English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

আমি নতুন মা

  • মারুফা মিতু   
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

মডেল : মা-আফরিন, ছেলে-আরহাম। ছবি : মঞ্জুরুল আলম

শুধু মা হওয়ার কারণে একজন তরুণী তাঁর জীবনের সবটা বিসর্জন দিয়ে একেবারে ঘরোয়া হয়ে যান। আর সেই আক্ষেপ তাঁর সারা জীবনই থাকে। আপনি মা হয়েছেন। অনেক পরিচয়ের সঙ্গে নতুন এক পরিচয় এটি। কিন্তু তাই বলে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দেওয়াটা ঠিক নয়। মাতৃত্ব এক অপার আনন্দ। সেই আনন্দের সঙ্গেই ঘুরেফিরে থাকুক প্রতিটি ক্ষণ

মাতৃত্ব নারীর চিরন্তন প্রত্যাশা। নারী মা হন। পরিপূর্ণ হন। কিন্তু আমরা দেখি যে আমাদের দেশে একজন তরুণী যখন মা হন, তখন তিনি তাঁর নিজস্ব সত্তা পুরোটাই ভুলতে বসেন। সারাক্ষণ সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এবং এই যে গাড়ি চলা শুরু করল একজন মায়ের তা আমৃত্যু চলে সন্তানের জন্য। শুধু একজন মা পরিচয়েই নারী কাটিয়ে দেন তাঁর পুরোটা জীবন। সন্তানকে শাসনে-সোহাগে আগলে রেখে, সারাক্ষণ তার ভালো-মন্দ ভাবনায় নারীর পার করতে হয় সময়। সারাক্ষণ সন্তানের দেখভাল করতে করতে নারী নিজেকে সময় দেওয়ার কথাটুকুও ভুলে যান প্রায়ই। তবে একজন নতুন মাকে সন্তানের ভালোর জন্যই নিজের যত্নে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।

সচেতনতা প্রসব-পরবর্তী সময়ে

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের গাইনি ও অবস বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফারহাত হোসেন জানান, প্রসব-পরবর্তী সময়ে বারবার প্যাড পরিবর্তন করে পরিষ্কার থাকা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা দুর্গন্ধযুক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ জীবাণু সংক্রমণের লক্ষণ বিষয়ে সচেতন থাকা, বারবার প্রস্রাব করে মূত্রথলি খালি রাখা এবং যাঁদের প্রসব স্থানে সেলাই দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মাঝেমধ্যে কুসুম গরম পানিতে হিপ বাথ নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে নজর রাখতে হবে। শিশুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সঠিকভাবে স্তন্যপান শুরু করানো এবং স্তনের সঠিক যত্ন নেওয়া, স্তন পরিষ্কার রাখা ইত্যাদি শিখে নেওয়া উচিত। পায়ে পানি থাকলে বেশির ভাগ সময় পা উঁচু করে ঘুমালেই তা চলে যায়। স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে দেড় মাস এবং সিজারের ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস ভারী কিছু ওঠানো বা ভারী কাজ নিষেধ। প্রসবের পর সঠিক জন্মবিরতি সম্পর্কেও জ্ঞান থাকতে হবে মায়েদের। যাঁদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ ছিল, তাঁদের সঠিক সময়ে আবারও চেকআপ করিয়ে নিতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম ও পরিচ্ছন্নতাজ্ঞান এ সময়ে সুস্থ থাকার জন্য খুবই জরুরি।

কেমন হবে খাবারদাবার?

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় একজন মায়ের গর্ভকালের চেয়েও বেশি ক্যালরির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই বাড়তি ক্যালরি আসবে মূলত প্রোটিন বা আমিষ থেকে, শর্করা বা ফ্যাট থেকে নয়। এমনটাই জানালেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ আখতারুন্নাহার আলো। তিনি আরো বলেন, প্রতিবার স্তন্যপান করানোর আগে-পরে প্রচুর পরিমাণে পানি ও জলীয় পদার্থ খাওয়া উচিত। সারা দিনের এই তরলে পানি ছাড়াও দুধ, স্যুপ, ফলের রস, ঝোলের তরকারি ইত্যাদি থাকতে পারে। কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখা এবং ভিটামিনের অভাব পূরণের জন্য প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। ক্যালসিয়াম বেশি আছে ছোট ও গুঁড়া মাছ, শুঁটকি মাছ, ডাল ও দুধে। আয়রন আছে কাঁচকলা, কচু, কচুশাক, বিট, পুদিনাপাতা, ধনেপাতা ইত্যাদিতে। টক ফলে আছে ভিটামিন সি, যা আয়রন রক্তে মিশতে সাহায্য করে। ফাস্টফুড, কোমলপানীয়, ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত শর্করা খেলে ওজনই বাড়বে শুধু, কিন্তু পুষ্টিমান রক্ষা হবে না। তাই পুষ্টিকর খাবার খান, অতিরিক্ত খাবার নয়।

