English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ইতিহাসের খেরোখাতা

অযত্ন-অবহেলায় নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থাবলি

  • হোসাইন মোহাম্মদ জাকি   
  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

নর্থব্রুক হল (১৮৯০)

প্রাচীন ঢাকার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নর্থব্রুক হল এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ-ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক ঢাকায় এক সফরে এসেছিলেন। এই সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁর নামে এই হলটি নির্মাণ করা হয়। হলটি নির্মাণে সর্বমোট ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। ১৮৭৪ সালের ১৬ জুলাই নবাব খাজা আব্দুল গনির বাসভবন আহসান মঞ্জিলের এক সভায় এই উদ্যোগের সূচনা। ওই সভার রেজল্যুশন হতে দেখা যায়, সভায় হলের সঙ্গে একটি গণপাঠাগার নির্মাণের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেখানে উপস্থিত গণ্যমান্যদের মধ্য থেকে এ জন্য অর্থদানের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়। ১৮৭৯ সালে হল নির্মাণের কাজ শেষ হলেও মহারানী ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে ১৮৮০ সালের ২৪ মে ঢাকার কমিশনার নর্থব্রুক হলের দ্বার উদ্ঘাটন করেন। ১৮৮০ সালের ২৫ জুন জুডিশিয়াল বিভাগের সেক্রেটারিকে লেখা কমিশনারের এক চিঠিতে যার প্রমাণ মেলে। ১০০ কনস্টেবলসহকারে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর ফৌজি কায়দায় কমিশনার সাহেবকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ১৮৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নর্থব্রুক হলের লাগোয়া ভবনে যুক্ত হয়েছিল একটি গণপাঠাগার। নামকরণ করা হয়েছে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনসনের নামে। ১৯০৯-১৯১০ সালে তিনি ঢাকার কমিশনারও ছিলেন। লাইব্রেরির গায়ে অদ্যাবধি

JOHNSON HALL নামাঙ্কিত রয়েছে। লাল ইটে তৈরি বলে স্থানীয়ভাবে এটি লালকুঠি লাইব্রেরি নামেও পরিচিত। এটিই ঢাকার সবচেয়ে পুরনো গ্রন্থাগার। ১৮৮৮ সালে এই লাইব্রেরির জন্য বিলাত থেকে ৬০০ টাকার বই আনানো হয়। নবাবসহ সেকালে ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার শ্রেণি যাঁদের পুস্তকাদি ও আর্থিক দানের পরিপ্রেক্ষিতে এই গ্রন্থাগারের সূচনা, তাঁদের নামাঙ্কিত কিছু আলমারি ও বইয়ের পাতায় তাঁদের সিলমোহর আজও গ্রন্থাগারটিতে বিদ্যমান রয়েছে। নর্থব্রুক হল ও সংলগ্ন লাইব্রেরির দরজা, জানালা ও দেয়ালের নকশা ইউরোপিয়ান কায়দায় আর মুসলিম স্থাপত্যের সঙ্গে মিল রেখে গম্বুজের নকশা করা হয়েছে। নির্মাণের পর নর্থব্রুক হল থেকে বুড়িগঙ্গা নদী দেখা যেত। তবে ১৯৩০ সালের আগেই এখান থেকে নদী দেখার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ৩৬৫টি আসনের হলরুমে নাটক ছাড়াও বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার করা হতো। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গ বিভাগ কার্যকর ঘোষণার দিন এই হলে নবাব সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলমান সমিতি গঠিত হয়। প্রবেশ পথের স্মৃতিফলকে দেখা যায়, ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভা সংবর্ধনা দেয়। ১৯৫০ সালের দিকে নর্থব্রুক হল ব্যবহৃত হয়েছিল টেলিগ্রাফ অফিস, পরে কিছুদিন সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ হিসেবে। এর পর এর কর্তৃত্বভার গ্রহণ করেছিল ঢাকা পৌরসভা। ষাটের দশকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখানে নাটক হতো। বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রবীর মিত্র নিয়মিত এখানে নাট্যচর্চা করতেন। এখান থেকেই তিনি সিনেমায় এসেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে হলটি অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। সংস্কারের অভাবে এরই মধ্যে এর অভ্যন্তরীণ সরঞ্জামাদি সবই নষ্ট হয়ে গেছে।

