English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

থাইল্যান্ডে বাংলাদেশিদের ব্যবসা ও বিয়ে

  • কাজী হাফিজ    
  • ১০ জুন, ২০১৮ ১৭:২০

মনিকা’স কিচেনে দেশি খাবারের স্বাদ নিতে লেখক (সবার ডানে) ও তাঁর ভ্রমণসঙ্গীরা।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে পৌঁছানোর পরবাংলাদেশি খাবার কোথায় পাওয়া যেতে পারে খোঁজ করতেই জানা গেলোসুকুমভিত এলাকার কথা। স্থানটি বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের কাছেই। রাস্থার পাশে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। নামগুলোও বাংলায় লেখা। থাই ও ইংরেজিতেও লেখা আছে।

আমাদের টানলো মনিকাস কিচেন নামটি। রেস্টুরেন্টের নামের সাথে সেখানে লেখা আছে ঘরোয়া পরিবেশে বাংলা খাবার পরিবেশন করা হয়। হালাল খাবারের নিশ্চয়তাও দেওয়া আছে। এ বিষয়ে আরবি লেখাগুলো পড়লেও মনে হয় রেস্টুরেন্টটিতে মুসলিমদের রমজান মাসের একধরণের ধর্মীয় আবহ বিরাজ করছে।

হোটেল মালিকঊষা বিশ্বাস আমাদের পরিচয় পেয়ে খুশি হলেন। খুশি হলেন তাঁর স্বামী তৃষিত বিশ্বাসও। দুজনেই চমৎকার মানুষ।

ঊষা বিশ্বাস জানালেন, তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার পলাশে। আর তৃষিত বিশ্বাসের পৈত্রিক নিবাস নেত্রোকানায়। তাঁদের ঢাকার মোহাম্মদপুর আসাদ অ্যাভিনিউয়ে একটি ফ্লাট রয়েছে। বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের প্রবেশ পথে সুকুমভিত সয়-৩-এ রেস্টুরেন্টটির শুরু ২০০০ সাল থেকে। তার আগে থেকে তৃষিত বিশ্বাস ব্যাংককে ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রসে চাকরি করতেন। বর্তমানে তিনি অবসরকালীন ছুটিতে রয়েছেন। দুই পুত্র সন্তান তাঁদের। এদের একজন গৌতম স্ত্রী সুপ্রিয়া বিশ্বাসকে নিয়ে বাবা-মায়ের সাথেই রয়েছেন। তিনি বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে কাস্টমার কেয়ারে চাকরি করেন। আরেক ছেলে পিয়াল বিশ্বাস আমেরিকা প্রবাসী।

ঊষা বিশ্বাস ঊষা জানালেন, তাঁদের মনিকাস কিচেন সাধারণত সকাল ৮টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত খোলা থাকে। রমজান উপলক্ষ্যে খোলা থাকছে রাত ২টা পর্যন্ত। বাংলাদেশি ছাড়া, ভারতীয়, অ্যারাবিক, ভুটানিজ এবং বার্মিজ কাস্টমারও আসে মনিকাস কিচেনে। শাঝে মাঝে ইউরোপিয়ান কাস্টমারেরও দেখা মেলে। তবে বাঙালি কাস্টমারই বেশি। অ্যারাবিয়ান কাস্টমারদের পছন্দ, বিরানি, চাপাতি ও নানরুটি। কোরাল ও তেলাপিয়া মাছ ভাজিও ওরা পছন্দ করে।

বাঙালিদের পছন্দের খাবার কীভাবে জোগাড় করেন- এ প্রশ্নে ঊষা বিশ্বাস বললেন, পটল, লালশাক, সিম আর কাকরোল ছাড়া আমাদের পছন্দের প্রায় সব সবজিই এখানে পাওয়া যায়। এখানকার বেগুনগুলো চমৎকার। সিড ছাড়া বেগুন। গরুর মাংস, খাসির মাংস -এসবও পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের খাসির মাংস এখান চাইতে ভালো। ট্যাংরা, পোয়া, রুই, ইলিশ -এসব মাছও পাওয়া যায়। ইলিশ আসে মিয়ানমার থেকে। এখানে ফরমালিনের ভয় নেই।

