English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

অভিবাসী নারী দুঃখী নারী

  • মারুফা মিতু    
  • ৬ জুন, ২০১৮ ১৩:২৬

আমি আগে দেশে মানুষের বাড়িতে কাম করতাম। খালাম্মারা একটু ফ্রিজের খাবার দিলে মন খারাপ অইতো। অহন বুঝতাছি বিদেশের বেডিগো চেয়ে আমগো দেশের মানুষ কত বালা। সারা দিন কাম করাইত। একবেলা খাওন দিত। আর শুইতে দিত বাথরুমের পাশে। গন্ধে সারা রাইত ঘুম আইতো না। সারা দিন কাম করাইত। একটু ভুল হইলেই মাইর দিত। আমি যহন দূতাবাসে আছিলাম তহন অনেকেরেই দেখছি, যাগো মাইরা মালিকরা হাত-পা ভাইঙ্গা দিছে। আবার অনেকেরেই দেখছি গর্ভবতী হইয়া আইছে। এক মাইয়ারে তো অনেকবার অনেকজনের কাছে বিক্রিও কইরা দিছিল। নিজের নিঃস্ব হওয়া, বিপর্যস্ত জীবনের কথা এভাবেই বলেন ৪০ বছর বয়স্ক মোর্শেদা। সম্প্রতি সৌদি আরবে বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। মোর্শেদার মতো এমন আরো অসহায়, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া নারীদের কথা শুনছি আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে। নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে যাঁরা পাড়ি জমিয়েছিলেন আকাশপথে। কিন্তু নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন দেশে। নিঃস্ব হয়ে।

তেমনি আরেক নারী সাবিনা। ঢাকার গাজীপুরে তিন ছেলে-মেয়ে আর স্বামী নিয়েই ছিল সাবিনার ছোট সংসার। তবে সংসারে একটু সচ্ছলতা আর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মাস ছয়েক আগে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব যান তিনি। পূর্ব পরিচিত ইসলাম আলীর কথায় গুলশানের একটি এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে কাজের খোঁজে সৌদি আরব যান সাবিনা। কিন্তু ফেরেন শূন্য হাতে, সঙ্গে হারান সাজানো সংসার। তাঁর সঙ্গে আর সংসার করতে চান না স্বামী।

সাবিনা জানান, সৌদি আরব পৌঁছার পর তাঁকে একটি বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর বাসার মালিক তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে যায়, যাতে তিনি পালাতে না পারেন। সাবিনা দিনে এক বেলা ঝুটা খাবার খেয়ে, টয়লেটের পাশে শুয়ে, সব নির্যাতন সহ্য করে দিন কাটাতে থাকেন শুধু একটি সুযোগের আশায়। এক দিন যখন তিনি সে সুযোগ পান, তখন ওই বাসা থেকে পালিয়ে যান।

সাবিনা বলেন, আমার দেড়টা লাখ টাকাই পানিতে গেল। সৌদি আরবে ছয় মাস থাকনের পর দেশে আইতে পারলাম। এহনো অনেকে দূতাবাসে আছে। ২০০-২৫০ জনের মতো গর্ভবতী মাইয়াগো দেখছি। ওরা সবাই ঘরের কামের জন্য এহানে আইছিল। কিন্তু মালিকরা ওগোরে গর্ভবতী বানাইয়া দূতাবাসে ছাইড়া দিয়া গেছে। অনেকে আবার পালাইয়াও আইছে।

নিজের দুঃখের সঙ্গে সাবিনা আরো বলেন, এক মাইয়া আইছিল। শরীরের অবস্থা ভালো আছিল না অর। শরীরের জায়গায় জায়গায় মাইরের দাগ। ওর মালিক ওরে খালি একেকজনের কাছে কয়েক রাইতের লিগা বিক্রি কইরা দিত। আমার লগেই দেশে ফিরছে। আরো অনেক মানুষরে দেখছি দূতাবাসে। মালিকরা কারো হাত-পা ভাইঙ্গা দিছে, কারো গায়ে গরম পানি ঢাইলা দিছে, আরো অনেক ধরনের নির্যাতন করছে।

