English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

প্রতিযোগিতা

রাশিয়ায় ব্রোঞ্জজয়ীদের গল্প

সম্প্রতি বাংলাদেশের হয়ে রাশিয়ার ইয়াকুতিয়া আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মেলা থেকে ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে ফিরেছে তিন কিশোর। তাদের গল্প শোনাচ্ছেন আফরা নাওমী

  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

রাজধানীর সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছে অদ্রি প্রিয়ম ভৌমিক, মাশরুর আহমেদ ও মো. শিহাব শারার। পড়াশোনার প্রচুর চাপ। কিন্তু তারা একাডেমিক পড়াশোনা ছাড়াও যুক্ত আছে ডিবেট, স্পোর্টস, ছবি আঁকা, স্কেটিংয়ের মতো বিষয়ের সঙ্গে। এ ছাড়া শিহাবের মূল আগ্রহের বিষয় ইংরেজি সাহিত্য এবং আণবিক জীববিজ্ঞান। মাশরুর ভালোবাসে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা আর প্রিয়মের ঝোঁক পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞানে। অর্থাৎ তাদের প্রধান সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় বিজ্ঞান বিষয়ে। সুখ্যাতি আছে বিজ্ঞান মেলায় পুরস্কারজয়ী হিসেবেও। সেই পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সুখ্যাতির কারণেই কলেজ থেকে তাদের নির্বাচিত করা হয় রাশিয়ার ইয়াকুতস্কের ইয়াকুতিয়া ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স গেমস ২০১৮ এর জন্য। আর এমন একটা সুযোগ হাত ছাড়া করেনি তিন বন্ধুর কেউই।

বিশ্বের নামী বিজ্ঞানবিষয়ক উৎসবগুলোর একটি ইয়াকুতিয়া আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গেমস। গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় ছিল অলিম্পিয়াড, গবেষণাপত্র কন্টেস্ট, একাডেমিক কনফারেন্স, রোবোটিক টেকনোলজি, হ্যাকাথন ও বিজ্ঞান মেলাসহ বেশ কিছু সেগমেন্ট। এখানে বিভিন্ন দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

মেলার আর্থ অ্যান্ড এনভায়রোনমেন্টাল সায়েন্স ক্যাটাগরিতে ইফিশিয়েন্ট রিমুভাল অব ক্যাডমিয়াম ফ্রম ওয়াটার ইউজিং ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স অ্যান্ড অ্যালগি অ্যাডজরপশন নামের প্রজেক্ট নিয়ে উপস্থিত হয় এই তিন কিশোর। তাদের প্রজেক্টের মূল বিষয়টি এমন ছিল, পানির প্রবাহের মধ্যে তড়িৎ চুম্বক ব্যবহার করলে ক্যাডমিয়াম চুম্বক দ্বারা বিকর্ষিত হয়ে পাত্রের তলায় পড়ে থাকবে এবং এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে বিশুদ্ধ পানি। অর্থাৎ কিভাবে খুবই কম খরচে ক্ষতিকারক বস্তু পানি থেকে অপসারণ করে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা যাবে, তারই নতুন এক উদ্ভাবন ছিল পজেক্টটি।

মাশরুর বলল, পুরো প্রজেক্টে সঙ্গে ছিলেন আমাদের পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রধান সুদেব চন্দ্র পাল স্যার। তিনি রাশিয়ায়ও গিয়েছিলেন। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল দীর্ঘ এক যাত্রা। যেমন, প্রথমে অনলাইনে প্রজেক্ট সম্পর্কে একটি আর্টিকেল মেইল করতে হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর রাশিয়ার ইয়াকুতস্ক শহরে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিয়েছি আমরা। ছিল পোস্টারিংয়ের কাজ অর্থাৎ আমাদের একটি স্টল দেওয়া হয় যেখানে আমরা পোস্টার তৈরি করে বিচারক, বিশেষজ্ঞ ও দর্শকদের কাছে প্রজেক্টের বিষয়বস্তু তুলে ধরি ও এর সঙ্গে প্রজেক্ট ডিসপ্লে করি।

বিশ্বের খ্যাতনামা সব প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষজ্ঞরা বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কঠিন সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের। তবে প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণী পর্বে নিজেদের নাম শুনে অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভরে যায় তাদের মন।

আমাদের কাছে অংশগ্রহণটাই বড় ছিল। বিশ্বের নামিদামি স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্ম শেয়ার করাটা কম ছিল না জানায় শিহাব। তবে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে বাকিদের প্রজেক্ট দেখে খালি হাতে যে ফিরব না এটুকু মনে হয়েছিলযোগ করে প্রিয়ম। ফলাফল প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের হয়ে এই প্রতিযোগিতা থকে জয় করে এনেছে ব্রোঞ্জ পদকটি।

