English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সে মৃত্যুর সাথে লড়ছিল, আমরা অক্সিজেন মাস্ক খুঁজছিলাম পাগলের মতো...

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ২৭ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:৫৬

আবিদের মৃত্যু সনদ

গত ১৮ আগস্ট, শনিবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতের নাম ইফতেখারুল আলম আবিদ (২৫)। নিহত আবিদ ফেনী জেলার ধুলসরদা এলাকার মো. ইউনুছ আলীর ছেলে। তার বন্ধু আব্দুল্লাহ মতিন খান এ লেখাটি লিখেছেন-

গত কয়েকদিন ধরেই হাজারো প্রশ্নবাণে আমি জর্জরিত। যেসব প্রশ্নের বেশীরভাগই ঘটনার বিবরণ জানতে চাওয়া নিয়ে এবং পুরোপুরিই একপাক্ষিক, ভয়ঙ্কর এবং একইসাথে বিরক্তির উদ্রেক করে। এসব প্রশ্নের সাথে আমাকে দেখতে হয়েছে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটিতে কিভাবে লোকমুখে বিভিন্ন মিথ্যা এবং বানোয়াট কথা যুক্ত হয়।

মানুষের সাথে মেশা এবং কথা বলায় আমি কখনই ততটা ভালো ছিলাম না। এই কারণেই অধিকাংশ সময়ই আমার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়, যা কখনই আমি আমলে নেইনি। কিন্ত এ ঘটনাটার ব্যাপারটি অন্যরকম। আমি বিশ্বাস করি সবারই অধিকার রয়েছে সত্যটি জানার। আমার সবচেয়ে প্রিয় ও অন্যতম কাছের বন্ধুর মৃত্যুর অন্যতম সাক্ষী হিসেবে আমার দায়িত্ব সত্যটি সবাইকে জানানোর। আমি নিজে কখনই আশা করব না যে আমার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্ররও আমার মতো দুর্ভাগ্য হোক। যাই হোক, নিচে আমি গত ১৮ আগস্টের দুর্ঘটনাটির বিশদ বিবরণ লিখছি। যদি কোনো ভুল করে থাকি তাহলে সকলের ক্ষমাপ্রার্থী।

আমি, ইফতেখার, বখতিয়ার ও শুভ্র সকাল ০৬:৪০ থেকে ০৬:৪৫ মিনিটে সৈকতে নামি গোসলের উদ্দেশ্যে। কোনো বিপদের আশঙ্কা আমরা করিনি কারণ সেখানে কোনো লাল পতাকা ছিল না এবং আমাদের কেউ কোনোরকম সতর্ক করেনি। সকাল ০৭:২০- ০৭:২৫ এ ঘটনাটি ঘটে।

আমি আর বখতিয়ার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। বখতিয়ার ডাঙ্গার দিকে মুখ করে আর আমি ইফতেখারের দিকে। ইফতেখার আমাদের থেকে ৪-৫ ফুট দূরে তুলনামূলক বখতিয়ারের কাছাকাছি। ঘটনার কিছু আগেই শুভ্র ক্লান্ত বীচের দিকে চলে যায়। ইফতেখার বুক সমান পানিতে বসে ছিল এবং তার মুখ হাস্যজ্জোল। হঠাৎ ওর মুখের হাসি মিলিয়ে যায় এবং ভয়ের ছাপ পড়ে তাতে। আমি তখনই বুঝি কিছু একটা ঠিক নেই। ওর দিকে ছুটে যাই আমি এবং ওকে বলি আমার হাত ধরতে এবং ও আমার হাত ধরে। এর মধ্যেই বখতিয়ার ও আমার হাত ধরে। কিন্তু ঢেউয়ের ধাক্কা ছিল প্রচণ্ড এবং আমরা তিনজনই ডুবতে শুরু করি।

সময়টা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। আমরা দেখি যে আমাদের পায়ের নিচ থেকে বালি সরে যাচ্ছে এবং আমরা গর্তের মত একটি জায়গায় পড়ে যাই। আমাদের হাত পিছলে যায়, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই আমরা, শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে সাঁতরাতে চেষ্টা করে ডাঙ্গায় উঠে আসি আমি আর বখতিয়ার এবং বেঁচে যাই আমরা । এ সময়ের মধ্যেই শুভ্র আমাদের দিকে দৌড়ে আসে। আমাদের হাত ধরা থেকে ডুবে যাওয়ার যে সময়টা, এটা খুবই কম ছিল (অবশ্য এখন যা আমার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল) যাই হোক, আমরা যখন কম পানিতে, তখন শুভ্র আমাকে আর বখতিয়ারকে পানি থেকে টেনে বের করে। আমরা দাঁড়াই এবং ইফতেখারকে খুঁজতে থাকি। আমরা ওর পিঠ দেখতে পাই, ওর হাত-পা, মুখ ছিল পানির নিচে। আমরা কেউই ওকে নড়তে দেখিনি তখন, এমনকি একবারের জন্যও নয়। বখতিয়ার সাঁতরে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করতেই শুভ্র ওকে থামায় কারণ তা ছিল আমাদের যে কারোরই সাধ্যের বাইরে। আমরা তড়িৎগতিতে লাইফগার্ডদের সাহায্য প্রার্থনা করি।

