English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ইমরান কি লক্ষ্যহীন তীরন্দাজ!

  • কালের কণ্ঠ অনলাইন   
  • ১২ আগস্ট, ২০১৮ ২২:১৬

ইমরান খান ছবি:টুইটার

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী আঠারো আগস্ট ইমরান খান পাকিস্তানের মসনদে বসতে যাচ্ছেন। গত দুই দশক ধরে পাকিস্তানে ক্ষমতার রাজনীতির-একাদশে তিনি খেলে চলেছেন। তার এই সময়কার পথযাত্রায় অনেকবারই এমন মনে হয়েছে যে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সাবেক এই লেডিকিলার তকমা পাওয়া ক্রিকেট ক্যাপ্টেনকে হাতে হারিকেন দিয়ে রোজনীতির ফুটপাথ ধরিয়ে দিলেন বলে- যে পথ দিয়ে একসময়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন তিনি।

ভারতীয় সিনেমার লিভিং লিজেন্ড অমিতাভ বচ্চন একসময়ে বিশাল জনপ্রিয়তায় ভর করে বন্ধু রাজিব গান্ধির হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির পথ যে অতি কুটিল পিচ্ছিল আর জটিল- সেই জ্ঞান পেতে বেশিদিন লাগেনি অমিতজীর। মানে মানে ইজ্জত বাঁচিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে মানে সিনেমার লোক সিনেমায় ফিরে গেছেন।

কিন্তু পাকিস্তানি ইমরান খান যে অন্য ধাতুতে গড়া তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েচেন এরই মধ্যে- যে কোনো উপায়ে তিনি পাকিস্তানি রাজনীতির চাণক্য-কৌটিল্য তন্ত্রের নাগপাশ বাঁচিয়ে টিকে থাকেন গেম পাল্টে দেওয়া খেলোয়াড়দের তালিকায়।

শুরুর দিকে তিনি ভেবেছিলেন নিজের বিশ্বকাপজয়ী ক্যাপ্টেনের জনপ্রিয়তায় ভর করে সহজেই দেশ সামলানোর কাপ্তানিটাও পেয়ে যাবেন। কিন্তু আদতে পাকিস্তানি রাজনীতির পিচটা তার মতো আনারি রাজনীতিকের জন্য বোলিং সহায়ক না- এটা টের পেতে বেশি সময় লাগেনি তার।

পাকিস্তানি রাজনীতির ক্রমপরিবর্তনশীল পিচে বোলিং যতো নিখুঁতই করেন না কেন- আপনাকে নো-বল, ওয়াইড বল বা বেধরক ছক্কার পিটুনির শিকার হতে হবেই- এই সত্য বোঝার সঙ্গে সঙ্গে ইমরান এটাও বুঝে ফেলেন যে সেনা প্রভাবিত তার দেশের রাজনীতির ময়দানে কোনো নিউট্রাল আম্পায়ারিংয়ের ব্যবস্থাই নেই। ঝোল যে যেভাবে নিজের পাতে টেনে নিতে পারে সেটাই মেনে নিতে বাধ্য হয় অন্যেরা। আবার পরিস্থিতি পাল্টালে সেই ঝোলই কারো গলায় বিষ হয়ে দেখা দেয়।

পাকিস্তানি রাজনীতিতে যাদের বা যে মহলের আম্পায়ার হওয়ার কথা- বাস্তবে দেখা যায় তারাও দুইপক্ষের হয়ে খেলে থাকেন। কখনো কখনো উভয় দলের ক্যাপ্টেন্সিও তাদের দখলে থাকে- আরো মজার ব্যাপার হলো কখনো কখনো খেলায় বাজিও ধরে সেই আম্পায়ার পক্ষ- তারপর তার থেকে হওয়া লাভের হিস্যাদারও থাকে তারা।

