তাঁর কাছে জানতে চান, হামিদ খান কই?

স্যার, উনি ফোন করেছিলেন। রওনা হয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছবেন।

আচ্ছা, টিক্কা খানের খবর কী?

উনিও বলেছেন, কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছবেন।

এত দেরি কেন?

স্যার, রাওয়ালপিন্ডি থেকে আসতে কিছু সময় তো লাগবেই।

এত কথা বলছ কেন তুমি। বাইরে যাও। দেখো, এলো কি না।

জি স্যার। স্যার, জানালাগুলো খুলে দিই?

কেন?

রুমের ধোঁয়া বের হয়ে যাক!

সিগারেটের ধোঁয়া নিয়ে তোমার এত চিন্তা কেন?

স্যরি স্যার।

আচ্ছা দাও. জানালাগুলো খুলে দাও। পর্দা সরাবে না কিন্তু!

জি স্যার।

পিএস সাহেব জানালাগুলো খুলে দিলেন। তারপর তিনি তাঁর রুমে গিয়ে দেখেন, হামিদ খান, টিক্কা খানসহ অন্যরা তাঁর রুমে বসে আছেন। পিএস সাহেব দৌড়ে আবার প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে ঢুকে তাঁকে জানালেন স্যার, হামিদ খান, টিক্কা খান স্যার আসছেন। তাঁদের আসতে বলব?

অবশ্যই। আবার জিজ্ঞাসা কেন করছ?

স্যরি স্যার।

আমি দেখলাম, তোমার কাণ্ডজ্ঞান কিছুটা কম। প্রেসিডেন্টের পিএস হওয়ার যোগ্যতা তোমার নেই। তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ?

জি স্যার।

যাও, তাড়াতাড়ি জেনারেল সাহেবদের ডাকো।

পিএস সাহেব আর কোনো কথা না বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। হামিদ খানকে বললেনস্যার, শিগগির স্যারের রুমে ঢোকেন। স্যারের মেজাজ কিন্তু ঠিক নাই। তাঁর মেজাজমর্জি বুঝে কথাবার্তা বলবেন। তা না হলে কিন্তু বিপদ আছে।

হামিদ খান বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, তাই নাকি! কী নিয়ে!

পিএস সাহেব বললেন, বুঝতে পারছি না, স্যার। একটার পর একটা সিগারেট টানছেন। আর বিড়বিড় করে কী যেন বলেন। কোনো কথা বোঝা যায় না।

হামিদ খান প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর সঙ্গে অন্য সেনা কর্মকর্তারাও আছেন। তাঁরা রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, কী ব্যাপার বলেন তো! আপনারা এত দেরি করলেন কেন?

হামিদ খান বললেন, স্যরি স্যার।

না না, আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়েছে। আর কখনো এত দেরি করবেন না।

জি স্যার।

আমার একটা উদ্বেগের কথা বলার জন্য আপনাদের ডেকেছি। আপনারা চিন্তাভাবনা করে মতামত দেবেন। আপনাদের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেব।

হামিদ খানসহ অন্য কর্মকর্তারা ইতিবাচক মাথা নাড়লেন।

প্রেসিডেন্ট সাহেব আবার বললেন, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ইয়াকুব খান ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না।

হামিদ খান বললেন, স্যার কি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েছেন?

না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। তবে আমার মনে হচ্ছে, তাঁকে দিয়ে হচ্ছে না।

টিক্কা খান বললেনস্যার, আপনি কি নিজে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন?

প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, বলেছি।

আতিকুর রহমান বললেন, আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে কি কোনো তথ্য আছে, স্যার?

প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, নিশ্চয়ই আছে।

হামিদ খান বললেন, আপনি কি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, স্যার?

আপনারা বলেন কী করা উচিত? প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন।

মোহাম্মদ শরিফ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কিছুটা সময় নেওয়ার কথা বললে প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। একটা ক্রিটিক্যাল পরিস্থিতির মধ্যে সময়ক্ষেপণ করা কি ঠিক?

হামিদ খান সঙ্গে সঙ্গে বললেননা স্যার, মোটেই ঠিক না। গভর্নর হিসেবে আপনি কাকে নিয়োগ করবেন ঠিক করেন।

মোহাম্মদ শরিফ বললেন, ইয়াকুব খানকে কোথায় দেবেন, স্যার?

