English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

লালাই : ভালোবাসার ব্যতিক্রমধর্মী এক উপাখ্যান

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ২৯ আগস্ট, ২০১৮ ২১:৩৫

চলচ্চিত্রকে সবার সামনে প্রদর্শনের যন্ত্র আবিষ্কারের শত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর অনেক আধুনিক যন্ত্র এসেছে। ১৬ মিলিমিটার কিংবা ৩৫ মিলিমিটারের গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিতে। বায়োস্কোপে চোখ লাগিয়ে দৃশ্য অবলোকন করা মানুষ বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই চলচ্চিত্র দেখছে থ্রিডি আইম্যাক্স স্ক্রিনে।

অথচ আমাদের দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি পড়েছে একেবারেই নাজুক পরিস্থিতিতে। দর্শক না পেয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একসময়ের হাউজফুল সব প্রেক্ষাগৃহ। এজন্য কেউ দুষছেন প্রেক্ষাগৃহের নাজুক পরিবেশকে, তো কেউ প্রশ্ন তুলেছেন চলচ্চিত্রের মান নিয়ে।

এছাড়া গৎবাঁধা চলচ্চিত্র, নকল কাহিনি, অদক্ষ ক্যামেরা সঞ্চালনা, অভিনয়ের নিম্নমান, নির্মাতার অদক্ষতা ইত্যাদি অভিযোগ তো রয়েছেই। তবে আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বেহাল দশার মধ্যেও কিন্তু বেশ প্রশংসা কুড়িয়ে চলেছে টেলিভিশন নাটক। এর আগে বড় ছেলে নাটকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে বেশ কিছু নাটক নির্মাণের খবর চোখে পড়ছিল গণমাধ্যম মারফত। যাদের নাটক নিয়ে দর্শকের আগ্রহ বেশি চোখে পড়েছে, তরুণ নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ তাদের মধ্যে অন্যতম। ঈদের আগেই গণমাধ্যম মারফত জানা যায়, অন্য অনেক নাটকের মধ্যে লালাই নির্মাণ করছেন তিনি। গৃহপালিত গরুর প্রতি তার মনিবের ভালোবাসার গভীরতাকে কেন্দ্র করে নাটকটি নির্মাণ করা হচ্ছে জেনে আগে থেকেই তা দেখার আগ্রহ ছিল।

লালাই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো এবং তানজিন তিশা। ইউটিউব চ্যানেল ধ্রুব টিভিতে দেখি নাটকটি। আনিসুর বুলবুলের গল্পে এবং বান্নাহর চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করা নাটকটি একবারের বসায় দেখি ফেলি সাধারণ দর্শকের চোখে।

এরপর নাটকটির সমালোচনা লেখার জন্য আরেকবার দেখতে বসি। প্রথমবারের দেখায়, যে কোনো দর্শকের কাছে নাটকটি ভালো লাগবে, এটা হলফ করেই বলা যায়।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, প্রেম-ভালোবাসা কেন্দ্রিক কিংবা ভাঁড়ামি ঘরানার বাইরে গিয়ে পোষা প্রাণীকে নিয়ে বর্তমান সময়ে এসে নাটক নির্মাণ করার সাহস দেখানো এবং এ ধরনের গল্প লেখার জন্য নির্মাতা-গল্পকার উভয়ে প্রশংসার দাবিদার।

কালু চরিত্রে নিশো একেবারে অনবদ্য। তার হাঁটা চলাফেরা দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। কোমরে ব্যথা পাওয়া লোকের মতোই সাবলীল নিশো। তাছাড়া গরু কিনে নিয়ে যাওয়া লোকের বাড়িতে কালুর যাওয়া দিয়ে নাটকের শুরু করাতে দর্শক বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলেই মনে হয়। কারণ নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের শুরুর দৃশ্য চমকপ্রদ হলে বাকি সময়ও দর্শককে ধরে রাখা যায়।

