English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

নাসরিনের এগিয়ে যাওয়ার গল্প

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মেয়ে নাসরিন জাহান চৌধুরী। ১৯৯৩ সালে সিইপিজেডের বাংলাদেশ হ্যাটস অ্যান্ড ব্যাগ (বিডি) লিমিটেডে কমার্শিয়ালে সহকারী হিসেবে যোগ দেন। দক্ষতার সঙ্গে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি একই মালিকের প্রতিষ্ঠান নিউ এ্যারা ফ্যাশনস এমএফআরএস (বিডি) লিমিটেডে ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। দক্ষ হাতে সামলাচ্ছেন প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কারখানাটির পুরো কমার্শিয়াল বিভাগ। লিখেছেন : রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম

  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

১৯৯৩ সালে নাসরিন জাহান চৌধুরী যখন চট্টগ্রাম ইপিজেডের বাংলাদেশ হ্যাটস অ্যান্ড ব্যাগ (বিডি) লিমিটেড কারখানায় কমার্শিয়ালে সহকারী হিসেবে যোগ দিলেন তখন পুরো ইপিজেডেই এই সেকশনে শুধু একজন নারীকে তিনি পেয়েছিলেন। তবে জাপানি মালিকানাধীন মামিয়া-অপি (বিডি) লিমিটেডে সুফিয়া বেগমও বেশিদিন থাকেননি চট্টগ্রাম ইপিজেডে। তাই অনেকটা একা একাই কমার্শিয়াল সেকশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় সদ্য অনার্স-মাস্টার্স করা এই নারী। একই সাথে অফিসের কমার্শিয়াল সেকশন সামলে ব্যাংকে দৌড়, সেখান থেকে বন্দর-কাস্টমস ঝামেলার কাজগুলো কতটা সামলাতে পেরেছিলেন?

দক্ষতার সাথে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন বলেই নাসরিন জাহান সেই একই মালিকের আরও সমপ্রসারিত প্রতিষ্ঠান নিউ এ্যারা ফ্যাশনস এমএফআরএস (বিডি) লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। দক্ষ হাতে সামলাচ্ছেন প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কারখানাটির পুরো কমার্শিয়াল বিভাগ।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বেপজা) পরিচালিত দেশের ৮টি ইপিজেডের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে চট্টগ্রাম ইপিজেড।

এই ইপিজেডের বর্তমানে চালু থাকা ১৭০টি কারখানার মধ্যে দুই লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করে। এই শ্রমিকের ৬৫ শতাংশই নারী। এর মধ্যে কয়েক হাজার নারী কাজ করেন কর্মকর্তা পর্যায়ে।

এই নারীদেরই পুরোধা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম নাসরিন জাহান চৌধুরী। এ কারণে বেপজা থেকে শুরু করে ইপিজেডের প্রায় প্রত্যেকের কাছে পরিচিত মুখ তিনি। আড়াই হাজার টাকা বেতন যে চাকরি শুরু করেছিলেন সেখানে এখন তিনি যে বেতন পান সেটাকে সন্তোষজনকই বললেন।

আদিনিবাস চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ির রাঙামাটিয়ায়। তবে বাবার রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে সিআরবি এলাকায়। বাবা মরহুম কামাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন রেলওয়ের মেকানিক্যাল অফিসার আর মা রোকেয়া বেগম গৃহিণী। ৩ বোন ও ২ ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন পদার্থবিদ্যায়।

বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশ গার্মেন্টস খাত থেকে আসে। আকর্ষণীয় বেতন আর কর্মসংস্থানের সুবিধার কারণে শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের চাকরির অগ্রাধিকার তালিকায় উপরের দিকেই থাকে গার্মেন্টস।

