English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

‘লক্ষ্যে অটুট থাকলে সফলতা আসবেই’

  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

শাবাব লেদার-এর কর্ণধার মাকসুদা খাতুন। শিক্ষকতা দিয়ে শুরু ক্যারিয়ার। মাঝে বছর দুই বায়িং হাউসে এবং পরে লেদার নিয়ে কাজ করেন। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা, সাহস ও সঞ্চয় জুগিয়ে নিজেই গড়ে তোলেন শাবাব লেদার কারখানা। এর পর খুলেছেন শোরুম। করেছেন অনেকের কর্মসংস্থানও। তাঁর সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন ফরহাদ হোসেন

বাবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জে হলেও বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। ২০০৮ সালে অনার্স পড়ার সময়ই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। বিয়ের পরে চলে গেলাম স্বামীর সংসারে। সেখানে গিয়ে সমাজের আর দশটা মেয়ের মতো শুরু হলো সংসার সামলানোর কাজ; কিন্তু তাই বলে শিক্ষাজীবনের যবনিকা টানিনি। পড়ার পাশাপাশি সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য চাকরি নিলাম স্কুল শিক্ষক হিসেবে। শেষ করলাম স্নাতকোত্তর পর্বের পড়াশোনা। মাঝে কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান। ইচ্ছা ছিল ব্যাংকার হওয়ার। সে জন্য পড়াশোনাও করি বিজনেস বিষয়ে। নানা কারণে আর ব্যাংকে চাকরি করা হয়ে ওঠেনি। এর পর শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে শুরু করলাম একটা বায়িং হাউসের চাকরি। সেখানে ছিলাম বছর দুয়েক। সেটা ছেড়ে যোগ দিই লেদারের পণ্য তৈরির একটি কম্পানিতে। সেখানে তৈরি হতো লেদারের ব্যাগ, বেল্টসহ নানা পণ্য। সেসব পণ্য বিদেশেও রপ্তানি হতো। সুযোগ পাওয়ায় সেখান থেকেই শেখা হয় নানা কাজ। কিভাবে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, কিভাবে পণ্যের ডিজাইন করা হয় কিংবা ফাইনাল ফিনিশিংটাই বা কী করে দিতে হয় ইত্যাদি। যতই দিন যেতে থাকল কাজ শেখা ও বোঝার বিষয়টা ততই পাকাপোক্ত হতে থাকল। একটা সময়ে এসে মালিকের সঙ্গে বায়ারদের বনিবনা না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেল সেই কারখানা। কিন্তু তাতে নিজে তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। যেহেতু এই কাজটা ভালো করেই জানাশোনা, তাই ভাবনাজুড়ে ঘুরেফিরে এটাই আসত। আমার স্বামীও কাজটার বিষয়ে জানতেন। তাঁরও লেদারের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। জেনে-বুঝেই তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করলাম। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইলাম। তিনি অমত করলেন না। বলতে পারা যায় অনেকটা সাহস দিলেন। সেই ভাবনা থেকেই নিজের হাতেই ২০১৭ সালের শুরুর দিকে ঢাকার হাজারীবাগে নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটা কারখানা চালু করি। আসলে লেদারের প্রডাক্ট তৈরি করতে গেলে শুরুতে বেশ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। সেটা শুরু করতেই হিমশিম খেতে হয়েছে আমাকে। জমানো যা ছিল সেটা তো আছেই, তার পরও নিজের গহনা বিক্রি করে, অন্যের কাছ থেকে ধারকর্জ করে, সেই টাকা দিয়ে ধীরে ধীরে কেনা হয় নানা ধরনের মেশিনপত্র। পুরো চালু করতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়।

আমাদের দেশে যেকোনো উদ্যোক্তাকেই নানা ঘাত-প্রতিঘাত সয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আমার বেলায়ও এর ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। আর উদ্যোক্তা যদি হয় নারী। তবে তো কোনো কথাই নেই, হাজারো প্রতিকূলতা তাকে ঘিরে ধরবে। লেদার নিয়ে কাজ করে খুব কম মেয়েই। এখানকার পরিবেশ এখনো নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। সময়ে সময়ে সামাজিক নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হতো। তারপর তো বিনিয়োগ, দক্ষ কর্মীর খোঁজ করা, নতুন নতুন ডিজাইন আনা, কাস্টমার ডিলিং, নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করাকম কষ্টের ছিল না। একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য এগুলো অনেক বড় চ্যালেঞ্জের কাজ। তার পরও নিজেকে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে স্বামী, সন্তান, সংসার গুছিয়ে কাজ করতে হয়েছে বা এখনো হচ্ছে।