প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের হেড অব সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন করব।

হামিদ খান বললেন, আপনার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে, স্যার। তাহলে গভর্নর হিসেবে কাকে দিচ্ছেন?

ভাইস অ্যাডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসানকে।

মোহাম্মদ শরিফ বললেন, খুব ভালো সিদ্ধান্ত, স্যার।

প্রেসিডেন্ট সাহেব হামিদ খানকে উদ্দেশ করে বললেনখান সাহেব, আজই অর্ডার জারি করেন।

জি স্যার।

হামিদ খান দাঁড়িয়ে বললেন, আমি তাহলে আসি!

আতিকুর রহমান বললেন, আমরাও আসি, স্যার।

প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, ঠিক আছে, আসুন। খান সাহেব, অফিস অর্ডার জারি করে আমাকে জানান।

জি স্যার। আমি এখনই করছি।

প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুম থেকে বের হয়ে সবাই এক জায়গায় গোল হয়ে দাঁড়ালেন। আতিকুর রহমান সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, আমার একটা কথা আছে।

হামিদ খান বললেন, কী কথা?

স্যার এত অস্থিরতায় ভুগছেন কেন? এত ঘন ঘন গভর্নর বদল করলে পূর্ব পাকিস্তানিরা কী ভাববে? আতিকুর রহমান বললেন।

হামিদ খান বললেন, কী আর বলব বলেন! আমাদের কিছু করার আছে? যান, অফিসে যান। কাজ করেন।

সবাই যে যাঁর মতো অফিসে চলে গেলেন।

গভর্নর হাউসের দরবার হল ধোয়ামোছা করা হচ্ছে। নতুন সাজে সাজানো হচ্ছে। অনেক দিন পর এখানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে কিছুই বলা হচ্ছে না। দরবার হলে আসা অতিথিরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করেন। একজন আরেকজনের কাছে অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানতে চান। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেন না।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষের প্রশ্নের উত্তর মিলল। চিফ সেক্রেটারি শফিউল আজম ডায়াসে মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁকে দেখে মুহূর্তের মধ্যে সব আলোচনা বন্ধ হয়ে গেল। দরবার হলে পিনপতন নীরবতা। ঘোষক বললেন, সম্মানিত অতিথিবর্গ, স্লামুআলাইকুম। শুভ সন্ধ্যা। এখন আমি আপনাদের একটা সুখবর দেব। আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন যে ভাইস অ্যাডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান পূর্ব পাকিস্তানে নতুন গভর্নর নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব খানের স্থলাভিষিক্ত হবেন। আর ইয়াকুব খান চিফ অব সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জনাব মোহাম্মদ আহসান কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন। তাঁকে শপথ পড়াবেন বিচারপতি সালাহউদ্দিন।

এই ঘোষণার পর তুমুল করতালি হলো ঠিকই, আবার কানাঘুষাও শুরু হলো। অতিথিদের কেউ কেউ পরস্পরের কাছে জানতে চান, হঠাৎ কী হলো? ইয়াকুব খানকে কেন সরানো হলো? উনি তো ভালোই কাজ করছিলেন! সরকারের মতিগতি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকারের বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে নাকি!

শফিউল আজম আবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, সুধীমণ্ডলী, আমাদের নবনিযুক্ত গভর্নর সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান ইতিমধ্যে দরবার হলে এসে উপস্থিত হয়েছেন। বিচারপতি মহোদয়ও আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন। এখনই আমাদের শপথ অনুষ্ঠান শুরু হবে।

বিচারপতি সালাহউদ্দিন এবং সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান প্রায় একই সঙ্গে মঞ্চে এলেন। নবনিযুক্ত গভর্নরকে দেখে অতিথিরা তুমুল করতালি দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। তারপর শুরু হলো শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান।

দশ

শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন যাবেন। যাওয়ার আগে তিনি কয়েকজন নেতাকে তাঁর বাসায় ডেকেছেন। তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করবেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোশতাক আহমদ, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান যথাসময়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হাজির হয়েছেন। সবাই পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরুর একপর্যায়ে তাঁদের সামনে এসে দাঁড়ালেন শেখ মুজিব। শুরুতেই তিনি তাজউদ্দীন আহমদকে উদ্দেশ করে বললেন, কী পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছিলা তোমরা?

