|
|
( ০৮ -০২ - ২০১১ ) -তারিখের সন্ধানী
হালদার আর্তনাদবাংলাদেশের মিঠাপানির কার্পর্জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের কারণে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এর দু'পাশের জীববৈচিত্র্য। সময় থাকতে নজর না দিলে হালদা একদিন হয়ে যাবে হালের বুড়িগঙ্গার মতো। হালদা ঘুরে এসে জানাচ্ছেন রাজীব নন্দী
নদীর বুকে ইঞ্জিন নৌকা। খট খট শব্দে কান ঝালাপালা। নৌকার পাশেই বয়ে চলা পানিতে ভাসছে শ্যাওলা। পরম সুখে ডিগবাজি খাচ্ছে মলা মাছের ছা। নদীর বুক থেকেই চোখে পড়বে নদী পাড়ের জীববৈচিত্র্য আর মাছ ধরতে গিয়ে জেলের জাল ফেলা। মমতাময়ী নদীটির নাম হালদা। সি্নগ্ধ-শান্ত হালদার বিশেষত্ব হলো, হালদা বাংলাদেশের কোটি টাকার মিঠাপানির কার্পর্জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। আর বিজ্ঞানীদের শঙ্কা, নিরিবিলি সোনার খনিটি হয়তো আর নির্মল থাকবে না। বিলুপ্ত হতে পারে দুই পাশের জীববৈচিত্র্য। সময় থাকতে নজর না দিলে একদিন হালদার পরিণতি হতে পারে বুড়িগঙ্গার মতো 'নির্মম'।
দুনিয়ার এ মাথা থেকে ও মাথা, হ্রদ থেকে নদী, পুকুর থেকে নালা_সবই যখন দূষণ আর দখলের খপ্পরে তখন হালদা নদীর মাছ আর নদী তীরবর্তী জীববৈচিত্র্য রক্ষার সংগ্রামে এগিয়ে গেল চট্টগ্রাম।
পাহাড়ি স্রোত, নিয়মিত জোয়ার-ভাটা আর অসংখ্য বাঁকে সমৃদ্ধ মাছের প্রজননের জন্য আদর্শ জায়গা হালদা নদী। পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির বদনাতলী পাহাড় থেকে শুরু এই হালদা ফটিকছড়ির বুকের ওপর গিয়ে পড়েছে চট্টগ্রামে। বিবিরহাট, নাজিরহাট হয়ে হাটহাজারী, রাউজান, কোতোয়ালীর দুই পাশ অপূর্ব নৈসর্গিক সুন্দর বিলিয়ে কালুরঘাটের কাছে হয়েছে কর্ণফুলীর বাহুলগ্না।
অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া হালদাবিষয়ক ওয়েবসাইটটির এক নিবন্ধে বলেন, "হালদা একটি 'টাইডাল' নদী, যেখানে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে। সমুদ্র থেকে দূরত্ব মাত্র ১০-১২ কিলোমিটার। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে হালদায়। হালদায় সমুদ্রের লবণাক্ততার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় শুষ্ক মৌসুমে। জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি নদীর অনেক ভেতরে ঢোকে। এ বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে হালদা নদীতে লবণাক্ততা এতটা বেড়ে যায় যে চট্টগ্রাম ওয়াসা এই পানি পানের অযোগ্য ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম ওয়াসা হালদা নদী থেকে প্রতিদিন দুই কোটি গ্যালন পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরবরাহ করে।
এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে রুই জাতীয় মাছগুলো অন্যান্য নদী থেকে 'মাইগ্রেট' করে হালদায় আসে। তাই, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে রুই-জাতীয় মাছের মাইগ্রেশন বাধাগ্রস্ত হবে। প্রজনন ক্ষেত্রের পানির গুণাগুণ পরিবর্তনের কারণে প্রজনন পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
হালদা নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এখন যে মাত্রায় নদীর উজানে সমুদ্রের লোনা পানি বাড়ছে, তাতে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে তা হালদা নদীর বর্তমান প্রজনন ক্ষেত্রে পেঁৗছে যাবে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল, এই প্রকল্পে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখেই প্রকল্পের উপাদানগুলো ঠিক করা এবং মিঠাপানির সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে লোনাপানির আগ্রাসন ঠেকানোর সুষ্ঠু পরিকল্পনা হাতে নেয়া। অথচ প্রকল্পে বরং উল্টোটাই করা হয়েছে।