দুইজন লাইফগার্ড এর মধ্যেই ঘটনাটি দেখে আমাদের দিকে দৌড়ে আসছিল। ইতোমধ্যে ইফতেখারকে আর দেখা যাচ্ছিল না, সে পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিল। লাইফগার্ড সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ইফতেখারকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এসময়টা খুবই দীর্ঘ মনে হচ্ছিল কিন্তু হয়তো সেটা হবে কয়েক মিনিট। আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন খবর দেয় যে, তীরে একটি দেহ ভেসে এসেছে। আমরা দৌড়ে সেখানে যাই। লাইফগার্ড এবং বখতিয়ার মিলে ইফতেখারকে তুলে নেয়। তখনও শ্বাস নিচ্ছিল ইফতেখার। আমরা তাকে একটু দূরে নিয়ে শুইয়ে দেই। আমাদের কাছে মনে হয়নি সে পানি খেয়েছিল, তার পেট একটুও ফোলা ছিল না। সে পানি খুবই কম খেয়েছে আমাদের এটাই ধারনা।

তার নাকে রক্তফেনা জমছিল। লাইফগার্ডরা আমাদেরকে বলে, ওকে যথাসম্ভব শীঘ্র হাসপাতালে নিতে হবে। ০৭:২৫- ০৭:৩০ এর মধ্যে তারা একটি অটোর ব্যবস্থা করে এবং আমরা চারজন আর দুইজন লাইফগার্ড সহ সকাল ০৭:৪৫ এ আমরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পৌঁছাই।

আমরা তখনই ওকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। ডাক্তার এসে আমাদের বলে ওকে সাধারণ বিভাগে সরিয়ে নিতে। তখনও ইফতেখার শ্বাস নিচ্ছিল। ০৭:৫০ এ ভর্তি করা হয় ওকে। আমরা ওকে সাধারণ বিভাগে নিয়ে আসি কিন্তু কোনো বিছানাই খালি ছিল না। সেখানেই মেঝেতে নোংরা একটি তোষকে ওকে শোয়ানো হয়। রুটিন চেক শুরু হয় ওর। ওর রক্তচাপ স্বাভাবিক কিন্তু হৃদস্পন্দন পড়ে যাচ্ছিল দ্রুত।

কর্তব্যরত চিকিৎসক এবং ইন্টার্ন ওকে গ্যাস্ট্রিক এর একটি ইঞ্জেকশন দেয় এবং হৃদস্পন্দন পড়ার জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যুক্ত করে। আমাদের বলে আমরা যেন ওর সাথে কথা চালিয়ে যাই এবং ওকে শ্বাস নিতে বলি। নাকে তখনও রক্তফেনার সৃষ্টি হচ্ছিল ওর। কিছুক্ষন পরে তারা একটি অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে আসে কিন্তু ছিল না কোনো অক্সিজেন মাস্ক।

একটি সদর হাসপাতালে কোনো অক্সিজেন মাস্ক ছিল না আর আই. সি. ইউ. তে কোনো জায়গাও ছিল না। আমি হোটেলে ছুটে যাই মোবাইল এবং টাকা আনার জন্য আর শুভ্র নিকটস্থ ঔষধের দোকানগুলোতে মাস্ক খুঁজতে থাকে কিন্তু ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল না। কিছুক্ষণ পরে আমি মাস্ক খুঁজতে থাকি আর বখতিয়ার এবং শুভ্র ইফতেখারের সাথে কথা বলতে থাকে ওর হাত আর পায়ের তালু ঘষতে থাকে।

দুর্ভাগ্যবশত আমরা অক্সিজেন মাস্ক খুঁজে পাইনি আর হাসপাতালও একটি মাস্ক দিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। অবশেষে নেবুলাইজার এর মাস্ক খুলে অক্সিজেন মাস্কের পরিবর্তে ব্যবহার করা হলো। তখনও এত অল্প কিছু নিয়েই ইফতেখার লড়াই করে যাচ্ছিল। ওর স্পন্দন সর্বোচ্চ ৬৭ তে যেয়ে দাঁড়ায় কিন্তু খুব দ্রুতই আবার তা পড়ে যেতে থাকে। প্রায় এক ঘণ্টা দশ মিনিট লড়াই করার পর অচেতন হয়ে পড়ে ইফতেখার। ডাক্তার ইসিজি করে ওকে মৃত ঘোষণা করে (মৃত্যু নিবন্ধন অনুযায়ী সকাল ০৮:৪০ )।

