English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ইয়েমেন : শান্তি সুদূরপরাহত

  • তামান্না মিনহাজ   
  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে পুরোপুরি বিপর্যস্ত। শুরুটা আরব বসন্ত দিয়ে, যার মাধ্যমে দেশটিতে স্থিতিশীলতা আসবে বলে মনে করা হচ্ছিল; কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে তারা ইয়েমেনে যা ঘটিয়ে চলেছে, তাতে এই সংকটের আশু সমাধানের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে; বরং জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্টো আশঙ্কারই ইঙ্গিত।

মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়

জাতিসংঘের ভাষ্যে, ইয়েমেনে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় চলছে। গত সাড়ে তিন বছরে এ যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। আহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। দেশটির ৭৫ শতাংশ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। অন্তত সোয়া কোটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য দরকার জরুরি খাদ্য সহায়তা। প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের জানা নেই, তাদের পরবর্তী বেলার খাবার জুটবে কি না। পাঁচ বছরের নিচের চার লাখ শিশু ভুগছে চরম অপুষ্টিতে। দেশটিতে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা, ছড়িয়ে পড়েছে কলেরা আর ডিপথেরিয়া।

শুরু যেখান থেকে

২০১১ সালে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ তাঁর ডেপুটি আব্দ-রাব্বু মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন; কিন্তু প্রেসিডেন্ট হাদিকে অনেক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। আল-কায়েদার হামলা, দক্ষিণে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সালেহর প্রতি অনেক সামরিক কর্মকর্তার আনুগত্য। এর বাইরে দুর্নীতি, বেকারত্ব আর খাদ্য সংকট তো ছিলই। কোনো পরিস্থিতিই সামাল দিতে পারছিলেন না তিনি। নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে শিয়া প্রধান হুতি আন্দোলনের কর্মীরা সাদা প্রদেশ ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিদ্রোহীরা সানা অঞ্চলেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পালিয়ে যান প্রেসিডেন্ট হাদি।

প্রেসিডেন্ট সালেহর অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও হুতিদের সম্মিলিত জোট গড়ে ওঠে। তারা পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের পেছনে শুরু থেকেই ইরানের সমর্থন ছিল বলে অভিযোগ। হাদিকে আবার ক্ষমতায় আনতে সৌদি আরব আর অন্য আটটি সুন্নি দেশ একজোট হয়ে ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। এই জোটকে লজিস্টিক আর গোয়েন্দা সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স। ২০১৫ সালের আগস্টে হাদি সমর্থিত বাহিনী এডেন দখল করে ও হুতিদের তাড়িয়ে দেয়।

প্রেসিডেন্ট হাদি নির্বাসনে থাকলেও তাঁর সরকার এডেনে অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম শুরু করে। তবে হুতিরা সানা ও তিয়াজে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। সেখান থেকেই সৌদি আরবে মর্টার আর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। ২০১৭ সালে নভেম্বরে রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার পর ইয়েমেনে অবরোধ জোরালো করে সৌদি আরব। হুতি জোটের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। একপর্যায়ে সৌদি আরবকে নতুন সম্পর্কের প্রস্তুাব দেয় সালেহ। এতে ক্ষিপ্ত হয় হুতি বিদ্রোহীরা। রাজধানী থেকে পালানোর সময় গত বছর ডিসেম্বরে তাদের হাতে নিহত হন সালেহ।

কী আছে জাতিসংঘ প্রতিবেদনে

ইয়েমেন যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সম্ভবত যুদ্ধাপরাধ করেছে এবং এ যুদ্ধে সাধারণ মানুষ হতাহতের সংখ্যা কমাতে কোনো পক্ষই যথাযথ উদ্যোগ নেয়নিসাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের তদন্তদল। হুতি বিদ্রোহীদের হাতে সরকার পতনের সময় থেকে চলতি বছর জুন পর্যন্ত ইয়েমেনের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা জানতে অনুসন্ধান চালায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের একটি বিশেষজ্ঞ দল। গ্রুপ অব ইনডিপেনডেন্ট ইমিনেন্ট ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল এক্সপার্ট শীর্ষক এ দলের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের প্রতিবেদনে বলেছেন, ইয়েমেনে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত সব পক্ষ উল্লেখযোগ্য হারে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে। অনেক ঘটনা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, প্রতিবেদনে এমন মন্তব্যও করেছেন বিশেষজ্ঞরা। হতাহতের বেশির ভাগ দায় সৌদি জোটের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন সামরিক অবস্থানের পরিবর্তে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাজার, শিশুদের স্কুলবাস, চিকিৎসাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে জোটের হামলার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অবশেষে ভুল স্বীকার

জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক দিন আগেই ইয়েমেনের একটি স্কুলবাসে হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এতে প্রাণ যায় ৪০ শিশুর। ৯ আগস্ট উত্তরাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশে ঘটে এ ঘটনা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন নাকচ করে দিলেও স্কুলবাসে হামলা চালানো ভুল ছিল বলে সম্প্রতি স্বীকার করে করেছে সৌদি জোট। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। জোটের জয়েন্ট ইনসিডেন্টস অ্যাসিস্ট্যান্ট টিমের (জেআইএটি) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মানসুর আল মনসুর দাবি করেন, হুতি নেতা ও যোদ্ধাদের বহন করার কারণে বাসটি বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল। হামলার স্থান নির্ধারণে ভুলের কারণেই অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। জোটের যৌথ বাহিনী কমান্ড ওই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। এখন দেখার অপেক্ষা, ইয়েমেন সংকটের শেষ কোথায়।

চাকরি আছে- এর আরো খবর