English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

হরর ক্লাব

দিঘির পারের ঘটনাগুলো

কেউ বলে মনগড়া, কেউ বলে সত্য। চাঁদপুরের মতলবের পশ্চিম পিংড়া এলাকার প্রধানিয়া বাড়ির দিঘির পার ঘিরে অদ্ভুতুড়ে কিছু গল্প জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

আসার পথে দেখি, কয়েকটি গরু দৌড়ে উত্তর দিকে যাচ্ছে। আমি তো অবাক। দেখলাম, আমাদের দুটি গরুও ওই দলে আছে। চোখের পলকেই দেখি, ওরা শূন্যে ভাসছে

দিঘির একপাশে বাড়ি অন্য পাশে উঁচু জায়গা। সেখানে একসময় মেহগনির বাগান ছিল। পারে খেজুরগাছও আছে। বাড়ির বিপরীত দিকের পারে ঝোপঝাড়ও রয়েছে কিছু কিছু। দিঘির পারে আবার একটি কাছারিঘরও আছে। ২০-২১ বছর আগে নাকি নিয়মিতই জিন-ভূতের দেখা মিলত। এখনো টুকটাক ঘটনার কথা শোনা যায়। তবে আগের মতো গা ছমছমে ভাবটা কমে এসেছে অনেকটাই।

চারদিকে বিল। মাঝখানে দিঘি ও বাড়ি। আগে একা গেলে ভয়ে গায়ে কাঁটা দিত যে কারোর। তবে এখন ঝোপঝাড় কম হওয়ায় ভয় কমেছে। বাড়িটার পাশেই বকাউলবাড়ি। সেখানকার বাসিন্দা রিয়াদ বকাউল বলেন, দাদার কাছে একবার একটা গল্প শুনেছিলাম এই দিঘি নিয়ে। বিশ-একুশ বছর আগের ঘটনা। তখন এটা নতুন বাড়ির দিঘি নামে পরিচিত ছিল। সেখানে তখনো ঘরবাড়ি ওঠেনি। দিঘিটা ছিল বিলের মাঝ বরাবর। দুই পাশে ভিটা। তখন নাকি আশপাশের বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে দিঘির পারে বাসনকোসন উঠত। পরে লোকজন ওই বাসনকোসন দিয়েই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করত। তবে একবার ঘটে বিস্ময়কর ঘটনা। পাশের বাড়ির এক অনুষ্ঠানে বাসন নিলেও পরে আর সেগুলো ঠিকমতো দিঘির পারে এনে রেখে দেয়নি। ওই ঘটনার পর থেকে বাসন ওঠা বন্ধ হয়ে গেল। অনেকেই এগুলোকে মনগড়া ঘটনা বলে।

রিয়াদ আরো জানালেন, দিঘির পারে আগে মেহগনির বাগান ছিল। এখন নেই। সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। একদিন সন্ধ্যায় আমি বাগানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি ছোট ছেলে দেখতে পেলাম। আমি ভাবলাম, ও এই নিরিবিলি এলাকায় কী করে। ছেলেটাকে চিনতেও পারছিলাম না। একটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখি, ছেলেটা গায়েব! আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। তবু সাহস করে পুরো বাগান খুঁজতে থাকি। কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি। পরে মনে হলো, মনের ভুল হয়তো। কিন্তু না! বাগান থেকে বের হওয়ার সময় দেখি, কে যেন দৌড় দিচ্ছে। দৌড়ের শব্দ পেলাম। কিন্তু কিছু দেখতে পেলাম না। আমার বুঝতে বাকি রইল নাএটা অশরীরী কিছুর কাজ। এরপর দেরি না করে দ্রুত বাড়ি চলে যাই। তবে এখন আর ওখানে ভূতটুত কেউ দেখে না। গভীর রাতেও অনেকে হেঁটে যায়। তবে কারো সমস্যা হতে শুনিনি।

