English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

প্রবন্ধ

সন্ত কবির জার্নাল

আহমাদ মোস্তফা কামাল

  • ১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০

অঙ্কন : মানব

কোনো কোনো সময় নতুন কোনো বই পড়তে ইচ্ছা করে না। হয়তো নতুন এক জগৎ ওই বইয়ের ভেতরে অপেক্ষা করে আছে; নতুন কোনো উপলব্ধি, ইঙ্গিত বা ইশারার সঙ্গে হয়তো দেখা হয়ে যাবে ওই বইটি পড়লে, তবু ইচ্ছা করে না। নতুন বইয়ের গন্ধে লোভ সামলাতে না পেরে ভেতরে ঢুকে প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও তো কম নয়! হয়তো খুব নামিদামি স্বাস্থ্যবান কোনো বই পড়তে পড়তে শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে মনে হয়েছে, যতটা সময় ব্যয় করলাম তা অপচয়ই হয়ে গেল। আবার কোনো কোনো বই পড়তেই পারিনি, মানে পাঠযোগ্যই মনে হয়নি। এ রকম অর্ধপঠিত বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। তাই নানা কারণে মন যখন বিমূঢ় হয়ে থাকে, কিংবা বিষণ্ন; কিংবা অস্থিরতায় ভুগি, হতবাক হয়ে থাকি কোনো কারণে, তখন নতুন কোনো বই হাতে তুলে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। তখন ভালো লাগে পুরনো কোনো প্রিয় বই পড়তে। একজন পাঠক যখন তার পঠিত একটি বই আবার তুলে নেয় হাতে, পড়ার জন্য, বুঝে নিতে হয়ওই বইয়ের ভেতরে এমন কিছু আছে যা তাকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। ওই ধরনের বই পড়লে হৃদয় এক অনির্বচনীয় অনুভূতিতে ভরে ওঠে, কোমল আর মায়াময় হয়ে ওঠে মন, মানুষকে ভালোবাসতে ইচ্ছা করে, জীবন ও পৃথিবীর দিকে নতুন চোখে তাকাতে ইচ্ছা করে, জগেক আরো বেশি বাসযোগ্য মনে হয়। এ এক অপ্রকাশযোগ্য অনুভূতি। একে শুধু আধ্যাত্মিক অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করা চলে। কিন্তু মুশকিল হলো এই বইগুলো এরই মধ্যে কয়েকবার পড়া হয়ে গেছে আমার। নানা সময়ে ফিরে ফিরে গেছি তাদের কাছে, ফলে এতটাই পরিচিত তারা যে কোন পৃষ্ঠায় কী আছে তা-ও যেন চোখের সামনে ভাসে। আমার সংগ্রহে যে বইগুলো আছে তার মধ্যে ও-রকম প্রিয় বইয়ের সংখ্যা কম নয়। যখন ঘুরে ঘুরে ওগুলো দেখতে থাকি, ভাবি, হাতে তুলে নেব কি না, তখন যেন দেখতে পাই কোথাও কোথাও উজ্জ্বল সব পঙক্তি আবেদনময়ীর ভঙ্গিতে শুয়ে আছে বইটির অমুক পাতায়, কোথাও হয়তো বিষণ্ন কোনো পঙক্তি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে ওইখানে, কোথাও বা রাগী কোনো পঙক্তি চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। পঙক্তিগুলো যেন রক্তমাংসের মানুষ একেকটা, অনুভূতিময়, প্রকাশোন্মুখ। হ্যাঁ, এভাবেই বই পড়ি আমি। এতটা গভীর ভালোবেসে। বই আমার প্রিয়তম শেষ আশ্রয়, জগৎ যখন শূন্য হয়ে যায় তখনো তার বুক থাকে পূর্ণ।

ছোটবেলা থেকে বাছবিচারহীনভাবে বই পড়েছি অনেক বছর এবং অনুভব করছি, এভাবে পড়ার একটা সুবিধা পাচ্ছি এই মধ্যবয়সে এসে। পড়তে পড়তে একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হয়ে যায় নিজের অজান্তেই, এরপর যেকোনো লেখা আর পড়ার দায় থাকে না, অনেক বই-ই দু-চার পাতা পড়ে রেখে দিতে হয়। অবশ্য এটা ভালো না খারাপ তা বলা মুশকিল, কিন্তু এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হওয়ার জন্য যে পরিমাণ পড়তে হয় তাতে ওই রেখে দেওয়ার অধিকার জন্মে যায় একজন পাঠকের এবং আরেকটি ব্যাপারও ঘটে, এই যে স্ট্যান্ডার্ড, সেখানে দু-একজন লেখক দাঁড়িয়ে যান, যাঁদের নির্দ্বিধায় পড়া যায়, বারবার ফিরে পড়া যায়। এই লেখকদের প্রায় সবাই প্রিয় লেখকে পরিণত হন। তার মানে এই নয় যে এঁদের বাইরে আর কোনো প্রিয় লেখক নেই বা থাকেন না, কিন্তু ওই ফিরে ফিরে পড়ার ব্যাপারটা সবার ক্ষেত্রে ঘটে না।

কিন্তু কেনই বা পুরনো বই ফিরে ফিরে পড়ি? হয়তো হাজারটা কারণ বলা যায় এ প্রশ্নের উত্তরে, কিংবা কিছু না-ও বলা যেতে পারে; পড়তে ভালো লাগে, পড়তে ইচ্ছা করে, এই কি যথেষ্ট নয়? যেমন এই মুহূর্তে আমাকে এক অপূর্ব সঙ্গ দিচ্ছে শঙ্খ ঘোষের জার্নাল বইটি। নতুন পড়া কোনো বই নয়, এর আগে একাধিকবার পড়েছি। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কোনো গদ্যের বই যে এতবার পড়া যায়, পড়তে ইচ্ছা করে, সেটি আমার জানাই ছিল না। বারবার পড়া যায় কবিতার বই, আমরা সবাই তাই করি, কিন্তু কোনো কোনো গদ্যের বইও যে কবিতার মতো হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠতে পারে, জার্নাল না পড়লে আমার তা জানাই হতো না। অবশ্য শঙ্খ ঘোষের গদ্যসংগ্রহের যে আটটি খণ্ড আছে, তার প্রতিটিই ঘুরেফিরে পড়েছি, এখনো পড়ি, পড়তে ভালো লাগে বলেই, তবু জার্নাল যেন এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে আমার মনে। অথচ এই লেখাগুলো নিয়ে বই হওয়ারই কথা ছিল না। ভূমিকায় জানাচ্ছেন তিনি, ১৯৭৮ সালে এক বছরের শান্তিনিকেতন-বাসের সময় প্রতি রাতেই কিছু না কিছু লিখে রাখতেন। একান্ত ব্যক্তিগত আর নিভৃত লেখাগুলো প্রকাশের কথা ভাবেননি বলেই যখন যেমন খুশি লিখতেন। বছরখানেক পরে, একটি লিটল ম্যাগাজিনে প্রতিশ্রুত লেখাটি কিছুতেই লিখে উঠতে পারছিলেন না যখন, তখন নিরুপায় হয়ে সেই দৈনন্দিন জার্নাল থেকেই দুটো অংশের অনুলিপি করে দিলেন, নিতান্তই অসংগত জেনেও। তার পর থেকে তাঁর কাছে এ রকম জার্নাল লেখার দাবি আসতে লাগল দেশের নানা প্রান্ত থেকে। আর সেই লেখাগুলো নিয়েই তৈরি হলো অপূর্ব এই বইটি। জানাচ্ছেন তিনি

প্রবন্ধের বদলে জার্নালে এই আকস্মিক আগ্রহ কি এই জন্যে যে ভারী প্রবন্ধ পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন অনেকে? কারণ যা-ই হোক, মুদ্রণের জন্য যা লেখা হয়নি তার নির্বাচিত অনেকটা অংশই মুদ্রিত হয়ে গেল এইভাবে, অক্ষমতার ফল হিসেবে।

ছিন্ন ছিন্ন মুহূর্তের এইসব ভাবনা আর অনুভব নিশ্চয় তুচ্ছ লাগবে পাঠকের কাছে, ঘনতা আর ধারাবাহিকতার অভাবে পড়বার আগ্রহও হবে না অনেকের। ছোটো হালকা অলস অসংলগ্ন গদ্য যাঁরা একেবারেই পড়তে পারেন না, এ-বই তাঁদের জন্য নয়।

ভাগ্যিস অক্ষমতার ফল হিসেবে লেখাগুলো প্রকাশ করেছিলেন তিনি, নইলে আমরা এমন চমত্কার বই পড়ার সুযোগ পেতাম কোথায়?