তাজউদ্দীন বললেন, সব জেলা ও উপজেলা কমিটির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। সামরিক শাসনের কারণে তারা মিছিল-মিটিং কিংবা রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি পালন না করলেও আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময় করছে। আমি মনে করি, আমাদের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা আছে।

শেখ মুজিব বললেন, এর মধ্যেই আমাদেরকে ইয়াহিয়া সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করতে হবে। একেবারে চুপচাপ বসে থাকলে সরকার নির্বাচন নিয়ে বাহানা করতে পারে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে বললেনজি মুজিব ভাই, ঠিক বলেছেন। সরকারের হাবভাব দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে। চাপ তৈরি করতে না পারলে আইয়ুবের পথে হাঁটতে পারেন ইয়াহিয়া। আইয়ুব খানই তো ইয়াহিয়াকে তৈরি করেছেন!

তাজউদ্দীন বললেনমুজিব ভাই, ক্যাম্পেইন তো শুরু হয়েই গেছে। নতুন করে আর কী শুরু করব?

তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। আমি খুলনা, যশোরে গিয়ে তো সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই বক্তৃতা দিয়েছি। পরে এক সেনা কর্মকর্তা আমার সঙ্গে দেখা করে বললস্যার, আমার চাকরি থাকবে না। আপনি স্যার যা বলেন, ঢাকায় গিয়ে বলেন। আমি তাকে বলেছি, আমি আমার কাজ করছি; আপনি আপনার কাজ করেন! আপনাকে কি আমি বাধা দিচ্ছি?

তাজউদ্দীন বললেন, একদম ঠিক বলেছেন, মুজিব ভাই।

তাজউদ্দীন আরো কিছু বলতে চাইছিলেন। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শেখ মুজিব আবার বললেন, সরকারের ওপর কঠিন চাপ প্রয়োগ করতে হবে। ইয়াহিয়াকে কিছুতেই সুযোগ দেওয়া যাবে না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত চাপে রাখতে পারলেই আমরা উইন করব। কী বলো, মোশতাক?

মোশতাক আহমদ বললেন, আমি একমত। তবে সমস্যা হচ্ছে, সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ অতিমাত্রায় তত্পর। তারা সারাক্ষণ আমাদের কর্মকাণ্ড মনিটর করছে। কখন কোথায় যাচ্ছি, কী করছি তা কেন্দ্রীয় সরকারকে পাঠাচ্ছে।

তা তো পাঠাবেই। চুপচাপ বসে থাকার জন্য তো আর ওদের পাঠায়নি। আমাদের কৌশলে কাজ করতে হবে। ওদের বুঝতে দেওয়া যাবে না।

মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে উদ্দেশ করে শেখ মুজিব বললেন, তোমরা কিছু বলবে না?

মনসুর আলী বললেন, আমাদেরও একই কথা। সরকারকে চাপে রাখতে না পারলে নির্বাচন দ্রুত দেবে না। নির্বাচন না হলে আমাদের দাবি আদায় করাও মুশকিল হবে।

কামারুজ্জামান এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বললেন, সরকারের মনোভাব ভালো নয়। ইয়াহিয়া নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে আইয়ুবের নীতি অবলম্বন করতে পারেন। একপর্যায়ে তারা আমাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের পথ বেছে নেবে। এটা যাতে করতে না পারে সে জন্য আমাদের এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে।

মনসুর আলী, কামারুজ্জামানের কথা শুনে শেখ মুজিব সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, তোমরা সবাই যে সরকারের মনোভাব ফিল করতে পারছ, এটা আমার ভালো লাগছে। সত্যি ভালো লাগছে। তোমাদের সবার মতামত শুনে বুঝলাম যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি না করলে কিছুই আমরা আদায় করতে পারব না। আমাদের নির্বাচনের দাবি থেকে যদি আমরা সরে যাই তাহলে আবার পিছিয়ে পড়ব। নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা নেমে আসবে। কী বলো, তাজউদ্দীন?