এমন যখন অবস্থা তখন অনেকেই যেমন ভাবছেন যে পাকিস্তানি ক্ষমতার মসনদে ইমরান খানের আরোহন পরিস্থিতি বদলে দিবে, চিরশত্রু প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন হবে, ভেঙ্গে পড়া বিদ্যুৎব্যবস্থা, জনগণের নিরাপত্তা, জঙ্গি ইস্যু, অর্থনৈতিক উন্নয়ন- সব সমস্যার সমাধান করে দেবে- তারা হয়তো ভুল করছেন।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার কাশ্মির ইস্যু, ভারতীয় পাঞ্জাবে খালিস্তান আন্দোলনে তথাকথিত ইন্ধন দেওয়া তথা ভারতের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালাতে জাতির কাছে অঘোষিত প্রতিশ্রুতি- সবকিছুই একজন সাচ্চা পাকিস্তানি হিসেবে আগের জায়গায়ই আছে। সুতরাং, পাকিস্তানি তখ্ত-তাউসে জেন্টেলম্যান ইমরানের আগমনে উল্লেখিত ধারাবাহিকতার রকমফের খুব একটা হবে না।

একটি কথা সত্য, অনেকবার হোঁচট, ধাক্কা আর ধোঁকা খেয়ে পাকিস্তানি রাজনীতির খেলাধুলা ক্রিকেটের মতোই বুঝে গেছেন ইমরান। তিনি মনে মনে এমন একজন আম্পায়ারের খোঁজে ছিলেন যিনি তাকে নিরাপদে অভীষ্ট উইনিং টার্গেটে নিয়ে যাবেন। যেখান থেকে সহজেই প্রতিপক্ষের সব বিগ বিগ উইকেট লহমার ফেরে ফেলে দিতে পারেন।

ইমরান একটা পর্যায়ে বুঝতে পারেন যে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি চালার যথেষ্ট দক্ষতাও তিনি অর্জন করেছেন, কিন্তু প্রতিপক্ষের উইকেট উপড়ানো সেই বোলিং তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত করতে পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত মনপসন্দ আম্পায়ারটি না আসছে। সেরকম না হলে প্রতিপক্ষকে ক্লিন বোল্ড করে দেওয়া বলগুলোকেও নো-বল ডেকে যাবেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়েও অতি ক্ষমতাবান সেই আম্পায়ার। এজন্য দেরি না করে তাকে চলমান আমপায়ারদের ইচ্ছার ছাঁচেই নিজেকে ঢালতে হবে। তো শেষতক ইমরান তা-ই করলেন।

ফলাফল তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি আমরা। সম্প্রতি সমাপ্ত পাকিস্তানি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) প্রধান নওয়াজ শরিফ ও তার পার্টির ওপর বজ্রপাত ঘটতে চলেছে- কারণ, সেনাবাহিনীর হর্তাকর্তাদের পছন্দের আদমি এখন ইমরান খান। যখন নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চলছিল- তখনি গুজব-গুঞ্জন রটে যায় যে সেনা সমর্থন পেয়ে গেছেন ইমরান তাই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তিনিই হচ্ছেন। এসব গুজব-গুঞ্জনের ধারাবাহিকতার সরল অঙ্ক হচ্ছে- নওয়াজ এখন জেলখানায় আর ইমরান অপেক্ষায় মসনদে বসার।

রাজনৈতিক অপকর্ম ছাড়াও ইমরানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অনৈতিক আচরণের যেসব অভিযোগ নির্বাাচনের আগে উঠেছিল তা পাকিস্তানের মতো দেশে যে কোনো রাজনৈতিক নেতার ক্যারিয়ার দাফন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তবে বাস্তবে সেসব তার কিছুই করতে পারেনি।

ফলশ্রুতিতে নির্বাচনের ফলে দেখা গেল, সেনাবাহিনীর মনোভাবের-ই প্রতিফলন ঘটেছে জনতার রায়েও!

এই ঘটনা শুধু ইমরান খানের জন্য ঘটে নাই। পাকিস্তানের সব চরমপন্থি জঙ্গিবাদী দলগুলো যাদের ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়- তারা নির্বাচনে কাঙ্খিত সাফল্য পায়নি। তাদের প্রস্তুতি পুরোমাত্রায় ছিল, পাকিস্তানি গণতন্ত্রে বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তারা নিজেদের আসন গাড়তে যাচ্ছিলেন এবার, সাধারণ্যে এক ধরনের জনসমর্থন ছাড়াও বিভিন্ন শক্তিশালী প্রভাবক মহলও তাদের পক্ষে ছিল- কিন্তু ফল সেরকম হয় নাই। এতে অনেকেই ভাবতে পারেন, তাহলে কি কট্টরপন্থী মনোভাবের রাজনীতিতিকদের ব্যাপারে পাকিস্তানি ভোটারদের মোহভঙ্গ ঘটেছে?