দুই

ছিন্ন ছিন্ন মুহূর্তের এইসব ভাবনা আর অনুভব বলেই হয়তো বহু ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলে চলেন তিনি এই বইয়ে, কিন্তু তুচ্ছ নয় মোটেই। বরং তিন লাইনের মধ্যে তিন শ লাইনের ভাবনা পুরে দেন আর ওই যে ইন বিটুইন লাইনস বলে কথাটিও রকম অদৃশ্য পঙক্তি থাকে তিন হাজারটি। ফলে স্বাদু-প্রাঞ্জল গদ্য হলেও তরতর করে পড়ে ওঠা যায় না, চিন্তা এসে ভিড় করে মাথায়, তারপর ভোগায়। যেমন প্রথম লেখায় মুহূর্ত নিয়ে যা বললেন তিনি আর পড়ে আমার যা যা মনে হলো তা নিয়েই তিন শ লাইন লিখে ফেলা যায়। এই বিপুল চিন্তা-উসকানি, ভাবনাবিস্তারি লেখা তিনি লেখেন কী করে? হ্যাঁ, তাঁর আছে সেই আশ্চর্য সংযম ও সংহতি, কোথায় থামতে হবে তা ভালো করেই জানেন, আমাদের মতো নন যে অহেতুক বাকিবস্তার ঘটাবেন, ফলে কবিতার মতোই তাঁর গদ্য প্রচুর ইঙ্গিত ও ইশারা দেয়, ভীষণ ভাবিয়ে তোলে পাঠককে। তিনি চিন্তার সূত্রমুখ খুলে দেন, এক চিন্তা থেকে অন্য চিন্তায় যাতায়াত করেন অনায়াসে, পাঠককে সঙ্গে নিয়েই, পাঠের অভিজ্ঞতা তাই অন্য রকম হয়ে ওঠে। ওই যে মুহূর্তের কথা বলছিলাম, যা নিয়ে আমরা ভুগি অহরহ, এই বর্তমানের মুহূর্ত নিয়ে, হয়তো তা আনন্দে ভরা, কথকতায় ভরা, উচ্ছ্বাসে ভরা, প্রিয়জনের মধুর সান্নিধ্যে ভরা। কিন্তু এই মুহূর্ত তো মুহূর্তই, অচিরেই হারিয়ে যায় তা। হ্যাঁ, হারিয়েই যায়, কিন্তু মিথ্যা হয়ে যায় না। আজ যে আপনজন কাল সে পর হয়ে যেতে পারে, নিকটজন হয়ে যেতে পারে দূরের, সুখের স্মৃতিগুলো কালিমালিপ্ত হতে পারে, প্রেমগুলো ক্ষয়ে যেতে পারে। তবু তারা মিথ্যা হয়ে যায় না। কোনো এক মুহূর্তে কেউ একজন আপন হয়ে উঠেছিল, হৃদয়াবর্তী হয়ে উঠেছিল, অনেক সুখ-আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গী ছিল, সেসব মিথ্যা হয় কী করে?

অনেক দিন পর সেই প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে যদি বিপরীত অভিজ্ঞতাও হয় তবু আগের মুহূর্ত মিথ্যা হয়ে যায় না। বেদনা হয়, দুঃখ হয়, কিন্তু মিথ্যা হয় না। তিনি এই দুই অভিজ্ঞতার ভেতরে সামঞ্জস্য খুঁজে দেখার কথা বলেন এবং জানান সেটিই জীবনের একটা কাজ।

প্রেমও চূড়া থেকে নেমে আসে একসময়, সমতলে আছড়ে পড়ে, কাতরায়, রক্তাক্ত হয়, কাঁদে। তবু তার এই কাতর দশা দেখে ভাবার কোনো কারণ নেই যে ওই চূড়ার প্রেম, ওই তুঙ্গ মুহূর্তগুলো মিথ্যা ছিল। এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে নিতে হয়, এই যা!

তিন

বিশ্বাস-অবিশ্বাস শিরোনামে এক জরুরি প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন তিনি এবং যথারীতি সেটি আরো অনেক ভাবনাকে উসকে দেয়। প্রসঙ্গটি গীতাঞ্জলি পাঠ নিয়ে। একজন অবিশ্বাসীর কি ভালো লাগতে পারে এ রকম কবিতা? অশ্রুকুমার জিজ্ঞেস করেছিলেন শঙ্খকে। ঠিক একই প্রশ্ন আবু সয়ীদ আইয়ুব করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুকে, সুনীলের লেখায় পড়েছি। এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেছেন শঙ্খ-সুনীল দুজনেই। সুনীল জানিয়েছিলেন, অবিশ্বাসীর ভালো লাগে না, তবু আইয়ুবের ভালো লেগেছিল। কারণ তিনি ঠিক ছেড়ে আসতে পারেননি তাঁর বিশ্বাসগুলো। কিন্তু শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণই আলাদা। একজন সন্ত তিনি, এ কথা আমার মনে হয় তাঁর ব্যাখ্যা পড়ে। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের মতো এই বিশ্বের একটা কল্যাণময় পরিণতির কথা বিশ্বাস না করলেও একজন মানুষ সমস্ত অর্থেই অবিশ্বাসী হয়ে যায় না বা জগতের প্রতি বিবমিষা তৈরি হয় না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সঙ্গে ভালোবাসা আর বিরাগের প্রশ্নটাকে এক করে ফেলি বলেই এ ধরনের সমস্যা হয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি অবিশ্বাসের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু প্রেমহীনতার পক্ষে নয়। বরং অবিশ্বাসীরা যে দায় থেকে ভালোবাসে, এই পার্থিব জীবনের বাইরে আর কিছু নেই জেনে এখানেই সর্বস্ব সমর্পণ করে সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তিনি সেটিকেই খুব গুরুত্ববহ করে তুলেছেন।

সত্যি বলতে কী, আমার নিজের বিশ্বাস খানিকটা রবীন্দ্রভাবনার অনুগামী। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয় অবশ্য; রুমি, লালন, কবীর এবং আরো কিছু সুফির দর্শন ও চিন্তাও আমার ভাবনাজগতে প্রভাব ফেলেছে। এক কল্যাণময়-মঙ্গলময় নিপুণ শিল্পীর অপূর্ব সৃজনী ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে ধরা দেয় এই বিশ্বজগৎ আমার কাছে। কখনো গণিতের জাদুকরী বিমূর্ত রূপে, কখনো সংগীতের সুরে, কখনো চিত্রকরের রঙে। প্রকৃতিতে এই সব কিছুরই চমত্কার প্রকাশ দেখা যায় একটু চোখ মেলে তাকালেই। রং-শব্দ-গন্ধ দিয়ে রচিত এসব রূপ আমাকে বিমোহিত করে, ঘোরগ্রস্ত করে। ফলে সুনীল বা শঙ্খের সঙ্গে আমার মত মেলার কোনো কারণ নেই। তবু শঙ্খের এই মতামত আমার ভালো লাগে, গ্রহণযোগ্য মনে হয়, অনুভব করে উঠিঅন্ধবিশ্বাসীর চেয়ে এ রকম প্রেমময় অবিশ্বাসীরা মানুষের কল্যাণের জন্য অধিকতর প্রয়োজনীয়। কারণ সৃষ্টিকর্তারূপে কাউকে না মানলেও তাদের চোখে জগতের এই অপূর্ব সৃষ্টি-সৌন্দর্য ধরা পড়ে। অন্যদিকে অন্ধবিশ্বাসীরা নিতান্তই অন্ধ। তাদের চোখ নেই, তারা রূপ দেখে না, সৌন্দর্যও বোঝে না; ঈশ্বর ও ধর্মকে তারা করে তোলে তাদের আচারসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতার উৎস; অনেকে হয়ে ওঠে ত্রূদ্ধর, নির্মম, নির্দয়; কারণ ঈশ্বরের প্রেমময় শিল্পী রূপটি চিরকাল অধরাই রয়ে যায় তাদের কাছে।

চার

বিষয়ের ধারাবাহিকতা নেই বলেই নানা প্রসঙ্গে কথা বলেন তিনি। কখনো কবিতার ভাষা নিয়ে, কখনো আধুনিকতা নিয়ে, বৃষ্টি বা স্বপ্ন নিয়ে, কখনো পাঠক নিয়ে, কখনো বা লেখকদের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। শান্তিনিকেতনে ছিলেন বলেই হয়তো সেখানকার নানা মানুষের কথা আসে। ভাস্কর, কবি, শিল্পী। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, অমিয় চক্রবর্তী, শান্তিদেব, পুলিনবিহারী, শোভনলাল, শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ, ভিক্টর ইউবুলিস, শম্ভু মিত্র, রাধিকামোহন, শৈলজারঞ্জনএ রকম আরো কতজনের কথা আসে! এমনকি দাতারাম বা সান্ত্বনার মতো মানুষের কথাও। যেমন ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরী, রামকিংকর আর শর্বরী রায় চৌধুরীর কথা জানা হয়ে যায় আমাদের মাত্র কয়েক পাতার মধ্যেই। তাঁদের কথা বলতে গিয়ে আসে নানা প্রসঙ্গ, তাঁদের ব্যক্তিচরিত্র, তাঁদের জীবনযাপনের ধরন, পারস্পরিক সম্পর্কের সৌন্দর্য ইত্যাদি। একটা উদ্ধৃতি দেওয়া যাক