এর পর আমরা ইফতেখারের পরিবার এবং আমাদের বন্ধুদের জানাই। পুলিশ মৃত্যুর কারণ নিয়ে জেরা করে। ইফতেখারকে মর্গে সরিয়ে নেয়া হয়। আমাদের বন্ধু সাদমান ইবনে আলম এই সংবাদ পাওয়ার পরেই লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ী পাঠিয়ে দেয় ১০:৩০ - ১১ টার মধ্যে, যাতে করে ইফতেখারের মৃতদেহ আমরা ফেনীতে তার নিজ বাড়ীতে নিয়ে আসি।

যাই হোক পুলিশ আসার পর অসংখ্যবার আমরা তাদের বিবৃতি দেই এবং অক্সিজেন মাস্কের কথাও উল্লেখ করি। আমাদের বলা হয় যে, ইফতেখারের দেহ সেখান থেকে ছাড়াতে হলে ওর পরিবারের কাউকে উপস্থিত হতে হবে। ইফতেখারের বোনকে এই সংবাদ দেয়া হলে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ০১:৪৫ মিনিটের ফ্লাইট ধরতে সক্ষম হন। ১১:৪৫ মিনিটে আমাদের মুবিন ভাই এবং জায়েদ ভাই সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ করেন। মুবীন ভাই ইফতেখারের মরদেহ ফ্রিজারে রাখার ব্যবস্থা করেন। মুবীন ভাই এবং জায়েদ ভাই ইফতেখারের বোন কক্সবাজারে পৌছার আগ পর্যন্ত আমাদেরকে হাসপাতাল থেকে দূরে থাকার জন্য বাধ্য করেন। জায়েদ ভাই আমাদেরকে বলেন হোটেল বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস হেরিটেজ এর লবীতে থাকার জন্য। ইফতেখারের বোন এবং দুলাভাই কক্সবাজার পৌঁছান দুপুর ০২:৩০ এ। তারা হাসপাতালে ইফতেখারকে দেখতে যান। পরে আমরা থানায় যাই, সেখানে ইফতেখারের বোন, জায়েদ ভাই এবং কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের উপস্থিতিতে সমস্ত পুলিশি কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর ইফতেখারের মরদেহ আমরা গ্রহণ করি এবং লাশবাহী গাড়িতে ফেনীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই সন্ধ্যা ০৬:০০ টায়।

ইফতেখারের দুর্ঘটনামূলক মৃত্যুর প্রকৃতির রায়টি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মনে হতে পারে এবং মনে হতে পারে এটি হয়েছে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ঘটনাবলির ধারাবাহিকতার ফলে। কিন্তু এমন কয়েকটি বিষয় রয়েছে যা আমি আমার মন থেকে সরাতে পারছি না:

১. সৈকতে কোনো ধরনের সতর্কতামূলক চিহ্ন এবং কোনোধরনের জরুরি যান যা এ ধরণের কোনো ঘটনার জন্য ব্যবহার করা যাবে।

২. কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মতো একটি হাসপাতালে আন্তরিকতার অনুপস্থিতি এবং অক্সিজেন মাস্কের মতো জরুরি যন্ত্রপাতির (কোনো ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে) অভাব।

৩. এবং সর্বশেষে, মৃত্যু নিবন্ধনে কী কোনো একটা কিছু বাদ থেকে যাচ্ছে না? আমি বলতে চাচ্ছি মৃত্যুর কারণ কি শুধুই ডুবে মারা যাওয়া? আমরা কি নিশ্চিত যে এটা হৃদ, শ্বাস বা অন্য কোনো প্রত্যঙ্গের ব্যর্থতা নয়? কারণ এই বিশাল পুরো সময়টাই সে মৃত্যুর সাথে লড়ে যাচ্ছিল যখন আমরা একটি অক্সিজেন মাস্ক খুঁজছিলাম পাগলের মতো।

আমি জানি একজনের মৃত্যুর কারণগুলো গণিতের সমস্যার মত সমাধান করে তার মৃত্যু আটকানো যায় না। কিন্তু যখন অনেক ছোট ছোট সমস্যা যেগুলো, যদি সময়মত সমাধান করা যায়, একজনের মৃত্যুর সাথে লড়ার সময় তার জয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তাই আমি আশা করি এবং আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি যে এই জিনিসগুলি কর্তৃপক্ষ আমলে নেবে যাতে আর কোনো ইফতেখার অসহায়ভাবে মারা না যায়; কারণ আমি আমার প্রিয় বন্ধুকে তার শেষ মুহূর্তে দেখেছি।

-- আব্দুল্লাহ মতিন খান

নাগরিক মন্তব্য- এর আরো খবর