English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

বিছানায় রিপোর্টারের এক বছর, যেন অকেজো ঘড়ির জীবন...

  • আমিরুল ফয়সল   
  • ৯ এপ্রিল, ২০১৮ ১০:৫৬

গতকাল প্রথম প্রহরে (৭ এপ্রিল, শনিবার দিবাগত রাতে) পূর্ণ হলো ব্রেইন স্ট্রোকজনিত কারণে প্যারালাইজড দশায় আমার দুঃসহ একটি বছর!

২০১৭ সালের ওই রাতে ভয়ংকর ব্রেইন স্ট্রোকের আঘাতে চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলি আমি। এরপর একটার পর একটা দিন গেছে রাত গেছে। সপ্তাহ গেছে মাস গেছে। দেখতে দেখতে পুরো একটা বছর চলে গেলো, আমি নিজের পায়ে ভর দিয়ে এককদমও হাঁটাচলা করতে পারিনি।

কী দুঃসহ ভয়ংকর অভিজ্ঞতা! যে কর্মচঞ্চল মানুষটি প্রতিদিন ভোরে ও বিকেলে দুবেলা নিয়ম করে মাইলের পর মাইল হাঁটতো, জীবনকে ভালোবেসে প্রাণের আনন্দে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতো, সাংবাদিকতা পেশার প্রয়োজনে এখানে ওখানে ছুটে যেতো, টানা একটা বছর সেই মানুষটি এক পাও হাঁটতে পারেনি। ভাবা যায়!

স্বভাবে ছটফটে সেই মানুষটি আজ সামান্য চিলেকোঠা মাপের ছোট্ট একটা কক্ষে পঙ্গুপ্রায় পড়ে আছে। এখন কেবল পড়া, প্রার্থনা আর প্রতীক্ষা ছাড়া দৃশ্যত কোনও কাজই নেই আমার। এখন কাকডাকা ভোরেরও ঢের আগে ঘুম ভেঙে যায় আমার। বহু কষ্টে নিজেকে প্রস্তুত করি আরো একটা দুঃসহ দিনের জন্য। পক্ষাঘাতের নতুন এই দশায় পড়ে আমার রোজনামচা পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

এখন আমি পাঁচবেলা নিয়ম বেঁধে পরম করুণাময়কে প্রাণভরে ডাকি। তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রতি পলে পলে অকৃতী অধম আমাকে দেয়া তাঁর অতুল দানের শোকর গোজার করি।

প্রার্থনার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র গান শুনি। বিচিত্র বিষয়ে পড়ি, অন্তর্জালে গুগোল আর ইউটিউব সমুদ্রে ডুব দিয়ে জানা-অজানা বহু বিষয়ে আরো নিবিড়ভাবে বিচিত্র তালাশ করি। অনুজপ্রতীম ফিজিওথেরাপিস্ট ডা. আনোয়ারের দেয়া নিয়মবদ্ধ ব্যায়ামগুলো দিনভর চর্চা করি। জীবন বদলে গেছে। কিংবা আসলে এটাই জীবন!

গেলো একটা বছরে বহু বিচিত্র কিসিমের কষ্ট আমি পেয়েছি। বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। দৈনন্দিন কাজের তাগাদা নেই, তাই অখণ্ড অবসর। যেন অকেজো ঘড়ির জীবন। এই সুযোগে সৃষ্টির রহস্য থেকে শুরু করে ধর্ম, প্রকৃতি, দর্শন, সমাজ, পরিবার, বন্ধুত্ব, ভূগোল, ক্রিকেট, সংগীত, সুফিবাদ-তাসাউফসহ পাশব ও মানবজীবনের বহু জানা-অজানা দিক সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ পেয়েছি, পড়াশুনা করার সময় পেয়েছি।

বিচিত্র স্বভাবের বহু মানুষের মনস্তত্ত্ব আর শঠতা-ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ দেখেছি। এতোই বুঝেছি যে আজ মনে হচ্ছে আপাতত একটা জনম এসব নিয়ে নতুন কিছুই আর বোঝার বাকি নেই!

আহা! পৃথিবীতে কতো মানুষ কতো বিচিত্রভাবে কতো আনন্দময় জীবনযাপন করছে! আর আমি? আজ স্রেফ ছোট্ট একটা জানালা আকাশ আমার। অদূরের এই জানালার ছোট্ট ফ্রেমটুকুই এখন আমার উঠোন।

সারাদিন শুধু লেখা আর পড়া, শুধু পড়া আর লেখা। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে নিবিড় প্রার্থনা, সুরের আশ্রয় আর অশ্রান্ত লড়াই!

জীবনে কখনোই নিজের প্রয়োজনে আপন-পর কাউকে অকারণে ডাকাডাকি করে বিব্রত করিনি আমি। সবসময় মনে হয়, ডাকাডাকি করাটা আসলে সম্পর্কের দূরত্বেরই পরিচায়ক। মনে হয়েছে কাছের জনকে আবার কণ্ঠ উঁচিয়ে ডাকতে হবে কেন? কল (Call) মানেও তো ডাকা। তাই অকারণে আপন-পর কাউকে যেচে ফোনকলও করিনা। শুধু সারাদিন মনে মনে প্রতীক্ষা করি। আর নির্ঘুম প্রহরীর মতো প্রহর গুণি, দেখি কোনও আপন আমার কথা মনে করে কীনা! এই প্রতীক্ষাতেই দিন যায়, রাত যায়, মাস গেছে, বছরও পেরিয়ে গেলো। সুখ হয়, যখন দেখি আমার আপনরা কতো ব্যস্ত! পঙ্গুপ্রায় আমার কথা যেচে মনে করার মতোন অতো সময় তাদের নেই।

সারাদিন পড়ি, সারারাত পুড়ি। নিরন্তর ওড়া আর একাকী পোড়া ছাড়া আর কী কাজটিই বা করবে নিঃস্ব নিঃসঙ্গ এই ফিনিক্স পাখীটি?

আমিরুল ফয়সল, সিনিয়র রিপোর্টার

রিপোর্টার্স ডায়েরি- এর আরো খবর