প্রায় কোনো আসবাব নেই রামকিংকরের, ছোটো ঘরখানিও যেন হাহা করছে। ময়লা একখানা চাঁদর-বিছানো চৌকি, দু-এক টুকরো পত্রিকা, ছোট্ট একটা অ্যালবাম, সিগারেট আর অ্যাশট্রে, চৌকির নীচে খালি কয়েকটা বোতল গড়িয়ে গড়িয়ে এ ওর গায়ে লাগছে, শব্দ হচ্ছে ঠুংঠাং : এই হলো ছবি। কথা বলেন জড়ানো, খানিকটা নেশার ঘোরে থাকেন সব সময়েই, তাই অস্ফুট আর অসমাপ্ত বাক্যমালা, কী বলতে চান বুঝে নিতে হয় ঠারেঠোরে, প্রবলভাবে যেটা বুঝিয়ে দেন সে হলো ওঁর উঁচু গলার হাসি। অস্পষ্ট সংলাপের মধ্যেও বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরাগ, নিজেকে নিয়ে কৌতুক আর শিল্পীর পরম ঔদাসীন্য। শঙ্খ চৌধুরী হয়তো জিজ্ঞেস করলেন : কিংকরদা, আপনার সেই ছবিটা কী করে হারাল? কোথায় গেল? উত্তর : সেই ছবি? কোনটা বলো তো? হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ছবি। কী হলো বলো তো? ছবি। ছবিটা...। আচ্ছা, সেই ছবি। ওটা বোধ হয়, হ্যাঁ ওই যে কে একবার নিল! ভালো ছবিটা। আর দিল না। হা হা হা হা। সেই ছবিটা তো? ঠিক ছবি। তারপরে সিগারেট। আর তারপর অন্ধকারের মধ্যে বিরাট বিরাট করে এদিকে ওদিকে তাকানো।

কত বড় একজন শিল্পী, অথচ কী শিশুর মতো সরল, নির্মল! আর কত অল্প বাক্যেই না সেটি আমাদের জানিয়ে দেন শঙ্খ ঘোষ! প্রতিটি শিল্পী-সাহিত্যিক নিয়ে বলা কথাগুলো এমন হৃদয়স্পর্শী। আবার যখন দাতারাম বা সান্ত্বনার মতো মানুষদের কথা বলেন তিনি, তখন তা এক ভিন্ন মাত্রা পেয়ে যায়। সান্ত্বনা নামের মেয়েটিকে নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি শুরু করেছেন এভাবে

কিছুই আমার মনের মতো নয় : কোনো কোনো মানুষ কত সহজেই এ কথা ভেবে নিতে পারে। প্রত্যাখ্যান করবার, অবজ্ঞা করবার, অপছন্দ করবার হাজার রকম অবস্থা আমাদের সামনে ছড়ানো আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু সে বড়ো হতভাগ্য যার কাছে সবটাই কেবল তাই। এটা তো ঠিকই যে শাদায়-কালোয় ভরে আছে সংসার। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটাকে দেখতে চাই আমি, শাদাটাকেই না কালোটা।

এইভাবে শুরু করে, আলাপটার আরেকটু বিস্তার ঘটিয়ে তিনি বলেন সান্ত্বনা মেয়েটির কথা, শান্তিনিকেতনে থাকে সে। শান্তিনিকেতন আর আগের মতো নেই, এ নিয়ে যারা বিলাপ করে তাদের প্রতি কোনো রোষ বা বিতৃষ্ণা না জানিয়েই যে বলতে পারে, আমার তো আজও খুব ভালো লাগে এই গাছপালা, ছোট ছোট এই ছেলেমেয়ের দল, বড়রাও কতজনে কত রকমের কাজ করছেন, খুব একটা অন্য রকম আবহাওয়া না? আর কোথাও কি আছে এমন? যে যা বলুক, আমার কিন্তু বেশ ভালো লাগে।

এই এক ধরনের মানুষ, যারা সাদাটা দেখতে জানে, নিজেদের মনটি তাই থাকে শুভ্র-সুন্দর, নিজেদের চারপাশকেও তারা শুভ্রতায় ভর দিতে পারে।

পাঁচ

কথাটা উঠেছিল একটি কবিতা নিয়ে। তাঁর তুমি আর নেই সে তুমি শিরোনামের একটি কবিতা পড়ে তাঁর এক বন্ধু নাকি বলেছিলেন, কবিতাটি লিখে ভালো করেননি তিনি। আর এ কথা শুনে কবির মনে হয়েছে, কেউ ভালো লাগা না-লাগার কথা বলতে পারেন, এমনকি কবিতার বিষয়বস্তু বা যে মতির প্রকাশ আছে সে সম্পর্কে কেউ তাঁর দ্বিমত জানাতে পারেন, কিন্তু পাঠক হিসেবে, ব্যক্তিগত বা সংঘগত পাঠক হিসেবে, আমি কি এই দাবি তুলতে পারি যে আমার ভাবনাপদ্ধতির বা রুচিপদ্ধতির বাইরে কথা বলতে পারবেন না একজন লেখক? এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই আলোচনাটিকে তিনি নিয়ে গেছেন এই উপমহাদেশের (কিংবা এর বাইরে আরো অনেক দেশেরও) রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপচর্চার দিকে।

লেখা যখন প্রত্যক্ষ রাজনীতিকে ছুঁয়ে থাকে, তখনই এ প্রশ্নটা আরো জটিল হয়ে দেখা দেয়। আরো জটিল, কেননা প্রতি নিঃশ্বাসে তখন পরখ করা হয় : তুমি কোন দলে?...এখন চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সবাই সবাইকে অনুচ্চারিত একটা জিজ্ঞাসার মধ্যে দিয়ে দেখছে, দেখতে চাইছে : তুমি কোন দলে?

এই লেখাটা যখন পড়ছি, তখন মনে হচ্ছেকী ভীষণভাবে মিলে যাচ্ছে আমাদের অভিজ্ঞতা, তাঁর চল্লিশ বছরের আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। আমাদেরও এখন শুধুই দলাদলি, শুধুই বিভাজন। কেউ না কেউ বন্দুক তাক করার মতো করে ওই প্রশ্নটি তাক করে বসে আছে আমাদের দিকেতুমি কোন দলে? কারো সমালোচনা করলে নিশ্চিতভাবেই সে ঠেলে দেবে আমাদের অন্যদিকে। সেই অন্য আবার ভয়ংকর, রীতিমতো জীবনসংশয় দেখা দিতে পারে ও রকম অন্যের তকমা গায়ে এঁটে গেলে এবং যাচ্ছেও। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করলে তাঁরা এবং তাঁদের অনুসারীরা সমালোচকদের ঠেলে দিচ্ছেন মৌলবাদীদের দলে, নানা রকম তকমা এঁটে দিচ্ছেন গায়েরাজাকার, বামাতি, জামাতি এইসব কত কী! আবার মৌলবাদীদের সমালোচনা করলে তারা দিচ্ছে নাস্তিক তকমা। শুধু তকমা দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তালিকা প্রস্তুত করছে, সেই তালিকা পত্রপত্রিকায় ছাপিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে সম্ভাব্য খুনিদের কাছে, বের করছে লকলকে ছুরি। একবার তকমা আঁটতে পারলেই হলোতা সে যে তকমাই হোক, খুন করা তখন বৈধ হয়ে যাচ্ছে। কী ভয়ংকর এক পরিস্থিতির মধ্যে আমরা বাস করছি, ভাবা যায়? অথচ সমালোচনা তো এক গ্রহণযোগ্য রীতি। কোনো একটি দলের বা কোনো একজন ব্যক্তির সব কাজ তো সব সময় গ্রহণযোগ্য হয় না, হতে পারেও না। শতভাগ বিশুদ্ধ কোনো রাজনীতি যেমন নেই, নেই কোনো মানুষও। তার সমালোচনা কি করা যাবে না? শঙ্খ ঘোষ লিখছেন

