English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

কোরবানি করার সর্বোত্তম পদ্ধতি

  • মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   
  • ২১ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:৫৮

মহানবী (সা.)-এর বহু সুন্নাত মুসলমানদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সেগুলোর দিকে অনেকেরই কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অথচ আমরা সবাই নিজেদের নবীপ্রেমিক দাবি করি, আবার এটাও স্বীকার করি যে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ সামগ্রিক জীবনে সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন মুক্তির অন্যতম শর্ত। মহানবী (সা.)-এর সেসব হারিয়ে যাওয়া সুন্নতের অন্যতম হলো নিজ হাতে কোরবানি করা। মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম নিজ হাতে কোরবানি করতেন। মদিনার জীবনে মহানবী (সা.) কখনো কোরবানি ত্যাগ করেননি। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করেছেন। প্রতিবছরই তিনি কোরবানি করেছেন। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৪৯)

এই কোরবানি মহানবী (সা.) নিজ হাতে করতেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর কোরবানির পশুর ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে নিজ হাতে কোরবানি করতে দেখেছি। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১৫৫)

কোরবানি ছুরি প্রদর্শন ও রক্তপাতের মহড়া নয়। কোরবানি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বিনম্র প্রকাশ। আল্লাহর বান্দা হিসেবে উচিত ছিল নিজের জীবন আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করা। কিন্তু সেটি সম্ভব না হলে অন্তত নিজের উপার্জিত অর্থে কেনা পশু (প্রাণ) আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করাই কোরবানির মূল কথা। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনা হলো, পশুর ওপর মানবিকতা ও দয়ার্দ্রতা প্রকাশ করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) (কোরবানির আগে) ছুরি ধারালো করতে এবং তা পশুর দৃষ্টির অগোচরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তোমাদের কেউ জবেহ করার সময় যেন তা দ্রুত সম্পন্ন করে (যাতে পশু অধিক পরিমাণে কষ্ট না পায়)। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১৭২)

অনেক সময় দেখা যায়, আগেভাগে গোশত খাওয়ার জন্য ঈদের নামাজের আগেই কোরবানি করে ফেলা হয়। অথচ ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করলে কোরবানি হবে না। জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) কোরবানির দিন (প্রথমেই) নামাজ আদায় করেন। তারপর তিনি খুতবা দেন। এরপর (কোরবানির পশু) জবেহ করেন। তিনি ঘোষণা দেননামাজের আগে যে ব্যক্তি পশু জবেহ করবে, তাকে নামাজের পর আরেকটি পশু জবেহ করতে হবে...। (বুখারি, হাদিস : ৯২৮, ৬৮৮৪)

পশু জবেহ করার নিয়ম

১. জবাই করার আগে পশুকে ঘাস, পানি ইত্যাদি ভালোভাবে খাওয়াতে হবে। কোরবানির প্রাণীকে ক্ষুধার্থ বা পিপাসার্ত রাখা অন্যায়। ২. পশুকে কোরবানি করার স্থানে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া অন্যায়। ৩. জবেহ করার জন্য পশুকে কঠোরভাবে শোয়াবে না। ৪. কিবলার দিকে ফিরিয়ে বাঁ পাশের ওপর শোয়াতে হবে। ৫. পশুর চার পায়ের মধ্যে তিনটি বাঁধবে। ৬. আগে থেকেই ছুরি ধার দিয়ে রাখবে। ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবেহ করবে না। ৭. কোরবানির পশু শোয়ানোর পর ছুরি ধারানো অন্যায়। বরং আগেই ধার দিয়ে রাখতে হবে (ফতোয়ায়ে রহিমিয়া, ১/৯৮) ৮. এমনভাবে জবেহ করা যাবে না, যার ফলে গলা পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। ৯. জবেহ করার সময় বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলতে হবে। ১০. একটি পশুকে আরেকটি পশুর সামনে জবাই করবে না। ১১. পশুর প্রাণ বের হওয়ার আগে চামড়া খসানো যাবে না। (জাওয়াহিরুল ফিকহ : ২/২৭৩)

কোরবানির পশু জবেহর বিভিন্ন দোয়া

কোরবানির পশু কিবলার দিকে ফিরিয়ে এই দোয়া পড়বে : ইন্নি ওয়াজ জাহতু ওয়াজ হিয়া লিল্লাজি ফাতারাছ ছামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহ ইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন।...বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।

অর্থ : নিশ্চয়ই আমি দৃঢ়ভাবে সেই মহান সত্তার অভিমুখী হলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আমি মুশরিকদের অন্তর্গত নই। নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণসবই বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এ কাজের জন্য আদিষ্ট হয়েছি। আর আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন। আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৭৮৬; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২১)

পশু জবেহ করার সময় এই দোয়া পড়বে

আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা। অর্থ : হে আল্লাহ! (এই কোরবানির পশু) তোমার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং তোমারই জন্য উৎসর্গকৃত। এরপর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার পড়বে। অর্থ : মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহ সবচেয়ে বড়।

জবেহ করার পর এই দোয়া পড়বে

আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিন ওয়া খলিলিকা ইবরাহিমা আলাইহিমাস সালাম।

অর্থ : হে আল্লাহ! এই কোরবানি আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন, যেভাবে আপনি তা কবুল করেছিলেন আপনার প্রিয় বন্ধুদ্বয় মুহাম্মদ (সা.) ও ইবরাহিম (আ.)-এর পক্ষ থেকে। (মেশকাত : ১/১২৮)

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা।

ইসলাম ও জীবনযাপন- এর আরো খবর