English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

নবম ও দশম শ্রেণি

বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা

শামীমা ইয়াসমিন, প্রভাষক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা

  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সৃজনশীল প্রশ্ন

দ্বাদশ অধ্যায়

উদ্দীপক : কানাডার নাগরিক ডিকি বিশ্ববিখ্যাত একটি টেলিভিশন চ্যালেনের যুদ্ধ ও সংঘর্ষ শীর্ষক রিপোর্টের কাজ করে থাকেন। তিনি গত সপ্তাহে দক্ষিণ এশিয়ার একটি যুদ্ধের কারণ উল্লেখ করেন এভাবে দেশের মুসলিম অধ্যুষিত এবং দুটি অঞ্চলে বিভক্ত একটি অঞ্চলের হাতেই অন্য অঞ্চলের সব অর্থ-সম্পদ ব্যবহৃত হতো। শোষিত অঞ্চলের জন্য তাদের অর্জিত সম্পদ মাত্র ১৬ শতাংশ ব্যয় হতো। এ ধরনের বৈষম্যের কারণেই বৃহৎ দেশটি ভেঙে শোষিত অঞ্চলটি একটি স্বাধীন দেশে রূপ নেয়।

ক) আগরতলা মামলা দায়ের করা হয় কত সালে?

খ) মৌলিক গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়?

গ) ডিকির রিপোর্ট পাঠ্য বইয়ের যে দেশের যে যুদ্ধের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করে তার বর্ণনা দাও।

ঘ) ডিকির বর্ণিত কারণটি ছাড়াও অনেক কারণে বাংলাদেশের জন্মমতামত প্রদান করো।

উত্তর : ক) আগরতলা মামলা ১৯৬৮ সালে দায়ের করা হয়।

খ) জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পরিত্যাগ করে এক অদ্ভুত ও নতুন নির্বাচনকাঠামো প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন, যা মৌলিক গণতন্ত্র নামে পরিচিত। মূলত মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে এক ধরনের সীমিত গণতন্ত্র, যাতে শুধু নির্দিষ্টসংখ্যক লোকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অধিকার ছিল। ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তনের আদেশ জারি করা হয়। এই ব্যবস্থায় চার স্তরবিশিষ্ট একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল।

গ) ডিকির রিপোর্ট বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করে। ১৯৪৭ সালের পর থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সব পরিকল্পনা প্রণীত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানে। জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তানের তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রথমটিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ব্যয় ছিল যথাক্রমে ১১৩ কোটি ও ৫০০ কোটি রুপি, দ্বিতীয়টিতে ছিল ৯৫০ কোটি রুপি আর পশ্চিমের জন্য ১৩৫০ কোটি রুপি। দ্বিতীয়টিতে পূর্ব-পশ্চিমের জন্য বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ৩৬ ও ৬৩ শতাংশ। ১৯৫৬ সালে করাচির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় ৫৭০ কোটি টাকা, যা ছিল মোট সরকারি ব্যয়ের ৫৬.৪ শতাংশ। সে সময়ের পূর্বে সরকারের ব্যয় ছিল ৫.১০ শতাংশ। পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের পূর্বের ৫৪.৭ শতাংশ অবদান থাকলেও, পূর্বের জন্য বৈদেশিক সাহায্য ব্যয় করা হতো মাত্র ২৬.৬ শতাংশ। এভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক এক বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের সব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে পশ্চিমের ওপরই নির্ভর করে থাকতে হতো। যার ফলে পূর্বের রাজনৈতিক নেতারা এই বৈষম্য নিরসনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। যার চরম প্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে।

ঘ) উদ্দীপকে ডিকির বর্ণিত কারণটি হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনে রাজনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক বৈষম্য, সামরিক বৈষম্য প্রভৃতিও বিরাজমান ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে পশ্চিম পাকিস্তানের মুখাপেক্ষী রাখা হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভের পরও পূর্ব পাকিস্তানকে ক্ষমতার স্বাদ পেতে দেওয়া হয়নি। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন, ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র, ১৯৬২ সালে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে পূর্ব পাকিস্তানকে চরম রাজনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ হলেও তাদের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো না। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের ৪২ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে পূর্বে ছিল মাত্র দুই হাজার ৯০০ জন। ১৯৬৬ সালে গেজেটেড কর্মকর্তার মধ্যে আগের ছিল মাত্র এক হাজার ৩৩৮ জন। বিদেশে পাকিস্তানের ৬৯ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে ৬০ জনই ছিল পশ্চিমের। সামরিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের ১৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তার মধ্যে আগের ছিল মাত্র একজন। আইয়ুব খানের শাসনামলে ৬০ শতাংশ সামরিক বাজেটের বৃহদাংশই পশ্চিমের জন্য ব্যয় করা হতো। সুতরাং বলা যায়, ১৯৭১ সালে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, এর পেছনে অন্য অনেক কারণ তথা সামরিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যও দায়ী ছিল।

পড়ালেখা- এর আরো খবর