English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ফেসবুক থেকে পাওয়া

জীবনে পাওয়া ১০টি সেরা লজ্জা

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ১১ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:২৮

সাব্বির আহমেদ ইমন

১. ক্লাস ফাইভে পড়ি, পাশের বাড়ির আমার বয়সী এক ছেলের সাথে ওর বিদেশি লেগো সেট নিয়ে খেলা করি। একদিন ওর সেটের একটা পার্টস খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি ও খুঁজলাম। আমি ওর বাসা থেকে বের হবার সময় ওর মা আমার শার্ট-প্যান্টের পকেট চেক করলো।

২. আমার এক পরিচিত ভাই একটা দুর্দান্ত আইবিএম পিসি কিনল। মানে ওর বাবা কিনে দিয়েছিলেন। উনি তখন ইন্টার পড়তেন। সবাইকে দাওয়াত করে এনে কম্পিউটার দেখাচ্ছে। আমি ওই পিসি র মাউসটা একটু নাড়ানোর অপরাধে কষে থাপ্পড় খেলাম।

৩. কুরবানি ঈদের পরের দিন আমি বাড়িওয়ালার বাসায় দেখা করতে যাই। ওনারা কথাবার্তা বললেন। আমি টেবিলে বসে আছি। পরিচারিকা পোলাও মাংস, কাবাব নিয়ে এল। আমি হাত ধুতে বাথরুমে গেলাম। এসে দেখি কিছুই নেই। সে তাদের আত্মীয়কে খাবার দেবার পরিবর্তে ভুল করে আমাকে দিয়েছে। পরে সেমাই খেয়ে চলে এলাম।

৪. পাড়ার সবাই একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছি। এক ভাইয়ার বাবা গাড়ি কিনেছেন সেই সেলিব্রেশনে। আসার সময় দামি মাইক্রোবাসে সবার জায়গা হলো। আমার হলো না। এক বড় ভাই বলল, তুমি একটা রিকশা করে চলে আসো। আমি গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। একটা মেয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।

৫. আমার ক্যালকুলেটর নষ্ট, বন্ধুকে বললাম এক্সাম চলছে, দুই/তিন দিনের জন্য ক্যালকুলেটরটা ধার দে। ওর ক্যালকুলেটরটা এক্সপেনসিভ। ও দিল না। হেসে হেসে বলল, এইটা হারায়া ফেললে তোর আব্বাও এইটা কিনে দিতে পারবে না।

৬. স্কুল লাইফে একটা মেয়েকে অনেক পছন্দ করতাম। তাকে বলার সাহস কখনো হয়নি। একদিন সাহস করে ওর বার্থডে তে একটা গোলাপ দিয়ে বললাম, হ্যাপি বার্থডে। ও গোলাপটা ছুড়ে ফেলে আমাকে বলল, যেমন ফকিন্নি মার্কা চেহারা তেমন ফকিন্নি ছাত্র। এতো সাহস ক্যান তোমার!! পাশে ওর অনেক বান্ধবী ছিলো, সবাই হো হো করে হেসে ফেলল।

৭. ক্রিকেট ম্যাচ হবে। পাশের পাড়ার সাথে। চ্যালেঞ্জ ম্যাচ। আমি খুবই এক্সাইটেড। আগেরদিন ব্যাট মুছে রেডি করলাম। সকালে আমার মা আমাকে আদর করে দোয়া পড়ে দিলেন। মাঠে গিয়ে দেখি আমাদের টিমে ১৪ জন। আমি ওপেনিং বলিং করব। হালকা প্র্যাক্টিস করছি। ক্যাপ্টেন বড় ভাই ১১ জন সিলেক্ট করে দুইজন এক্সট্রা রাখলেন। আমি রিকশা করে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে এলাম। ১৪তম লোকটা আমি।

৮. নাইনে অংকে পেলাম ৩৯। ক্লাস টেনে রোল নাম্বার পিছিয়ে ৬০। আমার আত্মীয়-স্বজন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। একবার আমার এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গেলাম। ক্লাস থ্রিতে পড়া আমার কাজিন আমার কাছে একটা অংক নিয়ে এল। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলাম। ওর মা বললেন, যাও সুমনের (আমার আরেক কাজিন) কাছে বুঝো। ও অংক বুঝে নাকি? যথারীতি সবাই হেসে ফেলল। ক্লাস থ্রি এর অংকও আমি বুঝি না।

৯. ছোটবেলায় খুব রোগা ছিলাম। দেখতেও ভালো ছিলাম না। একসাথে পাড়ার সব ছেলেরা যখন খেলতাম, কোনো সুন্দর মেয়ে আশেপাশে এলে অন্যরা আমাকে আব্দুল আব্দুল করে ডাকতো। একবার আমি শুনতে পেরেছিলাম একটা ছেলে বলছিল, ওর নাম ও আব্দুল, দেখতে ও আব্দুলের মতো।

