English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সাইকেলে চড়ে সর্বোচ্চ সড়কে

সবুজ পৃথিবীর দাবিতে দুই চাকায় ভ্রমণ করেন তিনি। সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে দুনিয়া দেখার স্বপ্ন তাঁর। এরই মধ্যে বিশ্বের সর্বোচ্চ মটোরেবল রাস্তায় (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮ হাজার ৩৮০ ফুট উচ্চতা) সাইকেল চালিয়ে বাংলাদেশি হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন। তিনি মো. তোজাম্মেল হোসেন মিলন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। তাঁর গল্প জানাচ্ছেন আদীব আরিফ

  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

মিলনের জন্মস্থান পাবনায় হলেও বাবার চাকরি সূত্রে বেড়ে উঠেছেন গাজীপুরের জয়দেবপুরে। ছোটবেলা থেকে শখের বশে সাইকেল চালাতেন। একসময় এটি যে নেশার মতো হয়ে যাবে, বুঝতে পারেননি। ট্রাফিক জ্যামের জনপদে এক দিন কৌতূহলী হয়ে ক্যাম্পাস থেকে নিজের বাসায় সাইকেল চালিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। সেদিন প্যাডেল চাপতে চাপতে সাইকেলে চেপে দুনিয়া দেখার ভাবনাটি তাঁর মাথায় চেপে বসে। এর পর যুক্ত হন গাজীপুর সাইকেল রাইডার্স (জিসিআর) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাইক্লিং ক্লাবের সঙ্গে। আর ভ্রমণ করতে থাকেন দেশের নানা প্রান্তে। এরই মধ্যে ৪৫টি জেলা ঘোরা হয়ে গেছে তাঁর। এদিকে এ বছরের জানুয়ারিতে জিসিআর ও কলকাতা সাইকেল সমাজের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত পরিবেশ বাঁচাও, সাইকেলের জন্য লেন করোশীর্ষক আয়োজনে তিনি করেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব।

অনেক অভিযাত্রীরই স্বপ্ন থাকে দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু রাস্তায় সাইকেল চালানোর। এ জন্য মিলন ও তাঁর সঙ্গীরা সাইকেল ট্রাভেলার বিডি নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছিলেন ভ্রমণের বার্তা। সি টু সামিট হিমালয়সাইকেল এক্সপেডিশন শিরোনামের সেই বার্তা দেখে তাতে অংশগ্রহণে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করলে অভিজ্ঞতার আলোকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সঙ্গীযাত্রী। অবশেষে তাঁরা ভ্রমণপথ হিসেবে নির্ধারণ করেন বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ (সমুদ্রসীমা ০ ফুট) কক্সবাজার থেকে শুরু করে বিশ্বের সর্বোচ্চ রাস্তা ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে অবস্থিত খারদুংলা পাস (সমুদ্রসীমা থেকে ১৮ হাজার ৩৮০ ফুট উচ্চতা) পর্যন্ত। তাঁদের প্রস্তুতি শুরু হয় মার্চ মাসে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য সাইকেল আপডেট করে নেন তাঁরা। সংগ্রহ করেন পর্যাপ্ত অক্সিজেন ক্যান এবং স্লিপিং ব্যাগ, গাছে ঘুমানোর জন্য হ্যামক, পেনিয়ার ব্যাগ, বাড়তি পাঁচটি টিউব, বাড়তি দুটি টায়ার ও অন্য জিনিসপত্র।

ভ্রমণ ঠিক হয়ে যাওয়ার পর যাত্রা পথের খরচ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান মিলন। কেননা এমন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে অন্তত দুই মাস। এ সময়ের যাবতীয় খরচ তাঁর একার পক্ষে সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শরিফ উদ্দিন। আরো এগিয়ে আসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরের ডিসি অফিস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাইক্লিং ক্লাব ও গাজীপুর সাইকেল রাইডার্স কর্তৃপক্ষ। ভ্রমণের লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করে সাইকেল ট্রাভেলার বিডি।

ভ্রমণের সময় হিসেবে জুন থেকে আগস্ট মাসকে বেছে নেন তাঁরা। কেননা বেশি শীতে বরফ পড়ে রাস্তা বন্ধ এবং অতি গরমে তাপমাত্রা খুব বেশি হওয়াদুই পরিস্থিতিতেই সাইকেল চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মে-জুনে রমজান মাস থাকায় তাঁরা ঈদের পরের দিন, ১৮ জুনকেই নির্দিষ্ট করেন যাত্রা শুরুর ক্ষণ হিসেবে। এদিন টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে এ যাত্রার উদ্বোধন করেন কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া অফিসার। এর পর চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুর হয়ে দিনাজপুরের বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে ২৮ জুন ভারতের শিলিগুড়িতে প্রবেশ করেন তাঁরা। রংপুর ও দিনাজপুর পাড়ি দেওয়ার সময় কৌতূহলী মানুষ চারপাশে ভিড় করত তাঁদের ফেরিওয়ালা ভেবে! যাত্রাপথে যেখানেই বিশ্রাম নিয়েছেন, পেয়েছেন নানা মানুষের ভালোবাসা। টানা ৬১ দিনের সাইকেল যাত্রা শেষে ১৭ আগস্ট তাঁরা খারদুংলা পাস জয় করতে সক্ষম হন। এই দীর্ঘ ভ্রমণে চার হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন মিলন ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।

