English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন!

  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

ফ্ল্যাটসংস্কৃতি বিকশিত হওয়ার পর থেকে অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন বাক্যটি বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছে। শহরের চাকচিক্যময়, কারুকার্য খচিত, আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বহু ভবনের প্রধান ফটকে আটকানো একমাত্র দৃষ্টিকটু বিষয় সম্ভবত ওই বাক্য সম্বলিত ছোট্ট সাইনবোর্ডটি। বিশেষ করে যখন সেল্ফ ড্রাইভ গাড়ি হয় তখন খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ভবনের সামনের সড়কে গাড়ি রাখার জায়গা থাকলে, সেখানে কিছু সময়ের গাড়ি রাখা গেলেও দীর্ঘ সময়ের জন্য গাড়ি পার্কিং করা যায় না। আবার ভবনের সামনের সড়কে গাড়ি পার্কিং করার জায়গা না থাকলে দূরে গিয়ে গাড়ি পার্কিং করে রাখাও বিপজ্জনক। কারণ গাড়ির যন্ত্রাংশ চোরেরা সদা-সর্বদা সুযোগ খুঁজতে থাকে, কখন একটি গাড়ি মালিক/ড্রাইভারবিহীন পাওয়া যাবে, কখন লুকিং গ্লাস, লাইট ইত্যাদি ত্বরিত গতিতে খুলে নেওয়া যাবে।

একসময় ছিল অতিথি আসাকে মনে করা হতো ভাগ্যলক্ষ্মী। ধর্মেও অতিথি আসাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি বলে বর্ণনা রয়েছে। গ্রামে অতিথিকে অকল্পনীয় আদর-আপ্যায়ন করার রেওয়াজ এখনো চালু রয়েছে। অবশ্য চট্টগ্রামের লোক যে অতিথিপরায়ণ, তা বলাবাহুল্য। কিন্তু নগরের ফ্ল্যাটসংস্কৃতি তথা ফ্ল্যাটবাড়ির প্রধান ফটকে অতিথির গাড়ি বাহিরে রাখুন ক্ষুদ্র সাইনবোর্ডটি চট্টগ্রামের অতিথিপরায়ণ মানুষদের সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে অর্থাৎ অতিথি বিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করছে বলে মনে হয়। একথা সত্য, ফ্ল্যাটসংস্কৃতিতে ভবনে অতিরিক্ত কোনো পার্কিং স্পেস রাখার নিয়ম চালু হয়নি। কিন্তু ভবনের সামনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নিয়মের বাধ্যবাধকতার কারণে যেটুকু খালি জায়গা রাখা হয়, তাতে ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বাগান করার যে নিয়ম চালু করা হয়েছে, সেখানে যদি অন্তুতঃ একটি বা দুটি গাড়ি অস্থায়ীভাবে পার্কিং করার ব্যবস্থা করা যায়। খুবই অবাক হই এই ভেবে, ১০ তলা একটি ভবনে (যেখানে ২০ বা ততোধিক ফ্ল্যাট থাকে) অতিথির গাড়ি রাখার জন্য একটি পার্কিংও বরাদ্দ রাখা হয় না কেন? সেই ভবনে গাড়ি (প্রাইভেট কার) নিয়ে অতিথি আসলে তিনি গাড়িটি কোথায় রাখবেন?-প্রশ্নটি ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি বা ভবনের নক্শা অনুমোদনকারী সিডিএর কর্মকর্তাদের মনে কি একবারও আসে না? ভবনের অতিথির আসা গাড়ি চলাচলের সড়কে রাখলে যে পথচারী বা সড়কে চলাচলকারী গাড়ির সমস্যা হতে পারে-এই কথাটি কারও মনে আসে না কেন?

