English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সাবেদ আলীর কালো বিড়াল | আবু রেজা

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ১৩ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:১৯

সাবেদ আলী এখন একা থাকে। পরিবার বলতে সে একাই। তার ঘরে থাকে একটা কালো বিড়াল। এখন সবাই জানে সাবেদ আলী আর বিড়ালটা নিয়েই ওর সংসার। সাবেদ আলীর বাসায় দুই কামরা। সামনের কামরায় বসার ব্যবস্থা আর বিড়ালের জন্য একটা বিছানা। ভেতরের কামরায় থাকে সাবেদ আলী। তার বয়স ৪২ বছর। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে আর বিয়ে-শাদী করেনি। সন্তানাদিও নেই। ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন আর কেউ আছে কিনা সে হদিস কেউ জানে না। বিশ বছর আগে চাকরি নিয়ে এখানে আসে। তারপর আর সে কোনো দিন বাড়ি যায়নি। কেউ বাড়ির কথা বললেই সে বলত, আমার সঙ্গেই বাড়ি সঙ্গেই ঘর। আমি যাব কোথায়? অফিসের কাগজপত্রে রেকর্ড আছে। ওর ঠিকানা চরফ্যাশন, ভোলা। কিন্তু ওর কথা-বার্তায় ওই অঞ্চলের কোনো টান নেই। হয়তো ওর পূর্বপুরুষ ভোলায় থাকত।

নারায়ণগঞ্জে আদমজীর কাছাকাছি শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে দুটি কটন মিল। নদীর এপারে একটা ওপারে আরেকটা। নদীর এপারে ১ নম্বর আর ওপারে ২ নম্বর ঢাকেশ্বরী কটন মিল। সাবেদ আলী চাকরি করে ওপারে ২ নম্বর ঢাকেশ্বরী কটন মিলে। এই মিলের ভেতরে স্টাফ কোয়ার্টারে থাকে সাবেদ আলী। এখানে এসে সাবেদ প্রথমে একটা মেসে ওঠে। ওভাবেই চলে যায় বেশ কয়েক বছর। তারপর এলেন এক লেবার ম্যানেজার। তিনি ওকে বিয়ে দেন লেবার অফিসের হেড ক্লার্কের বড় মেয়ের সঙ্গে। সাবেদ কাজ করে টাইম অফিসে। প্রথমে ও টাইম কিপার হিসেবে কাজ শুরু করে। শ্রমিকদের দৈনিক উপস্থিতির হিসাব রাখাই ওর কাজ। পরে ম্যানেজার সাহেব ওকে একটা প্রমোশন দেন। ও সিনিয়র স্কেল পায়। তারপর বিয়ে করে। এপর সে প্রমোশন পেয়ে হয় হেড টাইম কিপার।

সাবেদ বিয়ে করে ১৮ বছর আগে। শারদীয় দুর্গাপূজার কিছুদিন পরে। ওর বউয়ের নাম শিউলি। মেয়েটা শিউলি ফুলের মতোই ফুটফুটে। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় পোয়াতি হয়। কিন্তু সুখ বেশি দিন সয়নি ওর। সকালে ফোঁটা শিউলি ফুলের মতোই বিকেলে ঝরে যায়। সন্তান হওয়ার সময় শিউলি মারা যায়। তখন সন্তান প্রসবের এত ভালো ব্যবস্থাও ছিল, এত এত চিকিৎসাও ছিল। ঘরেই প্রসব হতো। দাইমা যখন আর কিছুই করতে পারল না। তখন নৌকা করে নিয়ে যাওয়া হলো নারায়ণগঞ্জে সদর হাসপাতালে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ডাক্তার মা-শিশু কাউকেই বাঁচাতে পারল না।

সাবেদ শিউলিকে বড় ভালোবাসত। আঠারো মাসের সম্পর্কের বড় জোর ছিল। বড় টান ছিল শিউলির প্রতি সাবেদের। শিউলির মৃত্যুর পর সাবেদ কিছুদিন প্রায় পাগল ছিল। অফিসে যেত-আসত। কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলত না। কাজে মনোযোগ ছিল না। ম্যানেজার বাবুর নেক নজর ছিল বলে চাকরিটা টিকে যায়।