ওজন কমুক সময় নিয়ে

গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্ম নেওয়ার পর মেয়েদের ত্বকে কিছু পরিবর্তন আসে। এর অন্যতম হলো স্ট্রেচমার্ক ও মেলাজমা বা প্রেগন্যান্সি মাস্ক পড়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের ছন্দ ফিরে এলে এগুলো অনেকটাই কমে আসে; তবে কিছু ঘরোয়া উপায় সাহায্য করতে পারে। সন্তান জন্ম নেওয়ার পাঁচ-ছয় মাস পর থেকে চুল পড়া শুরু হতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই সন্তান জন্ম নেওয়ার আগে থেকেই মাসে দুবার করে নিয়মিত মাথার ত্বক ম্যাসাজ করাতে পারেন; এতে চুলের গোড়ায় রক্তসঞ্চালন নিয়মিত থাকবে। বেশি চুল পড়তে শুরু করলে চুল কেটে ছোট করে নিলেই ভালো হয়।

বাচ্চার বয়স দেড় থেকে দুই মাস হলে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শুরু করুন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর খুব শক্ত ব্যায়াম ও খাবার নিয়ন্ত্রণ করে অতিদ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলার চেষ্টা না করাই ভালো। কেননা, তাতে চর্বি ভেঙে শরীরে ও বুকের দুধের সঙ্গে এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হতে থাকে। তাই শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, ধীরে ধীরে ওজন কমানো।

পাশেই থাকুক স্বামী-পরিবার

প্রসবের পর পোস্ট পারটাম ব্লু বা বিষাদে আক্রান্ত হন এমন মেয়ের সংখ্যা খুব কম নয়। হরমোনের আকস্মিক ওঠানামা, শারীরিক পরিবর্তন, নতুন জীবনযাপন প্রণালীর সঙ্গে অনভ্যস্ততা, ঘুমের ব্যাঘাত ইত্যাদি এর সঙ্গে জড়িত। এতে মা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, মন খারাপ করে থাকেন, অবসাদ ও বিষাদগ্রস্ত থাকেন, যখন-তখন কান্না পায়, কখনো খিটখিটে হয়ে পড়েন। হরমোনের ছন্দ ঠিক হয়ে গেলে আপনা-আপনি এগুলো ঠিক হয়ে যায়। এই সময়টাতে পরিবারের প্রতিটি মানুষের নতুন মায়ের পাশে থাকা জরুরি, বিশেষ করে স্বামীর। নতুন মায়ের খাবার, ঘুম, শিশুর যত্ন-আত্তিসহ সব কিছুতে স্বামীকে তাঁর স্ত্রীর পাশে থাকা একান্ত জরুরি। কেননা একজন স্বামীই নারীর প্রকৃত বন্ধু। নারীর নতুন মা হওয়ার এই সময়ে স্বামীর প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর পাশে থাকা জরুরি। খাবারদাবার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে মানসিক সঙ্গ, তাঁকে খুশি রাখা স্বামীর কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সেই সঙ্গে পরিবারের সবারই এ বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। যদি তা না হয় এবং আরো কিছু খারাপ লক্ষণ দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

আনন্দময় জীবন

সময়ের ক্যালেন্ডার ঘুরে এমন পরিবর্তন আসেই মায়ের জীবনে। শুধু মা হওয়ার কারণে একজন তরুণী তাঁর জীবনের সবটা বিসর্জন দিয়ে একেবারে ঘরোয়া হয়ে যান। আর সেই আক্ষেপ তাঁর সারা জীবনই থাকে। আপনি মা হয়েছেন, এটা আপনার একটি পরিচয়। অনেক পরিচয়ের সঙ্গে নতুন এক পরিচয় এটি। কিন্তু তাই বলে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দেওয়াটা ঠিক নয়। মাতৃত্ব এক অপার আনন্দ। সেই আনন্দের সঙ্গেই ঘুরেফিরে থাকুক প্রতিটি ক্ষণ। কিন্তু সমাজের আর দশটা ঘটনার মতো মা হওয়ার এই সময়টাকে ইতিবাচকভাবেই নেওয়া উচিত। উপভোগ করা উচিত মাতৃত্বের পুরোটা সময়।

ঢাকা ৩৬০°- এর আরো খবর