কিন্তু নাসরিন জাহান যে সময় চট্টগ্রাম ইপিজেডে গার্মেন্ট কারখানার চাকরিতে যুক্ত হন সেই সময় এ দেশের মানুষের কাছে গার্মেন্টস বলতে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল বড়সড় দর্জি দোকান। সেখানে ভালো ও শিক্ষিত মেয়েরা কাজ করেন না। সেই প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করা খুব সহজও ছিল না। কিন্তু গত ২৫ বছর ধরে সফলতা এবং দক্ষতার সাথে নিজের কাজটি করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যাং ওয়েং শ্যাং গত ২৫ বছর ধরেই আস্থা রাখছেন নাসরিন জাহানের ওপর। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর কর্মপরিবেশের কারণে অন্য কোথাও যাওয়ার চিন্তা করেননি।

দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানার কারখানাটির বাংলাদেশ অংশের মালিক রাউজান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবার। কম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ বি এম ফজলে শহীদ চৌধুরী।

অফিসের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে নাসরিন জাহান বলেন, আমার মালিকপক্ষ কখনো আমাকে আলাদাভাবে নারী হিসেবে বিবেচনা করেনি। বরং একজন সহকর্মী হিসেবেই মূল্যায়ন করেছে। এ কারণে আমার ওপর কোনো কাজ অর্পণ করতে গিয়েও তাঁরা দ্বিতীয়বার চিন্তা করেনি। আমিও সর্বোচ্চ চেষ্টা করি অর্পিত দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে পালন করতে।

১৯৯৫ সালে বিয়ে হয় কলেজ শিক্ষক হারুনুর রশিদের সাথে। দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে সংসার। বিয়ের পরেও গার্মেন্টসে চাকরি করার পেছনে স্বামী ও শ্বশুরের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আর দশটি চাকরি থেকে গার্মেন্টসের চাকরি ভিন্ন। এখানে একজন নারীদের দিন শুরু হয় ভোর ৫টার আগেই। উঠেই পরিবারের জন্য নাস্তা, দুপুরের রান্না, সন্তানদের জন্য স্কুলের টিফিন সব তৈরি করে ৭টার মধ্যেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়। আবার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বাসায় এসে রান্নার প্রস্তুতি। সপ্তাহের ৬দিনের রুটিনই এমন। অনেক সময় শিপমেন্টের ঝামেলা থাকলে দেখা যায় বাসায় আসতে আসতে রাত ১১টা বেজে যায়। এমন অবস্থায় পরিবার থেকে সাপোর্ট না থাকলেও একজন নারীর পক্ষে কখনই গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করা সম্ভব নয়। আমি ভাগ্যবান পরিবার থেকে সে ধরনের সাপোর্ট পেয়েছি।

নাসরিন জাহানের বড় মেয়ে ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৭ম সেমিস্টারে পড়ে। অন্য মেয়েটি এবার মহসিন কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেছে। আর একমাত্র ছেলে চট্টগ্রাম সরকারি স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে পড়ে।

তিনি যোগ করেন, আমার স্বামী কলেজ শিক্ষক বলে প্রচুর সময় পান। এ কারণে আমার অনুপস্থিতিতেও সন্তানদের মানুষ করতে আমাকে বেগ পেতে হয়নি। তিনিই সবকিছু ভালোভাবেই সামলেছেন। কিন্তু এরপরেও আফসোস থেকে যায়। বাচ্চারা মাঝে মধ্যে বলে, আম্মু তোমাকে তো সেভাবে পাইনি আমরা।

তখন বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আমিও নিজেও আমার বাচ্চাদের শৈশব মিস করেছি। তখন মনে হয় সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে বাচ্চাদের নিয়েই থাকি।

কিন্তু পরক্ষণেই নিজের দায়িত্বের কথা মনে পড়ে যায়। আমার প্রায়ই মনে হয় এদেশের নারীদের এমন ত্যাগের কারণেই আজকের তৈরি পোশাকশিল্প দাঁড়িয়ে আছে।

দ্বিতীয় রাজধানী- এর আরো খবর