জি, মুজিব ভাই। আমাদের সজাগ থাকতে হবে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে অবিলম্বে আমাদেরকে জেলা সফরে বেরিয়ে পড়তে হবে।

শেখ মুজিব বললেন, তাহলে তা-ই করো। আমি লন্ডন থেকে ঘুরে আসি। তোমরা এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলায় সফরে যাও। আমি ফেরার পর আবার আমরা বৈঠকে বসব। এর মধ্যে যদি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে তাহলে ভালো। না করলে আমরা আরো বৃহত্তর পরিসরে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করব।

সবাই সমস্বরে বললেন, জি জি।

এ সময় ফজিলাতুন্নেছা রেণু এসে শেখ মুজিবকে বললেন, তোমার টেলিফোন। তাড়াতাড়ি এসো। ওয়াজেদ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।

শেখ মুজিব ফোন ধরার জন্য এগিয়ে যান। যেতে যেতে তিনি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেন, ওয়াজেদ হঠাৎ কেন ফোন দিল!

তুমি লন্ডন যাচ্ছ সে খবর পেয়েই হয়তো ফোন করেছে। ফজিলাতুন্নেছা বললেন।

শেখ মুজিব ফোনের রিসিভার কানে তুলেই বললেন, হ্যালো ওয়াজেদ! কী খবর বলো?

টেলিফোনের অপর প্রান্তে ওয়াজেদের কণ্ঠস্বরআব্বা, আপনি নাকি লন্ডন যাচ্ছেন?

হ্যাঁ বাবা। ২৬ অক্টোবর (১৯৬৯) আমাকে লন্ডনে পৌঁছতে হবে। তার আগে আমি ইতালিতে তোমাদের কাছে কয়েকটা দিন থাকতে চাই। আমার হাসু মা কেমন আছে?

জি আব্বা, ভালো আছে। আপনি ইতালিতে আসবেন, এটা তো আমাদের জন্য বিরাট সুখবর।

ধন্যবাদ। তবে এখনো চূড়ান্ত করি নাই। ইচ্ছা আছে।

ইচ্ছা যখন করেছেন তখন চলে আসেন, আব্বা।

ঠিক আছে। চেষ্টা করব। ভালো থাকো তাহলে! আমি এখন রাখি? হাসু মাকে বোলো।

জি আব্বা, বলব।

শেখ মুজিব টেলিফোন রেখে আবার সামনের রুমে গেলেন। তাঁকে দেখে তাজউদ্দীন বললেনমুজিব ভাই, আমরা তাহলে আসি। আপনি লন্ডন যাওয়ার আগে আবার না হয় আসব।

এখনই যাবে?

হ্যাঁ, যাই।

আচ্ছা, তাহলে আমি লন্ডন যাওয়ার আগে একবার এসো। আর নতুন কোনো খোঁজখবর থাকলে আমাকে জানাইয়ো।

জি, জানাব।

তাজউদ্দীনসহ অন্য নেতারা সবাই বের হয়ে যাঁর যাঁর বাসার উদ্দেশে রওনা হন।

ইতালিতে শেখ মুজিবের অবকাশযাপনের জন্য ওয়াজেদ মিয়া তাঁর বাসার কাছাকাছি একটি কটেজ ভাড়া নিয়েছেন। কিন্তু এর দুই দিন পরই টেলিগ্রামের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, শেখ মুজিব ইতালি সফর বাতিল করেছেন। তিনি ২৬ অক্টোবর লন্ডনে পৌঁছবেন। এ খবর জানার পর ওয়াজেদ মিয়া হাসিনাকে নিয়ে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের লন্ডনে যাওয়ার বিষয়ে তিনি তাঁর লন্ডনপ্রবাসী বন্ধু আবুল হাসনাতকে অবহিত করেন। আবুল হাসনাত তাঁর বাসার কাছে ছোট্ট একটি হোটেলে ওয়াজেদ মিয়া ও হাসিনার থাকার ব্যবস্থা করেন।