নাটকের পরতে পরতে আবেগের ছড়াছড়ি। হৃদয় বিদারক কিছু দৃশ্য বেশ আবেগী করে তোলে নাটকটি দেখার সময়। সেইসব দৃশ্যে সংলাপ না রেখে এবং গতি কমিয়ে রুদ্ধশ্বাস এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নির্মাতা।

কালুর মেয়ে অসুস্থ হওয়ার দৃশ্যে, তাকে নিয়ে তার মা-বাবার যে ছোটাছুটি, সেটা দর্শককে বেশ আবেগী করে তোলে। আর সেই দৃশ্য মন্থর গতিতে হওয়ায় দর্শকের রুদ্ধশ্বাস কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কোনো সংলাপ না থাকায় হাহাকারটা নিজেদের মতো করে ধরে নিতে পারবে দর্শক।

সেইসঙ্গে মেয়ের লজেন্স খাওয়ার বায়না মেটাতে কোমরে ব্যথা সত্ত্বেও তাকে নিয়ে দোকানের পথে যাওয়ার বিষয়টি জন্মদাতা কালুকে বাবা হওয়ার গৌরব এনে দেয়। কালুর স্ত্রীর যে অভিযোগ, সে তার মেয়ের প্রতি খেয়াল রাখে না; সেটা আর টেকে না। সে কারণে হুমায়ূন আহমেদের মতো বলতে হয়, বাবারা কখনো খারাপ হয় না।

এবারে আসি নাটকের অসঙ্গতির ব্যাপারে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যেমন গৎবাঁধা কিছু বিষয় রয়েছে; এই নাটকের পোশাক পরিকল্পনাকারী এবং মেকআপ আর্টিস্টের মন থেকেও সেই প্রবণতা বিলুপ্ত হয়নি। সে কারণেই হয়তো দরিদ্র কালুর স্ত্রীর গলায় ঝুলতে দেখা যায় তাবিজ।

কালু চরিত্রে নিশোকে সাবলীল মনে হলেও কালুর বাবার চরিত্রের ওই ব্যক্তিকে বয়সের কারণে একেবারেই মানানসই বলে মনে হয়নি। কালুর হাত-পা বেঁধে রাখার দৃশ্যটায়ও কিছু অসঙ্গতি থেকে গেছে। তার ডান হাতের দড়ি বাঁধাটা ঠিকভাবে হয়নি। যদিও চৌকির ডান দিকের পায়ায় দড়িটা বাঁধলেই সব ঠিক হয়ে যেত। এদিকে নজর দেওয়া জরুরি ছিল।

ঘাস কাটার দৃশ্যে কালুরূপী নিশোকে একেবারেই বেমানান ঠেকেছে। তার ঘাসকাটা দেখে মনে হয়নি, তিনি কখনো এ ধরনের কাজ করেছেন। কারণ, ঘাস কাটার সময় কেউ ওইভাবে ঘাসের ডগা ধরে না। এছাড়া ঘাস কাটতে যাওয়া কারো কাছে বাড়ি থেকে অন্যজন খাবার নিয়ে যায় বলে মনে হয় না। অথচ কালুর স্ত্রীকে দেখা যায়, তার কাছে খাবার নিয়ে যেতে।

যদিও কালুর গরু দেখতে যাওয়া কিংবা গরুকে মশার হাত থেকে বাঁচাতে ধোঁয়া দেওয়ার দৃশ্যগুলো রাতের বেলা ধারণ করায় বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। সেইসঙ্গে খাবার দেওয়ায় গামলা কিংবা মশা তাড়াতে ধূপের ব্যবহার অনেকটাই গ্রামীণ সংস্কৃতি তুলে ধরেছে। ছোটোখাটো কিছু বিষয়াদি বাদ দিলে ব্যতিক্রমধর্মী লালাই এককথায় অসাধারণ।

সমালোচক : কাওসার বকুল।

নাটকটি দেখতে পারেন এখানে

নাগরিক মন্তব্য- এর আরো খবর