আর তাই কারো কানে পেঁৗছায়নি হালদার আর্তনাদ। কয়েক দশক ধরে প্রাকৃতিক এই মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রে ডিমের পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো নিয়েও খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। কারণগুলো হলো_জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ত পানির আগ্রাসন, কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ, নদীর দুপাশের উপখালগুলোতে অপরিকল্পিত স্লুইস গেইট ও বাঁধ নির্মাণে মিঠাপানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ১১টি বাঁক কেটে দেওয়ার কারণে নদীর দৈর্ঘ্য ২৫ কি.মি. (বর্তমান দৈর্ঘ্য ৯৮ কি.মি.) কমে যাওয়ায় উজানের দিকে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির আগ্রাসন।
জানা গেছে, হালদার বুকে সংসার পেতেছে ৭৬ প্রজাতির মাছ। নদীর দুপাশে জীববৈচিত্র্য তো আছেই। কেচকি, ঘনি চাপলা, ফাইশ্যা, ফলি থেকে মলা, বাইলার বিরল সমাহার এখানে। কারণ একটিই_এই নদী এখনো দূষণের হাতে পড়েনি। এখন প্রশ্ন হলো_এত সম্ভাবনার হালদা কি বাঁচবে না? এ নদী বাঁচলে শুধু একটি নদীই বেঁচে যাবে না। দেশ পাবে একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। রক্ষা পাবে ঐতিহ্য। হালদা বাঁচলে বদলে যাবে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী আর রাউজান উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকা, বেঁচে যাবে কোটি টাকার মাছ। আর হালদার জীবন প্রবাহ থেমে যাওয়ার সঙ্গে বিদায় ঘণ্টা বাজবে নদীর ৭৫ প্রজাতির মাছেরও। তীরের বক, গয়ালসহ কয়েক শ প্রজাতির পাখির কলকাকলি সুরের কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকবে নদীর বুকে!
হালদা নদীর ওয়েবসাইট www,haldariver.org উদ্বোধন হলো চট্টগ্রামে। এই সাইটে হালদা নদীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌলিক তথ্যভাণ্ডারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদী সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার পথটাও সহজ হয়ে গেল। আর নদী রক্ষার এ উদ্যোগের কেন্দ্রে আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া।
হালদা না বাঁচলে হারিয়ে যাবে বিরল কয়েক প্রজাতির মাছের পাশাপাশি তীরের বক, গয়ালসহ কয়েক শ প্রজাতির পাখি ছবি : নিলয় দাশ
« পূর্ববর্তী সংবাদ |
দুনিয়ার এ মাথা থেকে ও মাথা, হ্রদ থেকে নদী, পুকুর থেকে নালা_সবই যখন দূষণ আর দখলের খপ্পরে তখন হালদা নদীর মাছ আর নদী তীরবর্তী জীববৈচিত্র্য রক্ষার সংগ্রামে এগিয়ে গেল চট্টগ্রাম।
পাহাড়ি স্রোত, নিয়মিত জোয়ার-ভাটা আর অসংখ্য বাঁকে সমৃদ্ধ মাছের প্রজননের জন্য আদর্শ জায়গা হালদা নদী। পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির বদনাতলী পাহাড় থেকে শুরু এই হালদা ফটিকছড়ির বুকের ওপর গিয়ে পড়েছে চট্টগ্রামে। বিবিরহাট, নাজিরহাট হয়ে হাটহাজারী, রাউজান, কোতোয়ালীর দুই পাশ অপূর্ব নৈসর্গিক সুন্দর বিলিয়ে কালুরঘাটের কাছে হয়েছে কর্ণফুলীর বাহুলগ্না।
অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া হালদাবিষয়ক ওয়েবসাইটটির এক নিবন্ধে বলেন, "হালদা একটি 'টাইডাল' নদী, যেখানে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে। সমুদ্র থেকে দূরত্ব মাত্র ১০-১২ কিলোমিটার। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে হালদায়। হালদায় সমুদ্রের লবণাক্ততার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় শুষ্ক মৌসুমে। জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি নদীর অনেক ভেতরে ঢোকে। এ বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে হালদা নদীতে লবণাক্ততা এতটা বেড়ে যায় যে চট্টগ্রাম ওয়াসা এই পানি পানের অযোগ্য ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম ওয়াসা হালদা নদী থেকে প্রতিদিন দুই কোটি গ্যালন পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরবরাহ করে।
এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে রুই জাতীয় মাছগুলো অন্যান্য নদী থেকে 'মাইগ্রেট' করে হালদায় আসে। তাই, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে রুই-জাতীয় মাছের মাইগ্রেশন বাধাগ্রস্ত হবে। প্রজনন ক্ষেত্রের পানির গুণাগুণ পরিবর্তনের কারণে প্রজনন পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
হালদা নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এখন যে মাত্রায় নদীর উজানে সমুদ্রের লোনা পানি বাড়ছে, তাতে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে তা হালদা নদীর বর্তমান প্রজনন ক্ষেত্রে পেঁৗছে যাবে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল, এই প্রকল্পে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখেই প্রকল্পের উপাদানগুলো ঠিক করা এবং মিঠাপানির সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে লোনাপানির আগ্রাসন ঠেকানোর সুষ্ঠু পরিকল্পনা হাতে নেয়া। অথচ প্রকল্পে বরং উল্টোটাই করা হয়েছে।
আর তাই কারো কানে পেঁৗছায়নি হালদার আর্তনাদ। কয়েক দশক ধরে প্রাকৃতিক এই মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রে ডিমের পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো নিয়েও খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। কারণগুলো হলো_জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ত পানির আগ্রাসন, কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ, নদীর দুপাশের উপখালগুলোতে অপরিকল্পিত স্লুইস গেইট ও বাঁধ নির্মাণে মিঠাপানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ১১টি বাঁক কেটে দেওয়ার কারণে নদীর দৈর্ঘ্য ২৫ কি.মি. (বর্তমান দৈর্ঘ্য ৯৮ কি.মি.) কমে যাওয়ায় উজানের দিকে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির আগ্রাসন।
জানা গেছে, হালদার বুকে সংসার পেতেছে ৭৬ প্রজাতির মাছ। নদীর দুপাশে জীববৈচিত্র্য তো আছেই। কেচকি, ঘনি চাপলা, ফাইশ্যা, ফলি থেকে মলা, বাইলার বিরল সমাহার এখানে। কারণ একটিই_এই নদী এখনো দূষণের হাতে পড়েনি। এখন প্রশ্ন হলো_এত সম্ভাবনার হালদা কি বাঁচবে না? এ নদী বাঁচলে শুধু একটি নদীই বেঁচে যাবে না। দেশ পাবে একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। রক্ষা পাবে ঐতিহ্য। হালদা বাঁচলে বদলে যাবে ফটিকছড়ি, হাটহাজারী আর রাউজান উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকা, বেঁচে যাবে কোটি টাকার মাছ। আর হালদার জীবন প্রবাহ থেমে যাওয়ার সঙ্গে বিদায় ঘণ্টা বাজবে নদীর ৭৫ প্রজাতির মাছেরও। তীরের বক, গয়ালসহ কয়েক শ প্রজাতির পাখির কলকাকলি সুরের কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকবে নদীর বুকে!
হালদা নদীর ওয়েবসাইট www,haldariver.org উদ্বোধন হলো চট্টগ্রামে। এই সাইটে হালদা নদীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌলিক তথ্যভাণ্ডারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদী সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার পথটাও সহজ হয়ে গেল। আর নদী রক্ষার এ উদ্যোগের কেন্দ্রে আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া।
« পূর্ববর্তী সংবাদ |
সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন, উপদেষ্টা সম্পাদক : অমিত হাবিব, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com








