English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ঢাকার অপরাধ

কেন কমছে না জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসা?

  • ঢাকা ৩৬০ ডিগ্রি প্রতিবেদক   
  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

পড়ন্ত বেলা কিংবা সন্ধ্যায় হেঁটে কিংবা রিকশায় কেউ যদি জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় যান, তাহলে আচমকা ডাক বা ইশারা পাওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। একটু নির্ভার হয়ে কাছে এগিয়ে গেলে ইশারাদাতা জিজ্ঞেস করবে, কী চাই আপনার? আপনি যা চাইবেন তা-ই পাবেন! নেশার জগতের এমন কিছু নেই, যা জেনেভা ক্যাম্পে মিলবে না।

রাজধানী ঢাকার যে কয়েকটি স্পট মাদকের জন্য পরিচিত, তার মধ্যে একটি হলো মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। মুক্তিযুদ্ধের সময় আটকে পড়া অর্ধলাখ অবাঙালির বসবাস এখানে। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই এলাকা পরিণত হয়েছে মাদকের আখড়ায়।

মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে গত মাসে জেনেভা ক্যাম্প থেকে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কোনো এক মাদক স্পট থেকে এত সংখ্যক মানুষ আইনের আওতায় আনার ঘটনা এটিই প্রথম। মাদক বিক্রি কমাতে জেনেভা ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। অভিযানে মাদক বিক্রি কয়েক দিন বন্ধ থাকলেও দিন গড়াতে অবস্থা আবার আগের মতো হয়ে গেছে। নানা চেষ্টার পরও এখানকার মাদক ব্যবসা থামছে না। জেনেভা ক্যাম্পের এই অন্ধকার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? কোন পথ ধরলে মাদকের সর্বনাশ থেকে মুক্তি পাবে যুবসমাজ?

দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় বাংলাদেশের অধিবাসী হিসেবে ভারতের বিহারিরা পাকিস্তানের আনুগত্য পোষণ করে। এ কারণে প্রায় ৩০ হাজার বিহারিকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শরণার্থীশিবিরে বন্দি রাখা হয়। কেটে গেছে ৪০ বছরের বেশি সময়। ২০০৩ সালে তাদের বেশির ভাগকেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তবে বঞ্চিত রাখা হয় রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে। এরই ফলে এ ক্যাম্পে বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে অঘোষিত মাদক ব্যবসার সাম্রাজ্য! প্রতিনিয়ত এখানে জন্ম নিচ্ছে ছোট-বড় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী। মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িতরা বলছে, তারা জেনেভা ক্যাম্পে বসবাস করলেও নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের অনেকেই লেখাপড়া জানে না, আবার কেউ লেখাপড়া করলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। জীবিকার তাগিদে তারা ঝুঁকি জেনেও বেছে নিয়েছে মাদক বিক্রির মতো পেশা।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা তথা সন্ত্রাস সৃষ্টি হওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। একদিকে নির্দিষ্ট একটা স্থানে বেড়ে উঠছে অসংখ্য মানুষ, অন্যদিকে এসব মানুষের জন্য নেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করার মতো সহজলভ্য কোনো পেশা। সেই সঙ্গে তাদের খেলাধুলাসহ চিত্তবিনোদনের জন্য নেই কোনো মাধ্যম। যে কারণে অল্প পুঁজিতে বেশি লাভবান হতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মাদক ব্যবসাকেই বেছে নিচ্ছে। আবার তাদেরই কেউ কেউ দৈন্যের মধ্যে বেড়ে ওঠায় বিষণ্নতা কাটাতে মাদক সেবন করে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, অপরাধীকে শাস্তির চেয়ে তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পুনর্বাসন। যেটি সারা বিশ্বে করে থাকে। জেনেভা ক্যাম্পের পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্তত মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য এটা দরকার।

মাদক বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছে, তারা জীবিকা নির্বাহ করতে অনেকটা বাধ্য হয়েই নিজেদের এ পেশায় জড়িয়েছে। এমনকি প্রতিনিয়ত ক্যাম্পের সদস্যরা এ পেশায় জড়াচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত থাকায় সংসার চালানো এবং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার তাগিদই তাদের এ পেশায় জড়িত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের মতে, এ ক্যাম্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিটি পরিবার মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আর এর মূল কারণ হিসেবে তারা সরকারের নীতিনির্ধারকদের দায়ী করছেন।

জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন্সের (এসপিজিআরসি) সভাপতি আব্দুল জব্বার খান বলেন, এরা যদি স্থায়ীভাবে কর্মে ঢুকতে পারে, তাহলে মাদক বিক্রির প্রবণতা কমে আসবে। ক্যাম্পে বসবাসকারীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জরুরি। তিনি আরো বলেন, কেউ তো নিজ ইচ্ছায় খারাপ কাজে জড়াতে চায় না। মাদক বিক্রি বন্ধ করতে হলে জেনেভা ক্যাম্পে কর্মসংস্থান জরুরি। সবাইকে কাজের সুযোগ দিতে হবে। গত রমজানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সৌজন্য সাক্ষাতে গেলে তিনি আমাদের বলেছেন, আমাদের এ ক্যাম্পে বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করবেন। প্রতিটি পরিবারকে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করে দেবেন। আমরা কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করে দেব। আমরা বলেছি, ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এখন পর্যন্ত পুনর্বাসনের কোনো লক্ষণ দেখতে পাইনি।

তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, এখানে অনেক ছেলে আছে, যারা বিএ, এমএ পাস করা। কিন্তু তাদের কোথাও সরকারি চাকরি হয় না। আমার তিনটি ছেলেও গ্র্যাজুয়েশন করা। কিন্তু সরকারি চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ নেই। কারণ আমরা বাঙালি নই, এটি যেন আমাদের অপরাধ। অথচ আমরা মনেপ্রাণে বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করেছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, এখানে এমন কোনো পরিবার নেই যে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাদক বিক্রি করে না, কিংবা মাদক সেবন করে না। পুলিশ-র্যাব অভিযান চালালে মাদক বিক্রি বন্ধ হয়; কিন্তু কয়েক দিন পর অবস্থা আবার আগের মতো হয়ে যায়। আমাদের পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাদক ব্যবসা করতে হয়। কারণ আমরা রাষ্ট্রের কোনো সুবিধা পাই না। অন্য এক বাসিন্দা বলেন, সরকার আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছে। সেখানে আমাদের ঠিকানা লেখা হয়েছে জেনেভা ক্যাম্প। কোনো হোল্ডিং নম্বর, বাসা নম্বর নেই। এ কারণে কোথাও চাকরি করতে গেলে, লাইসেন্স করতে গেলে আমাদের তা দেওয়া হয় না।

তেজগাঁও জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, জেনেভা ক্যাম্পকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্যাম্পের ছোট একটা পরিসরে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে তাদের জন্য জীবনধারণের উপযোগী কোনো পরিবেশ নেই। খেলাধুলার সুব্যবস্থা নেই, কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কাজেই মাদক হচ্ছে তাদের একমাত্র অবলম্বন। তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পের সমস্যাটা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। এখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সামাজিকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে।

ঢাকা ৩৬০°- এর আরো খবর