১৮ অক্টোবর হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াজেদ মিয়া লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে তাঁরা হোটেলে অবস্থান করেন এবং লন্ডনে অবস্থানরত ওয়াজেদ মিয়ার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন। ২৫ তারিখ তাঁরা নিশ্চিত হন, শেখ মুজিব ২৬ তারিখেই লন্ডনে পৌঁছবেন। ওই দিন সকালে ওয়াজেদ মিয়া ও হাসিনাকে হিথরো বিমানবন্দরে নিয়ে যান আবুল হাসনাত ও সুলতান শরীফ। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখেন বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে কয়েক শ বাঙালি উপস্থিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন গউস খান, মহিবুর রহমান, তোসাদ্দক আহমেদ, মিনহাজ উদ্দিন, বি এইচ তালুকদার, তৈয়বুর রহমান, জাকারিয়া চৌধুরী, ন্যাপ (ভাসানী) নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ছেলে শফিকুল গণি স্বপন, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ছেলে আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার প্রমুখ।

শেখ মুজিব যথাসময়ে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছেন। ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। আর লন্ডনপ্রবাসী ছাত্র এবং সেখানে কর্মরত বাঙালিরা তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করে। অভ্যর্থনা শেষে শেখ মুজিব ও তাঁর মেয়ে-মেয়েজামাইকে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের মাউন্ট রয়েল হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

লন্ডনে বেশ কর্মব্যস্ত সময় কাটান শেখ মুজিব। ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও তিনি বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। লন্ডনে এক বিশাল সিনেমা হলে শেখ মুজিবকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। ম্যানচেস্টার, লিভারপুলসহ কয়েকটি শহরেও তাঁর সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এসব সংবর্ধনায় শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তখন সেখানে উপস্থিত প্রবাসী বাঙালিদের অনেকেই শেখ মুজিবের আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানায়। এতে শেখ মুজিব সন্তুষ্ট হন।

লন্ডনে বসেই শেখ মুজিব খবর পান, নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিল, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন শহরে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে। এতে নাকি সামরিক সরকারের হাত রয়েছে। এ ঘটনায় শেখ মুজিব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি বার্মিংহাম সফর বাতিল করে ঢাকায় ফিরে আসেন।

ঢাকায় এসেই শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে ইয়াহিয়া সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনাদের পুরনো খেলার সঙ্গে আমরা পরিচিত। এই খেলা খেলবেন না। এর পরিণতি ভালো হবে না। বাঙালি জাতির দাবি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নস্যাৎ করতে পারবেন না। আমরা জানি, শাসকগোষ্ঠী কী চায়। আইয়ুব খান এমন খেলা খেলতে গিয়ে বিদায় নিয়েছেন। সুতরাং টালবাহানা না করে সাধারণ নির্বাচন দিয়ে দিন। আমরা নির্বাচন, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে চিরকাল অপেক্ষা করতেই থাকব, তা ভাবা উচিত নয়।

এগারো

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পত্রিকা হাতে নিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ভালো করে পত্রিকার নাম দেখলেন। ডন পত্রিকার নাম দেখে তিনি মনে মনে বললেন, এই পত্রিকায় শেখ মুজিবের বিবৃতি এত বড় করে ছাপা হলো। আমার বক্তব্যও তো প্রথম পাতায় ছাপা হয় না। শেখ মুজিবের বক্তব্য কেন প্রথম পাতায়! আমাকে হুমকি দিয়েছে বলে! নাকি ডন পত্রিকা মুজিবকে উসকানি দিচ্ছে! নিশ্চয়ই দিচ্ছে, তা না হলে এত বড় কাভারেজ দেওয়ার কারণ কী?

ইয়াহিয়া খান বিবৃতিটি ভালো করে পড়লেন। তারপর জেনারেল হামিদ খান, টিক্কা খান ও মোহাম্মদ শরিফকে ডেকে পাঠালেন। এখন তিনি সত্যি সত্যিই টেনশনে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কী করা যায় তা নিয়ে ভাবছেন। তিনি মনে মনে বলেন, শেখ মুজিবকে কে পেছন থেকে শক্তি জোগাচ্ছে? ইন্দিরা গান্ধী ইন্ধন জোগাচ্ছে না তো! পেছনে শক্তি না থাকলে আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বিবৃতি দেওয়ার কথা না। তাঁকে কোনো টোপ দেব নাকি! যদি গেলে! গিলতেও তো পারে। ভুট্টোর মতো তাকেও লোভ দেখাই। অবশ্য ইন্দিরা গান্ধী পেছনে থাকলে মুজিব কোনো ধরনের টোপও গিলবে না। তাহলে করণীয় কী?