স্কুলপড়ুয়া ইমনের কাছ থেকে শোনা গেল আরেক ঘটনা। সে জানায়, দিঘির পারে একটা কাছারিঘর আছে। আমরা আগে এখানকার মক্তবে পড়তাম। তখন আমি ক্লাস ওয়ানে। আমাদের এক বৃদ্ধ হুজুর ছিলেন। মাঝেমধ্যেই হুজুর বলতেন, তিনি নাকি জিন-পরিদের অবস্থান বুঝতে পারতেন। রাতের বেলায় কাছারিঘরের চালে ঢিল পড়ত। প্রথম প্রথম ভাবতেন, আম হয়তো। তখন আবার আমের সিজন ছিল। কিন্তু না। আমের মৌসুম যাওয়ার পরও ঢিল পড়া বন্ধ হলো না। তারপর আমাদের ওই হুজুর যত দিন ওখানে ছিলেন, প্রায় প্রতি রাতেই টিনের চালে ঢিলের শব্দ পেতেন। এখন ঢিলের শব্দ পাওয়া না গেলেও কাছারিঘরটি জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বাড়ির মানুষ জিনিসপত্র রাখার কাজে ওটাকে ব্যবহার করে।

এলাকার ষাটোর্ধ্ব কৃষক রহিম জানালেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন গরু মাঠে চরানোর দায়িত্ব ছিল। এদিকে তখন নতুন বাড়িতে দীঘির পারের ভিটায় ঘাস ছিল প্রচুর। আমরা সব সময় গরু ছেড়ে দিয়ে ঘাস খাওয়াতাম। গরুগুলোও ঘাস খেয়ে ফিরে আসত। কিন্তু একদিন রাত ১০টার মতো বেজে গেলেও গরুগুলো ফেরত আসেনি। আমার আব্বা আমাকে বলল, দেখ তো গরু কই। আমি হারিকেন নিয়ে দীঘির পারে আসি।

ওমা! আসার পথে দেখি কয়েকটি গরু দৌড়ে উত্তর দিকে যাচ্ছে। আমি তো অবাক। দেখলাম, আমাদের দুটি গরুও ওই দলে আছে। চোখের পলকেই দেখি, ওরা শূন্যে ভাসছে! আমি ভয় পেয়ে যাই। একটু অপেক্ষা করে আবার দীঘির পারে গিয়ে দেখি, আমাদের গরুগুলো ওখানেই ঘাস খাচ্ছে। আমি তখন আরো ভয় পেয়ে যাই। এরপর ভাবলাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গরু নিয়ে বাড়ি ফেরাই উত্তম। হুট করে মনে হলো, এগুলো আসলেই গরু তো? আমাদের গরুগুলো দিয়ে জমিতে চাষ দিতাম। ওগুলোর কাঁধে দাগ ছিল। ঘাস খেতে থাকা গরুগুলো পরখ করে দেখি দাগ আছে কি না। দাগ দেখে নিশ্চিত হই যে এগুলো আমাদেরই গরু। কিন্তু তখন দৌড়ে যাওয়া ও ভাসতে থাকা গরুগুলো কী ছিল, সেটি আজও রহস্য।

এলাকার শরীফ প্রধানিয়া বলেন, ছোটবেলায় দাদা-দাদির কাছ থেকে এখানকার ভূতের গল্প শুনতাম। একবার দাদা মাছ ধরতে নেমেছিলেন দীঘিতে। জাল ফেললেন। হঠাৎ বুঝতে পারলেন, জালটা অস্বাভাবিক ভারী হয়ে যাচ্ছে। যেখানে সাধারণত মাছের দেখাই পাওয়া যেত না, সেখানে তিনি কিনা জালের টানে দাঁড়াতেই পারছিলেন না! তারপর জাল টানতে থাকলেন দাদা। শেষমেশ পারে তুলে দেখলেন, জালে একটি মরা বিড়াল। আবার একদিন আমি রাতে দিঘির পারের খেজুরগাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামাতে গিয়েছিলাম। তখন বোধ হয় ক্লাস থ্রিতে পড়ি। গাছে উঠে হাঁড়ি নামাই। দেখি হাঁড়িভর্তি রস। হাঁড়িটা এক জায়গায় রেখে আরেক গাছে উঠি রস নামাতে। ওটা থেকে নামার পর দেখি, আগের হাঁড়িতে এক ফোঁটা রসও নেই। বিষয়টি বুঝতে পেরে ওখান থেকে দ্রুত চলে আসি।

দলছুট- এর আরো খবর