English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

'সেই বীভৎসতার কথা বলে বোঝানো অসম্ভব'

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ২ জুলাই, ২০১৮ ১০:৫৮

ছবি অনলাইন

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর যে বীভৎস নিপীড়ন চালিয়েছে, তার কিছু অংশ সম্প্রতি ব্রিটেনের ডেইলি মিররের বিশেষ প্রতিনিধি টম পেরি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। তাতে তিনি বিভিন্ন রোহিঙ্গা নারীদের সাক্ষাৎকার তুলে ধরেছেন। সে লেখার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো এখানে।

সাক্ষ্যপ্রমাণে ক্রমে যে বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো, চলতি শতাব্দীতে গণহত্যার সবচেয়ে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডটি মিয়ানমারের রাখাইনেই হয়েছে। তারা সেখানে একাধারে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও নিপীড়ন চালিয়েছে।

রোহিঙ্গা নারী ফাতিমা বেগমের কাছ থেকে মিয়ানমারের সেনাদের যে নৃশংসতার বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা কোনো মানুষ করতে পারে, এমনটা অনেকেই ভাবতে পারেন না। সেই বিভৎসতা তার সামনেই ঘটেছে বলে জানান ফাতিমা। সেই বীভৎসতা দেখে তিনি ভাষা হারিয়ে ফেলেন এবং বোবা হয়ে যান।

ফাতিমা বেগম বলেন, প্রথমে তারা আমাদের শিশুগুলিকে শূন্যে ছুড়ে মারে। পরে বড় ছোরা, চাপাতি দিয়ে তাদের কেটে কুচি কুচি করে এবং আগুনে ছুড়ে মারে।

ফাতিমা বলেন, আমাদের বসতবাড়িতে আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দিয়েছে সেনাবাহিনী। এর পর আমার স্বামীকে প্রথমে গুলি করে। পরে গলা কেটে তাকে হত্যা করেছে।

কক্সবাজারের কুতুপালংয়ের একটি আশ্রয়শিবিরে সাংবাদিক টম পেরি ফাতিমার সঙ্গে দেখা করেন। ফাতিমার কোলে ১৪ মাস বয়সী শিশুকন্যা হাসিনা। তিনি বলেন, আমি প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছি। যখন খড়কুটায় নির্মিত বসতবাড়ি আগুন গিলে ফেলছিল, তখন পেছনে না তাকিয়ে সবকিছু ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসি।

স্বামী হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা বনের ভেতরে পালিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাদের আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। তাই আমার স্বামী খাবার আনতে বাড়ির দিকে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে হানাদাররা অপেক্ষা করছিল।

ফাতিমা বলেন, সেনারা প্রথমে আমার স্বামীকে গুলি করে। পরে চাপাতি দিয়ে তার গলাকেটে দুই ভাগ করে ফেলে। এভাবে ৩০ জনকে হত্যা করে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছে।

নাফ নদীর তীরে যখন একদিন আগে ভেলায় চড়ে চারটি পরিবার নদী পার হয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছেন তখন টম পেরির সঙ্গে দেখা হয়। নাজিমা তাকে বলেন, ভেলায় ওঠার সময় লুকিয়ে থাকা সেনারা পিস্তল দিয়ে পেটালে তার স্বামী আসতে পারেনি। তিনি মিয়ানমারে রয়ে গেছেন।

অনেককে স্নাইপাররা দেখতে পেয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। সেখানে খাবারের অপেক্ষায় থাকা সারিতে কেবল নারীরাই ছিলেন। কয়েক হাজার পুরুষকে পাহাড়ের ওপাশে মিয়ানমারের বাহিনী হত্যা করেছে।

প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা ২০ বছর বয়সের আমিনার সঙ্গে দেখা হয়। তার কোলে ছিল আট মাস বয়সী সন্তান মোহাম্মদ ও ১৮ মাসের কন্যা মাহিয়া। বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় তিনি আট মাসের গর্ভবতী ছিলেন। আমিনা কথা বলছিলেন অস্থিরভাবে। তিনি বলেন, তারা আমাদের সন্তানদের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেছে। বন্য জানোয়ারের মতো তাদের কেটে টুকরা টুকরা করেছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার স্বামীকে নির্যাতন করেছে কিন্তু তিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন জানিয়ে নাজিমা বলেন, গর্ভাবস্থার কারণে আমি বেশি দৌড়াতে পারিনি। সবাই ভয়ে যার যার মতো করে পালাচ্ছিলেন। আমিও পালাচ্ছিলাম। যখন আমি নদীর কাছে বনের ভেতর পৌঁছালাম। পালানোর সময়েই আমার পেটে ব্যথা ওঠে এবং আমি সন্তান জন্ম দেই। এরপর বনের ভেতরে একা একা কাঁদছিলাম। এ সময় পাশের গ্রামের মেয়েরা আমার কান্না শুনতে পেয়ে সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তারাই সংযোজক নাড়ি কেটে দেন।

তিনি বলেন সে অবস্থাতেই সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানসহ আমি একনাগারে ১২দিন হেঁটেছি। আমি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলাম। পার্শ্ববর্তী মেয়েরা আমার সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং একটি ডিঙ্গিতে উঠতে আমাকে সাহায্য করেন।

নাজিমা বলেন, সদ্য জন্ম নেয়া মোহাম্মদের নানা স্বাস্থ্য সমস্যা হয়েছে। তার ত্বকে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। সে জ্বরেও ভুগছে। তবে বাংলাদেশে আসার কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই মেয়ে মাহিয়ার সঙ্গে তার দেখা মিলেছে।

কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির তার মতো অসংখ্য বিধবায় ভরে গেছে। তাদের চোখে মুখে স্বামী-সন্তান হারানোর শোক।

রোহিঙ্গা নিধন- এর আরো খবর