মনিকাস কিচেনে আমাদের জন্য পরিবেশন হলো, সাদা ভাত, আলু ও বেগুন দিয়ে টেংরা মাছ, রুই মাছ, ঢেড়স ভাজি, করলা ভাজি, গরুর ভোনা মাংস, আলু ভর্তাও ডাল। সেই সাথে শসা, গাজর, পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচের সালাদ। আমের আচার ও পাতি লেবুও পাওয়া গেলো।

এ ভোজ গত ৬ জুন রাত প্রায় ১০টার। ঊষা বিশ্বাসের কাছে আমাদের প্রস্তাব ছিল, আমরা বাংলাদেশি-এই বিবেচনায় আপনার পছন্দের খাবারগুলোও আমাদের দিতে বলুন।

আমরা মানে, আমার সাথে আরো তিনজন বাংলাদেশি সাংবাদিক, ঢাকাস্থ একটি চায়নিজ কোম্পানির একজন বাংলাদেশি জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং থাইল্যান্ডের একজন গাইড।

উষা জানালেন, সুকুমভিত এলাকাতেই রয়েছে ৭/৮টি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট। এসব রেস্টুরেন্টের কুক বা বাবুর্চি বাংলাদেশি।বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের কুক হিসেবেই শুধু মাত্র বাংলাদেশিদের নেওয়া যায়। ওয়েটার পদে বাংলাদেশিদের ওয়ার্ক পারমিট জোটে না। এ পদে কাজ করার সুযোগ রয়েছে মিয়ানমারের নাগরিক ও স্থানীয়দের।

থাইল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশিরা আর কি কি ব্যবসায় নিয়োজিত- এ প্রশ্নে ঊষা ও তৃষিত বিশ্বাস জানালেন, ব্যাংককে টেইলারিং ও টুরিজম ব্যবসাতেও রয়েছেন বেশ কয়েকজন।

জানা গেল মনিকাস কিচেন থেকে ট্যুর অ্যন্ড ট্রাভেলস ব্যবসাও পরিচালনা করা হয়। মোবাইল ফোনের সিম এবং রিচার্জ-এর জন্য কার্ডও মেলে।

চাাঁদাবাজি? এ প্রশ্নে বললেন, একদম নেই।

আপনারা কি থাইল্যান্ডের নাগরিকত্ব পেয়েছেন- এ প্রশ্নে এ দম্পতির কাছে জানা গেল, নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি ওই দেশে সহজ না। তবে বিজনেস ভিসায় অনেকদিন থাকা যায়। তৃষিত বিশ্বাস জানানেল তিনি থাইল্যান্ডের রানির অতিথি হিসেবে সে দেশে অবস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।

৭ জুন সন্ধ্যায় সুকুমভিত-১১ তে হোটেল অ্যাম্বাসেডরের অ্যাম্বাসেডর স্কোয়ারে দেখা মিললো, বাংলাদেশিদের বেশ কয়েকটি ব্যবসা কেন্দ্র। একটির নাম অ্যাম্বাসেডর স্কয়ার ইন্টারন্যাশনাল টেইলর। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পীরগঞ্জের মুস্তফিজুর রহমান ওই সময়ছিলেন না। ছিলেন তাঁরভাইপো রংপুর সদরের সুমন।

ঊষা বিশ্বাস, তৃষিত বিশ্বাস ও লেখক

সুমন জানালেন, প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯৮৭ সালে। তিনি যোগ দেন ২০০৩-এ। কাস্টমার মূলত বিদেশিরাই। এছাড়া তাদের অ্যাম্বেসেডর অর্কিডের ভিতরে সোনারগাঁও নামে একটি রেস্টুরেন্টও রয়েছে। থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি কোনোলেবার নিয়োগে অনুমোদন মেলে না। প্রতিষ্ঠানে মালিকের সহকারীহিসেবেথাকার সুযোগ আছে। টেইলরিং শপ বা দর্জি দোকানগুলোর দর্জি, কার্টার সবই স্থানীয় অথবাচাইনিজ। ব্যাংককে বাংলাদেশি টেইলরিং শপ আছে ১০টার মত। এসব প্রতিষ্ঠানে ট্রাভেল এজেন্সির কাজও চলছে। পাতায়াতে এ ধরণের প্রতিষ্ঠানেরসংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে বাংলাদেশিদের রেস্টুরেন্টের সংখ্যাও ব্যাংককের কয়েকগুণ বেশি।