হঠাৎ স্যালুটের শব্দে ইয়াহিয়া খানের ঘোর কাটে। তিনি তাকিয়ে দেখেন, হামিদ খান ও টিক্কা খান তাঁর সামনে। তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললেন, ও আপনারা! আপনাদের জন্যই তো অপেক্ষা করছি। আসেন আসেন! কী খবর বলেন তো! পূর্ব পাকিস্তান ঠিক আছে তো!

সবাই চেয়ারে বসলেন। এদিক-সেদিক তাকিয়ে হামিদ খান শুরু করলেনজি স্যার, ঠিক আছে। আহসান সাহেব যোগ দিয়েছেন।

ইয়াকুব সাহেবের খবর কী? তিনি কি খুব মন খারাপ করেছেন?

হয়তো কিছুটা মন খারাপ হয়েছে। তবে কোনো সমস্যা নেই। তিনি ঠিক আছেন।

ইয়াহিয়া খান ডন পত্রিকা হামিদ খানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা দেখেছেন?

হামিদ খান পত্রিকাটি হাতে নিয়ে বললেনজি স্যার, দেখেছি।

ইয়াহিয়া খান বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জানতে চাইলেন, এটা কী করে সম্ভব!

বুঝতে পারছি না, স্যার। ভেতরে ভেতরে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না কে জানে।

কিন্তু শেখ মুজিবের বিবৃতি ডন এত বড় করে কেন ছাপল? ডনের স্বার্থটা কী?

টিক্কা খান বললেনস্যার, আমার মনে হয় ডন উসকানি দিচ্ছে।

ইয়াহিয়া খান বলেন, আমি আপনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছি না। শেখ মুজিবের পেছনে বাইরের শক্তি থাকা অস্বাভাবিক নয়। শুধু জনগণের শক্তির বলে সে এমন হুমকি দিতে পারে বলে মনে করি না।

টিক্কা খান প্রেসিডেন্ট সাহেবের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বললেন, একদম ঠিক বলেছেন, স্যার।

হামিদ খান, এই পরিস্থিতিতে কী করণীয় বলেন তো? প্রেসিডেন্ট সাহেব জানতে চাইলেন।

শেখ মুজিবকে কোনোভাবে ম্যানেজ করা যায় না!

চেষ্টা করেন না! তার কাছে বিশেষ কাউকে যদি পাঠাতে হয়, পাঠান। তাকে ধৈর্য ধরতে বলেন। তাহলে তাকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অফার পেলে নিশ্চয়ই রাজি হবে।

ঠিক আছে, স্যার। আপনি কাকে পাঠাবেন ঠিক করেন।

ইয়াহিয়া খান গভর্নর সাহেবের নাম প্রস্তাব করে বললেন, আহসান সাহেবকে বলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। তবে প্রকাশ্যে দেখা করা যাবে না। গোপনে যাবেন। কেউ যেন জানতে না পারে।

হামিদ খান বললেন, আপনি নিজেই স্যার আহসান সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। আমার বলার চেয়ে আপনার বলা বেশি কার্যকর হবে, স্যার।

এই হলো আপনাদের সমস্যা। আপনারা কোনো কিছুর দায়িত্ব নিতে চান না। আপনি আমার কথা বলবেন! অসুবিধা কী?

আপনি বললে আমি অবশ্যই বলতে পারব, স্যার।

আমিই তো বলছি। আপনি তার সঙ্গে কথা বলেন। যত দ্রুত দেখা করতে পারে ততই মঙ্গল।

টিক্কা খান কিছু বলার জন্য প্রেসিডেন্ট সাহেবের অনুমতি চাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সাহেব অনুমতি দিলেন। তারপর টিক্কা খান বললেনস্যার, আপনার অফারকে শেখ মুজিব যদি দুর্বলতা ভাবে।

মোহাম্মদ শরিফ বললেন, সেটা ভাবতেই পারে।

ভাবলে ভাববে! তাই বলে আমরা দুর্বল হয়ে যাব নাকি!