মুশকিল এই যে, দৃষ্টিভঙ্গিত এই দলের ভাবনাকে ক্রমেই আমরা খুব ছোটো করে আনছি, খুব সংকীর্ণ। সেই সংকীর্ণতায় দল কথাটার কোনো দর্শনগত ভিত্তি আর বড়ো হয়ে থাকে না। বড়ো হয়ে ওঠে নিছক একটা পার্টিগত ভিত্তি। যুক্তিক্রমটা ঘুরে যায় তখন। এটা যথার্থ বলেই আমার পার্টি এটা করে, এই ধারণাটা উল্টে গিয়ে দাঁড়ায় : আমার পার্টি এটা করে বলেই এটা যথার্থ। দল যখন আমার কাছে দলীয়তা চায়, তখন এই বিচার-বিসর্জন চায়, বুদ্ধিসমর্পণ চায়।

তখনই যে-কোনো উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে সবাই দেখতে চান, এই লেখায় বা এই কাজে তুমি কাকে সমর্থন করছ, কার বিরোধিতা করছ? কিন্তু সমর্থন তো কোনো ব্যক্তিকে বা গোষ্ঠীকে নয়, সমর্থনের কথা ছিল তো কোনো কাজকে, কোনো পদ্ধতিকে। একজন মানুষ, যাকে আমি নির্ভরযোগ্য ও ভালো মানুষ বলেই ভাবি, তিনি কি কখনো এমন কাজ করতে পারেন না যা আমার বিবেক সমর্থন পায় না? যদি তিনি তা করেন কখনো, তবে সে-কথা বলা কি আমার পক্ষে অসংগত হবে? সে-কথা বললে কি সেই মানুষটির বিরুদ্ধে বলা হবে, নাকি তাঁর একটি ভাবনার বিরুদ্ধে মাত্র, তাঁর বিশেষ একটি কাজের বিরুদ্ধে? এইখানেই একটা জট তৈরি হয়, আর কাজের সঙ্গে ব্যক্তিকে আমরা একাকার করে নিই।...

যাঁকে আমরা মানি অথবা ভালোবাসি তাঁর বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা চলবে না, তাঁর সবটাকেই আমার নিতে হবে নির্বিকার এবং নির্বিচার আনুগত্যে, আর অন্যদিকে, যাঁর বিষয়ে আমাদের সামান্য কোনো প্রশ্ন উঠবে তাঁকে ভাবতে হবে সর্বতোভাবে পরিহার্য বা ঘৃণ্য, এই জায়গায় যদি এসে দাঁড়ায় মানুষ তবে তার মতো সর্বনাশ আর নেই।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা কী করব? কী হবে আমাদের উপায় আর লক্ষ্য? এ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি পরের লেখাটিতেই। কোনো একটি দলের কোনো একটি অপছন্দের কাজের বিরোধিতা করলে কি বিরোধী পক্ষকে সহায়তা করা হয়? সে-পক্ষ বড়ো একটা যুক্তি হিসেবেই কি প্রয়োগ করবে না সেটা, তৈরি হবে না কি এক বিপন্নতা? এসব প্রশ্নও তুলেছেন। প্রশ্নগুলো আমাদের এখানেও ওঠে এবং এই যুক্তিগুলো এখানে অহরহই দেখতে পাই যে এক পক্ষের যে কোনো একটি কাজের বিরোধিতা করা মানে তার বিরোধী পক্ষের হাতে একটা অস্ত্র তুলে দেওয়া। অতএব, হয় সব কাজেই সমর্থন করো, বিবেক বিসর্জন সম্পন্ন করো নিখুঁতভাবে; আর একান্তই যদি তা না পারো, তাহলে চুপ করে থাকো, নীরব হয়ে যাও। কবি এই যুক্তির অসারতাকেও প্রমাণ করেছেন নানা উদাহরণ দিয়ে এবং বলেছেন

এ যুক্তিতে আমরা আমাদের অভিপ্রেত সমস্ত মিথ্যাকেই সমস্ত ভ্রান্তিকেই সত্যের মুখোশ দিতে চাইব না তো? বড়ো একটা লক্ষ্যের জন্য যে-কোনো উপায়ই ভালো, এই ভাবতে ভাবতে, উপায়ের হীনতায় আমরা একটা সমগ্র জাতিকেই সুবিধাবাদের আশ্রয়ে হীন করে তুলতে চাইব না তো? হীন এবং অনাচারী এবং নির্বীর্য?

শুধু অন্যের সমালোচনা বা দৃষ্টিভঙ্গিগত ত্রুটি নিয়েই কথা বলেননি তিনি, বলেছেন আমাদের, অর্থাৎ যাদের কিছু করার কথা ছিল এই অপচর্চার বিরুদ্ধে তাদের, সীমাবদ্ধতার কথাও

আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে দীর্ঘকাল জুড়ে আমরা শুধু না এর দিকটাকে বড়ো করে তুলেছি, ইতির দিকে ভর আমাদের কম। করার দায়িত্ব নিতে নিজেদের আমরা তত প্রস্তুত করিনি, না-করার সুযোগ নিয়ে যত। আমরা দাবি করেছি, কিন্তু সৃষ্টি করিনি। আমরা খণ্ড খণ্ড উপায় ভেবেছি, কিন্তু তা যে আমাদের লক্ষ্যের সমগ্রতাকেও অনেক সময় খণ্ড খণ্ড করে দেয়, সেই ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা আমরা মনে রাখিনি।

যেন আমাদের সংকট নিয়েই কথা বলছেন তিনি। যদিও লেখাটি চল্লিশ বছর আগের এবং লেখা হয়েছিল ভারতের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে, তবু আজও এই কথাগুলো আমাদের জন্য কতই না প্রাসঙ্গিকএই দেশে, এই কালে। মহৎ মানুষদের চিন্তা এ রকমই হয়, দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে যায়, হয়ে ওঠে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক; অন্য দেশে, অন্য সময়েও।

ছয়

শঙ্খ ঘোষ রাজনীতি-অন্তপ্রাণ লেখক নন, কিন্তু নানা লেখায়, বিশেষ করে অনেক কবিতায়, তিনি রাজনীতির অনাচার নিয়ে লিখেছেন। দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে রাস্তায়ও নেমেছেন কখনো কখনো, মুখ ফিরিয়ে থাকেননি। কিন্তু অচিরেই ফিরে গেছেন নিজের লেখার জগতে, ধ্যান ও নিবেদন যে জগতের প্রধান অনুষঙ্গ। ছোট লেখাগুলোতেও তাঁর সেই ধ্যানমগ্ন চিন্তার পরিচয় মেলে। যেমন নেপথ্য শিরোনামের একটা লেখায় তিনি জানাচ্ছেন না লিখতে পারার বেদনার কথা

অনায়াস সাবলীল লিখে যাবার তৃপ্তি, শরীরের মধ্যে প্রতিমুহূর্তে কোনো প্রবাহকে বইতে পারবার তৃপ্তি : সেটা কত কম সময়ে মেলে। কত মুহুর্মুহু মনে হয় শুধু অবসানের কথা, নিষ্ফলতার কথা, অনুর্বরতার কথা। কিছু-না-করার ভয়াবহতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি কত দিন!

এক হিসেবে, একটা অবসান যেন দেখতে পাচ্ছি সামনে। নতুন একটা সময় আসছে স্পষ্টই, আর আমরা এখনো দ্বিধান্বিতার মধ্যে টলমল করছি। আমাদের চেতনাকে সেই ভাবী সময়ের দিকে প্রসৃত করে দেবার ঠিক ঠিক ভাষা কি আমরা জানি? আমাদের বোধে আর যুক্তিতে যেমন সামঞ্জস্য ঘটতে চায় না কিছুতে, তেমনি মিলতে চায় না আমাদের সময় আর ভাষা।

জানাচ্ছেন, যদি লেখা সম্ভব হতো, তাহলে এগুলোই হয়তো লিখতেন, কিন্তু হলো না। তো কী করা যায়? তিনি অপেক্ষা করতে চান ওদের লেখার জন্য। কারা ওরা? সে কথা পরিষ্কার করে বলেননি তিনি। একটা নাম আছে বটে, শৈলেশ্বর, সেই নাম আমাদের অচেনা, কিন্তু যে বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি, তাতে চেনা হয়ে ওঠে। এঁরা সেই লেখকগোষ্ঠী, যাঁরা সমকালের উতরোল-উত্তেজনাকে দূরে সরিয়ে রেখে নিভৃতে লিখে চলেন। কী অদ্ভুত মমতা নিয়ে শঙ্খ ঘোষ বলেন তাঁদের কথা!