বর্তমানে নর্থব্রুক হল ও সংলগ্ন লাইব্রেরিটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঘোষিত সংরক্ষিত ঐতিহ্য। এটি পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে অবস্থিত। এর দেখভালের দায়িত্ব এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। JOHNSON HALL-এর লাইব্রেরিটিতে ১২টি কাঠের আলমারি ভর্তি বই। এখানে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক বই সাজানো নেই। রানি ভিক্টোরিয়ার চিঠি থেকে শুরু করে এই লাইব্রেরিতে আছে বিলাতের ইতিহাস, সিপাহি বিপ্লব, প্রতাপশালী ব্রিটিশ শাসকদের জীবনী, ভারতবর্ষের সীমানা নির্ধারণ কমিটির প্রতিবেদন ও ইংরেজি সাহিত্যের নানা বই, যার বেশির ভাগ ইংরেজি ভাষায় এবং দুষ্প্রাপ্য। শ দুয়েক বাংলা বইও আছে। সেগুলোও শত বছরের পুরনো। একেকটি গ্রন্থ একেকটি ঐতিহাসিক সত্যকে ধারণ করে আছে। একসময় গবেষণা ও রেফারেন্স পুস্তক কলকাতা, আগরতলা এমনকি পাটনার খোদাবক্স লাইব্রেরিতে পাওয়া না গেলেও সেটা নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিতে পাওয়া যেত। শুরুতে এই লাইব্রেরিতে ২২-২৩ হাজার বই থাকলেও বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় অনেক বই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে শত শত মূল্যবান বই, জার্নাল, পত্রিকা উইয়ের পেটে গেছে। ছাদের ফাটল দিয়ে পানি পড়ে অনেক বই নষ্ট হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দালানটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে। দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়ালে একটি সাইনবোর্ড সেঁটে দেওয়া হয়েছে। পরিত্যক্ত ঘোষণার আগে লাইব্রেরির মাত্র দুটি আলমারির এক হাজার বই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। রাখা হয়েছে পাশের মইনুদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল হলের তিন তলায়। সেগুলো পড়ার কোনো অনুমতি নেই। এখনো পরিত্যক্ত দালানের ভেতর রয়েছে আরো ১০টি আলমারি ভর্তি প্রায় চার হাজার বই। উদ্ধারকৃত ও আটকে পড়া বইগুলো যথাযথ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সংরক্ষণ করা জরুরি। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) লাইব্রেরি খাতে বরাদ্দ ছিল এক কোটি ৭০ লাখ টাকা। অথচ তার পরও ঐতিহাসিক লাইব্রেরিটির এই করুণ দশা। দায়িত্বরত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, নর্থব্রুক হল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক গত মে মাসের শুরুতে তাঁকে লিখিতভাবে লাইব্রেরির বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছেন। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে সিটি করপোরেশন এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কিত চিঠি চালাচালি করতে করতে দালান, বই সবই অক্কা পেয়েছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে ইনটেনসিভ কেয়ারে নিলে হয়তো মহামূল্যবান কিছু বই বাঁচানো সম্ভব। অবিলম্বে উদ্যোগ নিয়ে গ্রন্থাগার ভবনের অভ্যন্তরের সংরক্ষিত দুর্লভ গ্রন্থগুলোকে রক্ষা করা সমীচীন হবে। এই গ্রন্থাগারের দুর্লভ গ্রন্থগুলোর ই-বুক প্রস্তুত করে তা জনগণের পাঠের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যায়। অমূল্য এই ঐতিহ্যের স্মারকগুলো ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে আমরা কি কোনো পদক্ষেপই নিতে পারব না?

ঢাকা ৩৬০°- এর আরো খবর