English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

অমুসলিমকে ভালোবেসে বাবা-ভাইয়ের হাতে খুন, প্রমাণ রাখলেন তরুণী

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২১:০৫

নিহত তরুণীর বাবা-ভাই

গাড়িতে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকা অবস্থায় ১৯ বছরের জেহানা বুঝতে পেরেছিলেন তার মৃত্যু নিশ্চিত। সে কারণে নিজের শরীরে লিখে রেখেছিলেন দুটি ফোন নম্বর। আর সেই ফোন নম্বরের সূত্র ধরেই তদন্তে নৃশংস এক হত্যার পেছনে থাকা জঘন্য সামাজিক ব্যাধির গল্প উঠে এসেছে।

গত ৩১ অাগস্ট সকালে ভারতের বর্ধমান শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে নবগ্রামে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে ধান খেতের মধ্যে এক তরুণীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। মুখটা ভারী কোনো কিছু দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। যাতে শনাক্ত করা না যায়।

অজ্ঞাতপরিচয় লাশ হিসেবেই সেই তরুণীর মরদেহ চালান করে দেওয়া হয়। ময়নাতদন্তের সময়ে মর্গের ডোমের চোখে পড়ে তরুণীর দেহে দুটি ফোন নম্বর লেখা রয়েছে। সেই ফোন নম্বরের সূত্র ধরেই পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর থানার পুলিশ মুম্বাইতে হদিস পায় করণ সিংহ নামে এক যুবকের।

জেলা পুলিশের দল মুম্বাই পৌঁছায়। সেখানে করণকে তারা ওই মৃত তরুণীর ছবি দেখাতেই জানা যায়, সেই মৃতের নাম জেহানা খাতুন। বাড়ি বিহারের মুজাফ্ফরপুরের ইলাদাদ গ্রামে। ওই একই গ্রামে করণেরও বাড়ি।

করণকে জিজ্ঞাসা করেই তদন্তকারীরা জানতে পারেন, জেহানার সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু করণ অন্য ধর্মের হওয়ায় সেই সম্পর্ক মেনে নেয়নি জেহানার পরিবার। একবার করণের সঙ্গে বিয়ে করবে বলে পালিয়েও গিয়েছিল জেহানা। কিন্তু তারপর মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন জেহানার বাবা মুহাম্মদ মুস্তাক। মেয়েকে বুঝিয়ে করণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলেন। তবে, ওই সম্পর্ক থেকে মেয়েকে তিনি বের করে নিয়ে আসতে পারেননি।

করণের সঙ্গে কথা বলেই তদন্তকারীরা সন্দেহ করেন, জেহানা খুনের সঙ্গে যোগ থাকতে পারে তার বাড়ির লোকজনের। করণের কাছ থেকেই পুলিশ জানতে পারে জেহানার বাবা মুস্তাক এবং ভাই জাহিদ কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় থাকেন। কলকাতা শহরে তারা গাড়ি চালান।

অন্যদিকে, পুলিশের একটি দল জেহানার বিহারের বাড়ি পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, কয়েকদিন আগেই জেহানাকে কলকাতায় নিয়ে গেছে তার বাবা-ভাই।

সেই সূত্র ধরেই রবিবার রাতে কলকাতায় পার্ক সার্কাস এবং আনন্দপুর এলাকায় হানা দেয় পুলিশ। আটক করা হয় জেহানার বাবা এবং ভাইকে। জিজ্ঞাসাবাদে মুস্তাক স্বীকার করেন যে, নিজের মেয়েকে খুন করেছেন তিনি। কিন্তু কেন?

পুলিশকে জেহানার বাবা-ভাই জানিয়েছেন, অন্য ধর্মের ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের গ্রামের লোকজনও মেনে নেয়নি। গ্রামের মোড়লরা রীতিমতো একঘরে করে রেখেছিল তাদের। তারপর অনেক অনুরোধের পর গ্রামের মাতব্বররা শর্ত দেন যে, ওই মেয়েকে গ্রামের বাইরে কোথাও থেকে বিয়ে দিয়ে আসতে হবে মুস্তাককে। তাকে গ্রামে রাখা যাবে না।

মঙ্গলবার বর্ধমান আদালতে হাজির করা হয় মুস্তাক এবং জাহিদকে। আদালতে যাওয়ার পথে জাহিদ বলেন, প্রথমে আমরা বিয়ে দেওয়ার জন্যই বোনকে কলকাতায় এনে রেখেছিলাম। কিন্তু করণকে কোনো ভাবেই বোন ছাড়তে রাজি ছিল না। তাই আমরাও আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।

জাহিদ জানায়, ওই রাতে বিহারেই ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কলকাতা ছাড়ে তিনজন। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই মত পরিবর্তন করেন মুস্তাক।

জাহিদ বলেন, বাবা বার বার বলতে থাকেন, বোনের বিয়ে দিয়েও লাভ নেই। সে আবার পালিযে যাবে করণের কাছে। তখন আমি বাবাকে বলি, করণের সঙ্গেই তবে বিয়ে দিয়ে দাও।

কিন্তু, তা মানতে পারেননি মুস্তাক। গাড়ি চালাচ্ছিলেন জাহিদ। পেছনের আসনে ছিলেন মুস্তাক এবং জেহানা। মুস্তাক আদালতের পথে খুব নিস্পৃহ-নির্বিকার মুখে বর্ণনা করেন, ঠিক কীভাবে খুন করেছেন মেয়েকে।

তিনি বলেন, জেহানাকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই গাড়ির মধ্যে গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করি। তারপর সেই দেহ টেনে নিয়ে যাই ধানের জমিতে। সেখানে পাথর দিয়ে মাথায় মুখে আঘাত করে বিকৃত করি মুখ, যাতে কেউ চিনতেও না পারে।

পূর্ব বর্ধমান জেলার পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, আটকদের আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এই হত্যার পেছনে আরো কোনো কারণ আছে কিনা, আমরা খতিয়ে দেখব।

বিদেশ- এর আরো খবর