লোকের চোখের আড়ালে থেকে লিখতে পারলেই সবচেয়ে সত্যি লেখা পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস হয় আজও, নেপথ্যের চেয়ে বড়ো শক্তি শিল্পীর কাছে আর কিছুই নয়, কিন্তু তবু মনে হয় কত দুঃসহ আর দুঃসাধ্য এই পরীক্ষা! দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, উপেক্ষা আর ঔদাসীন্যের পরিবেশের মধ্যে লিখে যেতে পারা, কেবল নিজের ওপর কেবলই নিজের ওপর ভর করে নিজের চারপাশকে আমূল খুঁড়ে তোলা, তুলে কোনো বীজ মিলল কি না-মিলল সে-বিচারেও শুধু নিজেকেই প্রশ্ন করে ফেরাএর জন্য যে পৌরুষ চাই তা বড়ো সুলভ নয় কোনো দিনই। তবু তো এত দিনের ভার নিয়ে লিখছে আজও শৈলেশ্বরের মতো অথবা অন্যদিকে সুবিমল মিশ্রের মতো মানুষেরা।

আবার লেখা-না-লেখায় তিনি তোলেন আরেক প্রসঙ্গ, বেশি লেখার সংকটের কথা। অবশ্য শুরুতে বলে নেন এ কথাও যে অনেক দিন ধরে লেখা না হলে মন তখন চারদিক থেকে খুঁজে বেড়াতে চায় অল্প লেখার সমর্থনে যত যুক্তি। এই তর্ক, অধিক বা অল্প লেখার পক্ষে-বিপক্ষের তর্ক, আমাদের এখানেও চলছে বহুদিন ধরে। অতিপ্রজ লেখকরা ক্রমাগত নিজেকে তরল করতে থাকেনএ কথা যেমন বলা হয়, তেমনই স্বল্পপ্রজ লেখকদের (বিশেষ করে গদ্য লেখকদের) লেখায় থাকে এক জড়তা, বোঝা যায়এ হলো নিয়মিত না লেখার ফল, এ কথাও শোনা যায় খুব। শঙ্খ ঘোষ একটু ভিন্নভাবে অল্প লেখার পক্ষে বলেন

আমরা যদি তেমন কোনো জায়গায় গিয়ে পৌঁছতে চাই যেখানে প্রতিটি উচ্চারণই পায় ভাস্কর্যের ক্ষমতা, যেখানে প্রতিটি শব্দই উঠে আসে তার সমস্ত শক্তি আর সত্য নিয়ে, তাহলে মুহুর্মুহু লিখতেই-বা হবে কেন? পারবেনই-বা কীভাবে একজন? নিজের সম্ভাবনাকে আমাদের লেখকরা কি শুধুই তরলিত করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন না সময়ের প্রবাহের মধ্যে, শুধু চলতি সময়টুকুকে ছুঁয়ে থাকবার জন্য? বর্তমানের বা সাম্প্রতিকের আতঙ্ক কি তাঁদের ভবিষ্যৎ থেকে নিবৃত্ত করে আনছে না অনেকখানি? লোকের চোখের আড়ালে চলে যাবার একটা ভয় থেকে, অনেক সময়ে বন্ধু বৃত্তের বা সামাজিক বৃত্তের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ থেকে অনেক সময়ে লেখকেরা অতিক্রম করে যান তাঁদের সীমা, এবং ভাঙতে থাকেন ছোটো ছোটো ভাস্কর্যের দাবিকে, অলস ব্যস্ততায় নিজেদের ছড়াতে থাকেন বহুচারী অকর্মণ্যতায় আর তারপর একদিন, অনেক দিন পরে নিজেদেরই অতীতের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখেন, কোথাও তেমন সঞ্চয় নেই কিছু।

এই ছোট্ট লেখাটি যেকোনো লেখককে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সত্যি বলতে কি, যদিও আমি বহুপ্রজ নই, তবু এই ভয়টা আমারও হয়। মনে হয়, অতীতের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখলে আমিও দেখব, কোথাও তেমন সঞ্চয় নেই কিছু এবং এই যেটুকু লিখে চলেছি, তার সবটাই যে নিজের আনন্দে তা তো নয়। মেনে নিতে দ্বিধা নেই, লোকের চোখের আড়ালে চলে যাবার ভয় আমার নেই, বরং আড়ালে থাকতেই ভালো লাগে আমার, কিন্তু বন্ধু বৃত্তের বা সামাজিক বৃত্তের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ যে অস্বীকার করতে পারি না, এ-ও তো সত্যি! সম্পাদকদের দাবি-অনুরোধও তো আসলে সামাজিক চাপই, কিংবা একে বন্ধু বৃত্তের চাপও বলা যায় না কি? কতটুকুই বা অস্বীকার করা যায় একে? কয়জনকেই ফেরানো যায়? এই না বলতে পারার অক্ষমতা কি ক্রমেই তরলীকৃত করে ফেলছে না আমাকে, আমাদের? কিন্তু এ সম্পর্কে চূড়ান্ত কথাটি হয়তো বলা যায় না। ভালো লেখার শর্ত হিসেবে অল্প লেখার কৌশল সব সময় ফলদায়ক না-ও হতে পারে। অনেককে দেখেছি, অল্প লেখার বাহানায় না লিখতে লিখতে কলমে মরচে পড়ে গেছে, লিখতেই ভুলে গেছেন তাঁরা। বহুপ্রজরা তরলীকৃত হয়ে যান, স্বল্পপ্রজরা হয়ে যান অচল, তাহলে উপায় কী? আমি নিজে যেহেতু বহুপ্রজ নই, তাই মনে হয়অল্প লিখলেও একজন লেখককে সর্বদা লেখার ভেতরে বসবাস করতে হয়। লেখার চিন্তা, লেখার বিষয় ও কৌশল, লেখার পরিকল্পনাএসবের মধ্যে বসবাস করতে পারলেই কেবল স্বল্পপ্রজরা সচল থাকতে পারেন, এই রকম মনে হয় আমার।

লেখালেখির নানা বিষয় নিয়ে এ রকম টুকরো টুকরো চিন্তাবিস্তারি আরো অনেক লেখা আছে এই বইয়ে। যেমন লেখকের শেখা শিরোনামের লেখাটির কথা বলি। একটি বই পড়েছেন তিনি, পড়ে বেশ ভয় তৈরি হয়েছে মনে, এ কথা জানাচ্ছেন শুরুতেই। ভয়? বই পড়ে ভয়? কেন? কারণ লেখায় যত্ন আছে, পরিশ্রম আছে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। না থাকলে নেই, সরিয়ে রাখলেই হলো, ভয় পাওয়ার কী আছে? সেটিকেই ব্যাখ্যা করেছেন তিনি, এক অনবদ্য ভঙ্গিতে। ভয় পাচ্ছেন এ জন্য যে আমরাও এই রকমই লিখি না তো? এই রকমভাবেই পাঠকের বিরক্তি আর অবিশ্বাস তৈরি করি না তো? হ্যাঁ, এভাবে দেখলে ভয় পাওয়ার কারণ আছে বটে, সব লেখকেরই আছে। তিনি জানাচ্ছেন, অনেক বয়স্ক মানুষের চালচলন ভালো করে লক্ষ করেন তিনি ইদানীং। সেটা তাদের ভুল ধরার জন্য নয়, বরং যে আচরণগুলো নিজের চোখে অসংগত লাগে সেগুলোকে থেকে নিজেকে সাবধান করার জন্যদেখবার একটা যোগ্য আয়না পাওয়া যায় অন্যদের মধ্যে, আর তাই অন্যদের লক্ষ করতে হয়। আর তার পরই বলেন সেই অমোঘ কথাগুলো, একটা ততটা ভালো নয় বই পড়ে তাঁর যা মনে হয়েছিল

অন্যের লেখা পড়েই ঠিক-ঠিক বোঝা যায় নিজের লেখার অতলস্পর্শী শূন্যতাগুলি, শিখরস্পর্শী অহমিকাগুলি, অন্তঃসারহীনতার অবাধ বিস্তার। নিজে যখন লিখি, লিখিত শব্দগুলির চারপাশে আরো অনেক অলিখিত অনুষঙ্গ পরিবেশ বাক্য ব্যঞ্জনা কতই-না থেকে যায়, নিজে তো সেই শব্দগুলিকে দেখছি তার সর্বস্ব নিয়েই, কিন্তু পাঠকের কাছে তা যখন পৌঁছায় আপেক্ষিক রিক্ততায় তখন অনেক কিছুই তো পায় না তারা। নিরাসক্ত পাঠক হিসেবে কি নিজের লেখাকে পড়তে পারি আমরা? বিচার করতে পারি তাকে দূর থেকে? পারি না সব সময়ে। তাই যখন এরই তুল্য কোনো লেখা দেখি অন্য লেখকের হাতে, তার শূন্যতাগুলি থেকে অভাবগুলি থেকে বুঝতে পারি আমারও কোথায় সর্বনাশ। বড়ো বড়ো লেখকের পদ্ধতি থেকে অনেক যেমন শিখবার আছে আমাদের, অনেক যেমন শিখতে পারি তাঁদের তির্যক এবং সংক্রামক বিন্যাস থেকে, তাঁদের বোধ থেকে, তেমনি উলটো করে অনেকটাই শেখার আছে লেখকের ব্যর্থতা থেকে, সে লেখার স্খলন আর অসারতার প্রতিফলন থেকে। করার জন্য শেখা, না-করার জন্য শেখাদুটোই তো শেখা।