নাকি মুনাফা মানসিকতা নামক নষ্ট এক রিপুর কাছে সবাই পরাভূত! ভবনের ফ্ল্যাট বিক্রি করে লক্ষ-কোটি টাকা মুনাফা তুলে নিয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নই কি অতিথির গাড়ি বাহিরে রাখার জন্য অলিখিত নিয়ম করা হয়েছে? পুরো ভবনের পার্কিং স্পেসে অতিথিদের অন্তত একটি বা দুটি প্রাইভেট কারের জন্য পার্কিং সংরক্ষিত রাখলে কত টাকা ক্ষতি হতো! মেনে নিলাম, আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি নিতে রাজি নয় বলেই তাঁরা (ভবন নির্মাণকারী ডেভেলপার কম্পানি) অতিথিদের জন্য পার্কিং স্পেস রাখেননি। কিন্তু ভবনের সামনে সামান্য খালি জায়গায় সৌন্দর্য বর্ধনের নামে যেখানে বাগান করা হলো, সেখানে তো অন্তত অতিথির দুটি গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা রাখা যেত। ফ্ল্যাট ক্রেতা বা ভূমি মালিক ফ্ল্যাটে বসে বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, গোলাপের ঘ্রাণ নেবেন-আর তাঁর ফ্ল্যাটে আসা অতিথির গাড়ি সড়কে পার্কিং করার কারণে গাড়ির গ্লাসটি চোরে নিয়ে যাবে বা সড়কে গাড়ি পার্কিং-এর কারণে পুলিশ কর্মকর্তা মামলা দিয়ে দেবেন-এমন বিপরীত দৃশ্য একজন স্থপতি ও ডেভেলপার কম্পানির কর্তাদের মাথায় আসবে না, তা সত্যিই দুঃখজনক।

প্রসঙ্গক্রমে চট্টগ্রাম নগরের বহুতল ভবনের পার্কিং সমস্যার কথাটি উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে। নগরে এমন অনেক বহুতল বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে, যেগুলোর নিচতলায় বা আন্ডারগ্রাউন্ডে পার্কিং ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল এবং কোনো কোনো ভবনে পার্কিং নেই বললে চলে। সিডিএ হতে অনুমোদন নেওয়ার সময় নিচতলা সম্পূর্ণ পার্কিং দেখানো হলেও ভবন তৈরির সময় নিচতলায় পার্কিং-এর স্থলে ১৫/২০টি দোকান তৈরি করা হয়। আর এই ১০০ বর্গফুটের একটি দোকান প্রতিটি ৩০/৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। পার্কিং-এর স্থলে দোকান তৈরি করে সিডিএর চোখে ধুলো দিয়ে এত বিপুল বাণিজ্য পৃথিবীতে কোথাও আছে কিনা আমাদের জানা নেই।

আমরা মনে করি, ফ্ল্যাট বাড়ির সামনের অতিথির গাড়ি বাইরে রাখুন এই ক্ষুদ্র সাইনবোর্ডটি মানুষের প্রতি মানুষের অসৌজন্যমূলক একটি চিহ্ন। ঘরে অতিথি আসবে, আর সেই অতিথির প্রতি সর্বোচ্চ আন্তরিক আচরণ ও সুন্দর আতিথিয়েতার যে চিরাচরিত রেওয়াজ, সেটার প্রতিও চরম অবজ্ঞা এই ক্ষুদ্র সাইনবোর্ড। ভবনের এই ক্ষুদ্র সাইনবোর্ড যান্ত্রিক সভ্যতার অশোভন নিদর্শন। এই অশোভনীয় আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সিডিএর প্রতি অনুরোধ, ৮তলা ভবনের নক্শা অনুমোদনের সময় অতিথির গাড়ি পার্কিং স্পেসের (অন্তত একটি) বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই (ভেতরে হোক বা বাইরে হোক) যেন নক্শা অনুমোদন দেওয়া হয়। আর ভবন নির্মাণকারী কম্পানির প্রতি অনুরোধ, ভবনের সামনে পুরো জায়গায় বাগান না করে অর্ধেকে বাগান করুন, বাকি অর্ধেক অতিথির গাড়ি পার্কিং-এর জন্য নির্ধারিত রাখুন। অথবা পার্কিং স্পেসে অতিথির গাড়ির জন্য পার্কিং চিহ্নিত করুন। সবারই মনে রাখা প্রয়োজন, টাকা রোজগারই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। মানুষের প্রতি মানুষের মায়া-মমতা, শ্রদ্ধা-সম্মানবোধই আমাদেরকে মানবজাতি হিসেবে সৃষ্টি শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন রাখবে।

মুহাম্মদ মুসা খান

কলামিস্ট ও সমাজকর্মী

mkhanctgbd@yahoo.com

দ্বিতীয় রাজধানী- এর আরো খবর