১০. কলেজ লাইফে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা আমার করার কথা, কিন্তু উপস্থাপিকা আমার সাথে উপস্থাপনা করতে চায়নি। কারণ, আমি ওর লেভেলের স্মার্ট নই। আমাকে অনুষ্ঠানের দিন রিহার্সেল সত্ত্বেও দর্শক সারিতে বসতে হলো। যদিও বেশীক্ষণ থাকা লাগেনি; অন্য ছাত্র-ছাত্রীদের হাসাহাসির কারণে বাধ্য হয়ে বাসায় চলে এসেছিলাম।

এই ঘটনাগুলো প্রতিটাই আমার সাথে ঘটা। আমি নিজের ব্যাপারে সত্যিই কনফিডেন্ট ছিলাম না। খুব কষ্ট হতো। মাঝে মাঝে মনে হতো মরে যাই না কেন!

আমি বড়লোক নই, সুদর্শন নই, স্মার্ট নই, কথা বলতে পারি না, খারাপ ছাত্র। কি দরকার আমার পৃথিবীতে থাকার? অনেক সময় শিক্ষকদের বকা খেতাম, মার খেতাম। কিন্তু আমি বেঁচে রইলাম, মরতে ভয় হয়। আমি চেষ্টা করে গেলাম।

আমার ভালো কোনো গুণ না থাকলে ও একটা শক্তি ছিলো। স্বপ্ন কে বাস্তবতার রূপ দেবার জন্য সাহস। একা একাই যুদ্ধ করেছি। পাশে পেয়েছি আমার মা আর বাবা কে। আমার ওপর তাদের অনেক বিশ্বাস ছিল।

মানুষের সব অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি নিজেকে পরিবর্তন করেছি। I always forgive, but never forget.

আমার জীবনটা খুব সহজ সুন্দর ছিলো না। আমাকে জীবনে অনেক অনেক ধাক্কা খেতে হয়েছে। আর আমি শিখেছি - জীবনে তোমার সব চেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু তুমি নিজেই।

চোখের পানি কেউ মুছে দেয় না, নিজেকেই মুছতে হয়। ঘুরে দাঁড়াতে হয়। যখন কোনো আশা থাকেনা, আশা তৈরি করে নিতে হয়। লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে চলে যাবার পরও সেখানে যাবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়, মাথা উঁচু করে সবার মাঝে নিজেকে আলোকিত করতে।

আমি কষ্ট করেছি। সবাই যখন আনন্দ করতো, আমি তখন পারতাম না। কিন্তু একদিন পেরেছি। এবং সেই জয়ের তৃপ্তি যে কতখানি, আমি জানি।

আজ আমাকে যে কোনো প্রোগ্রামে সম্মান করা হয়। আমাকে লজ্জা পেতে হয় না। মোটামুটি সফল একজন প্রকৌশলী বলা চলে।

আমার যে পরিমাণ লেগো সেট আছে, অনেকেই ঈর্ষান্বিত হবে। আমি যে কম্পিউটার ব্যবহার করি ওই ভ্যালুতে সাধারণ মানের দশটা কম্পিউটার কেনা যাবে। অনেক অনেক ইলেকট্রনিক গেজেট আমি কিনি। অপচয় হয়তো, কিন্তু তৃপ্তি পাই। প্রতিটা লজ্জার, চড়ের, লাঞ্ছনার হিসাব আদায় করি।

অসুন্দর বলে অনেক অপমানিত হয়েছি, এখন হইনা বরং সবাই বেশ হ্যান্ডসামই বলে। কথা না বলতে পেরেও এখন ভালো বক্তা। আনস্মার্ট হয়েও এখন অফিসে স্মার্টনেসের রেফারেন্স।

ঘুরে দাঁড়ানো খুব কষ্টের কিছু না। প্রয়োজন শুধু সাহস আর দমের। বুকে দম থাকলে হারতে চাইলেও হারা যায় না। আর আশা, সুন্দর একটা স্বপ্ন। যা পূরণ করা একমাত্র লক্ষ্য হতে হবে।

Dont expect help.... help yourself. আমি যখন ভেঙে পড়েছিলাম, তিনটা ওষুধ, আমার কাজে লেগেছিল- Self motivation Self Confidence Self Coaching

আমি কোটিপতি নই। আমার ওই রকম টার্গেটও ছিলনা কখনো। আমার টার্গেট ছিল একটা তৃপ্তিময় জীবনের। আমি সে জীবন পেয়েছি। তার জন্য আমি বুয়েটের কাছে, শিক্ষকদের কাছে ঋণী।

শেষ একটা কথা বলি, Hope is a good thing. Maybe even the best of things and good things never die. (The Shawshank Redemption)

My hope was to be a satisfied man, my hope didnt die...

- - সাব্বির আহমেদ ইমন, যন্ত্রকৌশল, বুয়েট ৯৭ ব্যাচ

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)

পাঠকের কথা- এর আরো খবর