হ্যাঁ, আমাদেরও শেখার আছে। শুধু লেখকের ব্যর্থতা থেকে নয়, বরং একটি ব্যর্থ লেখাকে কিভাবে দেখতে হয়, ছুড়ে ফেলে না দিয়ে কিভাবে দর্পণের মতো নিজেকে দেখে নেওয়া যায় ওই লেখার ভেতরে, সেটিও। শঙ্খ ঘোষ সন্তের নিরাসক্তি নিয়ে এই দুরূহ কাজটি আমাদের শিখিয়ে দেন।

সাত

এ রকমভাবে আরো কত প্রসঙ্গ যে আসে! বাংলা ভাষার লেখকদের প্রসঙ্গ যেমন আসে, তেমনি নানা বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আসে অন্যান্য ভাষার লেখকদের কথাও। মালার্মে, গ্যোয়েটে, নেরুদা, লোর্কা, গিনসবার্গ, সেলিন, দা ভিঞ্চি, ফ্রস্ট, অডেন, অলডাস হাক্সলি, দস্তয়েভস্কি, চেকভ, টমাস মান, এলিয়ট, টলস্টয়, গোর্কি, লুকাচ, সিনক্লেয়ার, উইল ডুরান্ট, তেইয়ার দ্য শারদ্যাঁর, কাফকা, রিলেকআরো কতজন! নিজের চিন্তার সঙ্গে এত এত লেখকের এত সব ভাবনাচিন্তাকে তিনি যে কী অদ্ভুতভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন, ভাবলে অবাক হতে হয়।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। পৃথিবীর মনীষীদের কাছে ১৯৩১ সালে এক চিঠি লিখেছিলেন উইল ডুরান্ট, কিছু জরুরি প্রশ্নসহ। ডুরান্ট তখনো দর্শনের কাহিনি লিখতে শুরু করেননি, তৈরি করছেন নিজেকে লেখার জন্য, আর তার আগে এই চিঠি, হয়তো তাঁর প্রস্তুতি পর্বেরই অংশএকই প্রশ্ন সেদিন তিনি পাঠিয়েছিলেন চার্চিল আর আইনস্টাইন, স্ট্যালিন আর টমাস মান, রাসেল আর হাউপ্টমান, ফ্রয়েড বা রবীন্দ্রনাথকে। জানতে চেয়েছিলেন, আধুনিক এই সময়ে মানুষের কাছে জীবনের আর কোনো মানে আছে। এই চিঠি যখন লেখেন তখনো পৃথিবীবাসী দেখেনি হিটলারের উত্থান, দেখেনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকট আর সংঘাতভরা সময়টি। সেই চিঠির বেশ খানিকটা তুলে দিয়ে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন

তখন, এই প্রশ্নগুলির মধ্য দিয়ে, তৈরি হচ্ছিল আধুনিকতার একপেশে চেহারা। আকস্মিক জন্ম আর আকস্মিক মৃত্যুর মাঝখানে সীমায়িত এই জীবনের কোনো মানে হয়তো আছে তার সীমার বাইরে, একদিন মানুষ তা বিশ্বাস করেছে সহজে। বিশ্বাস করেছে যে কোথাও আছে এক পরম শৃঙ্খলা, এক ধারাবাহিকতা, বুদ্ধির অগোচর কোনো কল্যাণভরা অস্তিত্ব আছে হয়তো কোথাও। এই বিশ্বাসে একদিন তার সামনে ছিল কোনো ঈশ্বর। কিন্তু নীেস ঘোষণা করেন ঈশ্বরের মৃত্যু; বলেন, আমরা হত্যা করেছি তাঁকে। সেই ঘোষণার পর অনেক অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এসে বিংশ শতাব্দীর ভারাক্রান্ত মানুষ তার চারদিকে দেখে শুধু বিচ্ছিন্নের শুধু আকস্মিকের শুধু বিশৃঙ্খলার পুঞ্জ, জীবনের বাইরে জীবনের আর কোনো মানে খুঁজে পায় না সে। সে দেখে শুধু পাপের ছায়া শুধু দুঃখের ছায়া, শুধু ভগ্নস্তূপ আর শূন্য গহ্বর। লেখেন আমাদের সাম্প্রতিক কবি : পাপ আর দুঃখের কথা ছাড়া কিছুই থাকে না।

কিছুই থাকে না আর? এটিই ছিল মনীষীদের কাছে ডুরান্টের প্রশ্ন। মনীষীরা কী উত্তর দিয়েছিলেন জানি না, কিন্তু ডুরান্ট নিজে তো তাঁর দর্শনের কাহিনিতে পেয়ে গিয়েছিলেন এক নির্ভর, যে নির্ভর নিয়ে বলেন : বয়ঃসন্ধির আকস্মিক অভিজ্ঞতার সামনে এসে তরুণরা যেমন হয়, আমরা আজ তেমনি বিপর্যস্ত, ভারসাম্যহারা। কিন্তু পরিণতি আসবে শিগগিরই, শরীরে মনে সামঞ্জস্য হবে একদিন, সামঞ্জস্য হবে আমাদের প্রাপ্তির সঙ্গে আমাদের সভ্যতার, প্রশ্ন এই, কীভাবে পৌঁছলেন তিনি এই নির্ভরে। বিশ্বাস হারানো পাপ বলেই কি এই বিশ্বাস?

দর্শন-ভাবনা নিয়ে বিশ শতকের এক আলোড়ন তোলা বইয়ের জন্মপূর্ব এই বিবরণ আমাদের মোহিত করে বৈকি!

আবার টলস্টয়কে নিয়ে গোর্কির লেখা স্মৃতিচারণামূলক বই Reminiscences of Leo Nikolaevich Tolstoy-কে যখন পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি তাঁর জীবনচরিত লেখাটিতে, তখন ভারি চমত্কার এক পর্যবেক্ষণ হাজির করেছিলেন তিনি আমাদের প্রবণতা সম্পর্কে :

এ-ধরনের বই অবশ্য আমাদের দেশে লেখা হবে না কখনো। আমরা মানুষকে হয় দেবতা করে তুলব, আজও, নইলে তাকে দেখাব পুরো মাপের শয়তান করে। আমি যাঁকে সীমাহীন শ্রদ্ধায় ভরে দিই, তাঁর মানসিক নানা স্খলনও যে চোখে পড়তে পারে আমার, সেই গহ্বরগুলি দেখবার পরেও যে তাঁর কাছে সম্পূর্ণ প্রণত হতে পারি আমি, নির্বিকার পূজারির এই দেশে এ-বোধটা পৌঁছতে আজও দেরি আছে।

গোর্কির এই বই নিয়ে আমিও লিখেছি একবার, তাই আর বিস্তারিত আলাপে যাচ্ছি না।

রুশ সাহিত্যিকদের নিয়ে বেশ কয়েকবারই কথা বলেছেন শঙ্খ ঘোষ। এপিক আর ট্র্যাজিক লেখাটিতে আছে আরেকটি অসামান্য পর্যবেক্ষণ :

এপিক আর ট্র্যাজিক। এই দুইয়ের মধ্যে যেন ভাগ করে দেওয়া আছে পৃথিবীর মন। টলস্টয় আর ডস্টয়েভস্কি যেন ভাগ করে নিয়েছিলেন তাঁদের কাজ, তাঁদের দুজনের মধ্য দিয়ে যেন গড়ে উঠছিল মানবতার এক সম্পূর্ণ অবয়ব।

অল্প কথায়, কী গভীর ভালোবাসা নিয়েই না এই দুই মহানকে মহিমান্বিত করেছেন শঙ্খ ঘোষ!

