English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ছিন্নমূল জীবন : যে জীবন বঞ্চনার

  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

কার্টুন : বিপ্লব

ওরা আর সব সাধারণ শিশুর মতো নয়। এ বয়সে ওদের কেউ মায়ের কোলে, কেউ স্কুলে থাকতে পারত। থাকতে পারত পরিবারের অটুট বন্ধনে। কিন্তু নিয়তির ফেরে এসব কিছুই পাওয়া হয় না ওদের। ওরা রাস্তায় ঘুমায়। পথে পথে ঘোরে। ক্ষুধার দায়ে রাস্তায়ই বেছে নেয় জীবিকার পথ। ওরা টোকাই, ওরা ছিন্নমূল পথশিশু। কেনই বা ওরা পথশিশু? ওদের জন্য রাষ্ট্র-সমাজের করণীয় কী? সামাজিক এ সমস্যার সমাধানই বা কোন পথে? এসব প্রশ্নের উত্তর-প্রতুত্তর নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন কবীর আলমগীর

ঢাকার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের প্রবেশমুখে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চার শিশু। ওদের বয়স ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। ওদের এক হাতে ভাঙারির বস্তা, অন্য হাতে পলিথিন। ওরা কী যেন ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত। এ চারজনের একজন সর্দারের ভূমিকা নিয়ে একেকজনের পলিথিনে ঢেলে দিচ্ছে সেই উপকরণ। পরে নিশ্চিত হওয়া গেল এরা জুতার আঠা ড্যান্ডি ভাগাভাগি করছে শুঁকার জন্য। কাছে গিয়ে আলাপ জমাতে জানা গেল এদের নাম আরিফ, মাহি, রাইসুল ও সম্রাট। এই চারজনই রাতের বেলা শুক্রাবাদ ফুট ওভারব্রিজে ঘুমায়। দিনের বেলা এরা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বোতল, প্লাস্টিকের টুকরা, ভাঙারি সংগ্রহ ও বিক্রি করে। ক্ষুধা মেটাতে ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে ওই চার পথশিশুই।

সঠিক হিসাব নেই পথশিশুর

ঢাকায় আরিফ, মাহিদের মতো কত পথশিশু রয়েছে, তার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নেই সরকারের হাতে। এক হিসাবমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ পথশিশু রয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকেরই বাস রাজধানী ঢাকায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) হিসাবমতে, শুধু ঢাকা শহরে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার পথশিশু রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য পুষ্টিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত; যাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। খোলা আকাশ, পার্ক, ফুটপাত, রেলস্টেশন, ফেরিঘাট লঞ্চটার্মিনাল কিংবা বাসস্টেশনে এরা থাকে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, টঙ্গি রেলস্টেশন, হাইকোর্ট মাজার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর, চানখারপুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিক্যাল, গাবতলী, সদরঘাট ও বিভিন্ন ফুটওভারব্রিজ এলাকায় পথশিশুদের দেখা মেলে বেশি।

শিশুদের নিয়ে কাজ করেএমন একাধিক সংস্থা জানিয়েছে, পথশিশুদের নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশটির সর্বশেষ আদমশুমারিতে ভাসমান মানুষ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, দেশটিতে চার লাখের মতো পথশিশু রয়েছে, যার অর্ধেকই অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকায়। অন্যদিকে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। ঢাকার হিসাব অবশ্য তাদের কাছে নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকাতেই ছয় লাখ পথশিশু রয়েছে। সারা দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ।

অন্ধকারের জীবন

পথশিশুরা ক্ষুধার জ্বালা, একাকিত্বের কষ্ট বা সঙ্গ দোষে তারা নানা ধরনের মাদক নিচ্ছে। এমন এক মাদক ড্যান্ডি। ড্যান্ডি সেবনের বিষয়ে রমনা পার্ক এলাকার পথশিশু সুজাত বলে, ক্ষুধা লাগে। ড্যান্ডি খেলে ঝিমুনি আসে, ঘুম আসে। তখন ক্ষুধার কথা মনে থাকে না। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাদকে আসক্ত। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে, যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে। পথশিশুরা সাধারণত গাঁজা, ড্যান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে এবং পেট্রল শুঁকে নেশা করে। এ ছাড়া মিছিল-মিটিং, বিভিন্ন রাজনৈতিক শোডাউনে কিংবা হরতালের পিকেটিংয়ে অহরহ পথশিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে কিংবা একবেলা পেটপুরে খাওয়ার বিনিময়ে এসব দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে শিশুরা। শোডাউন ছাড়াও পিকেটিং, ভাঙচুর কিংবা ককটেল নিক্ষেপের মতো বিপজ্জনক কাজেও ব্যবহার হচ্ছে এরা। কারওয়ান বাজারের পথশিশু সোলায়মান জানায়, কারওয়ান বাজার রেলগেটে মাদক বিক্রি হয়। সে এখান থেকে ভাঙারির বস্তায় মাদক ভরে তার পরিচিত বিক্রেতার কাছে দিয়ে আসে। প্রতিবার চালান দিয়ে সে ৮০ টাকা করে পায়। মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, পথশিশুদের অনিশ্চিত ও অন্ধকার জীবনের কথা আমরা সবাই জানি। আমাদের মনুষ্যত্ববোধই পারে তাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে। এখন দরকার যে যার অবস্থান থেকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা। তাহলেই পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব।