মোহাম্মদ শরিফ আবার বললেনস্যার, আমার মনে হয় আরেকটু ভেবেচিন্তে আগান।

ইয়াহিয়া বললেন, আমার ভাবনা-চিন্তা শেষ। আমি না ভেবেই কি আপনাদের ডেকেছি! শোনেন, কৌশল করেই আগাতে হবে। শেখ মুজিব টোপ গিলবে কি না সেটা তো আমরা জানি না। তার মনোভাব বোঝার জন্য হলেও টোপ ফেলা দরকার।

মোহাম্মদ শরিফ এবার আর কথা বাড়ালেন না। তিনি বললেন, জি স্যার। আপনি যা ভালো মনে করেন।

টিক্কা খান, আপনার কী মত? ইয়াহিয়া খান জানতে চাইলেন।

টিক্কা খান আমতা আমতা করে বললেনস্যার, আমার শঙ্কার কথা তো বলেছিই। আপনি চিন্তা করে দেখেন, স্যার। তবে নির্বাচনে গেলে শেখ মুজিবের দল বিজয়ী হবে বলে আমার ধারণা। তাঁকে ঠেকিয়ে রাখা মুশকিল হবে।

টিক্কা খানের কথায় তিনি সায় দিয়ে বললেন, আমারও তা-ই মনে হয়। তার পরও চেষ্টা করতে দোষ কী?

জি স্যার। অবশ্যই আমরা চেষ্টা করব, স্যার।

ইয়াহিয়া খান হামিদ খানের দিকে তাকালেন। তাতেই হামিদ খান বুঝতে পারলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁর মতামত জানতে চান। তিনি সামনের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, জি স্যার। আমরা চেষ্টা করি, স্যার। তবে আমাদের গোয়েন্দাদের ব্যাপারেও একটু ভাবা দরকার। তারা শেখ মুজিবের ক্ষমতার উৎস কী তা খুঁজে বের করতে পারে না!

আমি সেটাও খুঁজে বের করতে বলেছি। তবে আমার মনে হয়, তার শক্তির উৎস ভারত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীই পেছন থেকে শক্তি জোগাচ্ছে। ইয়াহিয়া বললেন।

হামিদ খান সহমত পোষণ করে বললেন, আপনার ধারণা সত্য হতে পারে, স্যার।

চোখ-কান খোলা রাখেন। গোয়েন্দাদের আরো সক্রিয় করেন। আপনারা বুঝতে পারছেন তো বিষয়টা?

হামিদ খান বললেনজি স্যার, বুঝতে পারছি।

আপনারা তাহলে এখন যান। আমাকে টাইম টু টাইম জানাবেন।

জি স্যার।

হামিদ খান ও টিক্কা খান স্যালুট দিয়ে প্রেসিডেন্ট সাহেবের দপ্তর থেকে বের হলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দপ্তরে ঢুকলেন নূরজাহান। তাঁকে দেখে প্রেসিডেন্ট সাহেবের আবেগ একেবারে উথলে ওঠে। তিনি বলেন, আইয়ে আইয়ে, মাই ডার্লিং! আমি মনে মনে তোমাকেই খুঁজছিলাম।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আহসান সাহেবকে ফোনে পাচ্ছেন না। তাঁর ফোনটা এনগেজড। প্রেসিডেন্ট সাহেব মনে মনে ভাবেন, এত সময় একটা ফোন এনগেজড! ঘটনা কী! কার সঙ্গে এত সময় ধরে কথা বলছে সে!

প্রেসিডেন্ট সাহেব সিগারেট ধরিয়ে বিরামহীনভাবে টানছেন আর নাকে-মুখে ধোঁয়া ছাড়ছেন। মেজাজ নিয়ন্ত্রণের এটা একটা কৌশল তাঁর। কিন্তু আজ তাঁর মেজাজ তুঙ্গে উঠে আছে। কিছুতেই নামছে না। দরকারের সময় কাউকে পাওয়া না গেলে তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। কখনো কখনো তাঁর মেজাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

প্রেসিডেন্ট সাহেব আবার ফোন করেন। এবার আহসান সাহেবকে পেয়েই তিনি বললেনকী ব্যাপার, আহসান সাহেব, নতুন প্রেমে পড়েছেন নাকি!

