English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

নাকি উচ্চ পর্যায়ে কোন পাঁঠা-ই নেই!

  • ক্যাপ্টেন মনোয়ার হোসেন   
  • ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ১৭:৫৬

দামি ফরাসি পারফিউমের মোহনীয় ঘ্রাণে মন উতলা। তার ওপর রুচিশীল পোশাকে আভিজাত্য ঝরে পড়ছে। কড়া মেক আপের সুন্দরী বেশ খানিকটা সময় ধরে কাউন্টারে, মন ভরে শপিং করেছেন কিংস বেকারির ধানমন্ডি ছয় নম্বর রোডের এই দোকানটায়। আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছি এক প্যাকেট পাউরুটি আর দুই পিস পেস্ট্রি কেক হাতে। সাথে আমার বউ।

ক্যাশ কাউন্টারে তার বিল তৈরি হলে পর টাকা বের করতে কাঁধে ঝোলানো গুচি ব্যাগটি খুলতেই চমকে আমার বউয়ের দিকে তাকালাম, দেখি সে-ও আমার মতনই চমকেছে। চল্লিশে পা দিয়েছেন কি দেননি। ফর্সা বা হাতের মোলায়েম আঙ্গুলে কয়েক বান্ডিল টাকা নাড়াচাড়া করতে করতে বেখেয়ালে কি যেন ভাবছিলেন।

সবগুলো এক হাজার টাকার নোট, রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা মোটা মোটা বেশ কয়েকটি বান্ডেলের থেকে এক বান্ডেল হাতে নিলেন। তারপর ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে অনুমানের ওপর বেশ কয়েকটা নোট আলাদা করে কাউন্টারে রাখলেন। কাউন্টারের ছেলেটি ওখান থেকে কয়েকটি নিয়ে বিলের টাকা রেখে বাকিটা ফেরত দিলেন। আমি আর আমার বউ দুজনেই বড় বড় চোখ করে অপলক চেয়ে আছি। ভদ্র মহিলার সাথে থাকা কাজের মেয়ে টাইপের কেউ দুহাত ভরে ব্যাগ নিয়ে কাউন্টার ছেড়ে গেল।

সুন্দরী ললনা ফিরে যেতে ফরাসি সৌরভের মন কাড়া সুগন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে দিলেন। সম্বিত ফিরে পেলাম। বাপরে! এত টাকার মালকিন!

আরেকদিনের গল্প। দু হাজার তিন-চারের হবে। ধানমন্ডি দুই নম্বর রোডের স্ট্যান্ডার্ড চার্টারড ব্যাংকে ব্রিটিশ পাউন্ড স্টারলিংয়ের একটি ড্রাফট করব আমার প্রফেশনাল সার্টিফিকেট রিনিউয়ের ফিস বাবদ।

ফর্ম ফিল আপ করছিলাম। কাউন্টারে বসে। আমার বাপাশে দেখি এক বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন, কাউন্টারের মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যদি বয়স্ক ভদ্রলোকের কাজটি আগে করে দেয় তবে আমার কোনো সমস্যা হবে কী না? আমি সম্মতি জানিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ভদ্রলোককে বললাম, নো প্রব্লেম। আপনি বসুন।

এই বসুন বলে ফেলাটার অপরাধে আমি পড়লাম বিশাল এক ক্যাঁচালে। তার কাজটি শেষ হচ্ছে না তিরিশ মিনিট পার হয়ে যাবার পরও। বেশ কয়েকটি এফডিআর ভাঙ্গাচ্ছেন।

পাশেই যেহেতু ছিলাম, অংকে দেখলাম প্রায় সোয়া কোটি টাকার। আমি বারে বার ঘড়ি দেখছিলাম। যেভাবে গল্প করছেন, তাতে মনে হচ্ছে না আরো একঘন্টায়ও তাদের কাজ শেষ হবে। গল্পের ছিঁটেফোঁটা যা কানে আসছিল তাতে জানা গেলে- এই অল্প কিছুদিন হল রিটায়ারমেন্টে গিয়েছেন। সচিব ছিলেন। ধানমন্ডিতে চারটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক। আরো একটা কিনছেন।