মেয়ে পথশিশুদের নির্মম জীবন

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথা হয় পথশিশু সুরাইয়ার সঙ্গে। সত্মায়ের অত্যাচার সইতে না পেরে সে বাড়ি ছাড়া বছর পাঁচেক আগে। এখন বয়স তার ১৩ বছর। সে জানায়, এই উদ্যানেই এক ভ্রাম্যমাণ নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। সেই নারী সুরাইয়াকে বাসায় নিয়ে যায়। ওখানে দুজন তাকে ধর্ষণ করে। পরে ওই নারী তাকে কোনোমতে রিকশায় তুলে দেয়। ওই বাসা থেকে আবারও সে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলে আসে। সুরাইয়া বলে, বুঝতে পারিনি। কী থেকে কী হয়ে গেল, কারো কাছে এ কথাটা বলবকেউ তো বিশ্বাস করতে চায় না। মেয়েটি বলে, লোকজন সুযোগ পেলে নানা রকম খারাপ কথা বলে। সদরঘাটের অপর পথশিশু সুলতানা। সে বলে, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করছে। আমি নানিবাড়ি আছিলাম। নানিবাড়িতে অভাব, তাই পথে আইয়া পড়ছি। সেও একাধিকবার যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। বেসরকারি সংগঠন সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রকল্প পথবাসী সেবাকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক রাসেল বারী বলেন, আমরা অন্তত ১৫ হাজার পথশিশুর সেবা দিয়েছি, যারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, এ রকম শত শত কিশোরীকে সেবা দেওয়া হয়েছে।

অধিকারবঞ্চিত এরা

এসব শিশুর শিক্ষার অধিকার নেই, স্বাভাবিক জীবনযাপনে মেলামেশার অধিকার নেই। ফলে এরা অপরাধ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কাউকে সহজে বিশ্বাস করে না। ধ্বংসাত্মক কাজে আগ্রহ, নেতিবাচক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পরিচয় ও ঠিকানা অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। অনেক সময় শিশুদের পিতা-মাতার নাম বলতে পারে না। ফলে তাদের জন্মনিবন্ধন করা যায় না। এসব শিশু ভবিষ্যতে নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়।

প্রকল্প আছে তবে!

পথশিশুদের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব থমকে থাকে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও কিঞ্চিত বাস্তবায়নের মধ্যে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের কল্যাণে ১৯৭৪ সালের ২২ জুন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট) করেছিলেন। যার মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি আদায়, সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা ও খারাপ কাজে ব্যবহার হওয়া ইত্যাদি থেকে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা যায়। বর্তমান সরকার শিশুবান্ধব নানা কর্মসূচি ও প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যদিও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ২০১৪ সালের মার্চে মাত্র ১০ টাকায় পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এ উদ্যোগে তেমন সাড়া মেলেনি।

২০১৫ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরকে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে সব কার্যক্রম সফলতার মুখ দেখেনি। এদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফের মতো কিছু সংস্থা ও মানবাধিকারকর্মীরা সীমিত পরিসরে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে। পথশিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজের সুযোগও করে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে টাকা দিয়েও সহায়তা করছে। এ ছাড়া কিছু কিছু এনজিও পথশিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করেছে।

দরকার সমন্বিত নীতিমালা

২০১১ সালে পথশিশুদের নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ। ওই প্রতিবেদনে পথশিশুদের সংজ্ঞায় বলা হয়, যেসব শিশু রাস্তায় দিনাতিপাত করে, রাস্তায় কাজ করে, রাস্তায় ঘুমায়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো আবাসস্থল নেই, যাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন রাস্তাকে কেন্দ্র করে, তারাই পথশিশু। জাতীয় শিশুনীতি ২০১১, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ এবং শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলা হয়।

জাতিসংঘ জানায়, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নদীভাঙন, শৈশবে বাবা-মায়ের অকালমৃত্যু, পিতা-মাতা সংসার পরিচালনায় অক্ষমসহ নানা কারণে ঢাকায় পথশিশু তথা সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পথশিশুদের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ২০১৬ সালে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহ্যান্সমেন্ট প্রগ্রাম (সিপ)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন গোসলহীন থাকে, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থতায় ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারে না। এ শিশুদের কল্যাণে নেই কোনো নীতিমালা। সরকার ঘোষিত ভিশন ২০২১ অর্জন করতে হলে এখনই এ শিশুদের কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি প্রয়োজন। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শিশু। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সভাপতি এমরানুল হক চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এসব পথশিশুর লেখাপড়া, স্বাস্থ্য সেবাসহ সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। সরকার উদ্যোগ নিলেই তা সম্ভব। একটা সমন্বিত নীতিমালা থাকলে পথশিশুরা এর সুফল পেত।

ঢাকা ৩৬০°- এর আরো খবর