তবে আগের লেদার ও বায়িং হাউসে কাজের লব্ধ অভিজ্ঞতা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। একই কাজে অভিজ্ঞতা থাকায় নতুন অনেক উদ্যোক্তার চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থেকেই আমার কাজটা গুছিয়ে নিতে পেরেছি। সেখানের অন্যদিকে যখন সামাজিক বাধাগুলো ঘর থেকে তৈরি হয়, সেটা একজন উদ্যোক্তার অনিশ্চয়তা তৈরি করে। তবে এ ক্ষেত্রে আমি সৌভাগ্যবান। কারণ আমার স্বামী সব সময় আমার পাশে থেকেছেন। শুরুর দিকে পরিবারের অনেকে নানা কটু কথা বললেও এখন আমার সাফল্য দেখে সবাই বাহবা দেয়। এটাও আমার কাছে এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

আমার শুরুটা খুব বেশিদিনের নয়। তার পরও প্রতিদিনই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ভালো করার। আমার কারখানায় লেদারের নানা ধরনের পণ্য তৈরি করা হয়। লেডিস ব্যাগ, জেন্টস ব্যাগ, অফিস ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, ওয়ালেট, মানিব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটসহ নানা পণ্য। ক্রেতার চাহিদার ওপর সব সময় নজর রাখি। এতে একটু একটু করে সাফল্য আসছে। কারখানার পর এ বছরের শুরুর দিকে জিগাতলার হাজারীবাগ এলাকায় একটি শোরুম দিয়েছি। বেশ কিছু অনলাইন আমার তৈরি পণ্য বিক্রি করে। বিশ্বখ্যাত লেদার ব্যাগ উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান আমার তৈরি পণ্য নিয়ে যায়। বেশ কিছু করপোরেট অফিসও আমার কাছ থেকে পণ্য নিয়ে যায়। ঢাকায় বিভিন্ন সময় আয়োজিত এসএমই মেলাগুলোতে নিয়মিত অংশ নিই। এতে ভালো অর্ডার আসে। বলা চলে মেলায় অংশগ্রহণ করলে বেশ রেসপন্স পাওয়া যায়। তা ছাড়া ফেসবুক পেজেও (www.facebook.com/pg/shabableather) বিক্রি হয় আমার পণ্য। এ ছাড়া জাপান, ফ্রান্স, গ্রিস, কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আমার পণ্য যায়। অনেক পরিশ্রম হলেও স্বল্প সময়ে ব্যবসার বিস্তৃতি এগিয়ে যাওয়ার পথে কম কিসে।

তাঁর ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাকসুদা বলেন, আমি জানি কোনো প্রতিষ্ঠানে শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই সাফল্য আসে না, বিনিয়োগ করতে হয় সময়, নিষ্ঠা ও দক্ষতা। শাবাবকে আমি দেশের অন্যতম সেরা লেদার ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করাতে চাই, যার তৈরি পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের আরো অনেক দেশে সুনাম কুড়াবে। নিজে স্বাবলম্বী হতে চেয়েছি, চেয়েছি আরো অনেকের কাজের সুযোগ করে দিতে। আজকে সেটা আমি করতে পেরেছি। এখন আমার হাজারীবাগের কারখানায় নিয়মিত কাজ করে ৩০-৩৫ জন কর্মী। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পেরে আমি গর্বিত। ক্রমেই ব্যবসার আরো পরিধি বাড়াতে চাই। তখন আরো অনেকের কাজের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব হবে। প্রতি মাসে কর্মীদের বেতন-ভাতা, শোরুম ভাড়া, কারখানা ভাড়াসহ প্রায় লাখ চারেক টাকা খরচ হয়। তবে মাস শেষে লাভের অংশটাও নেহাত কম থাকে না। নতুনদের জন্য তিনি বলেন, লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হলে, সাফল্য আনতে হলে ধৈর্য ধরে এগোতে হবে। কাজকে ভালো বাসতে হবে। সময় দিতে হবে। শিখতে হবে। আমি মনে করি লক্ষ্যে অটুট থাকলে সফলতা আসবেই। এখানে নারী উদ্যোক্তাদের নানা সমস্যা আছে, থাকবেএসবের মাঝেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে হবে।

শাবাব লেদার কারখানায় পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকরা

শাবাব লেদার শোরুম

ঢাকা ৩৬০°- এর আরো খবর