ঈশ্বর নিয়ে নানা মানুষের নানা ভাবনার প্রসঙ্গ অনেকবারই এসেছে জার্নালে। যেমন সর্বোচ্চ লেখাটিতে ফের তুললেন তিনি সেই প্রসঙ্গ, একটু ভিন্নভাবে। এক পাঠক তাঁকে লিখেছিলেনভালোবাসা সকলের চেয়ে বড়ো, এটা কেন লিখলেন আপনি? আপনিও কি তাহলে হায়ারার্কিকাল হয়ে পড়লেন? কোনো একটি সর্বোচ্চ, কোনো পিরামিডশৃঙ্গে কি তাহলে আপনারও আস্থা রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরেই তিনি আলাপের বিস্তার ঘটালেন, ভালোবাসার এক অসামান্য ব্যাখ্যা দিলেন। তারপর বললেন :

তেইয়ার দ্য শারদ্যাঁর মতো মানুষেরা অবশ্য ভাবতে পারতেন যে বিশ্বশীর্ষে আছে এই ভালোবাসার কোনো পরম উৎস, কোনো পরম লক্ষ্য ভালোবাসার। রহস্যময় সেই কেন্দ্রের তিনি নাম দিয়েছিলেন ওমেগা, যেন সেই উচ্চতম থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ে সব। না, তেমন কোনো শীর্ষকেন্দ্রকেও দেখতে পাই না আমি, কিন্তু দেখতে পাই প্রাণনার সমস্ত মহলেইজীব বা উদ্ভিদএকের দিকে অন্যের বিসর্পিত অভিমুখিতা, অভিমুখী সেই টানটারই অন্য নাম ভালোবাসা। যে মনে করে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে প্রকৃতি থেকে, সর্বস্ব থেকে, এমনকি সে-ও প্রতি মুহূর্তে যুক্ত হয়ে আছে, থাকতে চায়, তার মুহূর্তের সঙ্গে, প্রবাহণের সঙ্গে। যোগ ছাড়া কিছু নেই। আর সেই যোগেরই অন্য নাম ভালোবাসা। তেইয়ার দ্য শারদ্যাঁর পরম ওমেগা হয়তো নেই কোথাও, কিন্তু বিশ্বের প্রতিটি বিন্দুই যেন স্বতন্ত্র ওমেগা হয়ে ছড়িয়ে আছে বলে মনে হয়।

দর্শন আর প্রেমকে, ভাববাদ আর বস্তুবাদকে, জগৎ আর জীবনকে তাদের সমস্ত বিচ্ছিন্নতা ও বিপরীতমুখিতা সত্ত্বেও মিলিয়ে দেন শঙ্খ ঘোষ এসব লেখায়। আর আমরা, তাঁর পাঠকরা, বিস্ময় নিয়ে ভাবিকী করে পারেন তিনি ছোট্ট একটি লেখায় এত ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার বিবিধ গতিমুখকে একদিকে ধাবিত করে একটি সামগ্রিকতা তৈরি করতে? মনে কি হয় না, সাধারণ কোনো মানুষ নন তিনি? মনে কি হয় না, আমাদের এই সাদামাটা-আটপৌরে জাতির মধ্যেই বাস করছেন এক সন্ত, নীরবে-নিভৃতে?

আট

শুধু এসবই নয়, বিষয় হিসেবে আসে আরো অনেক কিছু। বৃষ্টি, বর্ষা, স্বপ্ন, গ্রাম, বন্যা, অবসাদ, প্রেম-অপ্রেম, মন, আঘাত, সৌন্দর্যমোট কথা কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টিসীমার আড়ালে থাকে না এবং আমি যে বারবার তাঁকে সন্ত বলে উল্লেখ করছি, তার কারণও এই লেখাগুলো। দুটো লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিলে হয়তো আরো খানিকটা বোঝা যাবে তাঁর সন্তসুলভ ভাবনার ধরন।

মন নামের ছোট্ট একটি লেখায় তিনি বলছেন

মনে মনে বলি : অন্যের কাছে যে আচরণ আশা করো, তেমনিভাবে গড়ে তোলো নিজের চলাফেরা। তাই বলে এর উল্টোটা কিন্তু ঠিক নয়। যেমন আচরণ করতে চাও তুমি, ঠিক সেইটেই যেন আশা কোরো না অন্যদেরও কাছে। তেমন আশা করলেই আহত আর আক্রান্ত হবে মন।

এ রকম করে কি ভাবি আমরা? না, বরং উল্টোটাই ভাবি। যেমনই হোক, আমার চলাফেরা, আমার প্রতি অন্যদের আচরণ যেন আমার প্রত্যাশামতো হয়, এ রকমই তো ভাবতে অভ্যস্ত আমরা। কিংবা আমি যে আচরণ করি, সবার আচরণও যেন তেমনই হয়; সবাই যেন আমারই মতো হয়, এ রকমও তো ভাবি। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ আমাদের মতো নন, তিনি ভাবেন অন্য রকমভাবে।

আবার প্রাকৃতিক শিরোনামের একটা লেখায় তিনি জানাচ্ছেন, সকালে আর রাতে ফুল উপহার পেয়েছিলেন; সকালে চাঁপা ফুল এসেছিল প্রবোধবাবুর কাছ থেকে আর রাতে বেল ফুল এলো শঙ্খ চৌধুরীর কাছ থেকে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলছেন

এ-রকম এক-একটা দিনে এই ভেবে কষ্ট হতে থাকে যে মুহূর্তপরেই এ আর থাকবে না। এইসব মুহূর্তই হলো অতীত ভবিষ্যৎ আর বর্তমানের মিলনমুহূর্ত, নিমেষের মধ্যে সময়টাকে তখন ভাবীকালের দিকে সরিয়ে নিয়ে অতীত হিসেবে ভাবতে পারা যায়। আর তারই নাম তো সুন্দর। সময়ের সঙ্গে এটাই তো সুন্দরের যোগ!

কথাটা কেবল এ নয় যে প্রকৃতির আবেশে মুগ্ধ হওয়া গেল। চাঁপা ফুল আর বেল ফুল ভালো। ভালোই এই চাঁদের আলো আর হাওয়া। কিন্তু তারও চেয়ে ভালো মানুষে-মানুষে চকিত সম্পর্কের উদ্যত এই ভঙ্গি, নিজের সার। বেশিক্ষণ হয়তো থাকবে না এটা, এই সম্পর্কবিন্দুটা, কাল সকালে আবার নানা শুকনো জঞ্জালে লুকিয়ে যাবে এই মুহূর্ত, আবার সবাই ভাবতে শুরু করবে গ্লানির কথা, হীনতা আর জৈবতার কথা : কিন্তু কে বলল যে সেটাই সব! এটাই হলো প্রাকৃতিকতা। আর এসব চাপের বাইরে হঠাৎ হঠাৎ চোখের কোণে যে মেঘ খেলে যায় একটু, সেই মেঘটাই মানবিক। তাকে কেন মিথ্যে বলে ভাবব? একদিনের সেই মেঘই তো আমাদের অনেক দিনের সম্বল হতে পারে?

ফুল উপহার পাওয়ার মতো এক সামান্য ঘটনাকে কী অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন তিনি। মহৎ শিল্পীরাই শুধু পারেন এমন, সাধারণের ভেতর থেকে বের করে আনেন অসাধারণত্বের সম্ভাবনা, সামান্যকে করে তোলেন অসামান্য মাধুর্যে ভরা কোনো ঘটনা।

নয়

এই বইয়ের দ্বিতীয় পর্বে সংকলিত হয়েছে আরো পাঁচটি লেখা। একটি সতীনাথ ভাদুরী প্রসঙ্গে, দুটো জীবনানন্দকে নিয়ে, একটি কাফকাকে নিয়ে আর শেষেরটি রিলকের এলিজি প্রসঙ্গে। ঠিক জার্নাল নয় এগুলো, প্রবন্ধও নয়, তাঁর ভাষায় প্রবন্ধের বীজ মাত্র! অথচ কাফকাকে নিয়ে যে আলোচনা তিনি করেছেন, কাফকা প্রসঙ্গে ও রকম লেখা আর কখনো পড়িনি। কিংবা রিলকে : মাল্টে থেকে এলিজির তুল্য লেখা কি খুব বেশি পড়েছি? মনে পড়ে না। এই লেখায় তিনি কথা শুরু করেছেন মাল্টেকে নিয়েই।

এ কি হতে পারে যে সত্যিকারের জানবার মতো জরুরী কথাগুলি জানাই হয়নি এখনো, দেখাও হয়নি বলাও হয়নি আজও? এ কি হতে পারে যে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ কেবল দেখেছে ভেবেছে লিখেছে অথচ অবহেলায় গড়িয়ে যেতে দিয়েছে দীর্ঘ এই সময়টাকে? কাতর এই প্রশ্ন তুলেছিলেন রিলকে তাঁর মাল্টে বইটির মধ্যে, এই এবং এ-রকম আরো, আর বারে বারে বলেছিলেন : হ্যাঁ হতে পারে সেটা। আর হতে পারে বলে তাঁকেই আজ ছুঁতে হবে জীবনের মূল প্রশ্নগুলি। যত তরুণ আর তুচ্ছই হোন না কেন তিনি, মাল্টেকে আজ শুধু লিখে যেতে হবে, লিখতে হবে দিনরাত, এই তাঁর ভবিতব্য।

কিন্তু লিখে যেতে হবে বললেই তো লেখা যায় না। অত সহজ তো নয় এই দিনরাত লিখে যাওয়ার ব্যাপারটা। কত সাধনায়, কত অপেক্ষায় তার দেখা মিলবে, কিংবা আদৌ দেখা মিলবে কি না, কে বলতে পারে?