এ সময়ে সাবেদ হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, ওর কোনো খোঁজখবর নেই। এ সময় নানা ফকিরের দরগায়, মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ায়। রাতের পর রাত কাটিয়ে দেয় শ্মশানঘাট, কবরস্থানের নীরব জায়গায়। নাওয়া-খাওয়া নেই। উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকে এখানে সেখানে। কোথায় গেল, কী খেল, কী পেল এসব নিয়ে ভাবনা নেই। ঘুরছে তো ঘুরছেই। আবার বসে আছে তো বসেই থাকছে দীর্ঘক্ষণ। এক জায়গায় ঠায় বসে কাটিয়ে দিল কয়েক দিন। বন-জঙ্গল, ঘাট-অঘাটের কোনো বাছ-বিছার ছিল না। সেখানে রাত সেখানেই কাত এমন ছিল হাল। খাওয়া-দাওয়ার কোনো খেয়াল ছিল না। পেলে খেতে, না পেলে নাই। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে ফিরে এল। একা নয়, তার পেছন পেছন এল একটা কালো বিড়াল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাতে সাবেদ ধীরে পায়ে ঢুকে পড়ল বাসায়। ওর সঙ্গে, ঠিক ঠিক পেছন পেছন ঢুকল বিড়ালটা।

মিলে শ্রমিকের দুই দলের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। সামনে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন। তার আগে থেকেই এক দল আরেক দলকে হটাতে চাচ্ছে। কে করবে কাকে কুপোকাত তাই নিয়ে দুই দল সদা ব্যস্ত। দুই দলই সকাল-বিকেল মিছিল বের করে। কার মিছিলে কত বেশি শ্রমিক থাকে তা দেখানোই প্রধান উদ্দেশ্য। তা ছাড়াও নানা উপায়ে দুই দলই নিজেদের দলে কর্মী ভিড়াতে চায়। নিজ নিজ দল ভারী করার চেষ্টা করছে দুই দলই। দলে ভিড়ানোর জন্য চা-নাশতা খাওয়ানোর পাশাপাশি চলে নানান চেষ্টা। চাকরিতে স্থায়ী করে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। কাউকে দেওয়া হয়, ভাই-ভাঁজতে বা আত্মীয়স্বজনের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। অমুক ভাইয়ের দল জিতলে আরামে চাকরি করার লোভ দেখানোর চেষ্টা তো রয়েছেই। এসবে কাজ না হলে ভয় দেখানোর চেষ্টাও বাদ যায় না। হুমকি-ধমকির পাশাপাশি মিলে ঘটে যাচ্ছে আরও নানান ভয়ের ঘটনা। সাদা পোশাকে মিলের ভেতরে কেউ একজন ঘুরে বেড়ায়। আড়ালে-আবডালে অনেকেই তাকে দেখেছে। কিন্তু কেউই তার চেহারা স্পষ্ট দেখেনি। কেউ তার স্পষ্ট বিবরণ দিতে পারছে না। কিন্তু এমন কেউ যে নেই বা এমন কাউকেই দেখা যাচ্ছে না, তাও কেউ হলফ করে বলতে পারছে। এ কথা এমনভাবে চাউর হয়েছে যে তা মিলের প্রশাসন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

মিলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের পক্ষ থেকে এ সমস্যা সমাধানের জন্য সভা ডাকা হয়। সভায় এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রশাসন শাখায়, এ নিয়ে মিটিং হয়েছে শ্রম শাখায়। এ উপদ্রব দমনে নানা কৌশল চিন্তা করা হয়েছে শ্রম শাখায় । শ্রম শাখা থেকে নিরাপত্তা শাখাকে নিরাপত্তা কর্মীদের মাধ্যমে টহল টিম গঠন করে সারা রাত টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সে অনুযায়ী টহল টিম লাঠি, বাঁশি আর বিশাল বিশাল টর্চ লাইট নিয়ে সারা রাত টহল দিচ্ছে। তিনজন করে তিনটি দল তিন দিকে টহল দিচ্ছে। এক দল থাকছে নদীর দিকে, এক দল থাকছে মিলের সামনের দিকে। আরে দল থাকছে ফ্যাক্টরির চারদিকে। তিনটি দলই থেকে থেকে বাঁশি বাজাচ্ছে। কোনো নড়াচড়ার শব্দ টের পেলেই হাঁক দিচ্ছে।