থাইল্যান্ডের পর্যটন নগরী পাতায়া সম্পর্কে জানা যায়, সেখানেপ্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই শুরু হয় বাঙালিদের আনাগোনা।

বর্তমানে শহরটিতে আড়াইশ-এর মতো বাংলাদেশিপরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করে। আর ব্যবসায়িক ও পর্যটক হিসেবে সব সময় দেড় হাজারের মতো বাংলাদেশির অস্থায়ী অবস্থান। পাতায়ায় বাংলাদেশিরা মূলত রিয়েল স্টেট, প্রপার্টি, ট্যুরিজম, রেস্টুরেন্ট, গেস্ট হাউজ, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট, টেইলরিং, রেডিমেট গার্মেন্টস-এসব ব্যবসায় যুক্ত।

থাইল্যান্ড প্রবাসি বাংলাদেশিদের অনেকেই থাই মেয়েদের বিয়ে করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে নিচ্ছেন বলে জানালেন সানি নামের এক বাংলাদেশি তরুণ। সানি নিজেও বিয়ে করতে যাচ্ছেন এক থাই কন্যাকে এবং এর মাধ্যমে ওই কন্যার সাথে প্রণয়ের সফল সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। সানির বড় ভাইও বিয়ে করেছেন এক থাই কন্যাকে। তাদের দুইটি সন্তান।

ব্যাংককের সুকুমভিত এলাকার অ্যাম্বাসেডর স্কয়ারে আরমানি ফ্যাশন অ্যান্ড ট্রাভেল নামের প্রতিষ্ঠানে দেখা হয় সানির সাথে।

৩০ বছর আগে সানির বাবা থাইল্যান্ডে কাজ শুরু করেন। পরে স্ত্রী- সন্তানদেরও সেখানে নিয়ে যান। আরমানি ফ্যাশন অ্যান্ড ট্রাভেল-এর যাত্রা শুরু হয় ১২ বছর আগে। প্রথমে টেইলরিং পরে ট্রাভেল ব্যবসাও যুক্ত হয়।

সানি বললেন, আমার ভাই এখানেহাসপাতালেজব করেন। একই সাথে এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করেন। এখানে একটি বাড়িওকিনেছেন। আমি এখানে এসেছি ১৩ বছর হলো। ওই সময় আমার সাথে আমার আম্মুও এখানে চলে আসেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরাতে।সেখানে আত্মীয়-স্বজন আছে।

সানি আমার সাথে কথা বলার মাঝে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। বলছিলেন থাই ভাষাতে।

কীভাবে শিখলেন এ ভাষা? এ প্রশ্নে বললেন, খুব সহজেই এ ভাষা শিখে নিয়েছি। আমাদের বাংলা ভাষার মতই থাই ভাষার উৎপত্তিসংষ্কৃত ভাষা থেকে। তাছাড়া এখানে বিয়ে করে স্থায়ী হতে যাচ্ছি- এদেশের ভাষা তো শিখতেই হবে।

বিয়ে প্রসঙ্গে সানি আরো বললেন, থাই মেয়েরা বাংলাদেশি মুসলিমকে বিয়ে করে মুসলিম হতে আপত্তি করে না। ওদের পরিবার থেকেও তেমন বাধা আসে না। বিয়ের পরের তিন বছরে সন্তানের বাবা হলে বিদেশিরা এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পায়।

বিয়ে ছাড়া আর কী ভাবে এখানে বসবাস করা যায়- এ প্রশ্নে সানি জানান, এখানে কমপক্ষে ২০ লাখ বাথ (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৫ লাখ টাকা) বিনিয়োগ করে কম্পানি খুললে ব্যবসা পরিচালনার জন্য দুই জনের অবস্থান ও কাজ করার অনুমতি মেলে। বিনিয়োগের পরিমাণএর দ্বিগুণ হলে ওয়ার্ক পারমিটের সংখ্যাও দ্বিগুণ হয়। অবৈধভাবে অবস্থান ও কাজের সুযোগ নেই এখানে।

লেখক : কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি

রিপোর্টার্স ডায়েরি- এর আরো খবর