ভ্রমণ সম্পর্কে মিলন জানান, ভারতের পথে অতিক্রম করেছি শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, মিরিখ, বিহার, গোরাখপুর, লখনউ, আগ্রা, দিল্লি, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, পাঞ্জাব, জম্মু ও কাশ্মীর; এর পর মানালি হয়ে লেহ-লাদাখ। খারদুংলা জয়ে অনেকেই সাধারণত মানালি থেকে মূল যাত্রা শুরু করে থাকে। কিন্তু পুরো হিমালয় অঞ্চল ঘুরে খারদুংলা জয় করার ঘটনা সম্ভবত এটিই প্রথম। দার্জিলিংয়ের পুরোটা পথ বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল চালিয়ে যাওয়াএ এক অতুলনীয় অনুভূতি।

দার্জিলিং অতিক্রমের সময় জ্বরে আক্রান্ত হন মিলন। তবু বিশ্রাম নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। সঙ্গী আরোহী কাজী শরিফ ও রাজীব দে অনিক তাঁর চেয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার এগিয়ে ছিলেন সেই মুহূর্তে। গহিন অরণ্যের সেই জনমানবহীন রাস্তায় সাইকেল নিয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকলে চিতাবাঘের আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কিছু রাস্তা সাইকেল ঠেলে আর কিছু রাস্তা প্যাডেল চেপে, ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রার জ্বর নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর কার্শিয়াং অঞ্চলে বিশ্রাম নেন তাঁরা। রাত কেটে গেলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন মিলন।

সাধারণত সকাল ৭টায় শুরু করে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, সময়ে সময়ে বিশ্রাম নিয়ে প্রতিদিন ছয়-সাত ঘণ্টা ভ্রমণ করতেন তাঁরা। এ সময় গড়ে পাড়ি দিতেন ১২০-১৩০ কিলোমিটার পথ। আগ্রা অঞ্চল অতিক্রম করা ছিল তাঁদের জন্য সবচেয়ে দুর্ভোগের। তখন সেখানকার তাপমাত্রা ছিল ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মতো। সূর্যের রোষানল থেকে নিজেদের বাঁচাতে এ অঞ্চলটিতে তাঁরা যাত্রা শুরু করতেন ভোর ৫টায়, আর সকাল ৯টায় নিতেন বিশ্রাম। এর পর তাপমাত্রা কমলে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সাইকেল চালাতেন তাঁরা। অন্যদিকে চ্যালেঞ্জের বিচারে তাঁদের জন্য সবচেয়ে দুরূহ ছিল উত্তর প্রদেশ অতিক্রম করা। সেখানকার তাপমাত্রা যেমন বেশি ছিল, মানুষগুলোও খুব জ্বালিয়ে মেরেছে! পথে নানা বাধা আর উৎপাতে বেশ নাকাল হতে হয় তাঁদের এ সময়। আবার জম্মু-কাশ্মীরও ছিল বেশ বিপজ্জনক এলাকা। সেখানকার স্থানীয়রা বাংলাদেশের পতাকা বহন করতে বাধা দেয়। এ ছাড়া পাসপোর্ট ও কাগজপত্র চেক করার নামে যখন-তখন করতে থাকে হেনস্তা। এমনকি জম্মুর চন্দরকোটে তাঁদের গ্রেপ্তারের মতো হয়রানিও করে স্থানীয় পুলিশ। সেখানে নানা দুর্ব্যবহারের মধ্যে পুরো এক দিন বন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে তাঁদের। অবশ্য জম্মু ও কাশ্মীরের অপরূপ দৃশ্য দেখে সেসব যাতনা তাঁরা মুহূর্তেই ভুলে গেছেন। এরপর অনেক কষ্টে পৌঁছেছেন মানালিতে। সেখান থেকে খারদুংলা ৫২০ কিলোমিটারের পথ। এ পথে অতিক্রম করতে হয় ছয়টি পাস। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উচ্চতায় এগুলোর অবস্থান। রাথাংলা পাস ১৩ হাজার ৫৮ ফুট, বারালচাল ১৫ হাজার ৫৯০ ফুট, নাকিলা ১৫ হাজার ৫৪৭ ফুট, লাচাংলা ১৬ হাজার ৬১৬ ফুট, তাংলাংলা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাস্তা ১৭ হাজার ৫৮২ ফুট এবং সর্বশেষ তাঁরা অতিক্রম করেন খারদুংলা পাস। অবশ্য সেই লক্ষস্থানটিতে পৌঁছানোর আগে, লেহ-লাদাখে তাদের থামিয়ে দেয় সেখানকার কর্তৃপক্ষ। কারণ হিসেবে জানানো হয়, খারদুংলায় বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ! এই অভিযাত্রীরা দমে না গিয়ে লেহ ডিসি অফিস বরাবর আবেদন করেন। আর এক দিনের বিশেষ অনুমতি নিয়ে জয় করেন খারদুংলা। দীর্ঘ এ ভ্রমণে মাত্র ১২ দিন তাঁরা হোটেলে রাত কাটিয়েছেন। বাকি দিনগুলোতে চলতি পথের মন্দির, মসজিদ, স্কুলের বারান্দা ও ধাবা ছিল তাঁদের বিশ্রামের জায়গা। যাত্রাপথে তাঁদের খাবার ছিল বিভিন্ন ধরনের। যখন যেখানে যা পেতেন, তা-ই খেতেন। ভ্রমণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা মিস হয়ে গেলেও মিলন তাতে মন খারাপ করেননি; বরং সাইকেল চালিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা জয় করার আনন্দ তাঁকে স্বপ্নবান করে তুলেছে আগামী দিনে অন্য কোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণে।

ক্যাম্পাস- এর আরো খবর