বিদেশে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য কতটুকু ফেরাতে পারছেন নারী শ্রমিকরা? সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অধিক অর্থ উপার্জনের আশায় তাঁরা বিদেশে যাচ্ছেন ঠিকই; কিন্তু অনেকেই যৌন নির্যাতনসহ নানা রকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অথচ অভিবাসী নারী শ্রমিকরা পুরুষদের চেয়ে কম উপার্জন করলেও তাঁরা তাঁদের আয়ের ৯০ শতাংশ টাকাই দেশে পাঠিয়ে দেন। যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা পাঠান মাত্র ৫০ শতাংশ। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের নারীদের রয়েছে বড় ভূমিকা। কিন্তু নাছিমা-মোর্শেদার মতোই তাঁদের জীবনে পরিণতি। ভাগ্যের পরিণতি।

ভাগ্য ফেরাতে হাজারো নারী শ্রমিক প্রতিবছর বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে অনেককেই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। যৌন নির্যাতন, খেতে না দেওয়া, বেতন না দেওয়া, কাজে ভুল হলেই মারধর, এক বাড়ির কথা বলে একাধিক বাড়িতে মাত্রাতিরিক্ত কাজ করানো, মিথ্যা মামলা দেওয়াএমন নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেকেই। কেউ কেউ এক বছর ধরে সেফ হোমে আছেনএমন তথ্যও পাওয়া গেছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রগ্রাম থেকে জানা যায়, ১০০ জনের বেশি নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে সাত লাখ নারী কর্মী বিদেশে অবস্থান করছেন। শুধু ২০১৭ সালেই এক লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন নারী শ্রমিক দেশের বাইরে গেছেন। বাংলাদেশে মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০০৩ সালে সরকার আংশিক ও স্বল্পদক্ষ নারীদের অভিবাসনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অভিবাসীদের মধ্যে যেখানে নারী অভিবাসীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ শতাংশ। নীতিমালায় পরিবর্তনের কারণে ২০০৯ সালে এই হার উন্নীত হয় ৫ শতাংশে।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারী শ্রমিকরা সবাই যে সমস্যার মুখোমুখি হন, তা ঠিক নয়। জর্দানে পার্লারের কাজ করা এক নারী শ্রমিক দেশে ফিরে জানান, ৯ মাস ধরে দেশে আছেন, আবার বিদেশে যাবেন। বিউটি পার্লারে কাজ করে তিনি মাসে ১৮ হাজার টাকা এবং ওভারটাইম মিলিয়ে পান মোট ৩০ হাজার টাকা। তিনি চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। কোনো সমস্যা হয়নি। তাঁর পরিবার তাঁর আয়ে সচ্ছলতার মুখ দেখেছে, তিনি পরিবারে মূল্যায়ন পাচ্ছেন। সমাজে তাঁর মর্যাদা বেড়েছে।

আরেকজন শ্রম অভিবাসী ফাতেমা বেগম জানান, দুই বছর আগে তিনি এক লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ওমান যান, যেখানে ৯ দিন থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন। নাছিমা বেগমকে বলা হয়েছিল তাঁকে এমন পরিবারে কাজ করতে দেওয়া হবে, যে পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৩, কিন্তু তাঁকে সাতটি পরিবারের কাজ করতে দেওয়া হয়। তিনি সেখান থেকে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, স্বামী ৩০ হাজার টাকা পাঠালে তা দিয়ে দেশে ফেরত আসেন।

বাংলাদেশ থেকে সাধারণত লেবানন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, ওমান, মরিশাস, কুয়েত, মালয়েশিয়া, বাহরাইন, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিকরা কাজ করতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিকদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হলেও নির্যাতনের শিকার তাঁরাই বেশি হন।

অভিবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানম জানান, অভিবাসীকর্মীদের ডাটা বেইজ তৈরি করে তথ্য সংরক্ষণ করা, চাকরির নামে বিদেশে পাচারকৃত ভিকটিমকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থাসহ আইনগত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও অর্থ সহায়তার বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। তাতে আমাদের নারীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে পাবেন।

প্রবাসের কান্না...- এর আরো খবর