চোখে মুখে বিরক্তি এঁকে তাদের আশে পাশে পায়চারি করছিলাম। উদ্দেশ্য- আমার বিরক্তিপূর্ণ চেহারা দেখে ব্যাংকের ভদ্রমহিলা যেন কাজটিই করেন, গল্পটা পরের বারের জন্য তুলে রাখেন। আমার পেছনেও বেশ বড় লাইন জমে গিয়েছে। আমি এর মাঝে বেশ কয়েকবার কাউন্টারের মহিলাকে বললাম যেন একটু দ্রুত করেন। উনি আবার বাংলা বলতে পারেন না, অথবা বলতে ঘৃণা করেন। আমাকে আরো একটু অপেক্ষা করতে বললেন।

ঘড়ির কাঁটায় পাক্কা চল্লিশ মিনিট চলে গিয়েছে, পেটও ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করা শুরু হয়েছে। দুপুর দুইটা পেড়িয়ে গিয়েছে। মেজাজ আর ঠিক রাখতে পারলাম না। আরো একবার রিকোয়েস্টও যখন শুনলেন না, চিৎকার করে জানতে চাইলাম আমি কী অপরাধ করেছি!

ভদ্রমহিলা বললেন, উনি একজন সম্মানিত কাস্টমার, সচিব এবং অনেক টাকার এফডিআর এই ব্যাংকে গচ্ছিত! আমি এবার চিৎকার করেই অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কত টাকার বেতনে চাকরি করতেন? কীভাবে এত টাকার মালিক হলেন এই জবাবটা আগে দিন!

ব্যস, আগুন ধরে গেল! চিৎকার চেঁচামেচিতে টেকা দায়। ভদ্রলোক খুব ক্ষেপে গেছেন, একপর্যায়ে তোতলাতে লাগলেন। জানতে চাইলেন, আপনি কে আমাকে এইসব জিজ্ঞেস করার?

আমি আমার পরিচয় দিলাম। তারপর বললাম, আমি আমার বৈধ আয়ের টাকা বৈধ পথেই ব্যাংকে পাঠাই। কাউন্টারের মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, শুনুন, আমিও আপনাদের একজন বড় কাস্টমার, এই দেশের আর দশজন খেটে খাওয়া ওয়েজ আর্নারদের মাঝে একজন।

আমিওবড় কাস্টমার কাস্টমার শুনে মহিলা তাচ্ছিল্য করে বললেন, আপনার অ্যাকাউন্টেতো তেমন টাকাই নেই।

আমার মেজাজ খুব চরমে ছিল। জোরেই বললাম, শুনুন, গত কয়েক বছরে আমি আমার রক্ত পানি করা টাকা আপনাদের ব্যাংকেই পাঠিয়েছি, হিসেব করে দেখেন উনার এই এফডিআর থেকে কম হবে না, অনেক বেশিই হবে। আর উনি যে এফডিআর ভাংগাচ্ছেন, তাকে জিজ্ঞেস করুন তার এই টাকা বৈধ নাকি অবৈধ।

আশপাশের মানুষ মজা দেখছিল। ঝগড়াঝাটির মাঝে ম্যানেজার এলেন, আমাকে শান্ত করে স্যরি বলে উনার কেবিনে নিয়ে গিয়ে আমার ড্রাফট করে দিলেন।

সমস্যা: এই হারাম খাওয়া লোকগুলো কী কারণে যেন সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যাক্তি। তাদেরই আমরা পূজা করি।

প্রশ্ন: ডিজি শিপিং এর এরকম দুইটা পাঁঠা দুদকের হাতে ধরা পড়ে রিমান্ডে গিয়ে পিটুনি খেয়েছে। খুব জানতে ইচ্ছে করে, গোবেচারা টাইপের পাঁঠা বলেই কি এদের প্যাঁদানি দেয়া হল, বলির পাঁঠা বানানো হল? নাহলে আরো উচ্চ পর্যায়ের পাঁঠাদের কখনোই ধরা হয় না কেন? নাকি উচ্চ পর্যায়ে কোন পাঁঠা-ই নেই!

ক্যাপ্টেন মনোয়ার হোসেন : বিদেশি জাহাজে কর্মরত মাস্টার মেরিনার

প্রবাসের কান্না...- এর আরো খবর