আহসান সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, জি স্যার!

এত সময় আপনার ফোন এনগেজড কেন?

স্যরি স্যার। জেনারেল ইয়াকুব সাহেবের সঙ্গে জরুরি কিছু কথা বলছিলাম।

আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে অফিসের কাজেই ব্যস্ত ছিলেন।

জি স্যার।

আপনাকে এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজটা করবেন। বুঝতে পারছেন?

জি স্যার।

আপনি দু-এক দিনের মধ্যেই শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করবেন।

জি স্যার।

দেখা করে তাকে ধৈর্য ধরতে বলবেন। আমরা বেশিদিন ক্ষমতায় থাকব না। যখন নির্বাচন দেব বলে ঘোষণা দিয়েছি, নির্বাচন অবশ্যই দেব। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে শেখ মুজিবের হাতেই আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর করব।

স্যার, আপনার রেফারেন্সে কথা বলব তো!

অবশ্যই। আপনি নিজে দায়িত্ব নেবেন কেন? আমার কথা বলবেন।

জি স্যার। ধন্যবাদ স্যার।

তাহলে যত দ্রুত সম্ভব দেখা করেন। শেখ মুজিব কী মতামত দেয় তা আমাকে জানাবেন।

জি স্যার।

ইয়াহিয়া খান ফোন রাখার পর আহসান সাহেবও রিসিভারটা ফোনের ওপর রাখলেন। কিছুক্ষণ বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন। তারপর আবার ফোনের রিসিভার কানে তুলে শেখ মুজিবের বাসার নম্বরে ডায়াল করলেন। কয়েকবার রিং বাজার পর শেখ মুজিব নিজেই ফোন ধরলেন। শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বর চিনতে পারলেন আহসান সাহেব। তিনি শুরুতেই বললেনহ্যালো, শেখ সাহেব বলছেন?

জি বলছি। কে বলছেন?

শেখ সাহেব, আমি গভর্নর আহসান।

ও আহসান সাহেব! কেমন আছেন?

জি, ভালো আছি। একটা বিশেষ দরকারে ফোন দিয়েছি।

জি জি, বলেন।

আপনার সঙ্গে একটা বিশেষ জরুরি আলাপ আছে। সাক্ষাতে বলতে হবে। কবে সাক্ষাৎ করতে পারি?

আপনি বলেন কবে কোথায় সাক্ষাৎ হতে পারে।

কাল বিকেলে ফ্রি থাকবেন?

শেখ মুজিব কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। কোথায় আসব বলেন।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। বিকেল পাঁচটায়।

ঠিক আছে। আমি যথাসময়ে চলে আসব। তাহলে রাখি?

জি জি।

আহসান সাহেব ফোনের রিসিভার কানে রেখেই এবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফোন দিয়ে জিএম সাহেবকে ধরলেন। তাঁকে বললেন, ব্যাপারটা গোপন। আশা করি গোপনই রাখবেন। কাল বিকেল পাঁচটায় আমি একটা বিশেষ বৈঠক করব আপনাদের এক নম্বর স্যুটে।

জি স্যার, জি স্যার! আমি ব্যবস্থা করছি, স্যার।

আহসান সাহেব ফোনের রিসিভার রেখে স্থির হয়ে বসলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বললেন, সব কিছুই তো ঠিকঠাকমতো হচ্ছে দেখি। শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকও কি ফলপ্রসূ হবে!

না। কোনো প্রলোভনই শেখ মুজিবকে তাঁর অবস্থান থেকে টলাতে পারেনি। এতে তাঁর প্রতি মানুষের আস্থা আরো বেড়ে যায়। ছয় দফার পক্ষে আপামর মানুষকে তিনি জাগিয়ে তোলেন। একপর্যায়ে ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশের মানুষ অগ্নিমূর্তি ধারণ করে।

ঈদ সংখ্যা ২০১৮- এর আরো খবর