শুধু যে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই এ যাত্রার সমাপ্তি হয়েছে, তা কিন্তু নয়। সময়গুলো ছিল স্বপ্নের মতো। প্রিয়ম, শিহাব ও মাশরুরের মুখে এমনটাই শোনা গেল। ওই সাত-আট দিনের থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে তাদের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার ব্যবস্থা করেছিল আয়োজকরাই। বিমানবন্দরে নামার পর পরই তাদের স্বাগত জানানোর জন্যও উপস্থিত ছিলেন তাঁরা। শিহাব জানায় তাদের ভ্রমণের স্থানগুলো সম্পর্কে। আমরা ঘুরেছি কয়েকটি জাদুঘরে, রিভার ক্রুজের আয়োজন ছিল লেনা নদীতে। গিয়েছি পার্মাফ্রস্ট গুহায়। গুহাটি খুব আকর্ষণীয়। কারণ গুহাটি বরফের এবং ভেতরের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৫ ডিগ্রি কি তারও নিচে। সেখানে সাজানো একেকটি মনুমেন্ট ছিল নজরকাড়া। সেরা মুহূর্ত কোনটি ছিল, জানতে চাইলে তারা তিনজনই বলে ওঠে, অবশ্যই যখন বিজয়ী হিসেবে আমাদের নাম ঘোষণা করা হয়। লেনা নদীর ওই রিভার ক্রুজে এক রাত থাকার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া ছিল দেশকে তুলে ধরে এমন কিছু পরিবেশন করতে হবে তাদের। মাশরুর জানায়, আমরা নাচ-গানে সেভাবে পটু নই। তাই পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে কিছু করে দেখাব বলে ঠিক করি। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, পাঞ্জাবি পরে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত সুন্দরবন, কক্সবাজার, কুয়াকাটা সি বিচ এবং দেশের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচিত করাই অন্যদের এবং সবশেষে আমাদের জাতীয় সংগীত গেয়ে শোনাই। সবাইকে উদ্বুদ্ধ করি বাংলাদেশ ভ্রমণে। এ ছাড়া অন্যদের উপস্থাপনা থেকে বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারি, অনেকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করি এবং রাতভর নাচ-গান করেই কাটে।

প্রিয়ম বলে, আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে তাদের দেশের সময়ের ব্যাপারটা। যেমন আমরা প্রথমে মস্কো শহরে হাজির হই। সেখানে এক রাত থেকে রওনা হই ইয়াকুতস্কের উদ্দেশ্যে। রাজধানী মস্কো থেকে শহরটি প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরে এবং ঠিক ছয় ঘণ্টারই ঘড়ির কাটার ব্যবধান দুই শহরের। অর্থাৎ কেউ যদি ইয়াকুতস্ক থেকে দুপুর ১২টায় প্লেনে রওনা হয়, মস্কো শহরেও দুপুর ১২টায়ই পৌঁছাবে। ব্যাপারটি খুবই ইন্টারেস্টিং!

খাবারের ব্যাপার জিজ্ঞেস করতেই একেকজনের চেহারা দেখার মতো! শিহাব জানায়, আমাদের দেশের সঙ্গে তাদের খাবারে অনেকই পার্থক্য। রাশিয়ানদের খাবারে মসলার বালাই নেই। সবই প্রায় সিদ্ধ খাবার। ওদের ঐতিহ্যবাহী খাবারও খেয়েছি আমরা। প্রিয়মের অবশ্য ভালো লেগেছে তাদের শর্মা স্টোরগুলো। প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বে একেকটি শর্মা হাউস, যদিও একটু ভিন্ন ঢঙের শর্মা, তাও শর্মা খেতে খুব ভালো লেগেছে।

ট্যুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন নতুন বন্ধু। রাশিয়ায় গিয়ে তারা শুধু রাশিয়ান নয়নেপালি, তুর্কি, সিঙ্গাপুরিয়ান বন্ধু পাতিয়ে ফেলেছে। ওই বন্ধুদের সঙ্গে এখন ফেসবুক, হোয়াটসএপের মাধ্যমে যোগাযোগও হচ্ছে। একেকজনের একেক বন্ধু হলেও একজনের কথা তারা তিনজনই বলল। আর সে হলো তাদের ফ্ল্যাট মেট নেপালি বন্ধু বিদুর কাফলে। বিদুর তাদেরই একজন হয়ে উঠছিল। একসঙ্গে খেতে ও বেড়াতে যাওয়া এবং সারা রাত গল্পগুজব করেই কাটিয়েছি আমরা। নিজেদের দেশের স্মারকও বিনিময় করেছি। একসঙ্গে বলল তিন কিশোর।

ক্যাম্পাস- এর আরো খবর