ঢাকা, সোমবার, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪১৭, ২৯ জিলহজ ১৪৩১, ০৬ ডিসেম্বর ২০১০
(উপরে) ১৯৯৫ সালে ঋষিপল্লীতে হিলারি, ড. ইউনূস ও চেলসি। ফাইল ছবি
(নিচে) শূন্য ভিটার সামনে ভক্ত দাস ও তাঁর স্ত্রী। ছবি : কালের কণ্ঠ
¦
সরেজমিনসেই হিলারিপাড়ায় শুধুই হায় হায় ফখরে আলম, যশোর
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সেই 'হিলারিপাড়া'র ঋষি সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ঋণ শোধ করার জন্য কেউ কেউ বাড়িঘর, সহায়-সম্পদ বিক্রি করে গ্রাম ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন। ঋণের জালে আটকা পড়ে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও যৌতুক গ্রামবাসীদের মধ্য যুগে ঠেলে দিচ্ছে।
১৯৯৫ সালের ৩ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূসের আমন্ত্রণে এই গ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন এসেছিলেন। হিলারিকে দেখানোর জন্য গ্রামীণ ব্যাংক ঋষিদের পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছিল। সেই বাড়ি নির্মাণের ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে অনেকেই এখন ভিটে ছাড়া। হিলারি আসার পর মশিহাটি ঋষিপাড়া গ্রামের নতুন নামকরণ হয় 'হিলারি আদর্শ পল্লী', যা এখন হিলারিপাড়া নামেই পরিচিত। গত শুক্রবার সরেজমিন হিলারিপাড়া ঘুরে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণের জালে আটকা পড়ার এসব খবর জানা গেছে।
হিলারিপাড়ার গ্রামীণ ব্যাংকের কেন্দ্রপ্রধান ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই সময় গ্রামের গরিব ২০ ঋষি পরিবারের বাড়ি নির্মাণের জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়। গ্রামের ভক্ত দাসের স্ত্রী পার্বতী রানীকে সে সময় বাড়ি নির্মাণের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক ২৫ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছিল। পার্বতীর পাকা বাড়ি দেখে হিলারি খুশি হয়েছিলেন; কিন্তু পরে পার্বতী উচ্চ সুদের ওই ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে বাড়িঘর, সহায়-সম্পদ সব বিক্রি করে
এখন পাশের সেনাবাহিনীর আবাসন প্রকল্পের একটি খুপরি ঘরে তিন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভক্ত দাস ও পার্বতী রানী বলেন, 'হিলারিকে দেখানোর জন্য আমাদের বাড়ি তৈরি করে দিয়েছিল। সেই বাড়ির টাকা শোধ করতে গিয়ে জমি, বাড়ি সব বিক্রি করে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।'
সুনীলের স্ত্রী ময়না রানীকেও বাড়ি করার জন্য একইভাবে ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ময়না ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে দুই ছেলেসহ চট্টগ্রামে পালিয়ে যায়। পরে গ্রামে ফিরে এসে দেড় বিঘা জমি আর বাড়ি বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করে। ময়নাও এখন তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে ভিটেমাটি হারিয়ে আবাসন প্রকল্পের বাড়িতে থাকেন। ময়না বলেন, 'আমরা মূর্খ মানুষ। অত কিছু বুঝিনি। স্যারেদের কথা মতন কিস্তি দিতে যেয়ে আমরা এখন পথের ফকির।'
ঋণগ্রহীতারা আরো বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে লক্ষ্মী রানী, শান্তি, ভানু দাসী, মিনা রানী, গীতা রানী এঁরা সবাই ভিটেমাটি, সহায়-সম্বল বিক্রি করে কিস্তি দিয়ে গ্রাম ছেড়েছেন। মায়া রানী নামের এক ঋণগ্রহীতা গরু-ছাগল, বিয়ের আংটি, থালা-বাটি, ভিটেমাটি বিক্রি করে কিস্তি শোধ করেছেন। মমতা রানী ঘরের টিন খুলে বিক্রি করে কিস্তি দিয়েছেন। গ্রামবাসীরা জানায়, সাত হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কয়েক বছর আগে পারুল মারা যান। ব্যাংক কর্মকর্তারা তাঁর লাশ দাহ করতে দেয়নি। পরে স্বামী কার্তিক ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার করায় লাশের সৎকারের অনুমতি মেলে।
জানা যায়, সে সময় হিলারি ক্লিনটনের সামনে ড. ইউনূস গ্রামের মহিলাদের শপথ করিয়ে ছিলেন, 'যৌতুক নেব না, যৌতুক দেব না। বাল্যবিবাহ গ্রাম থেকে দূর করব।' হিলারি ক্লিনটনকে গ্রামের প্রবেশ দুয়ারে দুটি শিশু মুক্তি ও সাথী অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। গ্রামবাসীরা জানায়, ১৯৯৯ সালে ১২ বছর বয়সে সাথীর আর ১১ বছর বয়সে মুক্তির বিয়ে হয়ে গেছে। দুজনেরই বিয়েতে টেলিভিশন, সাইকেল, ঘড়ি যৌতুক দিতে হয়েছে। গ্রামবাসীরা বলেন, 'গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের টাকা আদায়ের জন্য আমাদের ভয়ভীতি দেখায়। কিন্তু তারা বাল্যবিবাহ ও যৌতুক নিয়ে কোনো কথা বলে না।'
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় বারোবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'ওই গ্রামের মানুষ খুব গরিব। তারা ঋণ নিয়ে খেয়ে ফেলে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক_এসব এনজিও ঋণ শোধ করার আগেই নতুন করে ঋণের জালে ওদের আটকে ফেলে। ফলে ওরা এ থেকে আর মুক্তি পায় না।'
যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণ ব্যাংকের ওই গ্রামের কেন্দ্রপ্রধান শেফালী রানী বলেন, 'ঋণ নিয়ে আমি ভাগ্যের পরিবর্তন করেছি। ওরা ঋণ নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। ফলে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।'
আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৮৪১৫৪
পুরোনো সংখ্যা
সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন, উপদেষ্টা সম্পাদক : অমিত হাবিব, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com
free counters
Latest News Portal Food Recipe in Bangladesh jobs in Bangladesh