এ দিকে নির্বাচনের ডামাডোল জমে উঠেছে। ভোটের আশায় নেতারা শ্রমিকদের কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। শ্রমিকরাও যে যতটুকু পারে সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই সুযোগে অনেকেই কাজে ফাঁকি দিচ্ছে। বিশেষ করে রাতের শিফটে যাদের ডিউটি তারা ফাঁকি ঝুঁকিতে এগিয়ে আছে। রাতের ডিউটি শুরু হয় রাত দশটায়, শেষ হয় ভোর ছয়টায়। রাত দশটায় কার্ড ড্রপ করে শ্রমিকদের কেউ কেউ বারোটা পর্যন্ত কাজ করে। তারপর ফাঁকির ধান্দা শুরু করে। কেউ কেউ মেশিনের পাশে বিছানা করে ঘুমিয়ে নেয় ঘণ্টা দু-এক। কেউ কেউ আছে নেতাদের চ্যালা-চামুন্ডা। তারা ফাঁকিতে এক কাঠি সরেস। ঘণ্টা দু-এক কাজ করে দেয়াল টপকে বাসায় চলে যায়। ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়ে ভোর পাঁচটায় আবার আবার ফ্যাক্টরিতে ঢুকে পড়ে। নির্বাচনের ডামাডোলের কারণে মিলের উৎপাদন কমে গেছে। এ অবস্থা মোকাবিলার জন্য শ্রম শাখা বিশেষ তোড়জোড় শুরু করেছে। টাইম বিভাগকে মাঝরাতে সারপ্রাইজ ভিজিট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী টাইম কিপার ও হেড টাইম কিপার মাঝে মাঝে মাঝ রাতে ফ্যাক্টরি ভিজিট করে। মাঝে মাঝে শ্রম কর্মকর্তাও এমন সারপ্রাইজ ভিজিট করে থাকে।

এক রাতে ফ্যাক্টরির সারপ্রাইজ ভিজিটে গেল হেড টাইম কিপার সাবেদ আলী। তার সঙ্গে আছে হেড টাইম কিপারের অনারারি উপদেষ্টা সেই কালো বিড়ালটা। ফ্যাক্টরিতে গিয়ে সাবেদ আলী দেখল জনা বিশেক শ্রমিক বিছানা পেতে ঘুমাচ্ছে। সে ওদের হাজিরা কেটে দিল। আর জনা বিশেক শ্রমিককে ফ্যাক্টরিতে পাওয়া গেল না। ওরা কার্ড ড্রপ করে বাসায় চলে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে শ্রম শাখায় রিপোর্ট করে দিল। ওদের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলো। ওদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো।

এরপর থেকে ভয়ের উপদ্রব আরও বেড়ে গেল। সাবেদ আলীর ওপর নানারকম চাপ সৃষ্টি হতে থাকল। তাকে হুমকি দেওয়া হলো নানাভাবে। কিন্তু সব সময় কালো বিড়াল ওর সঙ্গে থাকে। ওকে মনে হয় পাহারা দিয়ে রাখে। সাবেদ আলীর প্রতি কেউ বিরূপ আচরণ করলেই বিড়ালটা তেড়ে আসে। এ এক অদ্ভুত কাণ্ড। বিড়ালের ভয়ে কেউ ওকে বেশি খাটাতে সাহস করে না। কিন্তু আড়ালে-আবডালে চলে সাবেদ আলীকে ঘায়েল করার চেষ্টা। সাবেদ আলীকে সেদিন নদীর ধারে কয়েকজন ধরেছিল মারবে বলে।

