English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ইতরামি করেন তাই লোকে ছ্যাঁচড়ামি করতে বাধ্য হয়...

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ১৯ মার্চ, ২০১৮ ১৮:০৫

পারতপক্ষে কারও সাথে আমার ঝগড়া হয় না। বন্ধুদের সাথে রাগারাগি করি, তবে ঝগড়া করি না। কিন্তু সেদিন ইচ্ছে করেই ঝগড়া করেছি। ঝগড়ার বিষয়, পাওনা টাকা। এটাও মূল বিষয় না, বরং যার কাছে টাকা পাবো, তার ওপর রাগ জমে ছিল, সেসব ঝেড়ে আসা।

আমি কাতারে দীর্ঘ দু বছর যে বাসায় থেকেছি, এই লোক সেই বাড়ির ম্যানেজার। ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ভাড়া ওঠানো এবং মূল মালিককে তা বুঝিয়ে দেওয়া তার কাজ। মালিকের অজান্তে দু-একটা রুম তৈরি করে সেগুলো থেকে ভাড়া উঠিয়ে নিজের ফায়দা লোটা বা মালিকের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অঙ্কে ভাড়া দিয়ে লাভ করা- এ দুটোই তার ব্যবসা।

হাস্যকর বিষয় হলো, কাতারে এই দালালি ব্যবসায় এসে অনেক বাংলাদেশি নিজেদের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন।

রুম ছেড়ে দেওয়ার আগে এই লোক আমার কাছ থেকে বেশকিছু অর্থ ধার নেন। সেই পাওনা এবং রুম ভাড়া দেওয়ার সময় যে জামানত রেখেছিলাম, তা ফিরিয়ে দিতে দশদিন সময় চাইলেন। আমি সময় দিলাম এবং নির্ধারিত তারিখের তিনদিন পর গেলাম। শুরু থেকে বাসায় আমার বন্ধুদের যাতায়াত আছে, এটা দেখে তিনি আমার কাছে দু জনের সমপরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ বিল দাবি করেছিলেন, আমি সেভাবেই দিয়ে এসেছি পুরো দু বছর। প্রায় মাসে আমি নির্ধারিত তারিখের দু-তিনদিন আগে তাকে ডেকে বাড়িভাড়া তুলে দিয়েছি। একাধারে মাসের বেশি সময় ধরে ছু্টি কাটাতে যখন দেশে যেতাম, তখনও তাকে পুরো ভাড়া অগ্রিম দিয়ে যেতাম।

প্রায় দু বছর থাকার পর যখন আমি রুমটি ছেড়ে আসি, তিনি আমাকে ধন্যবাদটুকুও দেননি। বরং, তাঁর আচরণে মনে হচ্ছিল, আমি চলে যাচ্ছি না, বরং তিনি যেন আমাকে উচ্ছেদ করছেন। আমার সঙ্গে যারা ছিল, তারা বেশ অবাক হয়েছে সেদিন এই লোকের আচরণে।

আমি আগে থেকেই জানি, প্রবাসে মাঝেমাঝে যে কয়েকজন ইতর দেখি, এই লোক তাদের মধ্যে একজন। ভাড়া নিতে বা কোনো প্রয়োজনে রুমে এলে দরজায় নক না করে ঘরে ঢুকে পড়তেন তিনি, তাঁর এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ দেখে আমার আরব বন্ধু একদিন তাকে বেশ ঝেড়েছে, আমি তখন বাসায় ছিলাম না। পরদিন আমাকে ডেকে তিনি বললেন, আপনার ওই আরব বন্ধু লোক ভালো না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি ভালো?

ওই বাসায় বিদ্যুৎ সংযোগে নির্ধারিত ধারণক্ষমতা ডিঙিয়ে বাড়তি রুম ভাড়া দেওয়ায় প্রচণ্ড গরমের সময় বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, আমি তখন সরাসরি বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করে সেটি সমাধানের জন্য অভিযোগ করি। তিনি একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ভাই, লাইন কেটে গেলে আপনি ফোন করবেন না, বিদ্যুৎ অফিসের টিম এসে বাসা চেক করলে আমার সমস্যা হবে। আমি তাকে বলেছিলাম, মাস শেষে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছি, আপনার চোরাই কারবারের জন্য আমি কি গরমে সেদ্ধ হবো?

সেদিন আমার পাওনা টাকা থেকে নানা অজুহাতে আড়াইশ রিয়াল কম দিতে চাইছিলেন তিনি। আমি বেশ বকাঝকা করে শেষে দেড়শ রিয়াল ছেড়ে দিয়ে এসেছি। তিনি বলেছিলেন, পরে দেব- আমি বলে এসেছি, আপনার মতো লোকের পেছনে দেড়শ রিয়ালের জন্য ঘোরাঘুরির সময় আমার নেই, ওটা আপনাকে দিয়ে গেলাম।

আমার রুদ্রমূর্তি আচরণে থতমত খেয়ে তিনি স্বীকার করছিলেন, অন্য ভাড়াটিয়াদের খারাপ আচরণে তাঁরও আচরণ খারাপ হয়ে গেছে, সেজন্য তিনি আমার সঙ্গে ভদ্রতায় ত্রুটি করেছিলেন। আমি উল্টো বলে এসেছি, দু বছর আপনার সঙ্গে গলা উঁচু করে কথা বলার প্রয়োজন হয়নি আমার, এখন বলতে হচ্ছে, কারণ আপনি লোক হিসেবে অতি মন্দ প্রকৃতির। আপনি ইতরামি করেন বলে লোকে আপনার সাথে ছ্যাঁচড়ামি করতে বাধ্য হয়।

বিদেশে এসে অর্থ উপার্জনের নেশায় মানুষ পশুর চেয়েও কতটা অধম হতে পারে, এর এমন অনেক জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ দেখা হচ্ছে এই প্রবাসে। মাঝেমধ্যে বড় কষ্টদায়ক হয় প্রবাসী-ব্যবসায়ীদের করা এইসব কাবুলিওয়ালা টাইপের আচরণ হজম করা।

তামীম রায়হান: গণমাধ্যম গবেষক, মানবাধিকার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কাতার

প্রবাসের কান্না...- এর আরো খবর