লিখতে হবে মহৎ কয়েকটি কবিতা। কিন্তু সে তো খুব অনায়াস কোনো ঘটনা নয়, কত দিনের কত আয়োজন চাই তার জন্য।...সারা জীবন, সারা দীর্ঘ জীবনের অপেক্ষার পর হয়তো অন্তিমে গিয়ে লিখতে পারে কেউ দশটি মাত্র ভালো লাইন। কবিতা তো কেবল আবেগ জাগানো নয়, কবিতা হলো অভিজ্ঞতা। একটি কবিতা লিখবার জন্য দেখতে হয় কত শহর, কত মানুষ, কত বস্তু; জানতে হয় কত জীব, কত পাখির উড়াল, সকালের দিকে খুলে-যাওয়া ছোটো ছোটো ফুলের কত ভঙ্গি। ফিরে যেতে হয় অচেনা দেশের নানা পথে, আশাতীত কত দেখাশোনায়, অবশ্যম্ভাবী কত বিচ্ছেদে, কত অস্পষ্ট শৈশব দিনে, অসুখের দিনে, শান্ত আর নিভৃত কোনো ঘরে, সমুদ্রের পাশে সকালের আলো, তারার সঙ্গে উড়ে যাওয়া কত নৈশ ভ্রমণ। মনে করতে হয় কত-না ভালোবাসার রাত, একের চেয়ে একেবারে ভিন্ন আরেকটি। বসতে হয় তাকে মুমূর্ষুর পাশে, জানালাখোলা ঘরে কোনো মৃতের পাশে। চাই এই সব কিছুর সমবেত স্মৃতি, আবার এসব ভুলে যাবারও ক্ষমতা থাকা চাই। যখন রক্তের মধ্যে একেবারে মুছে যাবে এসব, একটির থেকে অন্যটিকে ভিন্ন করে চেনা যাবে না আর, তখনই এসে পৌঁছতে পারে দুর্লভতম কবিতার মুহূর্ত।

কী অপূর্ব এই অপেক্ষার বিবরণ! কোথাও বলা নেই, তবু বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই অপেক্ষার মধ্যে আছে গভীর ধ্যান ও মগ্নতা, আছে নিবেদন ও প্রেম। আর কবিতার জন্য অপেক্ষার এমন মনোমুগ্ধকর, এমন হৃদয়গ্রাহী, এমন ধ্যানস্থ বিবরণ যে দিতে পারে সে নিজে সেই অপেক্ষার স্বরূপ যে জানে, নিজেই যে অপেক্ষা করে ও রকমভাবে, সে কথা আর না বললেও চলে। সাধে কি আর শঙ্খ ঘোষকে আমার সন্ত বলে মনে হয়?

তো, মাল্টের কথা বলতে বলতেই এবার তিনি বলেন রিলকের সেই আশ্চর্য এলিজির কথা, কয়েক বছর পরেই যেগুলো রচিত হয়েছিল। দশটি এলিজি সম্পূর্ণ করতে দশ বছর সময় লেগেছিল তাঁরএত দিনের সমস্ত অভিজ্ঞতা, তাঁর দেখা এবং দর্শন ঘন হয়ে এসে রূপ নিল তাঁর দশ পর্বের ওই মহাগীতিকাব্যে। এবং এলিজিগুলির মধ্যে এসে মিশে গেছে তাঁর জীবন আর মৃত্যু বিষয়ের এক সর্বাঙ্গীণ বোধ।

পৃথিবীকে চমকে দেওয়া, পাঠককে গভীরভাবে আলোড়িত করা, সেই এলিজিগুলোতে কী আছে, তার কী যে অদ্ভুত সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ, না পড়লে বোঝা যাবে না। একটা উদ্ধৃতি দিই :

মৃত্যু রিলকের ভাবনায়, কোনো অবসান নয় তাহলে, যেন সেটা কোনো মানবোত্তীর্ণ অস্তিত্বও নয়। মৃত্যু যেন জীবনেরই এক চলমান এক স্তর। সেইভাবে দেখলে মানুষ তার মৃত্যুর অভিজ্ঞতাকে নিজেরই অন্তর্গত বলে জানতে পারে একদিন। যে-কোনো মানুষের মৃত্যু যেন আমারই এক টুকরো মৃত্যু, জীবন যে অন্তিমের জন্য প্রতীক্ষা করে আছে তার প্রস্তুতি হতে থাকে যেন এইসব মৃত্যুধারার মধ্য দিয়ে। মৃত্যু তখন আর ভয়ংকর হয়ে দেখা দেয় না রিলকের কাছে, সেটা হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সবচেয়ে বড়ো ঘটনা মাত্র।

যে-কোনো মানুষের মৃত্যু যেন আমারই এক টুকরো মৃত্যুকী সুন্দর এই কথাটি! জন স্ক্যালজির সেই কথাটি মনে পড়ে যায় বাক্যটি পড়ে@ When you lose someone you love, you die too, and you wait around for your body to catch up. আর এসব মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হতেই তো আমাদের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়ে যায় চির-অবসানের জন্য।

দশ

কিন্তু শুধু মৃত্যুচিন্তাই নয়, জীবনকে আস্বাদ করতে হয় জীবনের মধ্যে থেকেই। সে জন্য কিছু কাজও করার আছে আমাদের। সরল-শুভ্র জীবনের প্রতি শঙ্খ ঘোষের পক্ষপাতটি বারবারই প্রকাশিত হয়ে পড়ে। যখন তিনি দাতারামের কথা বলেন বা বলেন সান্ত্বনার কথা, সেখানে কোনো খ্যাতিমান শিল্পী-সাহিত্যিক-দার্শনিকের প্রসঙ্গ থাকে না বটে, কিন্তু উপলব্ধি করে ওঠা যায়, এই মানুষগুলোর জীবনকেই আদর্শ জীবনের একটা রূপ বলে ভাবেন তিনি। দাতারাম যে আসলে কে, তাঁর পরিচয়ও নেই। শান্তিনিকেতনবাসী তিনি, এইটুকু শুধু জানা যায়। বৃষ্টির মধ্যে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন কবি, দাতারাম মৃদু সাবধান করে দিয়েছিলেন তাঁকে, ভিজে যাবেন বলে। অবশ্য আশ্বস্তও করেছেন এই বলে, ভেজা বেশ ভালো, আমিও ভিজতাম আগে। পরের দিন যখন ফিরলেন কবি, তখন আবার সেই দাতারাম : ভিজলেন তো? ঠাণ্ডা লাগেনি তো? লাগে না বেশি ঠাণ্ডা। আর তা ছাড়া, আমি কাল বাড়ি ফিরে প্রার্থনাও করেছি আপনাদের জন্য, যেন ঠাণ্ডা না লাগে। এই হলো দাতারাম বাল্মীকি। এই কথোপকথনের পর কবি বলছেন, এই হলো আরেক রকম মানুষ। মানুষ, যেমন হতে পারত। মানুষ, যেমন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা এমন হলাম কেন?

হ্যাঁ, স্বল্প চেনা একজন মানুষের যেন ঠাণ্ডা না লাগে সে জন্য প্রার্থনায় বসতে পারে যে মানুষ, তার ভেতরে যে এক গভীর মায়াভরা মন আছে, ভালোবাসায় পূর্ণ হৃদয় আছে, তা কি আর বলে দিতে হয়? মানুষের তো অমনই হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। আমরা অন্য রকম হয়ে গেছি। কিন্তু ও রকম হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর বাসনা হয়তো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। রিলকের এলিজি আলোচনায় তাই কবি বলে ওঠেন

জীবনের ছিন্ন মুহূর্তগুলি গড়িয়ে যায় অনিশ্চয়ের দিকে, অর্থহীনতার দিকে, তুচ্ছতার দিকে। কিন্তু হয়তো আমরা কেবলই আমাদের প্রস্তুত করে রাখতে পারি, বহু যত্ন করে, ধুয়েমুছে রাখতে পারি মনের মাঝখানে একখানা ঘর, যাতে অপস্রিয়মাণ মুহূর্তগুলির মধ্যে হঠাৎ কখনো ছুঁয়ে যেতে পারি অন্তহীনকে। রিলকে বলবেন, এই প্রস্তুতিই হলো ভালোবাসা, এই প্রস্তুতিই আমাদের হয়ে ওঠা।

শঙ্খ ঘোষ ছাড়া আর কে পারেন এভাবে ভাবতে, এভাবে বলতে?

তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো না, এই অপূর্ণতা বয়ে বেড়াতে হবে বাকি জীবন। না হোক, তবু চাই, তিনি আরো অনেক বছর থাকুন আমাদের মধ্যে। যত দিন থাকবেন তিনি, আমার ভাবতে ভালো লাগবে, কোথাও না কোথাও আমার এক অদেখা আপনজন আছেন, যাঁকে সন্ত কবি বলে ভাবতে ভালো লাগে আমার।

ঈদ সংখ্যা ২০১৮- এর আরো খবর