সাবেদ আলী হয়তো সেদিন বেদম মার খেত। কিন্তু সাবেদ আলীর সঙ্গে থাকা বিড়ালটার লম্ফঝম্প ছুটে আসে টহলরত পাহারাদাররা। তাদের দেখে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এভাবে সাবেদ আলীকে ঘায়েল করতে না পেরে শত্রুপক্ষ বেছে নেয় পুরোনো প্রচেষ্টা। শত্রুপক্ষ নানাভাবে তাকে ভয় দেখাতে লাগল। সে যখন রাতে ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরে তখন নানা রকম অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায়। এমন বিকট ঝিঁ ঝিঁ কীঁ কীঁ শব্দ যে শুনলে গা শিউরে ওঠে। বড় জাম গাছটার নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় ঠান্ডা-ঠান্ডা পানি তার গায়ের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। পানির এমন তীব্র গন্ধ যে গা গুলিয়ে ওঠে। সে রাতে বাসায় যাওয়ার পথে প্রায়ই দেখতে লাগল বিকট দর্শন ছায়ামূর্তি হঠাৎ এসে হঠাৎই মিলিয়ে যায়। সে দু-এক বার ছায়ামূর্তির পিছু নিয়েছে। কিন্তু ধরতে পারেনি কিছুই। ছায়ামূর্তিগুলো এত দ্রুত হারিয়ে যায় যে, ধরি ধরি করেও ধরা যায় না। ছুঁই ছুঁই করেও ছোঁয়া যায় না। ঘরের চালে গভীর রাতে ঢিল পড়তে লাগল। এমন ঢিল যে মনে হয় ইট-পাটকেলরা ছাদে নৃত্য করছে। এমন পরিস্থিতি সাবেদ আলী ছুটি চাইল। শ্রম শাখা থেকে ছুটি না মঞ্জুর হলো। বাধ্য হয়েই তাকে ডিউটি করতে হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা-অঘটনার শেষ নেই। আরও বিচিত্র নানা ঘটনা ঘটতে লাগল। সাবেদ আলীকে নানা উপায়ে ভয়ভীতি দেখাতে লাগল। এক রাতে সাবেদ আলী বাসায় গিয়ে দেখতে পেল তার বিছানায় একটা মাথার খুলি। এটা মানুষের নাকি কোনো প্রাণীর তা যাতে বোঝা না যায় সে জন্য এটাকে চুন-কালি দিয়ে অদ্ভুতভাবে সাজানো হয়েছে। এটাকে বিছানায় রেখে চার দিকে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল রং।

একদিন সন্ধ্যাবেলা ঘুম থেকে উঠল। রাতে ডিউটি থাকলে দুপুরে সাবেদ আলী ভাত খেয়ে ঘুমায়। একটা লম্বা ঘুম দিয়ে সন্ধ্যার পর ওঠে। আজও তাই করল। ঘুম থেকে উঠে নিজেই এক কাপ চা বানিয়ে খেল। বিড়ালটাকে একটু ভাত খেতে দিল। শরীরটা ভালো লাগছে না। মাথা ঝিমঝিম করছে, গা ম্যাজম্যাজ করছে। এ অবস্থায় ডিউটিতে যেতে হবে। তাই ডিউটিতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিতে হবে। হাতে এখনো ঘণ্টা তিনেক সময় আছে। এই ফাঁকে চলে গেল পুকুর পাড়ে। কিছুক্ষণ বসে থাকবে, যাতে ঠাণ্ডা বাতাসে মাথা ধরাটা যদি একটু কমে। এক ঘণ্টা পুকুর পাড়ে কাটিয়ে এল। এরপর ভাত রান্না করল। একটা ডিম ভুনা করল। ভাত খেয়ে রাত সাড়ে নয়টায় মধ্যে মিলে চলে গেল। দশটায় বি শিফটের শ্রমিকেরা বেরিয়ে যাবে আর সি শিফটের শ্রমিকেরা ঢুকবে। তাদের কার্ড জমা নিয়ে কার্ডে হাজিরা তুলতে হবে। সেই সঙ্গে রেজিস্ট্রি বইয়েও হাজিরা তুলতে হবে। এসব শেষ করে কারখানার ভেতরে পরিদর্শনে যেতে হবে। লেবার ম্যানেজার স্যার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। মাঝ রাতে ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে যেতে হবে। কিন্তু শরীর মানছে না। কৃষ্ণপক্ষ চলছে। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। এমন রাতে সবকিছুই আঁধার-কালো মনে হয়। শরীরের মধ্যেও অমাবস্যার পূর্ণিমা রাতে জোয়ার-ভাটা খেলা করে। ভেতরে-ভেতরে শরীর ভেঙে পড়ে। আজ যেন শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলতে হচ্ছে। রাত বারোটার ঘণ্টা পড়েছে। সেই কখন। এখন মনে হয় দেড়টার মতো বাজে। এমন সময়ে সাবেদ আলী বের হলো ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে। সঙ্গে তার কালো বিড়াল।