না, এর সঠিক উত্তর হচ্ছে- নিজদেশের ভোট নিয়ে এবার এটাই ছিল সেনাবাহিনীর রণকৌশল। সেনারা চায়নি তাদের দ্বারা ঘোষিত ননস্টেট প্লেয়াররা বনে যাক স্টেট প্লেয়ার আর তাদের কাজকামে নাক গলানো শুরু করুক।

বরং পাকিস্তানি সেনাদের জন্য এটা সুবিধাজনক যে- জঙ্গিরা থাকুক, তবে থাকতে হবে তাদের নিয়ন্ত্রণে। এতে করে জঙ্গিরা তাদের মুখাপেক্ষী থাকবে এবং তাদের ইশারায়ই সব ধরনের নর্তন-কুর্দন করবে। নির্বাচনে তাদের জিৎ হলে বল্গাহীন হয়ে যেত কট্টরপন্থিরা- সেনাবাহিনীর হাত থেকে ছুটে যেত নিয়ন্ত্রণের লাগাম।

তাই এবারের নির্বাচনে যা হয়েছে তা পাকিস্তানি রাজনীতি তথা গণতন্ত্রকে নিজেদের তরিকায় চালানোর সেনা ফর্মুলা বাস্তবায়ন বলা যায়। নির্বাচনের ফলটা হয়েছে পাতানো খেলার মতোই।

এটা এমন হিসেবে করা হয়েছে যাতে ইমরান খান যদি সরকার গঠন করেনও তা খুব মজবুত হবে না। এর ফলে তাকে হরদম থাকতে হবে সেনার নিয়ন্ত্রণে, আবার সেই নিয়ন্ত্রণের নিগড় ছিঁড়ে ফেলার শক্তিও তার থাকবে না, একটু বেচাল হলেই সরকার পতন! কারণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো পাননি। পাকিস্তানে এবার নির্বাচনী খেলায় চার-ছক্কার পেটাপিটি খুব হয়েছে, ছিল শ্বাসরুদ্ধকর সাসপেন্সও- কিন্তু দিন শেষে যার জেতার সেই জিতেছে, তবে কোনোমতে।

ইমরান খান তার জাতির কাছে ওয়াদা করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি এক নয়া পাকিস্তান উপহার দেবেন। তবে সেই নয়া পাকিস্তানে কি কি থাকবে আর কি কি থাকবে না সেটা এখনো পরিষ্কার না। তবে তার দল পিটিআই (তেহরিক-ই-ইনসাফ) বিভিন্ন সময়ে যেসব কথাবার্তা বলেছে তাতে রুগ্ন অর্থনৈতিক অবস্থাটাকে বদলে তাকতদার পাহলোয়ান বানানোর আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তব হচ্ছে পাকিস্তান চরম অর্থনৈকি সংকটের কিনারায় রয়েছে, নানামুখি সংকটে সিভিল সোসাইটির অবস্থা তচনচ, মোহাজিররা নিজেদের অবস্থা নিয়ে বেদিশা। অপরদিকে, বালুচিস্তান-সিন্ধু এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও থেমে নেই। চিরশত্রু ভারতসহ অন্যরা সেসবে ইন্ধন দেবে স্বাভাবিক।

এমন পরিস্থিতিতে, পাকিস্তানে নির্বাচন পরবর্তী নয়া কোনো লক্ষণীয় পরিবর্তন কঠিন এক আশা বলেই মনে হচ্ছে- এমনকি ইমরান খানের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বর নেতৃত্বও বিরাজমান পরিস্থিতির পাথর নড়াতে পারঙ্গম হবেন কি না তা প্রশ্ন হয়ে থাকবে দীর্ঘ সময়।

অনেকেই আশংকা করছেন তার পরিণতি হতে পারে লক্ষ্যহীন এক তীরন্দাজের মতো। যার ছোঁড়া তীর নিজের অজান্তে লক্ষ্যভেদ করতেও পারে, তবে বেশিরভাগ সম্ভাবনা আছে লক্ষচ্যুত হওয়ার।

আহ্সান কবীর, সাংবাদিক

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)

নাগরিক মন্তব্য- এর আরো খবর