ফ্যাক্টরির দিকে যেতে তার খটকা লাগল। আজকের রাতটা বেশি আঁধার-কালো মনে হচ্ছে। অদ্ভুত একটা আওয়াজ আসছে। দূরে কোথাও মনে হয় কুকুর ডাকছে। ডাকছে না বলে কুকুর কাঁদছে বলাই ভালো। শব্দটা কুকুরের কান্নার একটানা সুর। এমন শব্দে গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। থেকে থেকেই সাবেদ আলীর গা গুলিয়ে উঠছে। যাবে না ফিরে যাবে- এমন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে ফ্যাক্টরির গেটের কাছে চলে এল। ঢুকে গেল ফ্যাক্টরির ভেতর। সঙ্গে গেল তার কালো বিড়ালটা। ফ্যাক্টরিতে ঢুকেই সে প্রথমে গেল উইভিং সেকশনে মানে তাঁতখানায় সেখানে সুতা দিয়ে কাপড় তৈরি হয়। উইভিং শাখায় দেখল দুজন ঘুমাচ্ছে। ওদের ডেকে তুলল। ওদের নাম কার্ড নম্বর লিখে নিল। ওরাও আবার কাজ শুরু করল। তারপর গেল স্পিনিং শাখার দিকে। ওখানে তুলা থেকে সুতা তৈরি হয়। স্পিনিং শাখায় দেখল জনা পাঁচেক শ্রমিক বস্তা পেতে ঘুমাচ্ছে। ওদের ডেকে তুলতেই কারেন্ট চলে গেল।

কারেন্ট চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক ঘুটঘুট অন্ধকার হয়ে গেল। এমন অন্ধকার যে এক হাত দূরে কী আছে তাও দেখা যায় না, সে দুই সারি মেশিনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। কোন দিকে যাবে কিছুই বুঝতে পারছে না। আলো ছাড়া এ অবস্থায় এক পাও এগোনো সম্ভব নয়। সে পকেটে হাত দিয়ে টর্চ লাইট খুঁজল। কিন্তু না, আজ সে টর্চ আনতে ভুলে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল দানব আকৃতির একটি ছায়ামূর্তি। সাদা কাপড়ে জড়ানো ওর দেহ। ইয়া লম্বা লম্বা হাত-পা। পাঁচ ব্যাটারির টর্চ লাইটের আলোর মতো জ্বলজ্বলে চোখ। হাত দুটি পাখির ডানার মতো নাড়তে লাগল। আর ধীরে ধীরে সাবেদ আলীর কাছে আসতে লাগল। বিকট ছায়ামূর্তি দেখে মূর্ছা গেল সাবেদ আলী। ছায়ামূর্তিটি দুটি সাবেদ আলীকে কোলে তুলে নিয়ে ফ্যাক্টরির বাইরের দিকে যেতে লাগল। এই অবস্থা দেখে গর্জে উঠল সাবেদ আলীর কালো বিড়াল। এক নিমেষে বিড়ালটি বিকট আকার ধারণ করল। ধাওয়া করল ছায়ামূর্তিকে। ছায়ামূর্তিটি ধাওয়া খেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর ছুটল নদীর দিকে। পেছন পেছন ছুটল সাবেদ আলীর কালো বিড়াল। নদীর কাছাকাছি এসে ছায়ামূর্তি দুটি সাবেদ আলীকে মাটিতে আছড়ে ফেলল। তারপর ছায়ামূর্তি ঝাঁপ দিল নদীর জলে। কালো বিড়ালটি ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পানিতেই চলল ধস্তাধস্তি আর কুস্তাকুস্তি। তারপর ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তি আর কারও বিড়াল মিলিয়ে গেল নদীর জলে। টহলরত নিরাপত্তা কর্মীরা সাবেদ আলীকে উদ্ধার করে। তাকে মিলের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসায় সে সুস্থ হয়ে ওঠে। এ ঘটনার পর মিল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তের রিপোর্টে বলা হয়, সাবেদ আলীর ওপর যারা বিভিন্ন সময় নানা উপদ্রব করত, ঘটনার দিন তারাই সাবেদ আলীকে ভয় দেখানোর পরিকল্পনা করেছিল। তারাই ভূত সেজে সাবেদ আলীকে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু দানব আকৃতির ছায়ামূর্তি কোত্থেকে এল, কোথায় হারিয়ে গেল, আর কেই বা ভূত সাজল, সে রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। সে রাতের পর থেকে আবেদ আলীর কালো বিড়ালটিও আর ফিরে আসেনি।

সাহিত্য- এর আরো খবর